Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: শেষ কামরার মা)।

শেষ পর্ব

দরজার ওপাশ থেকে আবার সেই মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল।

“মিঠি, দরজাটা খোলো।”

অদিতি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত কাঁপছে। এতক্ষণ ধরে যে মানুষটিকে খুঁজছিল, তাঁর সম্পর্কে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে। বাবা কি সত্যিই তার বাবা নন? যে মাকে সে স্মৃতিতে দেখে এসেছে, তিনি কি সত্যিই তার মা? আর জন্মের রাতে যে দ্বিতীয় শিশুটির কথা বলা হচ্ছে, সেই শিশুটিই বা কে?

প্রশ্নগুলো যেন তার মাথার মধ্যে একসঙ্গে চিৎকার করছে।

হরিপদ পিছন থেকে বললেন, “দরজা খোলার আগে একটা কথা মনে রাখবেন। এই ট্রেনের সবচেয়ে বিপজ্জনক মিথ্যেটা কখনও অপরিচিত মানুষের মুখে আসে না। সেটা আসে পরিচিত মানুষের কণ্ঠে।”

অদিতি ঘুরে তাকাল।

“আপনি সব জানেন। তা হলে আমাকে এতক্ষণ ধরে সত্যিটা বলছেন না কেন?”

“কারণ সত্যিটা আমার মুখ থেকে শুনলে আপনি বিশ্বাস করবেন না। নিজের চোখে দেখতে হবে।”

“আপনি কি আমার বাবাকে চিনতেন?”

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি শুধু আপনার বাবাকে চিনতাম না, তাঁর শেষ যাত্রার সাক্ষীও ছিলাম।”

“তাহলে তিনি কোথায়?”

“শেষ কামরায়।”

অদিতি দরজার হাতলে হাত রাখল।

দরজাটা খুলে গেল।

ভেতরে কোনও আসন নেই, কোনও জানালা নেই। একটা ছোট্ট ঘর। মাঝখানে কাঠের চেয়ার। চেয়ারে বসে আছেন একজন মহিলা। তাঁর কোলে সাদা কাপড়ে মোড়ানো একটি শিশু।

মহিলার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। মুখে ক্লান্তির ছাপ। কপালের বাঁ দিকে ছোট্ট একটা কাটা দাগ। চুলের মধ্যে পাক ধরেছে।

অদিতি তাঁকে আগে কখনও দেখেনি।

তবু মহিলার চোখের দিকে তাকাতেই তার বুকের ভেতর কেমন একটা ব্যথা উঠল।

মহিলাটি বললেন, “এসেছ, মিঠি?”

অদিতি এবার দৃঢ় গলায় বলল, “আমাকে ওই নামে ডাকবেন না। আমার নাম অদিতি সেন।”

মহিলা মৃদু হাসলেন।

“তোমার নাম অদিতি। কিন্তু জন্মের সময় তোমাকে অন্য নামে ডাকা হয়েছিল।”

“কোন নামে?”

“মেঘলা।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“আমি এই নাম কখনও শুনিনি।”

“শোনার কথা নয়। তোমার জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নামটা কাগজ থেকে মুছে দেওয়া হয়েছিল।”

“আপনি কে?”

মহিলা শিশুটির মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে দিলেন। শিশুটি ঘুমিয়ে আছে। তার মুখে কোনও বিশেষ চিহ্ন নেই, কিন্তু তার বাঁ হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটি অস্বাভাবিকভাবে সামান্য বাঁকা।

মহিলা বললেন, “আমি মৃণালিনী দত্ত। ১৯৯৭ সালের ১৭ অক্টোবর রাতে কলকাতার একটি ছোট্ট হাসপাতালে আমার মেয়ে জন্মেছিল। সেই রাতেই তোমার মায়েরও সন্তান জন্মায়।”

“আপনি বলতে চাইছেন, আমি আপনার মেয়ে?”

“আমি বলতে চাইছি, তোমার জন্মের কাহিনি তোমাকে যেভাবে বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ নয়।”

অদিতি চেয়ারের সামনে দাঁড়াল।

“সোজা করে বলুন।”

মৃণালিনী গভীর শ্বাস নিলেন।

“সেই রাতে আমার সন্তান জন্মের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চিকিৎসকেরা তাকে অন্য ঘরে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর আমাকে জানানো হয়, আমার মেয়ে বাঁচেনি। আমি তার মুখও দেখতে পাইনি। শুধু একটা কাগজে সই করেছিলাম। সেই কাগজে লেখা ছিল, মৃত শিশুটিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে দাহ করা হবে।”

“তারপর?”

“পরদিন সকালে আমি জানতে পারি, আমার মেয়ের মৃত্যুর নথিতে ভুল আছে। সেখানে অন্য একটি শিশুর নাম লেখা। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু হাসপাতাল বলেছিল, সব কাগজ ঠিক আছে। কেউ আমার কথা শুনতে চায়নি।”

মৃণালিনী একটু থামলেন।

“কয়েক মাস পরে অনিরুদ্ধ সেন আমার কাছে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হাসপাতালের নথি বদলে দেওয়া হয়েছে। আমার মেয়ে হয়তো মারা যায়নি। কিন্তু তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তিনি জানেন না।”

অদিতির গলা শুকিয়ে গেল।

“আপনি কি আমার বাবা অনিরুদ্ধ সেনের কথা বলছেন?”

“হ্যাঁ। তিনি তোমার বাবার মতোই একজন মানুষ ছিলেন, যে একটা ভুলকে সংশোধন করতে গিয়ে আরও বড় ভুলের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছিল।”

“তাহলে আমি কার মেয়ে?”

মৃণালিনী শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন।

“তোমার জন্মদাত্রী কে, সেটা জানতে হলে তোমাকে আরও একটা সত্যি জানতে হবে। জন্মের রাতে হাসপাতালের দুটি শিশুকে অদলবদল করা হয়েছিল। কিন্তু সেই অদলবদল কোনও দুর্ঘটনা ছিল না। একজন চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে নথি বদলেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুদের পরিচয় বদলে দিলে তাদের ভবিষ্যৎও বদলে দেওয়া যায়।”

অদিতি স্তব্ধ হয়ে শুনছিল।

“সেই চিকিৎসকের নাম?”

মৃণালিনী বললেন, “ডাক্তার সমরেশ রায়।”

নামটা অদিতির কাছে অচেনা।

“তিনি কোথায়?”

“এই ট্রেনেই।”

ঘরের আলো এক মুহূর্তের জন্য নিভে গেল।

আবার জ্বলে উঠতেই অদিতি দেখল, চেয়ারটি খালি।

মৃণালিনী নেই। শিশুটিও নেই।

শুধু চেয়ারের ওপর একটি পুরোনো হাসপাতালের ফাইল পড়ে আছে।

অদিতি ফাইলটি তুলে নিল।

প্রথম পাতায় লেখা—

রাত্রিকালীন প্রসূতি বিভাগ, ১৭ অক্টোবর ১৯৯৭।

নিচে দুটি নাম।

১. মৃণালিনী দত্ত — কন্যাসন্তান।

২. মাধবী সেন — কন্যাসন্তান।

তারপর একটি লাল দাগ টেনে দুটি নামের পাশে লেখা—

পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ।

শেষ পাতায় একটি স্বাক্ষর।

ডা. সমরেশ রায়।

ফাইলের পেছনে পেন্সিলে লেখা আরেকটি বাক্য—

“একটি শিশু বেঁচে থাকবে। অন্যটির পরিচয় হারিয়ে যাবে। কিন্তু দুজনের একজন একদিন ফিরে আসবেই।”

অদিতি ফাইলটা বুকে চেপে ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

হরিপদ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“আপনি সব শুনেছেন?” অদিতি জিজ্ঞেস করল।

“হ্যাঁ।”

“এই ডা. সমরেশ রায় কে?”

হরিপদ মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

“একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবনকে কাগজের মতো সম্পাদনা করা যায়।”

“তিনি কি এখনও বেঁচে আছেন?”

“আমি জানি না।”

“কিন্তু আপনি বললেন, তিনি এই ট্রেনে আছেন!”

হরিপদ এবার অদিতির চোখের দিকে তাকালেন।

“আমি বলেছিলাম, তাঁর স্মৃতি এই ট্রেনে আছে। মানুষটি কোথায়, তা আমি জানি না।”

অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনারা সবাই কথার মধ্যে ফাঁক রাখেন কেন?”

হরিপদ শান্তভাবে বললেন, “কারণ আমরা সবাই নিজেদের অপরাধের কিছু অংশ লুকিয়ে রাখতে চাই।”

“আপনার অপরাধ কী?”

প্রশ্নটা শুনে হরিপদের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি ধীরে ধীরে নিজের কোটের বোতাম খুললেন। ভেতরের পকেট থেকে একটি পুরোনো ডায়েরি বের করলেন।

“এই ডায়েরিটা আপনার বাবার। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার পর আমি এটা নিজের কাছে রেখেছিলাম। এত বছর কাউকে দিইনি।”

অদিতি ডায়েরিটা নিয়ে খুলল।

প্রথম কয়েকটি পাতায় রেলওয়ের সিগন্যাল ব্যবস্থা, ট্রেনের সময়সূচি, কিছু প্রযুক্তিগত নোট। তারপর একটি পাতায় লেখা—

“১৭ অক্টোবর ১৯৯৭। রাত ১১টা ৪০।

আজ এমন একটা ঘটনা দেখলাম, যা কাউকে বলতে পারব না। ডা. সমরেশ রায় দুটি শিশুর নথি বদলে দিয়েছেন। মাধবীর মেয়ে জীবিত, কিন্তু তার কাগজে অন্য নাম। মৃণালিনীর মেয়ের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা হয়েছে। আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম। করিনি।

কারণ ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন, আমার মেয়ের চিকিৎসার খরচ তিনিই দেবেন।

আমি চুপ করে ছিলাম।

আজ বুঝলাম, মানুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ কখনও কখনও কিছু না করা।”

অদিতি পাতা উল্টে গেল।

পরের লেখাটি ২০০১ সালের।

“১৭ অক্টোবর ২০০১। রাত ১২টা ১৭।

পুরোনো সিগন্যাল ঘরে আবার সেই ট্রেনের দেখা পেলাম। রেলওয়ের কোনও নথিতে তার অস্তিত্ব নেই। তবু ট্রেনটি আসে। কামরায় এমন কিছু মানুষকে দেখেছি, যাদের মৃত্যু আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। তারা আমাকে চিনেছে।

আমি বুঝতে পারছি না, এটি কোনও বাস্তব ট্রেন, নাকি আমার অপরাধবোধের তৈরি দৃশ্য।

কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত—ট্রেনটি যতবার আসে, ততবার আমাকে সেই রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়।”

অদিতি ডায়েরি বন্ধ করল।

“আপনি কি আমার বাবার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে যুক্ত?”

হরিপদ মাথা নিচু করলেন।

“হ্যাঁ।”

“কী করেছিলেন আপনি?”

“২০১৪ সালের ১৭ অক্টোবর রাতে অনিরুদ্ধ এই ট্রেনে উঠেছিলেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, এবার তিনি সত্যিটা প্রকাশ করবেন। আমি তাঁকে থামাতে চেয়েছিলাম। কারণ তিনি সত্যিটা প্রকাশ করলে আমার অপরাধও সামনে চলে আসত।”

“তারপর?”

“আমি তাঁকে শেষ কামরায় যেতে সাহায্য করেছিলাম। ভেবেছিলাম, তিনি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তিনি আমাকে একটা কথা বলেছিলেন—‘হরিপদ, একদিন আমার মেয়ে আসবে। তাকে সত্যিটা বলবে।’”

অদিতি চুপ করে রইল।

“তাহলে আপনি এত বছর ধরে অপেক্ষা করছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু আপনি আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?”

হরিপদ এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন।

“আমি আপনাকে এখানে নিয়ে আসিনি। আপনি নিজেই এসেছেন। আমি শুধু আপনাকে দরজাগুলো চিনিয়ে দিয়েছি।”


ট্রেন আবার চলতে শুরু করল।

এবার কামরার জানালায় অদ্ভুত দৃশ্য ভেসে উঠতে লাগল। কোথাও পুরোনো হাসপাতাল, কোথাও নদীর ধারে একটা বাড়ি, কোথাও রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরী।

অদিতি প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে নিজের অতীত খুঁজতে লাগল।

হঠাৎ একটা জানালায় সে দেখল, ছোট্ট একটি মেয়ে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে এক যুবক—অনিরুদ্ধ সেন। যুবকের চোখে জল।

মেয়েটি বলছে, “বাবা, আমি কোথায় যাব?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিচ্ছেন, “তুমি যেখানে থাকবে, আমি তোমাকে খুঁজে নেব।”

দৃশ্যটি মিলিয়ে গেল।

অদিতির মনে হলো, এই কথাটা সে আগে শুনেছে।

কিন্তু কখন?

ছোটবেলায়?

নাকি এই ট্রেনেই?

ঠিক তখনই ট্রেনের দরজার পাশে একটি লাল আলো জ্বলে উঠল। তার নিচে লেখা—

শেষ কামরা: প্রবেশ নিষেধ।

হরিপদ বললেন, “এবার আপনাকে একাই যেতে হবে।”

“আপনি আসবেন না?”

“আমি ওই কামরায় যেতে পারি না।”

“কেন?”

“কারণ সেখানে যে মানুষটি অপেক্ষা করছেন, তিনি আমারও বিচার করবেন।”

অদিতি শেষ কামরার দিকে এগোল।

দরজার সামনে পৌঁছতেই তার কানে বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“মিঠি, আর এগিও না।”

সে থেমে গেল।

দরজার ওপাশে অনিরুদ্ধ সেন দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখে ক্লান্তি, চোখে গভীর দুঃখ।

অদিতি এবার পালাল না।

“তুমি কি সত্যিই আমার বাবা?”

অনিরুদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমি তোমাকে বড় করেছি। তোমার প্রথম স্কুলে যাওয়ার দিন তোমার হাত ধরে নিয়ে গিয়েছি। তুমি অসুস্থ হলে রাত জেগে তোমার পাশে বসে থেকেছি। তুমি যখন প্রথমবার সংবাদপত্রে নিজের লেখা দেখিয়েছিলে, আমি গোপনে সেই কাগজের দশটা কপি কিনেছিলাম।”

অদিতির চোখে জল এসে গেল।

“কিন্তু আমি তোমার জৈবিক মেয়ে নই?”

অনিরুদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি জানি না।”

“কীভাবে জানো না?”

“কারণ হাসপাতালের নথি বদলে দেওয়া হয়েছিল। আমি তোমাকে নিজের মেয়ে হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। পরে জানতে পেরেছিলাম, হয়তো তুমি অন্য কারও সন্তান। কিন্তু তখন তোমাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবতেও পারিনি।”

“তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি কেন?”

“ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সত্যিটা জানলে তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তাহলে তুমি আমাকে ভালোবাসার জন্য নয়, আমাকে হারানোর ভয়ে সত্যিটা লুকিয়েছিলে?”

অনিরুদ্ধ মাথা নত করলেন।

“প্রথমে হয়তো তাই। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, তুমি আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছ। তোমার জন্মের পরিচয় যাই হোক, তোমাকে বাবা বলে ডাকার অধিকার আমি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইনি।”

অদিতি দরজার চৌকাঠে বসে পড়ল।

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”

অনিরুদ্ধ তার পাশে বসলেন।

“আমি এই ট্রেনের যাত্রী হয়ে যাইনি, মিঠি। আমি এখনও জীবিত।”

অদিতি চমকে উঠল।

“তাহলে তুমি কোথায়?”

“আমি কলকাতার বাইরে একটা ছোট্ট শহরে থাকি। আমার স্মৃতির অনেকটা হারিয়ে গেছে। অমিয় সেনের লোকেরা আমাকে বহু বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিল। গত কয়েক মাসে কিছু স্মৃতি ফিরে এসেছে। আমি জানি, এই ট্রেন বাস্তবের কোনও সাধারণ ট্রেন নয়। এটা আমার অপরাধবোধ, আমার ভয়, আমার হারানো স্মৃতি—সব মিলিয়ে তৈরি একটা জগৎ। কিন্তু তোমার কাছে পৌঁছনোর পথ আমি এখানেই খুঁজে পেয়েছি।”

অদিতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“তাহলে এই ট্রেনের যাত্রীরা?”

“কিছু মানুষ বাস্তবে মারা গেছেন। কিছু মানুষ বেঁচে থেকেও নিজেদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছেন। আর কিছু মুখ আমার স্মৃতির ভেতর তৈরি। আমি এত বছর ধরে যে অপরাধবোধ বহন করেছি, সেই অপরাধবোধই তাদের কণ্ঠ দিয়েছে।”

“তুমি কি আমাকে চিঠি পাঠিয়েছিলে?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে তুমি জানতেই আমি আসব?”

“আমি আশা করেছিলাম। কিন্তু তোমাকে জোর করে আনতে চাইনি। তুমি নিজের সিদ্ধান্তে এসেছ।”

অদিতি বাবার হাত ধরল।

“আমি তোমাকে খুঁজতে এসেছিলাম। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, আমি আসলে নিজের পরিচয় খুঁজতে এসেছি।”

অনিরুদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“নিজের পরিচয় জন্মের কাগজে লেখা থাকে না, মিঠি। পরিচয় তৈরি হয় আমরা কী করি, কাকে ভালোবাসি, আর ভুল করার পর কীভাবে সেই ভুলের দায় নিই—তার মধ্যে দিয়ে।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“কিন্তু মৃণালিনী দত্ত? তিনি কি সত্যিই আমার মা?”

অনিরুদ্ধ উত্তর দিলেন, “সম্ভব। আবার নাও হতে পারে। তোমার জন্মের রাতের নথি এতটাই বদলে দেওয়া হয়েছে যে, শুধু কাগজ দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। সত্যি জানতে হলে হাসপাতালের মূল রেকর্ড, চিকিৎসকদের সাক্ষ্য এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা দরকার।”

“আর ডা. সমরেশ রায়?”

“তিনি এই পুরো ঘটনার অন্যতম সাক্ষী। তিনি কোথায় আছেন, তা আমি জানি না। কিন্তু তাঁর পুরোনো নোটের একটা কপি আমি লুকিয়ে রেখেছি।”

অনিরুদ্ধ নিজের পকেট থেকে একটি ছোট্ট কাগজ বের করলেন।

সেখানে একটি ঠিকানা লেখা।

বনগাঁ, পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টার, বাড়ি নম্বর ১৭।

নিচে একটি নাম—

সমরেশ রায়।

অদিতি কাগজটা হাতে নিল।

“আমি ওঁকে খুঁজে বের করব।”

অনিরুদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“খুঁজবে। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে নয়। সত্যিটা জানতে।”

ঠিক তখনই ট্রেনের ঘণ্টা বেজে উঠল।

একবার।

দুবার।

তিনবার।

অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।

“তোমার নামার সময় হয়েছে।”

“তুমি আমার সঙ্গে যাবে না?”

“আমি যেতে পারব না। এখনও আমার কিছু হিসাব বাকি আছে।”

অদিতি বাবার হাত শক্ত করে ধরল।

“আবার তোমাকে হারাতে চাই না।”

অনিরুদ্ধ তার মাথায় হাত রাখলেন।

“এইবার তুমি আমাকে হারাবে না। কারণ এইবার তুমি জানো, আমাকে কোথায় খুঁজতে হবে।”

শেষ কামরার দরজা খুলে গেল।

অদিতি দেখল, বাইরে শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।

ডিজিটাল ঘড়িতে সময়—রাত ১২টা ১৭ মিনিট।

সে দরজার বাইরে পা রাখল।

পিছনে ফিরে তাকাতেই ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। জানালার ওপারে অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে। তিনি হাত নাড়লেন।

তারপর ট্রেনটা ধীরে ধীরে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মে কোনও কুয়াশা নেই। কোনও অচেনা যাত্রী নেই। শুধু দূরে একজন রেলকর্মী ঝাড়ু দিচ্ছেন।

অদিতি নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।

রাত ১২টা ১৮।

তার ফোন চালু করতেই ব্যাটারিতে দেখা গেল ৬৮ শতাংশ চার্জ। নেটওয়ার্ক ফিরে এসেছে। কোনও অস্বাভাবিক কল বা বার্তা নেই।

তার হাতে শুধু পুরোনো ডায়েরি, হাসপাতালের ফাইল আর সমরেশ রায়ের ঠিকানা।

সে গভীর শ্বাস নিল।

এই রাতের সবকিছু কি বাস্তবে ঘটেছে? নাকি দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, বাবাকে হারানোর যন্ত্রণা আর অজানা তথ্য মিলিয়ে তার মস্তিষ্ক এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে, যার ব্যাখ্যা এখনও সে জানে না?

অদিতি জানত না।

কিন্তু সে জানত, এবার আর কোনও রহস্যকে অন্ধবিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দেবে না।


পরদিন সকাল।

অদিতি বনগাঁর উদ্দেশে রওনা দিল।

পুরোনো রেলওয়ে কোয়ার্টারের বাড়ি নম্বর ১৭ খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না। বাড়িটি জরাজীর্ণ। উঠোনে আগাছা। দরজায় তালা নেই, শুধু ভেতর থেকে বন্ধ।

অদিতি দরজায় কড়া নাড়ল।

কোনও উত্তর নেই।

আবার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে বৃদ্ধ কণ্ঠ শোনা গেল।

“কে?”

“আমি অদিতি সেন। ডা. সমরেশ রায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”

ভেতরে দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর দরজা খুলল।

দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধের মুখ দেখে অদিতির বুক কেঁপে উঠল।

এই সেই মানুষ, যার ছবি সে হাসপাতালের ফাইলে দেখেছিল।

সমরেশ রায়।

বৃদ্ধ অদিতির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তুমি অবশেষে এসেছ।”

অদিতি অবাক হয়ে গেল।

“আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন?”

“গত উনত্রিশ বছর ধরে।”

“কেন?”

সমরেশ ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে গিয়ে একটি পুরোনো কাঠের বাক্স বের করলেন। বাক্সের ভেতরে হাসপাতালের আসল নথি, দুটি শিশুর জন্মের রেকর্ড, চিকিৎসকদের স্বাক্ষর এবং একটি ভিডিও ক্যাসেট।

তিনি বললেন, “কারণ তোমাকে সত্যিটা জানানো আমার দায়িত্ব ছিল। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম।”

“কী সত্যি?”

সমরেশ বাক্স থেকে দুটি ছবি বের করলেন।

প্রথম ছবিতে নবজাতক একটি মেয়ে।

দ্বিতীয় ছবিতেও নবজাতক একটি মেয়ে।

দুটি ছবির পেছনে লেখা—

শিশু ক — মৃণালিনী দত্তের কন্যা।

শিশু খ — মাধবী সেনের কন্যা।

সমরেশ বললেন, “তোমাকে যে শিশুটির পরিচয়ে বড় করা হয়েছে, সেই শিশুটি অন্য একজনের সন্তান হতে পারে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যি অন্য জায়গায়।”

অদিতি তাঁর দিকে তাকাল।

“কোথায়?”

বৃদ্ধ ভিডিও ক্যাসেটটি টেবিলের ওপর রাখলেন।

“এই ভিডিওতে তোমার জন্মের রাতের সম্পূর্ণ ঘটনা আছে। সেখানে দেখা যাবে, কে নথি বদলেছিল, কেন বদলেছিল, আর সেই রাতে তৃতীয় একজন মানুষ কেন হাসপাতালে এসেছিল।”

“তৃতীয় একজন?”

সমরেশের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“হ্যাঁ। এমন একজন, যার নাম কোনও নথিতে নেই। অথচ সেই মানুষটিই তোমার বাবাকে বারো বছর আগে শেষ ট্রেনে উঠতে বাধ্য করেছিল।”

অদিতির বুকের মধ্যে আবার সেই পুরোনো ভয় ফিরে এল।

“কে সে?”

সমরেশ উত্তর দিলেন না।

তিনি শুধু ভিডিও ক্যাসেটটি অদিতির হাতে দিয়ে বললেন—

“দেখার আগে একটা কথা মনে রেখো। তোমার বাবা হয়তো তোমার জন্মদাতা নন। কিন্তু যে মানুষটি তোমাকে নিজের মেয়ে বলে বড় করেছে, তার ভালোবাসা কোনও পরীক্ষার ফল দিয়ে মাপা যায় না।”

অদিতি ক্যাসেটটি হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে রেললাইন।

একটা ট্রেন ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে।

তার জানালার পাশে এক মুহূর্তের জন্য একজন মানুষকে দেখা গেল।

ধূসর পাঞ্জাবি।

চোখে গোল চশমা।

অনিরুদ্ধ সেন।

অদিতি দৌড়ে দরজার কাছে গেল।

কিন্তু ট্রেন ততক্ষণে দূরে চলে গেছে।

তার ফোনে একটি নতুন বার্তা এল।

অজানা নম্বর।

“শেষ ট্রেনের যাত্রা শেষ হয়েছে। কিন্তু তোমার জীবনের আসল যাত্রা এখন শুরু।”

অদিতি বার্তাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ভিডিও ক্যাসেটটি ব্যাগে রাখল।

সে জানত, সামনে আরও প্রশ্ন অপেক্ষা করছে। কিন্তু এবার সে প্রশ্নগুলো থেকে পালাবে না।

কারণ কিছু যাত্রা স্টেশনে শেষ হয় না।

কিছু যাত্রা শুরু হয় নিজের পরিচয়কে প্রশ্ন করার সাহস থেকে।

আর কোনও এক অন্ধকার রাতে, কোনও অচেনা প্ল্যাটফর্মে, শেষ ট্রেন হয়তো আবার আসবে।

কিন্তু এবার অদিতি জানে—ট্রেনে ওঠার আগে তাকে নিজের সত্যিটা যাচাই করে নিতে হবে।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *