Categories
নারী কথা প্রবন্ধ বিবিধ রিভিউ

সরলা রায়: নারীশিক্ষার আলো জ্বালানো এক মহীয়সী নারী।

ভারতের সমাজসংস্কারের ইতিহাসে নারীশিক্ষা একটি দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। একসময় মেয়েদের উচ্চশিক্ষা তো দূরের কথা, বিদ্যালয়ে যাওয়াকেও অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় বলে মনে করত না। সেই সময়ে কিছু সাহসী নারী ও পুরুষ সমাজের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। বাংলায় সেই অগ্রণী নারীদের অন্যতম ছিলেন সরলা রায়।

তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী এবং নারীশিক্ষার প্রবল সমর্থক। তাঁর কাজের অন্যতম বড় পরিচয় কলকাতার গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল প্রতিষ্ঠা। ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় আজও তাঁর শিক্ষাদর্শের স্মৃতি বহন করছে। বিদ্যালয়ের নিজস্ব ইতিহাসেও সরলা রায়কে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু তাঁর অবদান শুধু একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নারীশিক্ষা, নারীর সামাজিক অধিকার, শিক্ষার প্রসার এবং সংগঠিত নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

সংস্কারমুখী পরিবারে বেড়ে ওঠা

সরলা রায় জন্মেছিলেন উনিশ শতকের বাংলার এক বিশিষ্ট সমাজসংস্কারক পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও সমাজসংস্কারক দুর্গামোহন দাস। তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যও নারীশিক্ষা ও সমাজসংস্কারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।

তাঁর বোন অবলা বসুও পরবর্তীকালে নারীশিক্ষা ও সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

ফলে ছোটবেলা থেকেই সরলা রায় এমন একটি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন যেখানে শিক্ষা, যুক্তিবাদ এবং সামাজিক সংস্কারের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা ছিল স্বাভাবিক।

এই পারিবারিক পরিবেশ তাঁর চিন্তাভাবনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

নিজের শিক্ষাজীবনও ছিল ঐতিহাসিক

যে সময়ে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত ছিল, সেই সময়েই সরলা রায় পড়াশোনার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেন।

তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রথমদিকের ভারতীয় নারীদের অন্যতম ছিলেন। চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনিও সেই প্রজন্মের নারী, যাঁরা উচ্চশিক্ষার দরজা নারীদের জন্য আরও প্রশস্ত করার পথে প্রথম দিকের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। পরে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের প্রথম মহিলা সদস্য হন।

এই ঘটনাটি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না।

এটি ছিল সেই সময়ের সমাজের জন্য একটি প্রতীকী পরিবর্তন।

একজন নারী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারেন—সরলা রায় নিজের জীবন দিয়েই সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

ঢাকায় নারীশিক্ষার কাজ

বিবাহের পর সরলা রায়ের জীবনের একটি সময় ঢাকায় কাটে। সেই সময়ও তিনি নারীশিক্ষার কাজে নিজেকে যুক্ত রাখেন।

ঢাকায় তিনি মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় এবং একটি মহিলা সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দরিদ্র ও বিধবা নারীদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি করার চিন্তাও তাঁর কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

এখান থেকেই তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

শিক্ষা শুধু বিদ্যালয়ের বিষয় নয়; শিক্ষা মানুষের জীবন বদলানোর একটি সামাজিক শক্তি।

বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই শক্তির গুরুত্ব তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন।

কলকাতায় ফিরে নতুন উদ্যোগ

কলকাতায় ফিরে সরলা রায় বিভিন্ন নারীকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।

তিনি স্বর্ণকুমারী দেবীর ‘সখী সমিতির’ সঙ্গেও কাজ করেছিলেন। এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল দরিদ্র ও বিধবা নারীদের শিক্ষা দেওয়া এবং তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা।

এই কাজের মধ্য দিয়ে সরলা রায় বুঝতে পেরেছিলেন যে নারীশিক্ষাকে কেবল অভিজাত পরিবারের মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

সমাজের পিছিয়ে থাকা নারীদের কাছেও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে।

এই চিন্তা তাঁর পরবর্তী কাজের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।

গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল

সরলা রায়ের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কাজগুলির একটি ছিল গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল প্রতিষ্ঠা।

১৯২০ সালে কলকাতায় এই বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। বিদ্যালয়টির নাম রাখা হয়েছিল বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা গোপালকৃষ্ণ গোখলের নামে।

সরলা রায়ের শিক্ষাদর্শ ছিল অত্যন্ত আধুনিক।

তিনি মনে করতেন, শিক্ষা মানে শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া নয়। শিক্ষা মানুষের চিন্তাশক্তি, ব্যক্তিত্ব, সংস্কৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গিকে বিকশিত করবে।

গোখলে মেমোরিয়াল স্কুলে তাই পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত, খেলাধুলা, নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

এই পদ্ধতি সেই সময়ের তুলনায় যথেষ্ট অগ্রসর ছিল।

তিন ভাষায় শিক্ষার ভাবনা

সরলা রায় বুঝেছিলেন, একটি শিক্ষিত মেয়েকে শুধু নিজের মাতৃভাষায় সীমাবদ্ধ রাখলে তার জ্ঞানের পরিসর ছোট হয়ে যেতে পারে।

তাই বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজির মতো ভাষা শেখানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

এর মধ্যে ছিল একটি বিস্তৃত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলার মেয়েরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে, আবার ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য হিন্দি এবং বৃহত্তর বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য ইংরেজিও শিখবে—এই ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তা ছিল তাঁর শিক্ষাদর্শের একটি বৈশিষ্ট্য।

নারীশিক্ষা থেকে নারী অধিকার

সরলা রায়ের কাছে নারীশিক্ষা ছিল বৃহত্তর নারী-অধিকার আন্দোলনের অংশ।

তিনি বুঝেছিলেন, একজন নারী যদি নিজের অধিকার সম্পর্কে না জানেন, তবে কেবল বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেই তাঁর সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হবে না।

তাই নারীশিক্ষার পাশাপাশি নারীর সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত অধিকার এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের প্রশ্নেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

১৯২০-এর দশকে নারীর ভোটাধিকার ও সামাজিক সংস্কারের প্রশ্নে যে সংগঠিত নারী আন্দোলন গড়ে উঠছিল, সরলা রায় তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্সের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এবং পরে তিনি সংগঠনটির সভাপতি হন।

অল ইন্ডিয়া উইমেন্স কনফারেন্স

১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত All India Women’s Conference বা AIWC ভারতের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংগঠন।

সরলা রায় এই সংগঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী ছিলেন। সংগঠনের বঙ্গীয় শাখা গড়ে তোলা এবং নারীশিক্ষার প্রসারে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য ছিল।

১৯৩২ সালে তিনি AIWC-এর সভাপতি হন। সেই সময় সংগঠনটি নারীশিক্ষা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে কাজ করছিল।

এখানে সরলা রায়ের ভূমিকা শুধু একজন শিক্ষাবিদের ছিল না।

তিনি ছিলেন একজন সংগঠকও।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারীদের একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।

বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অবস্থান

নারীশিক্ষার অন্যতম বড় বাধা ছিল অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া।

একজন মেয়ের শৈশব শেষ হয়ে যেত, শিক্ষা থেমে যেত এবং খুব অল্প বয়সেই তাকে সংসারের দায়িত্ব নিতে হতো।

সরলা রায় বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন। নারীশিক্ষার প্রসার এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধকে তিনি পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা হিসেবে দেখতেন।

তাঁর যুক্তি ছিল সহজ কিন্তু শক্তিশালী—

একটি মেয়েকে যদি শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সে নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে।

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ

সরলা রায়ের জীবন শুধু শিক্ষা ও সমাজসংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতেন। এমনকি তাঁর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৃত্যনাট্য ‘মায়ার খেলা’ বেথুন স্কুলে প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

এই ঘটনাটি তাঁর শিক্ষাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে।

তিনি মনে করতেন, একজন শিক্ষিত নারীর বিকাশ শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।

সংগীত, নাটক, শিল্প, সাহিত্য—এসবও ব্যক্তিত্ব গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক

সরলা রায়ের সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন ছিল—মেয়েদের কী শেখানো হবে?

শুধু গৃহস্থালির কাজ?

শুধু পরীক্ষার বিষয়?

নাকি তাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা হবে?

সরলা রায় তৃতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।

তিনি এমন শিক্ষা চেয়েছিলেন, যা একজন মেয়েকে চিন্তা করতে শেখাবে, প্রশ্ন করতে শেখাবে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে শেখাবে এবং সমাজের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে।

এই কারণেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শে পড়াশোনার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের ওপর গুরুত্ব ছিল।

একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে আন্দোলনের রূপ নেয়

গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল শুধু একটি বিদ্যালয় হয়ে থাকেনি।

সময়ের সঙ্গে এটি কলকাতার নারীশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

সরলা রায়ের মৃত্যুর বহু দশক পরেও প্রতিষ্ঠানটি তাঁর আদর্শের স্মৃতি বহন করছে। বর্তমান বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তাঁকে ১৯২০ সালের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করে এবং তাঁর শিক্ষাদর্শের কথা তুলে ধরে।

এটাই একজন শিক্ষাবিদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

একটি ভবন তৈরি করা সহজ।

কিন্তু এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবন গড়ে তোলে—সেটিই প্রকৃত উত্তরাধিকার।

সমাজের নানা স্তরে নারীদের জন্য কাজ

সরলা রায়ের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীদের সংগঠিত করা।

তিনি বুঝেছিলেন, একজন নারী একা যতটা এগোতে পারেন, সংগঠিতভাবে এগোলে তার শক্তি অনেক বেশি হয়।

মহিলা সমিতি, নারীশিক্ষা সংগঠন এবং পরবর্তীতে সর্বভারতীয় নারী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যুক্ততা সেই ভাবনারই প্রকাশ।

তিনি নারীকে শুধু সহানুভূতির পাত্র হিসেবে দেখতে চাননি।

তিনি চেয়েছিলেন নারী নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হোক এবং সামাজিক পরিবর্তনের অংশীদার হোক।

তাঁর সময়ের তুলনায় কতটা এগিয়ে ছিল তাঁর চিন্তা?

আজ আমরা নারীশিক্ষা, নারীস্বনির্ভরতা, সমান অধিকার এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের কথা স্বাভাবিকভাবে বলি।

কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের গোড়ায় এই ধারণাগুলি সমাজের সর্বত্র গ্রহণযোগ্য ছিল না।

সেই সময়ে একটি মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় বসবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটে থাকবে, বিদ্যালয় পরিচালনা করবে এবং নারীদের অধিকার নিয়ে সর্বভারতীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দেবে—এটি ছিল যথেষ্ট সাহসী পদক্ষেপ।

সরলা রায় সেই সাহস দেখিয়েছিলেন।

তাঁর জীবন থেকে আজকের শিক্ষকদের শিক্ষা

সরলা রায়ের জীবন আজকের শিক্ষকদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ তিনি দেখিয়েছিলেন, একজন শিক্ষক বা শিক্ষাবিদ শুধু পাঠ্যবই পড়িয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না।

একজন সত্যিকারের শিক্ষাবিদ সমাজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেন।

একটি মেয়ের আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারেন।

একটি পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারেন।

এমনকি একটি সমাজের মূল্যবোধও বদলে দিতে পারেন।

সরলা রায় সেই বৃহত্তর শিক্ষার ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন।

উত্তরাধিকার

১৯৪৬ সালে সরলা রায়ের জীবনাবসান হয়। কিন্তু তাঁর কাজ থেমে যায়নি।

গোখলে মেমোরিয়াল গার্লস’ স্কুল আজও কলকাতায় শিক্ষার একটি পরিচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষার পরিসর সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে, আধুনিক হয়েছে, কিন্তু নারীশিক্ষার যে স্বপ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানটির জন্ম—তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অটুট।

একজন মানুষের জীবন কতটা দীর্ঘ ছিল, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল তিনি তাঁর জীবদ্দশায় কী পরিবর্তনের বীজ বপন করে গিয়েছেন।

সরলা রায় সেই অর্থে একজন সফল সমাজসংস্কারক।

আমাদের জন্য সরলা রায়ের বার্তা

সরলা রায়ের জীবন আমাদের শেখায়—শিক্ষা কখনও কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়।

শিক্ষা সমাজকে বদলাতে পারে।

একজন শিক্ষিত নারী একটি পরিবারকে বদলাতে পারেন।

শিক্ষিত প্রজন্ম একটি সমাজকে বদলাতে পারে।

আর সেই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন এমন শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে জ্ঞান, সংস্কৃতি, মানবিকতা, স্বাধীন চিন্তা এবং সামাজিক দায়িত্ব—সবকিছুর সমন্বয় থাকবে।

সরলা রায় সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন।

তিনি এমন এক সময়ে মেয়েদের জন্য শিক্ষার দরজা খুলতে চেয়েছিলেন, যখন সেই দরজার সামনে ছিল অসংখ্য সামাজিক বাধা।

তাঁর হাতে তৈরি সেই পথ ধরে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য মেয়ে এগিয়ে গেছে।

তাই সরলা রায়কে শুধু একটি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর অবদানকে ছোট করা হবে।

তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যিনি বিশ্বাস করেছিলেন—একটি মেয়ের হাতে বই তুলে দেওয়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থী তৈরি করা নয়; ভবিষ্যতের একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে আলোকিত করার সম্ভাবনা তৈরি করা।

এই বিশ্বাসই তাঁকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *