Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ

আশোকা গুপ্ত: দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক মহীয়সী নারী।।।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সমাজগঠনের ইতিহাসে এমন অনেক নারী রয়েছেন, যাঁদের নাম বড় রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় খুব বেশি উচ্চারিত হয় না। কিন্তু তাঁদের কাজ ছাড়া সেই ইতিহাস পূর্ণ হয় না। তাঁরা মানুষের দুঃখের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন, বিপন্ন পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছেন, নারী ও শিশুর পুনর্বাসনের জন্য লড়াই করেছেন এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

আশোকা গুপ্ত ছিলেন তেমনই এক মহীয়সী নারী।

তিনি ছিলেন শিক্ষিত, সংগঠক, সমাজকর্মী এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এক দৃঢ়চেতা মানুষ। বাংলার দুর্ভিক্ষ থেকে নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক হিংসা, দেশভাগের উদ্বাস্তু সমস্যা থেকে গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা—জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর জীবনকে শুধু সমাজসেবার ইতিহাস বললে কম বলা হবে। এটি ছিল সংকটের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ প্রতিশ্রুতির গল্প।

শিক্ষাজীবন থেকেই আলাদা পথ

আশোকা গুপ্তের জন্ম ১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে। কলকাতায় তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। সেই সময়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী মেয়েদের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু পড়াশোনায় তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন।

তিনি বেথুন কলেজে পড়াশোনা করেন এবং গণিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক হন। তারও আগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।

এই শিক্ষাগত সাফল্য তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু তিনি কেবল নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য শিক্ষা ব্যবহার করেননি। পরবর্তী জীবনে শিক্ষাকে মানুষের সামাজিক উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন।

সমাজসেবার সঙ্গে প্রথম পরিচয়

ছাত্রজীবন থেকেই স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীকালে অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স বা AIWC-এর সঙ্গে যুক্ত হন।

এই সংগঠনের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণের নানা কাজে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সমাজসেবা তাঁর জীবনের প্রধান কর্মক্ষেত্রে পরিণত হয়।

বিয়ের পর স্বামী শৈবাল কুমার গুপ্ত ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের সদস্য। তাঁর কর্মসূত্রে আশোকা গুপ্তকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকতে হয়েছিল। ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা এবং সামাজিক সমস্যাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান তিনি।

এই অভিজ্ঞতা তাঁর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও বিস্তৃত করে।

বাংলার দুর্ভিক্ষে মানুষের পাশে

১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ছিল উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

অসংখ্য মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা যান। বহু পরিবার ভেঙে পড়ে। শিশুরা অনাহারে দিন কাটায়। গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ।

এই সময় আশোকা গুপ্ত বাঁকুড়ায় ত্রাণ ও সমাজসেবার কাজে যুক্ত হন। নারী ও শিশুদের দুর্দশা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ়ভাবে সমাজসেবার পথে নিয়ে যায়।

তাঁর কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনও আনুষ্ঠানিক কাজ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিপদের সময় সমাজের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল ও শিক্ষিত মানুষের একটি দায়িত্ব রয়েছে—তাদের এগিয়ে আসতে হবে।

নোয়াখালির ভয়াবহ দিন

আশোকা গুপ্তের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলির একটি ছিল ১৯৪৬ সালের নোয়াখালি।

সাম্প্রদায়িক হিংসার কারণে নোয়াখালির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারায়। নারীরা ও শিশুরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

সেই সময় আশোকা গুপ্ত অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্সের চট্টগ্রাম শাখার পক্ষ থেকে ত্রাণকর্মীদের একটি দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নোয়াখালিতে যান।

এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত।

একজন শিক্ষিত, নিরাপদ পারিবারিক জীবনে থাকা নারী হিসেবে তিনি চাইলে সেই পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি।

তিনি আক্রান্ত মানুষের কাছে পৌঁছেছিলেন।

ত্রাণ দিয়েছেন, আতঙ্কিত মানুষকে সাহস জুগিয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন।

গান্ধীর সঙ্গে নোয়াখালিতে

নোয়াখালির ঘটনায় মহাত্মা গান্ধীও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সেখানে যান।

আশোকা গুপ্তের কাজও সেই সময় গান্ধীয় শান্তি ও মানবসেবার ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ওঠে। তিনি মানুষের মধ্যে ভয় কমানোর চেষ্টা করেন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দিতে কাজ করেন।

নোয়াখালির অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।

তিনি বুঝেছিলেন, সাম্প্রদায়িক হিংসার সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক সংঘাতের অভিঘাত শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সেই পরিবারগুলির ওপর, যাদের হাতে কোনও ক্ষমতা নেই।

এই উপলব্ধি তাঁর পরবর্তী সমাজসেবার দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

বিপদের মধ্যেও থেকে যাওয়া

নোয়াখালিতে কাজ করার সময় আশোকা গুপ্ত শুধু ত্রাণ বিলি করে ফিরে আসেননি।

দুর্গত মানুষের মধ্যে থেকে তাঁদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি নোয়াখালির প্রত্যন্ত গ্রামেও তিনি মানুষের সঙ্গে থেকেছেন এবং তাদের পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছেন। তাঁর জীবনীতে এই সময়টিকে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

এই কাজ তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ করে—তিনি সমস্যাকে দূর থেকে দেখতে চাইতেন না।

সমস্যার কাছে যেতে চাইতেন।

মানুষের সঙ্গে বসে তাঁদের কথা শুনতে চাইতেন।

তারপর সমাধানের পথ খুঁজতেন।

দেশভাগের পর নতুন সংকট

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

পূর্ববঙ্গ থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। তাঁরা ছিলেন উদ্বাস্তু। অনেকেই ঘরবাড়ি, জমিজমা, সম্পদ এবং জীবিকার সমস্ত কিছু হারিয়ে এসেছিলেন।

বিশেষ করে নারী, শিশু এবং পরিবারহীন মানুষের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন।

এই সময় আশোকা গুপ্ত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পুনর্বাসনমূলক কাজের সমন্বয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তাঁর নেতৃত্বে নারী ও শিশুদের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং স্বনির্ভরতার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এই কাজের ধারাবাহিকতায় মহিলা সেবা সমিতি-র মতো উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদ্বাস্তু ও বিপন্ন নারীদের পুনর্বাসনের জন্য এই সংগঠন কাজ চালিয়ে যায়।

নারীর হাতে শিক্ষা ও কাজ

আশোকা গুপ্ত বিশ্বাস করতেন, নারীর প্রকৃত পুনর্বাসন শুধু আশ্রয় দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

একজন নারীকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।

তার শিক্ষা দরকার।

তার কাজ দরকার।

তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দরকার।

এই চিন্তা থেকেই তিনি গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন।

কস্তুরবা গান্ধী ন্যাশনাল মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত থেকে তিনি গ্রামীণ এলাকায় নারীশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, শিশু কল্যাণ ও নিরক্ষরতা দূরীকরণের কাজে নেতৃত্ব দেন।

বুনিয়াদি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

১৯৪৭ সালে তিনি AIWC Buniyadi Bidyapith প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হন।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য ছিল শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা ও সাক্ষরতার আওতায় আনা এবং পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদেরও শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব ছিল।

এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কয়েক দশক ধরে বজায় ছিল।

শুধু পড়াশোনা নয়—শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার কাজও এই উদ্যোগের অংশ ছিল।

এখানে তাঁর শিক্ষাদর্শ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি।

গ্রামীণ সমাজের জন্য কাজ

আশোকা গুপ্তের কাজের বড় অংশ জুড়ে ছিল গ্রাম।

তিনি জানতেন, ভারতের সামাজিক উন্নয়ন শহরকেন্দ্রিক হলে চলবে না।

গ্রামের নারীরা যদি শিক্ষার সুযোগ না পান, শিশুরা যদি বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে এবং পরিবারগুলি যদি জীবিকার স্থায়ী সুযোগ না পায়, তাহলে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।

তাই গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, নারী পুনর্বাসন এবং শিশু কল্যাণের কাজকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় গ্রামসেবা কেন্দ্রগুলির উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

প্রশাসনিক দায়িত্বেও সমাজকল্যাণ

আশোকা গুপ্ত শুধু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না।

তিনি পশ্চিমবঙ্গ স্টেট সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যাডভাইজরি বোর্ডের চেয়ারপার্সন ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ বোর্ডের সদস্য হিসেবেও কাজ করেন।

এই দায়িত্বগুলির মাধ্যমে সমাজকল্যাণের বৃহত্তর নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান তিনি।

তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল মাঠের।

তাই নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও সাধারণ মানুষের বাস্তব সমস্যাকে সামনে রাখার সুযোগ তাঁর ছিল।

শিশুদের জন্য তাঁর চিন্তা

নারীর পাশাপাশি শিশুদের কল্যাণও তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল।

অসহায় ও পরিবারহীন শিশুদের জন্য আশ্রয়, শিক্ষা ও পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করার বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। কলকাতায় SOS Children’s Village-এর সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল।

তিনি মনে করতেন, একটি শিশুর জন্য শুধু খাবার ও আশ্রয় যথেষ্ট নয়।

তার দরকার নিরাপত্তা।

তার দরকার ভালোবাসা।

তার দরকার শিক্ষা।

এবং সবচেয়ে বেশি দরকার এমন একটি পরিবেশ, যেখানে সে নিজেকে পরিবারের একজন সদস্য বলে মনে করতে পারে।

লেখিকার ভূমিকাতেও আশোকা গুপ্ত

আশোকা গুপ্ত নিজের অভিজ্ঞতাগুলি লিখেও রেখে গিয়েছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য বই “Noakhalir Durjoger Dine” এবং “In the Path of Service: Memories of a Changing Century”।

বিশেষ করে তাঁর স্মৃতিকথা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলার দুর্ভিক্ষ, নোয়াখালির অভিজ্ঞতা, স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময়ের সামাজিক পরিবর্তন এবং স্বাধীনতার পর সমাজসেবার নানা অভিজ্ঞতা।

ফলে তাঁর লেখা ইতিহাসেরও একটি মূল্যবান দলিল।

পুরস্কার ও সম্মান

দীর্ঘ সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে আশোকা গুপ্ত বিভিন্ন পুরস্কার পান।

১৯৯৪ সালে তিনি গান্ধী সেবা পুরস্কারে সম্মানিত হন। ২০০৩ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গোল্ড প্ল্যাক পান। ২০০৭ সালে তিনি জামনালাল বাজাজ পুরস্কার লাভ করেন।

কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় ছিল তাঁর কাজের সামাজিক প্রভাব।

যে নারী দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, নোয়াখালির হিংসার মধ্যে গিয়েছিলেন, দেশভাগের উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনে কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তী জীবনে নারী ও শিশুদের শিক্ষার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছিলেন—তাঁর জীবনের আসল সম্মান মানুষের স্মৃতিতে।

দীর্ঘ জীবনের শেষ অধ্যায়

আশোকা গুপ্ত ২০০৮ সালের ৮ জুলাই কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি প্রায় এক শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে ভারতের সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী ছিলেন।

একজন তরুণী হিসেবে যে সময়ে তিনি সমাজসেবায় প্রবেশ করেছিলেন, তখন ভারত ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে।

পরবর্তীতে তিনি দেখেছেন স্বাধীনতা।

দেখেছেন দেশভাগ।

দেখেছেন উদ্বাস্তু স্রোত।

দেখেছেন নতুন ভারতের নির্মাণ।

আর এই প্রতিটি পরিবর্তনের মধ্যেই তিনি মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন।

আমাদের কী শেখায় আশোকা গুপ্তের জীবন?

আশোকা গুপ্তের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—মানুষের সেবা করার জন্য অসাধারণ ক্ষমতার প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন অসাধারণ সাহস ও মানবিকতা।

নোয়াখালির মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে তিনি মানুষের কাছে গিয়েছিলেন।

দেশভাগের পর উদ্বাস্তু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

নারীদের শিক্ষা ও কাজের সুযোগ তৈরি করেছিলেন।

শিশুদের জন্য বিদ্যালয় ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন।

এবং নিজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য লিখে রেখে গিয়েছিলেন।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন শিক্ষিত নারী চাইলে নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সমাজের জন্য ব্যবহার করতে পারেন।

তাঁর জীবন আমাদের আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস শুধু বড় রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে তৈরি হয় না। ইতিহাস তৈরি করেন সেইসব নীরব কর্মীরাও, যারা বিপদের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং ধীরে ধীরে একটি সমাজকে বদলে দেন।

আশোকা গুপ্ত ছিলেন সেই নীরব অথচ শক্তিশালী পরিবর্তনের একজন নির্মাতা।

তাঁর জীবন তাই আজও আমাদের কাছে এক উজ্জ্বল বার্তা—

মানুষের দুঃখকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করা এবং সেই দায়িত্ব থেকে কখনও পিছিয়ে না যাওয়াই প্রকৃত মানবসেবা।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *