Categories
গল্প

শেষ বেঞ্চের ছেলেটা।

স্কুলের শেষ বেঞ্চটায় সবসময় একাই বসত অর্ণব।

ক্লাসের অন্য ছেলেরা তাকে খুব একটা পছন্দ করত না। কেউ বলত, সে পড়াশোনায় দুর্বল। কেউ বলত, সবসময় চুপ করে থাকে বলে নিশ্চয়ই অহংকারী।

শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না।

শুধু বাংলা শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু মাঝে মাঝে তার পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন,

—“অর্ণব, তুই এত চুপ করে থাকিস কেন?”

অর্ণব মৃদু হেসে বলত,

—“কথা বলার মতো কেউ নেই স্যার।”

অনিরুদ্ধবাবু আর কিছু বলতেন না।

একদিন ক্লাসে রচনা লিখতে দেওয়া হল—
‘আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।’

সবাই লিখতে শুরু করল।

কেউ লিখল বাবা।
কেউ মা।
কেউ দাদু-ঠাকুমার কথা।

অর্ণব অনেকক্ষণ খাতা ফাঁকা রেখে বসে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করল।

পরদিন খাতা দেখতে গিয়ে অনিরুদ্ধবাবু অর্ণবের লেখাটা পড়ে থমকে গেলেন।

মাত্র কয়েকটি লাইন—

“আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির নাম আমি জানি না।

প্রতিদিন সকালে স্কুলে আসার সময় গেটের বাইরে একজন বৃদ্ধকে দেখি। তিনি আমাকে দেখে হাসেন। কোনওদিন কথা বলেননি। কিন্তু যেদিন আমার টিফিন থাকে না, সেদিন তিনি নিজের রুটির অর্ধেকটা আমার হাতে দেন।

আমি জানি না তিনি আমার কে।

কিন্তু পৃথিবীতে যিনি না জেনেও আমার ক্ষুধা বোঝেন, তিনিই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।”

অনিরুদ্ধবাবুর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি পরদিন স্কুল ছুটির পর অর্ণবকে ডেকে বললেন,

—“ওই বৃদ্ধ মানুষটার নাম জানিস?”

অর্ণব মাথা নাড়ল।

দু’জনে স্কুলের গেটের বাইরে গেলেন।

কিন্তু সেদিন বৃদ্ধটি সেখানে ছিলেন না।

পরের দিনও না।

তৃতীয় দিনও না।

অর্ণব চুপ হয়ে গেল।

এক সপ্তাহ পর এক সকালে স্কুলে এসে অর্ণব দেখল, গেটের পাশে একটা ছোট বেঞ্চ রাখা হয়েছে।

বেঞ্চটির পাশে একটি ফলক।

লেখা—

“যে মানুষটি নিজের রুটি ভাগ করে অন্যের ক্ষুধা মেটাতেন, তাঁর স্মৃতিতে।”

অর্ণব অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

অনিরুদ্ধবাবু পাশে এসে বললেন,

—“উনি আর নেই, অর্ণব।”

অর্ণব কিছু বলল না।

—“উনার নাম ছিল হরিপদ কাকা। উনি কোনওদিন স্কুলে পড়েননি। কিন্তু তোর লেখা পড়ে বুঝলাম, উনি তোকে যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, সেটা অনেক বড়।”

অর্ণব বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর পকেট থেকে নিজের টিফিনের বাক্সটা বের করল।

বাক্স খুলে অর্ধেক খাবার বেঞ্চের ওপর রেখে দিল।

অনিরুদ্ধবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা কী করছিস?”

অর্ণব বলল,

—“কেউ যদি ক্ষুধার্ত হয়ে আসে…”

কথাটা শেষ করতে পারল না।

অনিরুদ্ধবাবু তার মাথায় হাত রাখলেন।

সেদিন থেকে স্কুলের সেই বেঞ্চটি আর শুধু বসার জায়গা রইল না।

প্রতিদিন সেখানে কেউ না কেউ নিজের টিফিনের কিছুটা রেখে যেত।

কেউ বিস্কুট।

কেউ ফল।

কেউ রুটি।

আর অর্ণব?

সে আর শেষ বেঞ্চে একা বসত না।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

কখনও কখনও একজন মানুষের ছোট্ট ভালোবাসা, অন্য একজন মানুষের পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

চায়ের দোকানের শেষ কাপ।

শীতের সকাল।

গ্রামের বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালাত গোপাল।

দোকান বলতে বাঁশের খুঁটি, টিনের চাল আর সামনে তিনটে কাঠের বেঞ্চ।

সকাল হলেই সেখানে ভিড় জমত।

কেউ চা খেতে আসত, কেউ খবরের কাগজ পড়তে, কেউ আবার শুধু গল্প করতে।

গোপালের দোকানের একটা নিয়ম ছিল।

যে-ই আসুক, প্রথম কাপ চা বাকিতে দেওয়া যায়।

গ্রামের লোকেরা হাসত।

“এই নিয়ম করে ব্যবসা চলে?”

গোপাল বলত,

“চা এক কাপের দাম বেশি নয়। কিন্তু কারও যদি পকেটে টাকা না থাকে, তাকে খালি মুখে ফেরানো যায়?”

একদিন সকালে দোকানে এলেন এক বৃদ্ধ।

পরনে পুরনো ধুতি-পাঞ্জাবি।

কাঁধে একটি কাপড়ের ব্যাগ।

চুপচাপ এসে শেষ বেঞ্চটায় বসে বললেন,

“এক কাপ চা হবে?”

“অবশ্যই।”

গোপাল চা বানিয়ে দিল।

বৃদ্ধ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,

“কত?”

“পাঁচ টাকা।”

বৃদ্ধ পকেট হাতড়ালেন।

তারপর মুখটা একটু নিচু করে বললেন,

“আজ টাকা নেই।”

গোপাল হেসে বলল,

“কাল দেবেন।”

বৃদ্ধ তাকালেন।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

“না।”

“তাহলে বিশ্বাস করছেন?”

গোপাল চায়ের কেটলি নামাতে নামাতে বলল,

“চা খাওয়ার জন্য মানুষকে আগে চিনতে হয় নাকি?”

বৃদ্ধ কিছু বললেন না।

পরদিন আবার এলেন।

আবার এক কাপ চা।

আবার টাকা নেই।

এভাবে টানা সাত দিন।

গ্রামের লোকজন এবার মজা করতে শুরু করল।

“গোপাল, লোকটা তোকে বোকা বানাচ্ছে।”

“সাত দিনের টাকা একসঙ্গে নিয়ে পালাবে!”

গোপাল শুধু হাসত।

অষ্টম দিন বৃদ্ধ এলেন না।

নবম দিনও না।

দশম দিনও না।

গোপালের কেমন যেন খারাপ লাগতে শুরু করল।

সে বুঝতে পারছিল না কেন।

লোকটাকে সে চিনত না।

তবুও যেন প্রতিদিন দোকানে একটা পরিচিত মুখের অপেক্ষা করছিল।

এক সপ্তাহ পর দুপুরে একটি বড় গাড়ি এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল।

গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন ভদ্রলোক।

সঙ্গে দু’জন কর্মচারী।

তিনি গোপালকে জিজ্ঞেস করলেন,

“আপনিই গোপাল?”

“হ্যাঁ।”

“আপনার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ প্রতিদিন চা খেতে আসতেন?”

গোপালের বুক ধক করে উঠল।

“হ্যাঁ। কী হয়েছে?”

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“উনি আমার বাবা।”

গোপাল অবাক।

“আপনার বাবা কোথায়?”

ভদ্রলোক ধীরে বললেন,

“দশ দিন আগে উনি মারা গেছেন।”

গোপাল স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কিন্তু… উনি তো তার পরের দিনও এখানে এসেছিলেন!”

ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন।

“জানি।”

তিনি পকেট থেকে একটি খাম বের করলেন।

“বাবা মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।”

“কী?”

“বলেছিলেন—‘আমার মৃত্যুর পর বাসস্ট্যান্ডের গোপালের কাছে যেও।’”

গোপাল খামটা নিল।

ভেতরে একটি ছোট্ট চিঠি।

“গোপাল,

তুই আমাকে চেনিস না।

কিন্তু আমি তোকে অনেকদিন ধরে দেখেছি।

প্রতিদিন দোকানে বসে দেখতাম—কেউ টাকা না দিলে তুই তাকে চা খেতে দিস।

একদিন একজন বৃদ্ধকে বিনা পয়সায় চা খেতে দেখে বুঝলাম, মানুষের কাছে এখনও মানুষের দাম আছে।

তাই গত কয়েকদিন ইচ্ছে করেই টাকা না দিয়ে চা খেয়েছি।

তোর বিশ্বাসটা পরীক্ষা করার জন্য নয়।

নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য—এই পৃথিবী এখনও পুরোপুরি বদলে যায়নি।

আমার ছেলে বড় ব্যবসায়ী।

অনেক টাকা আছে।

কিন্তু আমি চাই, আমার মৃত্যুর পর কিছু টাকা এমন কাজে লাগুক, যার মূল্য টাকায় মাপা যায় না।

তাই এই দোকানটার সামনে একটা পাকা ছাউনি করে দিস।

আর পাশে একটা বেঞ্চ।

যাতে বৃষ্টির দিনে পথের মানুষ দাঁড়াতে পারে।

টাকাটা আমার ছেলে দেবে।

শুধু একটা শর্ত—

চায়ের দাম যেন কোনওদিন মানুষের সামর্থ্য দেখে ঠিক না করিস।

যার আছে, সে দেবে।

যার নেই, সে শুধু চা খেয়ে যাবে।

—একজন অচেনা চা-খোর।”

চিঠি পড়ে গোপালের চোখ ভিজে গেল।

বৃদ্ধের ছেলে বললেন,

“বাবা আপনার দোকানটা খুব পছন্দ করতেন।”

গোপাল নিচু গলায় বলল,

“উনি প্রতিদিন শেষ বেঞ্চটায় বসতেন।”

“জানি।”

“ওই বেঞ্চটা আমি কাউকে বসতে দেব না।”

ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকালেন।

“কেন?”

গোপাল বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ উনি হয়তো আবার চা খেতে আসবেন।”

ভদ্রলোকের চোখও ভিজে গেল।

কয়েক মাস পর দোকানটার সামনে পাকা ছাউনি হলো।

একটি নতুন বেঞ্চও বসানো হলো।

বেঞ্চটির পাশে ছোট্ট একটি কাঠের ফলক।

তাতে লেখা—

“যার পকেটে টাকা নেই, তার জন্য এই বেঞ্চ আর এক কাপ চা সবসময় আছে।”

সেদিন থেকে গোপালের দোকানে আরও অনেক মানুষ আসতে লাগল।

কেউ পাঁচ টাকা দিত।

কেউ দশ টাকা।

কেউ কিছুই দিত না।

গোপাল কাউকে জিজ্ঞেস করত না।

শুধু চা এগিয়ে দিত।

আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে সে শেষ বেঞ্চটার দিকে একবার তাকিয়ে বলত,

“কাকা, আজও চা বাকি রইল।”

তারপর কেটলিটা নামিয়ে রাখত।

কারণ কিছু ঋণ টাকা দিয়ে শোধ হয় না।

কিছু মানুষ চলে গেলেও,

তাদের রেখে যাওয়া এক কাপ চায়ের উষ্ণতা অনেকদিন থেকে যায়।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

গল্প :: শেষ ট্রেনের যাত্রী।।।

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ছোট্ট স্টেশনটির নাম শিমুলতলা। দিনের বেলায় স্টেশনটিতে বেশ ভিড় থাকে, কিন্তু রাত বাড়তেই চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। প্ল্যাটফর্মের দু’টি হলুদ আলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর তার সঙ্গে মিশে ছিল হালকা বৃষ্টির শব্দ।

স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একা বসে ছিলেন অরুণবাবু।

বয়স প্রায় ষাট। হাতে পুরনো একটি চামড়ার ব্যাগ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি।

শেষ ট্রেনটি আসার কথা রাত এগারোটায়।

অরুণবাবু জানতেন, এই ট্রেনটিই তাঁকে সেই গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর আগে চলে এসেছিলেন।

কেন ফিরছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেও ঠিক জানতেন না।

চল্লিশ বছর আগে এই স্টেশনেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছিল।

তখন তিনি তরুণ। সদ্য কলেজ পাশ করেছেন। চাকরির জন্য শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর জীবনে এসেছিল মেঘলা।

মেঘলা ছিল পাশের গ্রামের মেয়ে। খুব সাধারণ, শান্ত স্বভাবের। অরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল গ্রামের লাইব্রেরিতে।

দু’জনের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা।

কিন্তু অরুণের বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেননি।

তিনি চেয়েছিলেন অরুণ শহরে গিয়ে ভালো চাকরি করুক, বড়লোক পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করুক।

একদিন অরুণকে শহরে যাওয়ার জন্য জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন স্টেশনে মেঘলা এসেছিল।

অরুণের ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে মেঘলা বলেছিল,

“তুমি যদি আজ চলে যাও, আমি অপেক্ষা করব।”

অরুণ কিছু বলতে পারেননি।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল।

আর তারপর?

জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।

চাকরি, বিয়ে, সংসার, সন্তান—সবই হয়েছিল।

কিন্তু মেঘলার কথা কখনও পুরোপুরি ভুলতে পারেননি তিনি।

বছর দশেক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একদিন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে অরুণ একটি চিঠি পেয়েছিলেন।

মেঘলার লেখা।

চিঠিটি তিনি কখনও পাননি।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি কথা ছিল—

“অরুণ, তুমি যদি ফিরে আসো, আমি এখনও অপেক্ষা করব। তবে তোমার জন্য নয়, তোমার সঙ্গে একবার কথা বলার জন্য।”

চিঠির তারিখ ছিল আজ থেকে তিরিশ বছর আগের।

চিঠিটি পড়ার পর অরুণ বহুবার মেঘলাকে খুঁজেছিলেন।

কিন্তু পারেননি।

কেউ বলেছিল, মেঘলা বিয়ে করে অন্য শহরে চলে গেছে।

কেউ বলেছিল, সে নাকি বিয়েই করেনি।

কেউ আবার বলেছিল, মেঘলা বহু বছর আগে মারা গেছে।

কোনটা সত্যি, অরুণ জানতেন না।

আজ হঠাৎ কেন যেন তাঁর মনে হল—একবার সেই গ্রামে ফিরে যাওয়া দরকার।

হয়তো মেঘলা নেই।

হয়তো সবকিছু বদলে গেছে।

তবুও যেতে হবে।

ঠিক তখনই স্টেশনের অন্ধকার দিক থেকে একটি ছোট্ট ছেলে এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল।

ছেলেটির বয়স দশ-এগারোর বেশি নয়।

পরনে ভেজা জামা।

সে অরুণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি অরুণকাকু?”

অরুণ চমকে উঠলেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমাকে চেনো?”

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,

“চিনি না। তবে আপনাকে চিনতে বলেছে।”

“কে?”

ছেলেটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করল।

“এটা আপনাকে দিতে বলেছে।”

অরুণ কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।

খামের ওপর লেখা—

অরুণের জন্য।

হাতের লেখাটা তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললেন।

মেঘলা।

চোখ ঝাপসা হয়ে এল তাঁর।

“মেঘলা কোথায়?”

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমার ঠাকুমা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

অরুণের বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল।

“তোমার ঠাকুমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল,

“মেঘলা।”

কথাটা শুনে অরুণ যেন পাথর হয়ে গেলেন।

এত বছর পরও?

মেঘলা বেঁচে আছে?

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ছেলেটি বলল,

“চলুন। ঠাকুমা বলেছে, শেষ ট্রেনটা যেন আপনি মিস না করেন।”

অরুণ ব্যাগটা তুলে দাঁড়ালেন।

চল্লিশ বছর আগে যে ট্রেনে তিনি মেঘলাকে পিছনে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, আজ সেই একই রকম একটি শেষ ট্রেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেন ছাড়ল।

জানালার পাশে বসে অরুণ খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

মাত্র এক লাইন লেখা—

“এবার আর তোমাকে যেতে দেব না—তবে এবার তোমাকে আমার কাছে থাকতে হবে না, শুধু একবার সত্যিটা শুনে যেও।”

অরুণের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

বাইরে অন্ধকার ছুটে চলছিল।

আর তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবনে কিছু ট্রেন দেরিতে এলেও, তাদের গন্তব্য কখনও হারিয়ে যায় না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প

গল্প :: পুরনো ছাতা।।

বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল রতন।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান চালায় সে। সারাদিন দোকানে বসে থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরাই তার প্রতিদিনের নিয়ম।

সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি নেমে গেল।

রতনের হাতে ছিল একটা পুরনো কালো ছাতা।

ছাতাটার একটা শিক বাঁকা, কাপড়ের কয়েক জায়গায় সেলাই করা। দেখতে এতটাই পুরনো যে কেউ দেখলে হয়তো ফেলে দিতে বলত।

কিন্তু রতন ছাতাটা ফেলতে পারত না।

কারণ ছাতাটা তার বাবার।

বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর ঘরের আলমারি থেকে এই ছাতাটাই শুধু নিজের কাছে রেখেছিল রতন।

বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রতন দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন।

বৃদ্ধার হাতে কোনও ছাতা নেই।

বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে।

রতন নিজের ছাতাটা একটু এগিয়ে ধরল।

“মাসিমা, কোথায় যাবেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“আর একটু সামনে। ওই বাঁশবাগানের পরেই আমার বাড়ি।”

রতন বলল,

“চলুন, আমি দিয়ে আসছি।”

দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা ছাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ছাতাটা খুব পুরনো দেখছি।”

রতন হেসে বলল,

“হ্যাঁ। অনেক পুরনো।”

“ফেলে দেননি কেন?”

রতন একটু চুপ করে থেকে বলল,

“যার ছিল, সে আমার কাছে খুব দামি ছিল।”

বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না।

বাঁশবাগান পেরিয়ে তাঁরা একটি ছোট্ট মাটির বাড়ির সামনে পৌঁছলেন।

বৃদ্ধা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে বললেন,

“কাল একবার আমার বাড়িতে এসো।”

রতন অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“একটা জিনিস দেখাব।”

পরদিন বিকেলে রতন সত্যিই গেল।

বৃদ্ধা তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন।

দেয়ালের পাশে রাখা ছিল একটি পুরনো কাঠের বাক্স।

বৃদ্ধা বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে কিছু পুরনো চিঠি, একটি ঘড়ি আর কয়েকটি সাদা-কালো ছবি।

তারপর একটি ছবি রতনের হাতে দিলেন।

ছবিটা দেখে রতন স্তব্ধ হয়ে গেল।

ছবিতে তার বাবা।

আর বাবার পাশে এই বৃদ্ধা।

রতন কাঁপা গলায় বলল,

“আপনি… আমার বাবাকে চিনতেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,

“চিনতাম না। তোমার বাবাই একদিন আমাকে চিনেছিলেন।”

রতন কিছু বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

“প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি খুব কষ্টে দিন কাটাতাম। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে বাজার থেকে ফিরছিলাম। তখন তোমার বাবা আমাকে নিজের ছাতা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন।”

রতন চুপ করে শুনছিল।

“আমি ছাতাটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা বলেছিলেন, ‘আপনার দরকার বেশি। রেখে দিন।’”

বৃদ্ধা একটু থামলেন।

“কিন্তু আমি রাখিনি। পরদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে ছাতাটা দিয়ে এসেছিলাম।”

রতন নিজের হাতে থাকা ছাতাটার দিকে তাকাল।

“তারপর?”

বৃদ্ধা বললেন,

“কয়েক বছর পর তোমার বাবা আবার আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ছাতাটা কি এখনও আছে?’”

“আমি বলেছিলাম, নেই।”

“তখন তিনি হেসে বলেছিলেন—‘থাক, ছাতা না থাকলেও স্মৃতিটা থাকুক।’”

রতনের চোখ ভিজে গেল।

সে বুঝতে পারল, এতদিন যে ছাতাটাকে সে শুধু বাবার স্মৃতি বলে জানত, তার সঙ্গে আরও একটি মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।

বৃদ্ধা বাক্স থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করলেন।

“এটা তোমার বাবার লেখা।”

রতন কাগজটি খুলল।

সেখানে লেখা—

“মানুষের জীবনে বড় কিছু করার সুযোগ সবসময় আসে না। কিন্তু বৃষ্টির দিনে কারও মাথার ওপর নিজের ছাতাটা ধরার সুযোগ প্রায়ই আসে।”

রতন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

চোখের জল মুছে সে বলল,

“মাসিমা, আমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।”

বৃদ্ধা হেসে বললেন,

“তোমার বাবা ভালো ছিলেন বলেই তো তুমি আজ এই পুরনো ছাতাটা নিয়ে আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছ।”

বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

রতন ছাতাটা খুলে বৃদ্ধার মাথার ওপর ধরল।

বৃদ্ধা বললেন,

“আজ ছাতাটা তোমার।”

রতন মৃদু হেসে উত্তর দিল,

“না মাসিমা। এটা আমার বাবার ছিল। এখন থেকে এটা আমাদের।”

দু’জন ধীরে ধীরে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করল।

পুরনো ছাতাটার নিচে দু’জন মানুষ।

আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল একজন মৃত মানুষের রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : শেষ ট্রেনের যাত্রী।

 

রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা। ছোট্ট স্টেশনটির নাম শিমুলতলা। দিনের বেলায় স্টেশনটিতে বেশ ভিড় থাকে, কিন্তু রাত বাড়তেই চারপাশ যেন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। প্ল্যাটফর্মের দু’টি হলুদ আলো মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছিল। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, আর তার সঙ্গে মিশে ছিল হালকা বৃষ্টির শব্দ।

স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে একা বসে ছিলেন অরুণবাবু।

বয়স প্রায় ষাট। হাতে পুরনো একটি চামড়ার ব্যাগ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন তিনি।

শেষ ট্রেনটি আসার কথা রাত এগারোটায়।

অরুণবাবু জানতেন, এই ট্রেনটিই তাঁকে সেই গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে তিনি প্রায় চল্লিশ বছর আগে চলে এসেছিলেন।

কেন ফিরছেন?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেও ঠিক জানতেন না।

চল্লিশ বছর আগে এই স্টেশনেই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি হয়েছিল।

তখন তিনি তরুণ। সদ্য কলেজ পাশ করেছেন। চাকরির জন্য শহরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই সময় তাঁর জীবনে এসেছিল মেঘলা।

মেঘলা ছিল পাশের গ্রামের মেয়ে। খুব সাধারণ, শান্ত স্বভাবের। অরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল গ্রামের লাইব্রেরিতে।

দু’জনের মধ্যে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব, তারপর ভালোবাসা।

কিন্তু অরুণের বাবা এই সম্পর্ক মেনে নেননি।

তিনি চেয়েছিলেন অরুণ শহরে গিয়ে ভালো চাকরি করুক, বড়লোক পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করুক।

একদিন অরুণকে শহরে যাওয়ার জন্য জোর করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সেদিন স্টেশনে মেঘলা এসেছিল।

অরুণের ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে মেঘলা বলেছিল,

“তুমি যদি আজ চলে যাও, আমি অপেক্ষা করব।”

অরুণ কিছু বলতে পারেননি।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছিল।

আর তারপর?

জীবন তাঁকে অনেক দূরে নিয়ে গিয়েছিল।

চাকরি, বিয়ে, সংসার, সন্তান—সবই হয়েছিল।

কিন্তু মেঘলার কথা কখনও পুরোপুরি ভুলতে পারেননি তিনি।

বছর দশেক আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একদিন পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে অরুণ একটি চিঠি পেয়েছিলেন।

মেঘলার লেখা।

চিঠিটি তিনি কখনও পাননি।

চিঠিতে মাত্র কয়েকটি কথা ছিল—

“অরুণ, তুমি যদি ফিরে আসো, আমি এখনও অপেক্ষা করব। তবে তোমার জন্য নয়, তোমার সঙ্গে একবার কথা বলার জন্য।”

চিঠির তারিখ ছিল আজ থেকে তিরিশ বছর আগের।

চিঠিটি পড়ার পর অরুণ বহুবার মেঘলাকে খুঁজেছিলেন।

কিন্তু পারেননি।

কেউ বলেছিল, মেঘলা বিয়ে করে অন্য শহরে চলে গেছে।

কেউ বলেছিল, সে নাকি বিয়েই করেনি।

কেউ আবার বলেছিল, মেঘলা বহু বছর আগে মারা গেছে।

কোনটা সত্যি, অরুণ জানতেন না।

আজ হঠাৎ কেন যেন তাঁর মনে হল—একবার সেই গ্রামে ফিরে যাওয়া দরকার।

হয়তো মেঘলা নেই।

হয়তো সবকিছু বদলে গেছে।

তবুও যেতে হবে।

ঠিক তখনই স্টেশনের অন্ধকার দিক থেকে একটি ছোট্ট ছেলে এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল।

ছেলেটির বয়স দশ-এগারোর বেশি নয়।

পরনে ভেজা জামা।

সে অরুণের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি কি অরুণকাকু?”

অরুণ চমকে উঠলেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আমাকে চেনো?”

ছেলেটি মৃদু হেসে বলল,

“চিনি না। তবে আপনাকে চিনতে বলেছে।”

“কে?”

ছেলেটি পকেট থেকে একটি ছোট্ট খাম বের করল।

“এটা আপনাকে দিতে বলেছে।”

অরুণ কাঁপা হাতে খামটি নিলেন।

খামের ওপর লেখা—

অরুণের জন্য।

হাতের লেখাটা তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিনে ফেললেন।

মেঘলা।

চোখ ঝাপসা হয়ে এল তাঁর।

“মেঘলা কোথায়?”

ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“আমার ঠাকুমা আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”

অরুণের বুকের ভেতরটা যেন থমকে গেল।

“তোমার ঠাকুমার নাম কী?”

ছেলেটি বলল,

“মেঘলা।”

কথাটা শুনে অরুণ যেন পাথর হয়ে গেলেন।

এত বছর পরও?

মেঘলা বেঁচে আছে?

ট্রেনের হুইসেল শোনা গেল।

ছেলেটি বলল,

“চলুন। ঠাকুমা বলেছে, শেষ ট্রেনটা যেন আপনি মিস না করেন।”

অরুণ ব্যাগটা তুলে দাঁড়ালেন।

চল্লিশ বছর আগে যে ট্রেনে তিনি মেঘলাকে পিছনে ফেলে চলে গিয়েছিলেন, আজ সেই একই রকম একটি শেষ ট্রেন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ট্রেন ছাড়ল।

জানালার পাশে বসে অরুণ খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

মাত্র এক লাইন লেখা—

“এবার আর তোমাকে যেতে দেব না—তবে এবার তোমাকে আমার কাছে থাকতে হবে না, শুধু একবার সত্যিটা শুনে যেও।”

অরুণের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

বাইরে অন্ধকার ছুটে চলছিল।

আর তাঁর মনে হচ্ছিল, জীবনে কিছু ট্রেন দেরিতে এলেও, তাদের গন্তব্য কখনও হারিয়ে যায় না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

গল্প : পুরনো ছাতাটা।

বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিল রতন।

বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান চালায় সে। সারাদিন দোকানে বসে থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরাই তার প্রতিদিনের নিয়ম।

সেদিন আকাশটা সকাল থেকেই মেঘলা ছিল। সন্ধ্যার পর হঠাৎ বৃষ্টি নেমে গেল।

রতনের হাতে ছিল একটা পুরনো কালো ছাতা।

ছাতাটার একটা শিক বাঁকা, কাপড়ের কয়েক জায়গায় সেলাই করা। দেখতে এতটাই পুরনো যে কেউ দেখলে হয়তো ফেলে দিতে বলত।

কিন্তু রতন ছাতাটা ফেলতে পারত না।

কারণ ছাতাটা তার বাবার।

বাবা মারা যাওয়ার পর তাঁর ঘরের আলমারি থেকে এই ছাতাটাই শুধু নিজের কাছে রেখেছিল রতন।

বৃষ্টির মধ্যে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ রতন দেখল, রাস্তার ধারে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন।

বৃদ্ধার হাতে কোনও ছাতা নেই।

বৃষ্টি ক্রমশ বাড়ছে।

রতন নিজের ছাতাটা একটু এগিয়ে ধরল।

“মাসিমা, কোথায় যাবেন?”

বৃদ্ধা বললেন,

“আর একটু সামনে। ওই বাঁশবাগানের পরেই আমার বাড়ি।”

রতন বলল,

“চলুন, আমি দিয়ে আসছি।”

দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধা ছাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“ছাতাটা খুব পুরনো দেখছি।”

রতন হেসে বলল,

“হ্যাঁ। অনেক পুরনো।”

“ফেলে দেননি কেন?”

রতন একটু চুপ করে থেকে বলল,

“যার ছিল, সে আমার কাছে খুব দামি ছিল।”

বৃদ্ধা আর কিছু বললেন না।

বাঁশবাগান পেরিয়ে তাঁরা একটি ছোট্ট মাটির বাড়ির সামনে পৌঁছলেন।

বৃদ্ধা দরজা খুলে ভেতরে ঢোকার আগে বললেন,

“কাল একবার আমার বাড়িতে এসো।”

রতন অবাক হয়ে বলল,

“কেন?”

“একটা জিনিস দেখাব।”

পরদিন বিকেলে রতন সত্যিই গেল।

বৃদ্ধা তাকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন।

দেয়ালের পাশে রাখা ছিল একটি পুরনো কাঠের বাক্স।

বৃদ্ধা বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে কিছু পুরনো চিঠি, একটি ঘড়ি আর কয়েকটি সাদা-কালো ছবি।

তারপর একটি ছবি রতনের হাতে দিলেন।

ছবিটা দেখে রতন স্তব্ধ হয়ে গেল।

ছবিতে তার বাবা।

আর বাবার পাশে এই বৃদ্ধা।

রতন কাঁপা গলায় বলল,

“আপনি… আমার বাবাকে চিনতেন?”

বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন,

“চিনতাম না। তোমার বাবাই একদিন আমাকে চিনেছিলেন।”

রতন কিছু বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

“প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আমি খুব কষ্টে দিন কাটাতাম। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে বাজার থেকে ফিরছিলাম। তখন তোমার বাবা আমাকে নিজের ছাতা দিয়ে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন।”

রতন চুপ করে শুনছিল।

“আমি ছাতাটা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমার বাবা বলেছিলেন, ‘আপনার দরকার বেশি। রেখে দিন।’”

বৃদ্ধা একটু থামলেন।

“কিন্তু আমি রাখিনি। পরদিন তাঁর বাড়িতে গিয়ে ছাতাটা দিয়ে এসেছিলাম।”

রতন নিজের হাতে থাকা ছাতাটার দিকে তাকাল।

“তারপর?”

বৃদ্ধা বললেন,

“কয়েক বছর পর তোমার বাবা আবার আমার কাছে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ছাতাটা কি এখনও আছে?’”

“আমি বলেছিলাম, নেই।”

“তখন তিনি হেসে বলেছিলেন—‘থাক, ছাতা না থাকলেও স্মৃতিটা থাকুক।’”

রতনের চোখ ভিজে গেল।

সে বুঝতে পারল, এতদিন যে ছাতাটাকে সে শুধু বাবার স্মৃতি বলে জানত, তার সঙ্গে আরও একটি মানুষের জীবন জড়িয়ে আছে।

বৃদ্ধা বাক্স থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করলেন।

“এটা তোমার বাবার লেখা।”

রতন কাগজটি খুলল।

সেখানে লেখা—

“মানুষের জীবনে বড় কিছু করার সুযোগ সবসময় আসে না। কিন্তু বৃষ্টির দিনে কারও মাথার ওপর নিজের ছাতাটা ধরার সুযোগ প্রায়ই আসে।”

রতন আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

চোখের জল মুছে সে বলল,

“মাসিমা, আমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন।”

বৃদ্ধা হেসে বললেন,

“তোমার বাবা ভালো ছিলেন বলেই তো তুমি আজ এই পুরনো ছাতাটা নিয়ে আমার বাড়ি পর্যন্ত এসেছ।”

বাইরে তখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।

রতন ছাতাটা খুলে বৃদ্ধার মাথার ওপর ধরল।

বৃদ্ধা বললেন,

“আজ ছাতাটা তোমার।”

রতন মৃদু হেসে উত্তর দিল,

“না মাসিমা। এটা আমার বাবার ছিল। এখন থেকে এটা আমাদের।”

দু’জন ধীরে ধীরে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে শুরু করল।

পুরনো ছাতাটার নিচে দু’জন মানুষ।

আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল একজন মৃত মানুষের রেখে যাওয়া ভালোবাসা।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

জানালার ওপাশে আলো।

প্রতিদিন রাত ঠিক দশটায় নীলার বাড়ির পাশের পুরনো বাড়িটিতে একটি আলো জ্বলে উঠত।

তারপর রাত বারোটায় ঠিক একইভাবে আলোটি নিভে যেত।

বছরের পর বছর ধরে একই ঘটনা।

বাড়িটা বহুদিন ধরে তালাবন্ধ। জানালাগুলো ধুলোয় ঢাকা, দেওয়ালের রং উঠে গেছে, উঠোনে আগাছা।

নীলা ছোটবেলা থেকেই বাড়িটাকে দেখে আসছে।

তার ঠাকুমা বলতেন,

“ও বাড়ির দিকে বেশি তাকাস না।”

“কেন?”

“কিছু বাড়ির দরজা বন্ধ থাকাই ভালো।”

কিন্তু নীলার কৌতূহল বরাবরই বেশি।

বিশেষ করে সেই আলোটা নিয়ে।

কারণ আলোটা কোনও সাধারণ আলো ছিল না।

প্রতিদিন রাত দশটায় ঠিক একটি জানালার ভেতর থেকে হলুদ আলো দেখা যেত।

কেউ যেন ঘরের মধ্যে বসে আছে।

এক রাতে নীলা সাহস করে বাড়িটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

লোহার গেট তালাবন্ধ।

ভেতরে কেউ নেই।

কিন্তু জানালায় আলো জ্বলছে।

নীলা ফোনের টর্চ জ্বেলে জানালার কাছে গেল।

ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।

টক… টক… টক…

কেউ যেন জানালায় হাত দিয়ে টোকা দিচ্ছে।

নীলা ভয়ে পিছিয়ে এল।

তারপর আবার শব্দ।

টক… টক… টক…

সে দৌড়ে নিজের বাড়িতে ফিরে গেল।

পরদিন সকালে পাশের বাড়ির বৃদ্ধ হরিপদ কাকুকে ঘটনাটা বলল।

হরিপদ কাকু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“তুই আলোটা দেখেছিস?”

“হ্যাঁ।”

“জানালায় কাউকে দেখেছিস?”

“না।”

হরিপদ কাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এই বাড়িতে একসময় একজন শিক্ষক থাকতেন। নাম ছিল অনিরুদ্ধবাবু।”

“তারপর?”

“একদিন হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন।”

“কোথায়?”

“কেউ জানে না।”

নীলা জিজ্ঞেস করল,

“আর ওই আলো?”

হরিপদ কাকু বললেন,

“অনিরুদ্ধবাবু প্রতিদিন রাত দশটায় পড়ার টেবিলের বাতি জ্বালিয়ে বসতেন। রাত বারোটায় আলো নিভিয়ে ঘুমোতেন।”

নীলার শরীর শিউরে উঠল।

“কিন্তু উনি তো নেই!”

হরিপদ কাকু বললেন,

“সেটাই তো রহস্য।”

সেদিন রাতে নীলা আর ঘুমোতে পারল না।

রাত দশটা বাজতেই আবার আলো জ্বলে উঠল।

কিছুক্ষণ পর জানালায় আবার—

টক… টক… টক…

নীলা এবার জানালার কাছে গেল।

কিন্তু এবার সে ভয় পেল না।

জানালার কাঁচে কুয়াশার মতো একটা আস্তরণ জমেছিল।

তার ওপর ধীরে ধীরে আঙুলের দাগ ফুটে উঠল।

তারপর তিনটি শব্দ—

“বইটা খুঁজে দেখো।”

নীলা হতভম্ব হয়ে গেল।

পরদিন সে হরিপদ কাকুকে সব বলল।

তিনি অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললেন,

“অনিরুদ্ধবাবুর একটা পুরনো লাইব্রেরি ছিল।”

দু’জনে মিলে বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়ে তালা খুললেন।

ঘরের ভেতরে ঢুকতেই পুরনো বইয়ের গন্ধ।

একটি ঘরে শত শত বই।

নীলা বইয়ের তাকগুলো দেখতে লাগল।

হঠাৎ একটি মোটা বই মেঝেতে পড়ে গেল।

বইটির নাম—

“মানুষের কাছে মানুষের ঋণ”

বইটি খুলতেই মাঝখান থেকে একটি পুরনো খাম পড়ে গেল।

খামের ওপর লেখা—

“যে এই চিঠি পাবে, সে যেন সত্যিটা জানে।”

চিঠিতে লেখা ছিল—

অনিরুদ্ধবাবু শিক্ষকতা করার পাশাপাশি গ্রামের দরিদ্র শিশুদের পড়াতেন।

কিন্তু গ্রামের কিছু প্রভাবশালী মানুষ তাঁর এই কাজ পছন্দ করত না। কারণ তিনি গ্রামের গরিব মানুষের জমি দখলের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন।

এক রাতে তাঁকে মারধর করে দূরের একটি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

তিনি কোনওভাবে পালিয়ে বেঁচেছিলেন।

কিন্তু ফিরে আসেননি।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা—

“আমি ফিরে আসতে পারব না। কিন্তু আমার বইগুলো যেন গ্রামের বাচ্চাদের কাছে পৌঁছয়।”

নীলার চোখে জল এসে গেল।

কিন্তু রহস্য তখনও শেষ হয়নি।

হরিপদ কাকু হঠাৎ বললেন,

“নীলা, তোর হাতে যে বইটা আছে, সেটা একটু দেখ।”

বইয়ের ভেতরের শেষ পাতায় একটি পুরনো ছবি আটকানো।

ছবিতে অনিরুদ্ধবাবু দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন শিশুর সঙ্গে।

ছবির একেবারে সামনে ছোট্ট একটি মেয়ে।

নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।

মেয়েটি তার মা।

নীলা বাড়ি ফিরে মাকে ছবিটা দেখাল।

মা অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“আমি যখন ছোট ছিলাম, উনি আমাকে পড়াতেন।”

“তুমি জানতেও?”

মা মাথা নাড়লেন।

“তোর দাদু মারা যাওয়ার পর সংসারে খুব কষ্ট ছিল। অনিরুদ্ধ স্যার আমাকে বিনা পয়সায় পড়িয়েছিলেন।”

নীলা বলল,

“তাহলে এত বছর ধরে ওই আলো…?”

মা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

“হয়তো আলোটা আমাদের মনে করিয়ে দিতে এসেছে—কেউ চলে গেলেই তার কাজ শেষ হয়ে যায় না।”

সেই রাতেও দশটায় আলো জ্বলল।

কিন্তু এবার নীলা ভয় পেল না।

সে নিজের পড়ার টেবিলে একটি বাতি জ্বালিয়ে বই খুলে বসল।

পরদিন থেকে নীলা গ্রামের কয়েকজন দরিদ্র শিশুকে পড়াতে শুরু করল।

আর আশ্চর্যের বিষয়—

যেদিন প্রথম শিশুটি এসে তার কাছে পড়তে বসল, সেদিন রাত দশটায় সেই পুরনো বাড়ির জানালায় আলো জ্বলল না।

চল্লিশ বছরের মধ্যে সেই প্রথম।

নীলা বুঝল—

আলোটা হয়তো কখনও বাড়ির ভেতরে ছিল না।

আলোটা ছিল একজন মানুষের অসমাপ্ত স্বপ্নে।

আর সেই স্বপ্ন যখন নতুন কারও হাতে পৌঁছে গেল, তখন জানালার ওপাশের আলোটির আর প্রয়োজন রইল না।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

যে চিঠির ঠিকানা ছিল না।

বিনোদবাবু ডাকপিয়নের চাকরি করতেন।

প্রায় তিরিশ বছর ধরে তিনি একই এলাকার বাড়ি-বাড়ি চিঠি বিলি করেছেন। কারও চাকরির নিয়োগপত্র, কারও বিয়ের নিমন্ত্রণ, কারও বিদেশে থাকা ছেলের চিঠি—হাজার হাজার চিঠি তাঁর হাত ঘুরে মানুষের কাছে পৌঁছেছে।

চিঠি বিলি করা তাঁর কাছে শুধু চাকরি ছিল না।

তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি চিঠির মধ্যে কখনও কখনও একটা মানুষের পুরো পৃথিবী লুকিয়ে থাকে।

সেদিন দুপুরে অফিসে ঢুকেই বিনোদবাবুর নজরে পড়ল একটি অদ্ভুত খাম।

খামের ওপর প্রাপকের নাম লেখা—

“যার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”

কোনও বাড়ির নম্বর নেই।

রাস্তার নাম নেই।

শহরের নাম নেই।

এমনকি প্রেরকের নামও নেই।

ডাকঘরের কর্মীরা চিঠিটা দেখে হাসাহাসি করছিল।

একজন বলল,

“এটা নিশ্চয়ই কারও মজা।”

বিনোদবাবু চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“যে পাঠিয়েছে, নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে।”

সেদিন সারাদিন তিনি চিঠিটা ব্যাগে নিয়ে ঘুরলেন।

কিন্তু কাকে দেবেন?

শেষ বিকেলে রাস্তার পাশে একটি বৃদ্ধ লোককে বসে থাকতে দেখলেন।

লোকটির সামনে একটি পুরনো লাঠি।

বিনোদবাবু হঠাৎ ভাবলেন, “হয়তো এই মানুষটিরই দরকার।”

কিন্তু খামটা হাতে নিয়ে আবার থেমে গেলেন।

“না।”

লোকটির কাছে ইতিমধ্যে তার পরিবারের একজন লোক এসে দাঁড়িয়েছে।

চিঠি তার জন্য নয়।

পরদিন সকালে তিনি দেখলেন, স্টেশনের পাশে এক তরুণী বসে কাঁদছে।

তার হাতে একটি হাসপাতালের রিপোর্ট।

বিনোদবাবু এগিয়ে গেলেন।

“কী হয়েছে?”

মেয়েটি বলল,

“বাবার অপারেশন হবে। টাকা জোগাড় করতে পারছি না।”

বিনোদবাবুর বুকটা কেঁপে উঠল।

তিনি খামটির দিকে তাকালেন।

হয়তো এটাই সেই মানুষ!

কিন্তু আবারও থেমে গেলেন।

তিনি জানতেন, নিজের অনুমানে কারও হাতে চিঠি দেওয়া যায় না।

চিঠির ঠিকানা খুঁজে বের করতেই হবে।

এভাবে তিন দিন কেটে গেল।

চতুর্থ দিন রাতে বাড়ি ফিরে বিনোদবাবু চিঠিটা টেবিলের ওপর রাখলেন।

তাঁর স্ত্রী বললেন,

“এত চিন্তা করছ কেন?”

বিনোদবাবু বললেন,

“চিঠির ঠিকানা নেই। কিন্তু প্রাপক আছে। শুধু আমি তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

স্ত্রী হেসে বললেন,

“হয়তো চিঠিটা তোমার জন্যই।”

বিনোদবাবু হেসে উড়িয়ে দিলেন।

“আমার জন্য আবার কেন?”

“তুমি সারাজীবন অন্যের চিঠি পৌঁছে দিয়েছ। কখনও কি কেউ তোমার কাছে চিঠি পাঠিয়েছে?”

বিনোদবাবু উত্তর দিলেন না।

সেদিন রাতে তিনি অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারেননি।

পরদিন অফিসে যাওয়ার আগে খামটি আবার হাতে নিলেন।

হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল খামের পেছনে খুব ছোট করে একটি তারিখ লেখা।

৩০ বছর আগে।

বিনোদবাবু অবাক।

ত্রিশ বছর আগে পাঠানো চিঠি এতদিন ডাকঘরে কীভাবে পড়ে ছিল?

তিনি পুরনো রেকর্ড খুঁজতে শুরু করলেন।

দুপুরে একটি পুরনো রেজিস্টার পাওয়া গেল।

সেখানে চিঠিটির কোনও প্রাপকের নাম ছিল না।

শুধু লেখা ছিল—

“বিনোদ দত্তের হাতে পৌঁছলে প্রদান করবেন।”

বিনোদবাবু স্তব্ধ।

চিঠিটা তাঁর জন্যই ছিল!

কিন্তু কে পাঠিয়েছিল?

কাঁপা হাতে খামটি খুললেন।

ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।

লেখা—

“বিনোদ,

তুমি হয়তো আমাকে মনে রাখোনি।

ত্রিশ বছর আগে এক শীতের রাতে রেললাইনের পাশে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। আমার কাছে টাকা ছিল না। বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না।

তুমি আমাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলে।

তোমার মা আমাকে খেতে দিয়েছিলেন।

পরদিন নিজের টাকায় আমাকে বাসে তুলে দিয়েছিলে।

আমি বলেছিলাম, একদিন তোমার টাকা ফেরত দেব।

তুমি বলেছিলে, ‘টাকা ফেরত দিতে হবে না। জীবনে যখন কাউকে অসহায় দেখবে, তখন তাকে সাহায্য করবে।’

আমি সেই কথা রেখেছি।

এই চিঠি লিখেছিলাম ত্রিশ বছর আগে। কিন্তু তোমার ঠিকানা জানতাম না।

আজ তোমার গ্রামের এক পুরনো বন্ধুর কাছ থেকে ঠিকানা পেলাম।

চিঠিটা হয়তো দেরিতে পৌঁছেছে।

কিন্তু কথাটা দেরি করে পৌঁছায়নি।

—অমল”

বিনোদবাবু চেয়ারে বসে রইলেন।

অমল!

নামটা তাঁর মনে পড়ল।

ত্রিশ বছর আগে সত্যিই এক যুবককে তিনি বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।

কিন্তু সেই ঘটনাটা তিনি বহু আগেই ভুলে গিয়েছিলেন।

চিঠির সঙ্গে আরও একটি কাগজ ছিল।

একটি ব্যাংকের রসিদ।

বিনোদবাবুর নামে একটি ছোট্ট মাসিক তহবিল খোলা হয়েছে।

নিচে লেখা—

“যে মানুষ সারাজীবন অন্যের চিঠি পৌঁছে দিয়েছে, তার অবসরের পর যেন কোনও চিঠির অপেক্ষায় থাকতে না হয়।”

বিনোদবাবুর চোখ ভিজে উঠল।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফেরার সময় রাস্তার পাশে সেই তরুণীটিকে আবার দেখলেন।

মেয়েটি এখনও হাসপাতালের রিপোর্ট হাতে দাঁড়িয়ে।

বিনোদবাবু কাছে গিয়ে বললেন,

“আপনার বাবার চিকিৎসার জন্য কত টাকা লাগবে?”

মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল।

বিনোদবাবু মৃদু হেসে বললেন,

“সবটা দিতে পারব না। কিন্তু যতটা পারি, দেব।”

মেয়েটির চোখে জল।

সে বলল,

“আপনি কেন করবেন?”

বিনোদবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,

“কারণ আজ আমি একটা চিঠি পেয়েছি।”

“কী চিঠি?”

বিনোদবাবু হাসলেন।

“যে চিঠির ঠিকানা ছিল না, কিন্তু ঠিক মানুষটার কাছে পৌঁছে গেছে।”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগলেন।

তাঁর ডাকপিয়নের ব্যাগটা সেদিনও কাঁধে ছিল।

তবে ব্যাগের ভেতরে আর কোনও চিঠি ছিল না।

ছিল শুধু একটি বিশ্বাস—

ভালো কাজ কখনও হারিয়ে যায় না। কখনও না কখনও, কোনও না কোনও পথে, তা মানুষের কাছে ফিরে আসে।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
অনুগল্প গল্প

ঘড়িটা থেমে ছিল।

সুব্রত বাবার ঘরটা পরিষ্কার করছিল।

বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। এতদিন ঘরটা খোলেনি। দরজা খুললেই পুরনো কাঠ, বই আর চন্দনের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করত।

সুব্রত খুব বেশি কথা বলত না।

বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কও শেষ কয়েক বছর ভালো ছিল না।

বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। নিয়মকানুনের ব্যাপারে কঠোর। আর সুব্রত ছোটবেলা থেকেই একটু স্বাধীনচেতা।

কলেজে পড়ার সময় একদিন বাবার সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে।

তারপর শহরে চাকরি।

বিয়ে।

সংসার।

বছরে দু-একবার বাড়ি আসা।

বাবার সঙ্গে কথা হতো, কিন্তু আগের মতো নয়।

বাবা কখনও বলেননি, “আমাকে দেখতে এসো।”

সুব্রতও কখনও বলেনি, “বাবা, তোমাকে মিস করি।”

এই না-বলা কথাগুলোই হয়তো তাদের মধ্যে একটা দেওয়াল তৈরি করেছিল।

ঘর পরিষ্কার করতে করতে সুব্রতের হাতে পড়ল একটা পুরনো কাঠের বাক্স।

বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটি হাতঘড়ি।

ঘড়িটা বহু পুরনো।

কালো চামড়ার বেল্ট।

কাঁচে ছোট্ট একটি আঁচড়।

সুব্রত ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখল।

কাঁটা থেমে আছে—

রাত ৮টা ১৭ মিনিটে।

সে অবাক হলো।

এই সময়টা কি কোনও বিশেষ সময়?

ঘড়ির পেছনে ছোট্ট করে খোদাই করা—

“S-এর জন্য।”

সুব্রত ভাবল, S মানে হয়তো তার নাম—সুব্রত।

কিন্তু বাবা তাকে এই ঘড়ি কখনও দেননি।

পরদিন সে পাশের বাড়ির পুরনো বন্ধু অশোককাকুর কাছে গেল।

ঘড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কাকু, এটা বাবার ছিল?”

অশোককাকু কিছুক্ষণ ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন,

“তুই এটা কোথায় পেলি?”

“বাবার বাক্সে।”

অশোককাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“তোর বাবার একটা অভ্যাস ছিল।”

“কী?”

“প্রতি বছর তোর জন্মদিনের রাতে এই ঘড়িটা বের করে দেখতেন।”

সুব্রত অবাক।

“কেন?”

অশোককাকু বললেন,

“ওটা তোর বাবার ঘড়ি ছিল না।”

“তাহলে?”

“তোর জন্মের দিন হাসপাতালের এক নার্স তাঁকে ঘড়িটা দিয়েছিলেন।”

সুব্রত কিছু বুঝতে পারল না।

“কেন?”

অশোককাকু এবার ধীরে ধীরে বললেন,

“তুই জন্মানোর সময় তোর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তাররা বলেছিলেন, দু’জনের মধ্যে একজনকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।”

সুব্রত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।

“শেষ পর্যন্ত তোর মা বাঁচেননি।”

তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।

“আর তুই?”

অশোককাকু বললেন,

“তুই বেঁচে গিয়েছিলি।”

সুব্রত ঘড়িটার দিকে তাকাল।

“তাহলে ৮টা ১৭ মিনিট…?”

অশোককাকু বললেন,

“তুই জন্মেছিলি ওই সময়।”

সুব্রত কিছু বলতে পারল না।

বাড়ি ফিরে সে আবার বাবার ঘরে গেল।

বাক্সটা খুলে ঘড়িটার নিচে রাখা পুরনো কাগজগুলো বের করল।

একটি ডায়েরি।

প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—

“আজ আমার ছেলে পৃথিবীতে এল। আর একই দিনে আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারালাম।”

সুব্রতের বুকটা ভার হয়ে গেল।

সে পড়তে লাগল।

“আজ ডাক্তার বললেন, ওকে বাঁচাতে হলে ওর মাকে বাঁচানো যাবে না।

আমি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব?

একজন আমার স্ত্রী।

আর একজন আমার সন্তান।

শেষ পর্যন্ত ডাক্তাররা যা করার করলেন।

সুমিতা চলে গেল।

আমার ছেলে রয়ে গেল।

আমি জানি না, কোনও বাবা কীভাবে এই শূন্যতা নিয়ে বাঁচে।”

পরের পাতায় লেখা—

“আজ ও প্রথমবার আমাকে বাবা বলেছে।

আমি ওকে কিছুতেই বুঝতে দেব না, ওর জন্মের সঙ্গে তার মায়ের মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক আছে।

ও যেন কোনওদিন নিজেকে দোষী না ভাবে।”

সুব্রতের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।

আরও কয়েক পাতা পরে—

“আজ সুব্রত আমার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।

ও হয়তো মনে করছে আমি ওকে বুঝি না।

আসলে আমি ওকে এতটাই ভালোবাসি যে, নিজের কষ্টটাও ওকে বলতে পারি না।”

সুব্রত ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।

এত বছর সে ভেবেছে, বাবা তাকে ভালোবাসতেন না।

অথচ বাবা নিজের সমস্ত কষ্ট লুকিয়ে তাকে বড় করেছেন।

ঘড়িটা হাতে নিয়ে সে বাবার চেয়ারে বসে পড়ল।

রাত ৮টা ১৭ মিনিট।

সুব্রত মোবাইলের দিকে তাকাল।

হঠাৎ মনে হল, ঘড়িটা ঠিক করার দরকার নেই।

এটা যেমন থেমে আছে, তেমনই থাকুক।

কারণ ওই মুহূর্তটাই ছিল তার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ এবং সবচেয়ে বড় দুঃখের মুহূর্ত।

পরদিন সুব্রত ঘড়িটা একজন ঘড়িওয়ালার কাছে নিয়ে গেল।

লোকটি বলল,

“ঘড়িটা ঠিক করে দেব?”

সুব্রত মাথা নাড়ল।

“না।”

“কেন?”

সুব্রত মৃদু হেসে বলল,

“এটা থেমেই থাকুক।”

তারপর ঘড়িটা সে নিজের হাতে পরে নিল।

বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল—

বাবার সঙ্গে শেষবার যখন কথা হয়েছিল, তখন সে শুধু বলেছিল,

“তুমি কিছুই বোঝো না।”

আজ সে বুঝতে পারছে—

বাবা হয়তো সবকিছুই বুঝতেন।

শুধু নিজের ভালোবাসাটা কখনও মুখে বলতে পারেননি।

সুব্রত আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,

“বাবা, আমিও তোমাকে ভালোবাসতাম।”

কথাটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।

কিন্তু তার কবজিতে তখনও ঘড়িটা চলছে না।

কাঁটা থেমে আছে—

৮টা ১৭ মিনিটে।

আর সেই থেমে থাকা সময়ের মধ্যেই সুব্রত খুঁজে পেল তার বাবার সারাজীবনের ভালোবাসা।

সমাপ্ত।

Share This
Categories
গল্প নারী কথা

লাল সাইকেলের স্বপ্ন।

সোনাঝুরি গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকত বারো বছরের মেয়ে ঝিলিক। ছোট্ট একটা মাটির বাড়ি, সামনে তুলসীতলা, পাশে কয়েকটা কলাগাছ আর বাড়ির পেছনে বিস্তীর্ণ ধানখেত—এই ছিল তার পৃথিবী।

ঝিলিক পড়াশোনা করতে খুব ভালোবাসত।

কিন্তু গ্রামের স্কুলটা ছিল বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে।

প্রতিদিন ভোরে উঠে তাকে হেঁটে স্কুলে যেতে হত।

বর্ষার দিনে কাদা পেরিয়ে, গ্রীষ্মে ধুলো উড়িয়ে, শীতের সকালে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সে হাঁটত।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে ঝিলিক মাকে বলল,

—“মা, আমার যদি একটা সাইকেল থাকত!”

মা চুপ করে রইলেন।

বাবা দিনমজুর। সংসারে চারজন মানুষ। সাইকেল কেনার মতো টাকা তাদের হাতে কখনও জমেনি।

মা শুধু বললেন,

—“একদিন হবে।”

ঝিলিক জানত, মায়ের সেই ‘একদিন’ হয়তো অনেক দূরে।

তবু সে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করল না।

স্কুলে তার প্রিয় বিষয় ছিল বিজ্ঞান। শিক্ষক যখন নতুন কিছু বোঝাতেন, ঝিলিকের চোখ জ্বলে উঠত।

একদিন বিজ্ঞান শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“তোমরা সবাই বড় হয়ে কী হতে চাও?”

কেউ বলল ডাক্তার।

কেউ পুলিশ।

কেউ শিক্ষক।

ঝিলিক উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

—“আমি বিজ্ঞানী হতে চাই।”

ক্লাসে কয়েকজন হেসে ফেলল।

অনিরুদ্ধবাবু হাসলেন না।

তিনি বললেন,

—“কেন?”

ঝিলিক বলল,

—“আমাদের গ্রামের অনেক সমস্যা আছে। আমি এমন কিছু বানাতে চাই যাতে গ্রামের মানুষের কাজ সহজ হয়।”

শিক্ষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

—“তাহলে আজ থেকেই শুরু করো।”

সেদিন কথাটা ঝিলিকের মনে গেঁথে গেল।

কয়েকদিন পর স্কুলে বিজ্ঞান প্রদর্শনীর ঘোষণা হল।

ঝিলিক ঠিক করল, সে এমন একটা জিনিস বানাবে যাতে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করে ব্যবহার করা যায়।

কিন্তু সমস্যা হল—প্রকল্প বানানোর টাকা কোথায়?

বাড়িতে বলতেই বাবা বললেন,

—“যা আছে তাই দিয়ে কর মা। নতুন জিনিস কিনতে পারব না।”

ঝিলিক বলল,

—“নতুন কিছু লাগবে না বাবা।”

সে পুরনো প্লাস্টিকের বোতল, বাঁশের টুকরো, ব্যবহৃত পাইপ আর কয়েকটি খালি ড্রাম জোগাড় করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে সে একটি ছোট মডেল তৈরি করল।

বৃষ্টির জল ছাদ থেকে পাইপ দিয়ে ড্রামে জমবে। তারপর সেই জল বাগানে ব্যবহার করা যাবে।

প্রথম মডেলটি ভেঙে পড়ল।

দ্বিতীয়টিও ঠিকমতো কাজ করল না।

তৃতীয়বার আবার চেষ্টা করল ঝিলিক।

এক রাতে মা দেখলেন, মেয়েটা উঠোনে বসে কিছু একটা নিয়ে কাজ করছে।

—“এত রাতে?”

—“কাল স্কুলে পরীক্ষা।”

—“ঘুমাবি না?”

ঝিলিক বলল,

—“স্বপ্নটা শেষ না করলে ঘুম আসবে না।”

মা কিছু বললেন না।

শুধু ঘরে গিয়ে মেয়ের জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে এলেন।

পরদিন বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে ঝিলিকের মডেল ঠিকঠাক কাজ করল।

বিচারকরা অবাক হয়ে দেখলেন।

একজন জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা তুমি নিজে বানিয়েছ?”

ঝিলিক মাথা নাড়ল।

—“জি।”

—“কী দিয়ে?”

ঝিলিক সবকিছু বুঝিয়ে বলল।

শেষে ফল ঘোষণা হল।

ঝিলিক প্রথম হল।

পুরস্কার হিসেবে সে পেল একটি বইয়ের সেট এবং একটি সাইকেল।

লাল রঙের সাইকেল।

সাইকেলটি দেখে ঝিলিক কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।

তার চোখে জল এসে গেল।

অনিরুদ্ধবাবু বললেন,

—“কী হল?”

ঝিলিক ফিসফিস করে বলল,

—“স্যার, এটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল।”

পরদিন ভোরে ঝিলিক প্রথমবার সাইকেল নিয়ে স্কুলের পথে বেরোল।

লাল সাইকেলটি কাঁচা রাস্তার ওপর দিয়ে ছুটছিল।

তার চুল বাতাসে উড়ছিল।

কিন্তু ঝিলিকের মনে হচ্ছিল, সে শুধু স্কুলে যাচ্ছে না—সে যেন নিজের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

কয়েক মাস পর গ্রামে আরেকটি সমস্যা দেখা দিল।

গরমের সময় পুকুরের জল শুকিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের মানুষ দূরের টিউবওয়েল থেকে জল আনত।

ঝিলিক ভাবতে শুরু করল।

সে এবার একটা সহজ জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করল।

অনিরুদ্ধবাবুর সাহায্যে গ্রামের কয়েকটি বাড়ির ছাদ থেকে বৃষ্টির জল সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করল।

প্রথমে গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করল না।

একজন বললেন,

—“এই বাচ্চা মেয়ে আবার আমাদের জল শেখাবে?”

আরেকজন হাসলেন।

কিন্তু ঝিলিক থামল না।

বর্ষার প্রথম বৃষ্টির দিন সে নিজের বাড়িতে ব্যবস্থা চালু করল।

বৃষ্টির জল পাইপ দিয়ে ড্রামে জমতে লাগল।

মা অবাক হয়ে বললেন,

—“এত জল!”

ঝিলিক হাসল।

—“এই জল ফেলে দিলে আবার কিনতে হবে।”

কয়েকদিন পর গ্রামের আরও তিনটি পরিবার সেই ব্যবস্থা তৈরি করল।

তারপর দশটি।

তারপর আরও অনেক বাড়ি।

ঝিলিকের ছোট্ট পরিকল্পনা ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের কাজে লাগতে শুরু করল।

একদিন পঞ্চায়েতের এক কর্মী এসে বললেন,

—“তোমার এই মডেলটা আমরা অন্য গ্রামেও দেখাতে চাই।”

ঝিলিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

যে মেয়েটাকে নিয়ে একদিন সবাই হাসছিল, আজ তার কাজ দেখতে মানুষ দূর থেকে আসছে।

তবে ঝিলিক বদলায়নি।

সে এখনও প্রতিদিন স্কুলে যায়।

লাল সাইকেলটাও এখনও তার সঙ্গী।

একদিন অনিরুদ্ধবাবু তাকে জিজ্ঞেস করলেন,

—“তুই বড় হয়ে কী হতে চাস?”

ঝিলিক একটু ভেবে বলল,

—“আগে ভাবতাম বিজ্ঞানী হব। এখন মনে হয়, আমি এমন কিছু বানাতে চাই যা গ্রামের মানুষের কাজে লাগে।”

শিক্ষক বললেন,

—“এটাই তো বিজ্ঞানীর আসল স্বপ্ন।”

বছর কেটে গেল।

ঝিলিক উচ্চশিক্ষার জন্য শহরে চলে গেল।

বিদায়ের দিন তার মা বললেন,

—“সাইকেলটা নিয়ে যাবি?”

ঝিলিক হেসে বলল,

—“না মা। এটা এখানেই থাকবে।”

—“কেন?”

—“গ্রামের যে মেয়েটা স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু সাইকেল নেই—সে ব্যবহার করবে।”

মা অবাক হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

ঝিলিক সাইকেলটা গ্রামের স্কুলে দিয়ে গেল।

সাইকেলের হ্যান্ডেলে ছোট্ট একটা কাগজ বাঁধা ছিল।

তাতে লেখা—

“স্বপ্ন দেখো। পথ যত দূরই হোক, একদিন পৌঁছবে।”

পরদিন গ্রামের আরেকটি মেয়ে সেই লাল সাইকেলে চেপে স্কুলে গেল।

তারপর আরেকজন।

তারপর আরও একজন।

লাল সাইকেলটি যেন এক স্বপ্ন থেকে আরেক স্বপ্নের কাছে ছুটে বেড়াতে লাগল।

আর সোনাঝুরি গ্রামের মানুষ বুঝল—

কখনও কখনও একটি ছোট্ট স্বপ্ন শুধু একজনের জীবন বদলায় না।

সেটা অনেক মানুষের পথ দেখায়।

সমাপ্ত।

Share This