দ্বিতীয় পর্ব — দর্শকাসনের তেরো নম্বর চেয়ার
১. শুক্রবারের আমন্ত্রণ
শুক্রবার বিকেল থেকেই আকাশের মুখ ভার। কলকাতার রাস্তায় সারাদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যার পর বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তেই উত্তর শহরের পুরোনো অলিগলিগুলো প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।
নীলাঞ্জনা নিজের ঘরে বসে বারবার ঘড়ি দেখছিল।
রাত আটটায় রঙ্গমহলে যেতে হবে।
কিন্তু সে কি সত্যিই যাবে?
গত দুদিনে তার কাছে আরও তিনটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল। প্রথম দুবার কেউ কথা বলেনি। তৃতীয়বার এক নারীকণ্ঠ বলেছিল, “আপনি যা খুঁজছেন, তা পেলে হয়তো আপনার নিজের জীবন সম্পর্কেও কিছু প্রশ্ন উঠবে।”
কথাটা বলে ফোন কেটে দেওয়া হয়েছিল।
নীলাঞ্জনা চেষ্টা করেও নম্বরগুলোর পরিচয় জানতে পারেনি।
তার সহকর্মী অরিন্দম তাকে স্পষ্ট নিষেধ করেছিল।
— তুমি একটা পুরোনো নাটকের মৃত্যু নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে পড়ছ, যেন এটা কোনো গোয়েন্দা উপন্যাস। সাবধানে থেকো।
নীলাঞ্জনা হেসে বলেছিল, — বাস্তবের অনেক ঘটনা উপন্যাসের চেয়েও অদ্ভুত।
অরিন্দম উত্তর দিয়েছিল, — আর বাস্তবের বিপদগুলো উপন্যাসের মতো শেষ হয় না।
কথাটা তার মনে পড়ল।
তবু সে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
ব্যাগে রাখল মোবাইল, ছোট টর্চ, নোটবুক, রেকর্ডার এবং অদ্বৈত রায়ের সেই পুরোনো ছবিটি। যাওয়ার আগে অরিন্দমকে একটি বার্তা পাঠাল—
“রঙ্গমহলে যাচ্ছি। রাত সাড়ে দশটার মধ্যে যোগাযোগ না করলে আমাকে ফোন করবে। ফোন না ধরলে পুলিশকে জানাবে।”
বার্তা পাঠিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল।
রাত আটটার পাঁচ মিনিট আগে রঙ্গমহলের সামনে পৌঁছে গেল নীলাঞ্জনা।
বৃষ্টি তখন প্রায় থেমে এসেছে। রাস্তার আলোয় ভেজা পাথরের ওপর হলুদ আভা পড়েছে। বহু বছরের পুরোনো সাইনবোর্ডটি বাতাসে সামান্য দুলছে।
প্রধান দরজার তালা ঝুলছিল না।
দরজাটি সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে।
নীলাঞ্জনা কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
সঙ্গে সঙ্গে তার কানে ভেসে এল এক অদ্ভুত শব্দ।
করতালি।
প্রথমে মৃদু, তারপর ধীরে ধীরে জোরালো।
যেন কয়েকশো দর্শক কোনো অসাধারণ অভিনয় দেখে হাততালি দিচ্ছে।
কিন্তু অডিটোরিয়ামে ঢুকে নীলাঞ্জনা দেখল, আসনগুলো ফাঁকা। মঞ্চের সামনে কোনো মানুষ নেই। শুধু লাল পর্দা টানা।
করতালি থেমে গেল।
ঠিক তখনই অডিটোরিয়ামের শেষ সারিতে একটি ছোট আলো জ্বলে উঠল।
সেখানে একটি আসনের ওপর সাদা কাগজ রাখা।
নীলাঞ্জনা এগিয়ে গেল।
আসনটির গায়ে পিতলের ছোট ফলকে লেখা—
১৩।
কাগজে লেখা ছিল—
“আপনার জন্য নির্দিষ্ট আসন। নাটক শুরু হওয়ার আগে দয়া করে বসুন।”
নীলাঞ্জনা চারদিকে তাকাল। কেউ নেই।
সে তেরো নম্বর আসনে বসল।
ঠিক রাত আটটা।
মঞ্চের ওপর একটি ঘণ্টা বেজে উঠল।
টং!
তারপর দ্বিতীয়বার।
টং!
লাল পর্দা ধীরে ধীরে দুদিকে সরে গেল।
মঞ্চের মাঝখানে একটি টেবিল, দুটি চেয়ার এবং পেছনে কালো দেওয়াল। টেবিলের ওপর একটি পুরোনো ডেস্ক ল্যাম্প জ্বলছে।
কেউ একজন মঞ্চের বাঁ দিকের প্রবেশপথ দিয়ে এসে দাঁড়াল।
একজন নারী।
বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের কাছাকাছি। পরনে সাদা শাড়ি, চুলে পাক ধরেছে। তাঁর ডান হাতের অনামিকায় রুপোর আংটি।
আংটির ওপর বৃত্তের মধ্যে তির্যক রেখা।
নীলাঞ্জনার শ্বাস যেন আটকে গেল।
শর্মিষ্ঠা বসু!
নারীটি দর্শকাসনের দিকে তাকালেন। তারপর ধীর গলায় বললেন—
“আজকের নাটকটি কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়। এই নাটকের প্রতিটি চরিত্র একসময় বাস্তবে বেঁচে ছিল। আর এই নাটকের শেষ দৃশ্যটি সতেরো বছর ধরে অসমাপ্ত রয়েছে।”
তিনি টেবিলের ওপর রাখা একটি ফাইল খুললেন।
“প্রথম চরিত্র—অদ্বৈত রায়। অভিনেতা, নাট্যকার এবং সত্য অনুসন্ধানকারী।”
একটু থেমে বললেন—
“দ্বিতীয় চরিত্র—সমরেশ বসু। পরিচালক। যিনি বিশ্বাস করতেন, মঞ্চে যা ঘটে, তার নিয়ন্ত্রণ সব সময় পরিচালকের হাতে থাকে।”
নীলাঞ্জনা নোটবুক বের করতে গিয়েও থেমে গেল। তার মনে হচ্ছিল, এই ঘটনা শুধু একটি নাটক নয়। তাকে এখানে ডাকা হয়েছে নির্দিষ্ট কিছু শোনানোর জন্য।
শর্মিষ্ঠা এবার সরাসরি তার দিকে তাকালেন।
“তৃতীয় চরিত্র—একজন সাংবাদিক। যিনি সত্য প্রকাশ করতে চান, কিন্তু এখনও জানেন না, তাঁর নিজের নামও এই নাটকের পুরোনো তালিকায় লেখা আছে।”
নীলাঞ্জনা চমকে উঠল।
মঞ্চের আলো নিভে গেল।
এক মুহূর্ত পর আলো আবার জ্বলে উঠতেই নারীটি আর সেখানে নেই।
টেবিলের ওপর পড়ে রয়েছে একটি ফাইল।
আর তার প্রথম পাতায় বড় অক্ষরে লেখা—
নীলাঞ্জনা দত্ত।
২. অদৃশ্য অভিনেত্রী
নীলাঞ্জনা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
— কে আছেন? আপনি কোথায় গেলেন?
কোনো উত্তর নেই।
সে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। টেবিলের ওপরের ফাইলটি খুলতেই প্রথম পাতায় তার নামের নীচে একটি তারিখ দেখতে পেল।
১৪ নভেম্বর, ২০০৯।
তারিখটি অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রাত।
পরের পাতায় একটি তালিকা।
অদ্বৈত রায়—অভিনেতা।
সমরেশ বসু—পরিচালক।
মাধুরী সেন—প্রধান অভিনেত্রী।
শর্মিষ্ঠা বসু—নাট্যকার।
দেবব্রত লাহিড়ী—প্রযোজক।
তারপর আরও একটি নাম।
অনিরুদ্ধ দত্ত।
নীলাঞ্জনার হাত কেঁপে উঠল।
এটি তার বাবার নাম।
অনিরুদ্ধ দত্ত মারা গিয়েছিলেন যখন নীলাঞ্জনার বয়স মাত্র দশ বছর। পরিবারের সবাই জানত, তিনি একটি ছোট প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। একদিন কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নীলাঞ্জনা কখনও বাবার কাজের জগৎ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে পারেনি। বাড়িতে তাঁর কোনো ডায়েরি ছিল না, কোনো ব্যক্তিগত কাগজপত্রও বিশেষ ছিল না। মা বলতেন, বাবা খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। বই ভালোবাসতেন, নাটক দেখতে পছন্দ করতেন, আর কাজের বাইরে নিজের মতো থাকতেন।
কিন্তু রঙ্গমহলের এই ফাইলে তাঁর নাম কেন?
নীলাঞ্জনা দ্রুত পরের পাতা উল্টাল।
সেখানে লেখা—
“অনিরুদ্ধ দত্ত—প্রকাশনা ও নথি সংরক্ষণের দায়িত্বে। ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর মূল চিত্রনাট্যের অনুলিপি প্রস্তুত করেছিলেন।”
নীলাঞ্জনা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
তার বাবা এই নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন!
তাহলে পরিবারের কাছে এ কথা গোপন রাখা হয়েছিল কেন?
ঠিক সেই মুহূর্তে মঞ্চের পেছনের দরজা থেকে শব্দ এল। কেউ যেন ধীরে ধীরে হাঁটছে।
নীলাঞ্জনা টর্চ জ্বালিয়ে সেই দিকে এগোল।
করিডরের শেষ প্রান্তে একটি ছায়া দেখা গেল।
— কে?
ছায়াটি থেমে গেল।
তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ শোনা গেল—
— ফাইলটা বন্ধ করুন।
নীলাঞ্জনা বলল, — আপনি কে? আমার বাবার নাম এখানে কেন লেখা?
— সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না।
— আপনি কি শর্মিষ্ঠা বসুকে চেনেন?
— আপনি যাঁকে মঞ্চে দেখেছেন, তিনি শর্মিষ্ঠা কি না, সেটা কি নিশ্চিত?
নীলাঞ্জনা থমকে গেল।
— আপনি বলতে চাইছেন, ওই নারী শর্মিষ্ঠা ছিলেন না?
— আমি কিছুই বলছি না। শুধু বলছি, মঞ্চে দেখা সব চরিত্রকে বাস্তব বলে ধরে নেবেন না।
ছায়াটি সরে যেতে লাগল।
নীলাঞ্জনা তার পিছু নিল। কিন্তু করিডরের বাঁক ঘুরতেই কাউকে দেখা গেল না। সামনে একটি বন্ধ দরজা। দরজার বাইরে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।
সে দরজায় হাত রাখল। দরজাটি ভেতর থেকে আটকানো।
হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠল।
অরিন্দমের ফোন।
— তুমি কোথায়? — অরিন্দম উদ্বিগ্ন গলায় বলল। — তোমার লোকেশন দেখাচ্ছে তুমি এখনও রঙ্গমহলে আছ।
— আমি ঠিক আছি। কিন্তু এখানে অদ্ভুত কিছু ঘটছে।
— বেরিয়ে এসো। এখনই।
নীলাঞ্জনা বলল, — আমার বাবার নাম এই নাটকের ফাইলে আছে। তিনি ‘অন্তিম দৃশ্য’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আমাকে আগে এটা জানতে হবে।
ওপাশে অরিন্দম চুপ করে গেল।
তারপর ধীরে বলল, — তোমার বাবার নাম অনিরুদ্ধ দত্ত?
— হ্যাঁ। তুমি জানো?
— একটা কথা তোমাকে আগে বলা উচিত ছিল। তোমার বাবার মৃত্যুর পুরোনো খবর আমি একবার পড়েছিলাম। দুর্ঘটনার বিবরণে কিছু অসংগতি ছিল। কিন্তু তখন তোমার পরিবারের ব্যাপার বলে আর খোঁজ করিনি।
নীলাঞ্জনা রাগে বলল, — তুমি আমাকে এসব আগে বলোনি কেন?
— কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আর একটা তথ্য আছে, যেটা তোমাকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে।
— কী তথ্য?
— তোমার বাবার মৃত্যুর আগের দিন তিনি রঙ্গমহলে গিয়েছিলেন।
নীলাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল।
ফোনের ওপাশে অরিন্দমের কণ্ঠ আরও নিচু হলো।
— তুমি এখনই বেরিয়ে এসো। বাকি কথা বাইরে এসে বলব।
ফোন কেটে গেল।
নীলাঞ্জনা আবার অডিটোরিয়ামে ফিরে এল।
মঞ্চে আলো জ্বলছে।
ফাইলটি যেখানে রাখা ছিল, সেখানে এখন আর কিছু নেই।
কিন্তু তেরো নম্বর আসনের ওপর একটি নতুন কাগজ পড়ে আছে।
তাতে লেখা—
“আপনার বাবা নাটকের দর্শক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই একমাত্র মানুষ, যিনি শেষ দৃশ্যটি বদলে দিয়েছিলেন।”
৩. বাবার গোপন কাজ
রঙ্গমহল থেকে বেরিয়ে নীলাঞ্জনা সোজা অরিন্দমের কাছে গেল। রাত তখন সাড়ে দশটা। তারা একটি খোলা চায়ের দোকানে বসে কথা বলতে শুরু করল।
অরিন্দম ল্যাপটপ খুলে একটি পুরোনো সংবাদপত্রের ডিজিটাল কপি দেখাল।
— এই খবরটা দেখো।
খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর। শিরোনাম—“মঞ্চেই মৃত্যু, নাট্যজগতে শোকের ছায়া।”
প্রতিবেদনের মাঝখানে একটি ছোট অনুচ্ছেদ ছিল:
“নাটকের মূল চিত্রনাট্য সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রকাশনা কর্মী অনিরুদ্ধ দত্তের সঙ্গে শেষ কয়েক দিনে পরিচালকের মতবিরোধের কথা শোনা গেলেও, বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।”
নীলাঞ্জনা খবরটি বারবার পড়ল।
— আমার মা কখনও বাবার এই কাজের কথা বলেননি।
অরিন্দম বলল, — হয়তো তিনি জানতেন না। অথবা জানলেও কোনো কারণে বলতে চাননি।
— বাবার মৃত্যুর খবরেও তো নাটকের কথা নেই।
— দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়েছিল স্থানীয় পাতায়। তদন্তের বিস্তারিত নথি সহজে পাওয়া যাচ্ছে না।
নীলাঞ্জনা নিজের বাবার মুখ মনে করার চেষ্টা করল। ছোটবেলায় বাবা তাকে বই পড়ে শোনাতেন। বাড়িতে পুরোনো নাটকের বই ছিল কয়েকটি। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর মা সেগুলোর অনেকগুলো সরিয়ে ফেলেছিলেন।
একটি ঘটনা হঠাৎ মনে পড়ল।
বাবা মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে এক সন্ধ্যায় বাড়িতে দুজন লোক এসেছিল। মা তাকে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পরে বাবা খুব চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। পরদিন সকালে নীলাঞ্জনা স্কুলে যাওয়ার আগে দেখেছিল, বাবা একটি কাগজ ছিঁড়ে ছোট ছোট টুকরো করছেন।
তখন সে কিছুই বুঝতে পারেনি।
এখন সেই স্মৃতি যেন নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসছে।
— আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে, — নীলাঞ্জনা বলল।
অরিন্দম মাথা নাড়ল।
— কথা বলো। কিন্তু একটা বিষয় খেয়াল করো। কেউ তোমাকে রঙ্গমহলে নিয়ে গেছে, তোমার বাবার নাম দেখিয়েছে, তারপর আবার ফাইল সরিয়ে দিয়েছে। এর মানে, কেউ চায় তুমি নির্দিষ্ট কিছু জানো। আবার কেউ চায় তুমি পুরো সত্য জানতে না পারো।
— তাহলে আমরা কী করব?
— প্রথমে তোমার বাবার কাজের কাগজপত্র খুঁজতে হবে। তারপর অদ্বৈত রায়ের মূল চিত্রনাট্য।
নীলাঞ্জনা ব্যাগ থেকে পুরোনো ছবিটি বের করল।
— চিত্রনাট্যটা হয়তো এই ছবির মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
অরিন্দম ছবিটি হাতে নিয়ে মন দিয়ে দেখল।
— ছবির পেছনের লেখাটা কে দিয়েছে?
— নিবারণ পাল। তিনি বলেছিলেন, ছবিটি শেষ অভিনয়ের পরদিন মঞ্চের পেছনে পেয়েছিলেন।
অরিন্দম ছবিটি আলোয় ধরল।
— এই ছবিতে অদ্বৈত ছাড়াও পাঁচজন আছে। কিন্তু পুরোনো প্রতিবেদন অনুযায়ী শেষ দৃশ্যের সময় মঞ্চে চারজন অভিনেতা ছিলেন।
— তাহলে পঞ্চম ব্যক্তি কে?
অরিন্দম ছবিটি আরও কাছে নিয়ে গেল।
— দাঁড়াও। পেছনে যে ছায়াটা দেখা যাচ্ছে, সে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে নেই। সে তাকিয়ে আছে দর্শকাসনের দিকে।
নীলাঞ্জনা ছবিটি নিজের হাতে নিল।
সত্যিই তাই।
ছবির পেছনের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির শরীর মঞ্চের দিকে থাকলেও মুখ সামান্য ঘোরানো। যেন সে দর্শকদের মধ্যে কাউকে লক্ষ্য করছে।
অরিন্দম বলল, — হয়তো এই মানুষটাই পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।
— কিন্তু সে কে?
— সেটা জানতে হলে আমাদের মাধুরী সেনকে খুঁজতে হবে। কারণ ছবিতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি এখনও বেঁচে থাকতে পারেন বলে মনে হচ্ছে।
নীলাঞ্জনা বলল, — তুমি কি জানো, তিনি কোথায় থাকেন?
— নিশ্চিতভাবে নয়। তবে তাঁর এক আত্মীয় দক্ষিণ কলকাতায় থাকতেন। পুরোনো নাট্যসংগঠনের রেজিস্টারে সেই ঠিকানা থাকতে পারে।
তারা সেদিন রাতেই তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা করল।
কিন্তু নীলাঞ্জনা বাড়ি ফেরার আগে মায়ের কাছে ফোন করল।
মা ফোন ধরতেই সে জিজ্ঞাসা করল—
— মা, বাবা কি কখনও রঙ্গমহল নাট্যশালায় কাজ করেছিলেন?
ওপাশে নিস্তব্ধতা।
তারপর মায়ের গলা শোনা গেল, অস্বাভাবিক শান্ত—
— তুমি এই প্রশ্ন এখন কেন করছ?
নীলাঞ্জনা বুঝল, মা কিছু জানেন।
— কারণ বাবার নাম ওই থিয়েটারের একটা নথিতে পেয়েছি।
মা দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা বললেন না।
তারপর বললেন—
— বাড়ি এসো। তোমাকে এমন একটা কথা বলব, যা এত বছর ধরে বলতে পারিনি।
৪. মায়ের স্বীকারোক্তি
পরদিন সকালেই নীলাঞ্জনা বাড়ি গেল।
তার মা সুপর্ণা দত্ত এখন একা থাকেন। ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় কয়েকটি গাছ, বসার ঘরে বইয়ের আলমারি, দেওয়ালে অনিরুদ্ধ দত্তের একটি ফ্রেমে বাঁধানো ছবি।
মা দরজা খুলে তাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
চা দেওয়ার পর সুপর্ণা অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
— তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলেন, — তিনি বললেন। — কিন্তু তাঁর একটা স্বভাব ছিল। অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকতে পারতেন না।
নীলাঞ্জনা মায়ের সামনে বসে বলল, — তিনি কি ‘অন্তিম দৃশ্য’ নাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন?
সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।
— ছিলেন। তিনি একটি প্রকাশনা সংস্থায় কাজ করতেন। সেই সংস্থা নাটকের বই ছাপত। অদ্বৈত রায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল সেখানেই। অদ্বৈত তাঁর লেখা নাটক প্রকাশ করতে চাইতেন, আর তোমার বাবা পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার কাজ করতেন।
— তাহলে নাটকের ফাইলে তাঁর নাম ছিল কেন?
— কারণ অদ্বৈত তাঁকে একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নাটকের মূল পাণ্ডুলিপির দুটি অনুলিপি তৈরি করতে বলেছিলেন। একটি প্রকাশের জন্য, অন্যটি নিরাপদে রাখার জন্য।
নীলাঞ্জনা জিজ্ঞাসা করল, — কী এমন ছিল সেই পাণ্ডুলিপিতে?
সুপর্ণা জানালার বাইরে তাকালেন।
— নাটকটি প্রথমে ছিল এক বিচারকের গল্প। পরে অদ্বৈত কিছু ঘটনা যোগ করেন, যেগুলো নাকি বাস্তবের সঙ্গে মিলে যাচ্ছিল। নাটকের এক চরিত্রের নাম ছিল ‘বিজন সেন’। সে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রকাশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু নাটক যত এগোয়, ততই বোঝা যায়, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শহরের কয়েকজন প্রভাবশালী মানুষের সম্পর্ক রয়েছে।
— এটা কি বাস্তব কোনো প্রতিষ্ঠানের কথা ছিল?
— আমি জানি না। তোমার বাবা একবার বলেছিলেন, অদ্বৈত এমন কিছু নথি পেয়েছেন, যা প্রকাশ পেলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে।
— তাহলে অদ্বৈত রায়কে খুন করা হয়েছিল?
মা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
— আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু তোমার বাবা বিশ্বাস করতেন, অদ্বৈতকে স্বাভাবিকভাবে মরতে দেওয়া হয়নি।
নীলাঞ্জনার বুকের ভেতর চাপ অনুভূত হলো।
— তুমি আমাকে এত বছর কিছু বলোনি কেন?
সুপর্ণার চোখে জল এসে গেল।
— কারণ তোমার বাবার মৃত্যুর পর আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তারা বলেছিল, আমি যদি রঙ্গমহল বা অদ্বৈতের নাম নিয়ে কোথাও কথা বলি, তাহলে তোমারও ক্ষতি হবে।
— কারা হুমকি দিয়েছিল?
— মুখ ঢাকা ছিল। আমি কাউকে চিনতে পারিনি। কিন্তু তারা তোমার স্কুলের নাম জানত। তোমার প্রতিদিন বাড়ি ফেরার সময় জানত। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
নীলাঞ্জনা মায়ের হাত ধরল।
— বাবা কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, সেটা কি তুমি জানো?
সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।
— তিনি বলেছিলেন, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজ বাড়িতে এনে রেখেছেন। সেদিন রাতে তিনি রঙ্গমহল থেকে ফিরেছিলেন। পরদিন সকালে বেরিয়ে আর ফেরেননি। দুপুরে খবর এল, রাস্তার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন।
— কাগজগুলো কোথায়?
সুপর্ণা উঠে আলমারির দিকে গেলেন। বহু পুরোনো একটি কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সের মধ্যে কয়েকটি বই, পুরোনো ছবি এবং হলদেটে কাগজ রাখা।
তিনি একটি ছোট নোটবুক নীলাঞ্জনার হাতে দিলেন।
— তোমার বাবার হাতের লেখা। আমি কখনও পুরোটা পড়িনি। পড়ার সাহস হয়নি।
নীলাঞ্জনা নোটবুক খুলল।
প্রথম পাতায় লেখা—
“অদ্বৈত বলছে, নাটকের শেষ দৃশ্য বাস্তবের সঙ্গে মিলে গেছে। সে আর অভিনয় করতে চায় না। কিন্তু সমরেশ তাকে থামতে দেবে না।”
পরের পাতায়—
“মাধুরী আজ জানাল, মঞ্চের আলো বদলানোর নির্দেশ শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন করা হয়েছে। কে করেছে, সে জানে না।”
আরও একটি পাতায়—
“মূল পাণ্ডুলিপি নিরাপদে নেই। দ্বিতীয় অনুলিপি সরিয়ে রাখতে হবে।”
তারপর কয়েকটি পাতা ছেঁড়া।
শেষের দিকে একটি বাক্য লেখা—
“যদি আমার কিছু হয়, তবে মনে রেখো—মঞ্চের আলো কখনও নিজে থেকে বদলায় না।”
নীলাঞ্জনা বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইল।
তার বাবা কি কোনো পরিকল্পিত ঘটনার কথা জানতেন?
আর মঞ্চের আলো বদলানোর সঙ্গে অদ্বৈতের মৃত্যুর কী সম্পর্ক?
হঠাৎ নোটবুকের ভাঁজ থেকে একটি ছোট কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল।
কাগজটিতে হাতে আঁকা একটি নকশা। চারকোনা একটি ঘর, পাশে সরু পথ, এবং মাঝখানে একটি বৃত্ত।
নকশার নীচে লেখা—
“দ্বিতীয় অনুলিপি — দর্শকাসনের নীচে নয়, তার বিপরীতে।”
নীলাঞ্জনা মায়ের দিকে তাকাল।
— তুমি কি জানো, এটা কী?
সুপর্ণা মাথা নাড়লেন।
— না। তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমি আর কোনো কাগজ খুঁজিনি।
নীলাঞ্জনা নকশাটি ব্যাগে রাখল।
তার মনে হচ্ছিল, রঙ্গমহলের রহস্য এখন আর শুধু অদ্বৈত রায়ের মৃত্যু নিয়ে নয়।
এটি তার নিজের পরিবারের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
৫. শেষ দৃশ্যের গোপন সংকেত
সেদিন বিকেলে নীলাঞ্জনা ও অরিন্দম আবার রঙ্গমহলে গেল।
এবার তাদের কাছে পুরসভার নতুন অনুমতিপত্র ছিল। নিরাপত্তারক্ষী মহাদেব প্রথমে তাদের দেখে অবাক হলেও ভেতরে যেতে দিলেন।
নীলাঞ্জনা মঞ্চের নকশাটি বের করে অরিন্দমকে দেখাল।
— “দর্শকাসনের নীচে নয়, তার বিপরীতে।” কথাটার মানে কী হতে পারে?
অরিন্দম অডিটোরিয়ামের দিকে তাকাল।
— মঞ্চের বিপরীতে তো দর্শকাসন। কিন্তু দর্শকাসনের নীচে কিছু নেই, শুধু কাঠের কাঠামো। হয়তো মঞ্চের বিপরীত দিকের দেওয়ালে কিছু আছে।
তারা দর্শকাসনের শেষ সারি থেকে মঞ্চের দিকে তাকিয়ে ঘরটি পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
তেরো নম্বর আসনের ঠিক বিপরীতে, মঞ্চের পেছনের দেওয়ালের ওপর একটি ছোট আয়তাকার কাঠের ফলক ছিল। এত উঁচুতে যে সাধারণ দর্শকের চোখে পড়ার কথা নয়।
ফলকটির ওপর রঙ্গমহলের পুরোনো প্রতীক খোদাই করা—বৃত্তের মধ্যে তির্যক রেখা।
নীলাঞ্জনা বলল, — এই চিহ্নটাই শর্মিষ্ঠার আংটিতে ছিল।
মহাদেব একটি মই এনে দিলেন। অরিন্দম সাবধানে উঠে ফলকটি পরীক্ষা করল। সেটি দেওয়ালের সঙ্গে পুরোপুরি আটকানো নয়। পাশে ছোট একটি ফাঁক রয়েছে।
মই থেকে নেমে অরিন্দম বলল, — এখানে একটা খোপ আছে। কিন্তু ভেতরে হাত ঢোকানো যাচ্ছে না।
নীলাঞ্জনা টর্চের আলো ফেলল।
খোপের মধ্যে কালো কাপড়ে মোড়া একটি পাতলা বস্তু দেখা গেল।
মহাদেবের সাহায্যে ফলকটি খুলতেই কাপড়ে মোড়া প্যাকেটটি বেরিয়ে এল।
ভেতরে একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপি।
প্রথম পাতায় লেখা—
“অন্তিম দৃশ্য — অদ্বৈত রায় ও শর্মিষ্ঠা বসু।”
নীলাঞ্জনা কাঁপা হাতে পাণ্ডুলিপি খুলল।
এটি নাটকের মূল চিত্রনাট্য।
প্রথম কয়েকটি পাতা সাধারণ নাটকের মতো। চরিত্রের পরিচয়, সংলাপ, মঞ্চসজ্জার নির্দেশ। কিন্তু শেষের দিকে এসে লেখা বদলে গেছে।
একটি পাতায় লাল কালিতে নোট—
“শেষ দৃশ্যে বিচারককে যে গুলি করবে, সে মঞ্চে উপস্থিত থাকবে না। গুলির শব্দ হবে আলো নিভে যাওয়ার পর। দর্শক বুঝবে, বিচারক মারা গেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কে গুলি করেছে, তা প্রকাশ করা হবে না।”
তার পরের পাতায় অন্য হাতের লেখা—
“এই নির্দেশ বাতিল। হত্যাকারীকে দর্শকের সামনে আনতে হবে। নইলে নাটক অসম্পূর্ণ থাকবে।”
অরিন্দম বলল, — মনে হচ্ছে, কেউ শেষ মুহূর্তে নাটকের সমাপ্তি বদলাতে চেয়েছিল।
নীলাঞ্জনা পাতা উল্টাল।
শেষ পাতায় একটি সংলাপ লেখা ছিল, যা সংবাদপত্রের কোনো প্রতিবেদনেই সে পড়েনি।
“তোমরা ভাবছ, আমি মারা গেলে সত্যও মরে যাবে। কিন্তু তোমরা ভুলে গেছ, এই মঞ্চে শুধু অভিনেতারা অভিনয় করে না। দর্শকরাও কখনও কখনও সাক্ষী হয়ে ওঠে।”
সংলাপটির নীচে অদ্বৈত রায়ের স্বাক্ষর।
আর তার পাশে আরেকটি ছোট নোট—
“যে মানুষটি তেরো নম্বর আসনে বসবে, তাকে সব দেখাতে হবে।”
নীলাঞ্জনা পাণ্ডুলিপি থেকে মুখ তুলল।
— তেরো নম্বর আসন! আমাকে সেখানে বসানোর কথা কি অদ্বৈত রায় জানতেন?
অরিন্দম ধীরে বলল, — অসম্ভব নয় যে ওই আসনটি নাটকের পরিকল্পনার অংশ ছিল। কিন্তু কেন?
পাণ্ডুলিপির শেষ পৃষ্ঠার ভেতরের দিকে আরও একটি কাগজ আটকানো ছিল। সেটি খুলতেই একটি ছোট ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিতে একজন তরুণী, পাশে এক শিশু।
নীলাঞ্জনা ছবিটি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেল।
শিশুটির মুখ তার নিজের ছোটবেলার ছবির সঙ্গে আশ্চর্যরকম মিলে যাচ্ছে।
ছবির পেছনে লেখা—
“নীলু, বয়স চার। মঞ্চের বাইরে যার জন্য সবকিছু বদলে গেল।”
নীলাঞ্জনার মাথা ঘুরে উঠল।
তার বয়স চার ছিল ২০০২ সালে।
অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর সাত বছর আগে।
ছবির তরুণীটি কে? আর তার কোলে নীলাঞ্জনার মতো দেখতে শিশুটি কেন?
অরিন্দম ছবিটি দেখে বলল, — এই নারীকে কি তুমি চেনো?
নীলাঞ্জনা মাথা নাড়ল।
— না। কখনও দেখিনি।
ঠিক তখনই পেছনের করিডর থেকে কারও পায়ের শব্দ এল।
ধীর, মেপে মেপে এগিয়ে আসছে।
অরিন্দম পাণ্ডুলিপিটি ব্যাগে রাখতে গেল। কিন্তু তার আগেই একটি কণ্ঠ শোনা গেল—
— পাণ্ডুলিপিটা যেখানে ছিল, সেখানেই রেখে দিন।
তারা ঘুরে দাঁড়াল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে এক মধ্যবয়স্ক নারী।
সাদা শাড়ি, রুপোর আংটি, চোখে গভীর ক্লান্তি।
শর্মিষ্ঠা বসু।
এবার তাঁর মুখে কোনো মঞ্চের আলো নেই। নেই অভিনয়ের ভঙ্গি।
তিনি নীলাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“তোমার বাবার মতো একই ভুল তুমি করছ।”
নীলাঞ্জনা এক পা এগিয়ে গেল।
— আপনি শর্মিষ্ঠা বসু?
নারীটি মাথা নাড়লেন।
— হ্যাঁ।
— তাহলে সেদিন মঞ্চে আপনি কে ছিলেন?
শর্মিষ্ঠা উত্তর দিলেন না।
নীলাঞ্জনা পাণ্ডুলিপিটি শক্ত করে ধরে বলল—
— আমার বাবার নাম এই নাটকের সঙ্গে কেন জড়িয়ে আছে? এই ছবিতে আমার মতো শিশুটি কে? আর অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুতে আসলে কী ঘটেছিল?
শর্মিষ্ঠা ধীরে ধীরে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন।
তারপর এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে নীলাঞ্জনার পায়ের নীচের মাটি যেন সরে গেল।
“অদ্বৈত রায়ের মৃত্যুর রাতে তোমার বাবা শুধু একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। তিনি সেই মানুষ, যিনি শেষ মুহূর্তে একজনের জীবন বাঁচিয়েছিলেন।”
— কার জীবন?
শর্মিষ্ঠা নীলাঞ্জনার চোখের দিকে তাকালেন।
“তোমার।”
অডিটোরিয়ামের সব আলো একসঙ্গে নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে নীলাঞ্জনা শুনতে পেল, মঞ্চের কোথাও একটি চেয়ার ঘষটে সরানো হচ্ছে।
তারপর একটি পুরুষকণ্ঠ—
“শর্মিষ্ঠা, আর একটা শব্দ বললে, এবার নাটকের শেষ দৃশ্য সত্যিই শেষ হবে।”
একটি তীব্র আলোর রেখা মঞ্চের ওপর পড়ল।
শর্মিষ্ঠা সেখানে দাঁড়িয়ে নেই।
পাণ্ডুলিপি নীলাঞ্জনার হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল।
আর অন্ধকারের মধ্যে কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল—
“তোমার বাবার দুর্ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না।”
চলবে…