রাত তখন ১২টা ১৭ মিনিট।
শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম নম্বর সাতের ওপর ঘন কুয়াশার মতো ধোঁয়া জমে আছে। অক্টোবরের শেষ দিকের রাত। স্টেশনের বেশির ভাগ দোকান বন্ধ। দু-একজন কুলি বেঞ্চে বসে ঝিমোচ্ছে। দূরে রেললাইনের ওপর দিয়ে একটা মালগাড়ি চলে যাওয়ার পর চারপাশে আবার নেমে এসেছে অস্বাভাবিক নীরবতা।
স্টেশনের পুরোনো ঘড়িটা বারোটা সতেরোতেই আটকে আছে।
ঘড়িটা নষ্ট হয়েছে বহুদিন। রেল কর্তৃপক্ষ নতুন ডিজিটাল ঘড়ি লাগিয়েছে, তবু কেউ পুরোনো ঘড়িটা খুলে ফেলেনি। স্টেশনের কর্মচারীদের মধ্যে একটা কথা চালু আছে—রাত বারোটার পর ঘড়িটার দিকে একটানা তাকিয়ে থাকলে নিজের জীবনের এমন একটা মুহূর্ত মনে পড়বে, যেটা তুমি ভুলে যেতে চেয়েছিলে।
কেউ কথাটা বিশ্বাস করে না।
কিন্তু রাতের শেষ ট্রেনের চালকরা ওই ঘড়ির নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় অকারণে গতি কমিয়ে দেন।
সেই রাতে প্ল্যাটফর্মের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল অদিতি সেন।
বয়স ঊনত্রিশ। পেশায় সংবাদপত্রের প্রতিবেদক। গত ছয় বছর ধরে অপরাধ, নিখোঁজ মানুষ এবং পুরোনো রহস্য নিয়ে কাজ করছে সে। কিন্তু আজ তার হাতে কোনও ক্যামেরা নেই, কাঁধে নেই সংবাদমাধ্যমের ব্যাগ। তার ডান হাতে একটি পুরোনো খাম, বাঁ হাতে ছোট্ট একটি কালো স্যুটকেস।
খামের ওপর লেখা—
অদিতি সেনের হাতে, ১৭ অক্টোবর, রাত বারোটার পরে।
লেখাটা তার বাবার।
সেই বাবা, যিনি বারো বছর আগে একটি ট্রেনে উঠে আর কখনও বাড়ি ফেরেননি।
অদিতির বাবা অনিরুদ্ধ সেন ছিলেন রেলওয়ের সিগন্যাল বিভাগের কর্মী। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার দিনটি ছিল ১৭ অক্টোবর। অফিসের নথি অনুযায়ী, রাত ১১টা ৪০ মিনিটে তিনি শিয়ালদহ থেকে শেষ লোকাল ট্রেনে উঠেছিলেন। ট্রেনটি গন্তব্যে পৌঁছেছিল, কিন্তু অনিরুদ্ধের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তাঁর মৃতদেহ মেলেনি।
কোনও প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি।
পুলিশ প্রথমে নিখোঁজ মামলা করেছিল। ছয় মাস পরে তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়।
অদিতির মা সেই ঘটনার তিন বছর পর মারা যান। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর স্বামী একদিন ফিরে আসবেন।
অদিতি কোনও দিন বিশ্বাস করেনি।
বারো বছর ধরে সে বাবাকে খুঁজেছে। রেল পুলিশের পুরোনো নথি ঘেঁটেছে, হাসপাতাল খুঁজেছে, অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহের তালিকা মিলিয়েছে। এমনকি বাবার সহকর্মীদেরও খুঁজে বের করেছে। কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর পেয়েছে—অনিরুদ্ধ সেনের আর কোনও খোঁজ নেই।
গতকাল সন্ধ্যায় অদিতির বাড়ির দরজার নিচ দিয়ে খামটি ঢোকানো হয়।
ভেতরে ছিল মাত্র একটি চিঠি।
“অদিতি,
তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, আমি কোথায় গিয়েছিলাম, তাহলে ১৭ অক্টোবর রাত ১২টা ১৭ মিনিটে শিয়ালদহের সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসো।
শেষ ট্রেনটা আসবে।
ওই ট্রেনে উঠবে না।
কারণ আমি সেখানে নেই।
— বাবা”
চিঠির নিচে আরও একটি লাইন ছিল।
“আর যদি ট্রেন থেকে কেউ নেমে তোমাকে তোমার ছোটবেলার নাম ধরে ডাকে, কোনও উত্তর দেবে না।”
অদিতি চিঠিটা বারবার পড়েছিল।
তার ছোটবেলার নাম ছিল মিঠি।
বাবা ছাড়া আর কেউ তাকে এই নামে ডাকত না।
তবু সে এসেছে।
কারণ বারো বছরের প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষের সাহস আর অবিশ্বাসের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না।
রাত ১২টা ১৬ মিনিটে স্টেশনের ঘোষণাব্যবস্থা থেকে একটা ভাঙা আওয়াজ ভেসে এল।
“যাত্রীদের জানানো হচ্ছে, শেষ ট্রেনটি কিছুক্ষণের মধ্যে সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করবে। যাত্রীরা দয়া করে—”
তারপর শব্দ থেমে গেল।
অদিতি মাথা তুলে তাকাল।
স্টেশনের ডিজিটাল বোর্ডে কোনও ট্রেনের নাম নেই। এই সময়ে সাত নম্বর প্ল্যাটফর্মে কোনও ট্রেন আসার কথা নয়। সে রেলওয়ের সময়সূচি ভালো করেই জানে।
দূরে রেললাইনের বাঁক থেকে একটি আলো দেখা গেল।
ট্রেনের হেডলাইট।
অদিতির বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
ট্রেনটি ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। পুরোনো নীল-সাদা কামরা। জানালার কাচে ধুলো। দরজার পাশে মরচে। ইঞ্জিনের গায়ে নম্বর লেখা থাকলেও কুয়াশার কারণে তা স্পষ্ট বোঝা গেল না।
ট্রেন থামল।
কোনও ঘোষণা হলো না।
দরজাগুলো খুলে গেল একসঙ্গে।
কিন্তু কোনও যাত্রী নামল না।
অদিতি নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল।
১২টা ১৭।
সে ফোন বের করে ছবি তুলতে গেল। স্ক্রিন জ্বলে উঠল, কিন্তু ক্যামেরা খুলল না। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। ব্যাটারির চার্জও হঠাৎ এক শতাংশ দেখাচ্ছে, যদিও স্টেশনে আসার সময় চার্জ ছিল সত্তর শতাংশের বেশি।
অদিতি ফোনটা বন্ধ করে ব্যাগে রাখল।
তারপর সে ট্রেনের দিকে এগোল।
প্রথম কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল একজন বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক। কালো কোট, মাথায় পুরোনো ধাঁচের টুপি। তাঁর হাতে একটি ছোট্ট ছিদ্র করার যন্ত্র।
“টিকিট?” বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি উঠব না।”
“তাহলে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
“একজনকে খুঁজছি।”
বৃদ্ধ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
“সবাই কাউকে না কাউকে খুঁজতে আসে।”
“আপনি কি অনিরুদ্ধ সেনকে চেনেন?”
প্রশ্নটা শুনে বৃদ্ধের চোখের মণি যেন সামান্য কেঁপে উঠল।
“এই ট্রেনে ওই নামে কেউ নেই।”
“আপনি ট্রেনের নাম বললেন না কেন?”
“এই ট্রেনের নাম জানলে আপনার কোনও লাভ হবে না।”
“কোথা থেকে এসেছে?”
বৃদ্ধ হাতঘড়ি দেখলেন।
“যেখান থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষরা ফেরে।”
অদিতি বিরক্ত হয়ে বলল, “দেখুন, আমি কোনও গল্প শুনতে আসিনি। আমার বাবা বারো বছর আগে একটা ট্রেনে উঠে নিখোঁজ হয়েছিলেন। তাঁর নামে একটা চিঠি পেয়েছি। তাই এসেছি।”
বৃদ্ধ এবার তার হাতে থাকা খামটার দিকে তাকালেন।
“চিঠিটা কে দিয়েছে?”
“জানি না।”
“চিঠির হাতের লেখা চিনেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে আপনার বাবার কথা বিশ্বাস করেন?”
অদিতি একটু থামল।
“আমি চিঠিটা বিশ্বাস করি। মানুষটাকে নয়।”
বৃদ্ধের মুখে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটল।
“ভালো। তা হলে আপনার এখনও ফেরার সুযোগ আছে।”
তিনি দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন।
“কিন্তু মনে রাখবেন, এই ট্রেনের যাত্রীরা নিজেদের গন্তব্য জানে না। কেউ কেউ জানে না তারা আদৌ জীবিত কি না। আর কেউ কেউ জানে, তবু নামতে পারে না।”
অদিতি কোনও উত্তর দিল না।
সে পাশ কাটিয়ে প্রথম কামরায় উঠল।
ভেতরে ঢুকেই তার মনে হলো, ট্রেনটি যেন অন্য কোনও সময় থেকে এসেছে।
কাঠের আসন। পুরোনো পাখা। জানালার ওপরে বিবর্ণ বিজ্ঞাপন। দেয়ালে ঝুলছে একটি সময়সূচি, যেখানে লেখা আছে—১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাসের ট্রেন চলাচলের তালিকা।
কামরার মাঝখানে বসে আছে এক কিশোর। বয়স চৌদ্দ কি পনেরো। তার পরনে স্কুলের পোশাক। কাঁধে ব্যাগ। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
অদিতি কাছে গিয়ে বলল, “এই ট্রেন কোথায় যাচ্ছে?”
ছেলেটি মুখ ফেরাল।
“আপনি কি আমার মাকে দেখেছেন?”
“তোমার মা কোথায়?”
“এই ট্রেনেই উঠেছিলেন।”
“কবে?”
“গতকাল।”
অদিতি অবাক হলো। “গতকাল?”
ছেলেটি মাথা নাড়ল।
“মা বলেছিল, স্কুল থেকে ফিরে আমাকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাড়ি গিয়ে দেখি মা নেই। তারপর স্টেশনে এলাম। ট্রেনটা দাঁড়িয়ে ছিল। মা ভেতরে বসে ছিল। আমাকে হাত নেড়ে ডাকল।”
“তুমি ট্রেনে উঠলে?”
“না। মা বলেছিল, আমি যেন উঠি না। তারপর ট্রেনটা চলে গেল। আজ আবার এসেছে।”
অদিতি ছেলেটির চোখের দিকে তাকাল। চোখে কোনও ভয় নেই। বরং এমন একটা নিশ্চিন্ত ভাব, যেন এই ঘটনা খুব স্বাভাবিক।
“তোমার নাম কী?”
“ঋজু।”
“বাড়ি কোথায়?”
“বেহালা।”
“তোমার সঙ্গে কেউ আছে?”
ঋজু মাথা নাড়ল।
অদিতি নিজের ব্যাগ থেকে একটা বিস্কুটের প্যাকেট বের করে ছেলেটির হাতে দিল।
“তুমি এখানে বসে থাকো। আমি অন্য কামরায় দেখে আসছি।”
ছেলেটি বিস্কুট নিল না।
“আপনি কি মিঠি?”
অদিতির শরীরের ভেতর যেন বরফ ঢেলে দিল কেউ।
“কী বললে?”
“মিঠি। আমার মা বলেছে, এই নামের একজন মেয়ে আজ ট্রেনে উঠবে।”
“তোমার মা কে?”
ঋজু উত্তর দিল না। সে শুধু জানালার বাইরে আঙুল তুলে দেখাল।
প্ল্যাটফর্মে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে।
লাল শাড়ি। খোলা চুল। মুখটা অস্পষ্ট।
মহিলাটি জানালার কাচের দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর ঠোঁট নাড়ল।
অদিতি শব্দ শুনতে পেল না, কিন্তু কথাটা বুঝতে পারল।
“মিঠি, বাড়ি চলো।”
এটা তার মায়ের কণ্ঠস্বর।
অদিতি তড়িঘড়ি জানালার দিকে এগিয়ে গেল।
প্ল্যাটফর্মে কেউ নেই।
সে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল, ঋজুও নেই।
শুধু আসনের ওপর পড়ে আছে একটি স্কুলের পরিচয়পত্র।
অদিতি সেটা তুলে নিল।
ছবিতে ঋজু হাসছে। নিচে নাম লেখা—
ঋজু মিত্র।
জন্ম: ১২ জানুয়ারি, ১৯৮৪।
পরিচয়পত্রের পেছনে লাল কালিতে লেখা—
নিখোঁজ: ১৭ অক্টোবর, ১৯৯৮।
অদিতির হাত কেঁপে উঠল।
এখন ২০২৬ সাল।
যে ছেলেটিকে সে কয়েক মিনিট আগে দেখেছে, সে আটাশ বছর আগে নিখোঁজ হয়েছিল।
অদিতি কামরা থেকে বেরিয়ে পরের কামরার দিকে এগোল।
দ্বিতীয় কামরায় কয়েকজন যাত্রী বসে আছে। কেউ খবরের কাগজ পড়ছে, কেউ জানালার দিকে তাকিয়ে, কেউ চোখ বন্ধ করে। তাদের পোশাকও আলাদা আলাদা সময়ের—কারও গায়ে আশির দশকের শার্ট, কারও পরনে পুরোনো শাড়ি, কারও হাতে এমন মডেলের মোবাইল, যা বহু বছর আগে বাজার থেকে উঠে গেছে।
অদিতি একজন মধ্যবয়স্ক লোককে জিজ্ঞেস করল, “এই ট্রেন কোথায় যাচ্ছে?”
লোকটি খবরের কাগজ থেকে চোখ না তুলেই বলল, “শেষ স্টেশন।”
“শেষ স্টেশনের নাম কী?”
“যার যার জন্য আলাদা।”
“আপনার নাম?”
লোকটি এবার মুখ তুলল।
“প্রবীর ঘোষ।”
অদিতি নামটা শুনে চমকে উঠল।
প্রবীর ঘোষ ছিলেন তার বাবার সহকর্মী। বারো বছর আগে তিনিই পুলিশের কাছে বলেছিলেন, অনিরুদ্ধ সেন সেদিন শেষ ট্রেনে উঠেছিলেন।
কিন্তু প্রবীর ঘোষ মারা গিয়েছিলেন সাত বছর আগে।
অদিতি ধীরে ধীরে বলল, “আপনি কি রেলওয়ের সিগন্যাল বিভাগে কাজ করতেন?”
প্রবীর মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। অনিরুদ্ধের সঙ্গে।”
“আমার বাবা কোথায়?”
প্রবীরের মুখের ভাব বদলে গেল।
“তুমি অনিরুদ্ধের মেয়ে?”
“হ্যাঁ।”
প্রবীর কাগজটা ভাঁজ করে রাখলেন।
“তোমার বাবাকে আমি শেষবার দেখেছিলাম ১৭ অক্টোবর, ২০১৪ সালে। রাত ১১টা ৪০ মিনিটে।”
“কিন্তু আপনি তো বলেছিলেন, ২০১৪ সালের সেই রাতেই তিনি ট্রেনে উঠেছিলেন।”
“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”
অদিতি তাঁর সামনে বসে পড়ল।
“কেন?”
প্রবীর জানালার বাইরে তাকালেন।
“কারণ তোমার বাবা ট্রেনে ওঠেননি। তিনি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন।”
“কোথায়?”
“যে স্টেশনের কোনও নাম নেই।”
“এমন কোনও স্টেশন নেই।”
“থাকার কথা নয়। কিন্তু আছে।”
প্রবীর নিজের কোটের পকেট থেকে একটা পুরোনো টিকিট বের করলেন। টিকিটের কাগজ হলদে হয়ে গেছে। তারিখ লেখা—১৭ অক্টোবর, ২০১৪।
গন্তব্যের জায়গায় কালো কালি দিয়ে একটি শব্দ লেখা—
ফেরত।
অদিতি টিকিটটা হাতে নিল।
“আপনি এই ট্রেনে কী করছেন?”
প্রবীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি সেই রাতের সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম। তারপর একদিন আমাকেও এই ট্রেনে উঠতে হয়েছে।”
“আপনি মারা যাওয়ার পর?”
“হ্যাঁ।”
অদিতি আর কোনও কথা খুঁজে পেল না।
প্রবীর বললেন, “এই ট্রেন মৃত মানুষদের জন্য নয়, অদিতি। এই ট্রেন তাদের জন্য, যাদের জীবনের কোনও হিসাব শেষ হয়নি। কেউ অপরাধ করেছে, কেউ অপরাধের শিকার হয়েছে, কেউ এমন সত্যি জেনেছে যা কাউকে বলতে পারেনি। তারা সবাই এখানে অপেক্ষা করে।”
“কিসের অপেক্ষা?”
“কেউ তাদের মনে রাখবে—তার।”
অদিতি উঠে দাঁড়াল।
“আমি এসব বিশ্বাস করি না।”
প্রবীর মাথা নাড়লেন।
“তোমার বিশ্বাস করার দরকার নেই। শুধু একটা কথা মনে রেখো—ট্রেন যখন থামবে, তুমি যেন নিজের নাম শুনে দরজার দিকে না যাও।”
“কেন?”
প্রবীর তার চোখের দিকে তাকালেন।
“কারণ এই ট্রেনে তোমার নামে একটা আসন রাখা আছে। আর সেই আসনে যে বসে আছে, সে তোমার বাবার থেকেও অনেক আগে থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
ঠিক তখনই ট্রেনের ভিতর ঘণ্টা বেজে উঠল।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
জানালার বাইরে প্ল্যাটফর্মের আলো একে একে নিভে গেল।
ট্রেন চলতে শুরু করল।
অদিতি জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, শিয়ালদহ স্টেশন পিছিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৃশ্য বদলে গেল। শহরের আলো নেই, বাড়িঘর নেই, রেললাইনের পাশে কোনও গাছ নেই। শুধু অন্ধকার।
তারপর একটা স্টেশন দেখা গেল।
ছোট্ট প্ল্যাটফর্ম। ভাঙা সাইনবোর্ড। সাইনবোর্ডে কোনও নাম লেখা নেই।
ট্রেন থামল।
সব যাত্রী একসঙ্গে মাথা তুলল।
দরজার বাইরে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে।
ধূসর পাঞ্জাবি, কাঁধে পুরোনো ব্যাগ, চোখে গোল চশমা।
অদিতি তার মুখ চিনতে পারল।
বাবা।
অনিরুদ্ধ সেন।
বারো বছর আগের মতোই দেখতে। চুলে পাক ধরেনি, মুখে বয়সের কোনও ছাপ নেই।
তিনি কামরার দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদু হাসলেন।
“মিঠি।”
অদিতির চোখে জল চলে এল।
“বাবা!”
সে ছুটে দরজার দিকে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে প্রবীর পিছন থেকে তার হাত চেপে ধরলেন।
“না!”
“ছাড়ুন! উনি আমার বাবা!”
“তোমার বাবা তোমাকে কখনও মিঠি বলে ডাকবেন না!”
অদিতি থমকে গেল।
“কেন?”
প্রবীরের মুখ ফ্যাকাশে।
“কারণ তোমার বাবা তোমাকে ওই নামে ডাকতেন শুধু তখনই, যখন তোমার চারপাশে আর কেউ থাকত না। আর এই কামরায় আমরা সবাই আছি।”
দরজার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সে এবার সোজা অদিতির দিকে তাকাল।
“মিঠি, ওর কথা শুনবে না। ও-ই আমাকে মেরেছে।”
প্রবীর চিৎকার করে উঠলেন, “মিথ্যে!”
বাইরের মানুষটি দরজার হাতল ধরল।
“অদিতি, তোমার হাতে যে চিঠি আছে, সেটা খুলে দেখো। শেষ পাতায় কী লেখা আছে?”
অদিতি কাঁপতে কাঁপতে খাম খুলল।
চিঠির শেষ পাতায় আগে কোনও লেখা ছিল না। এখন সেখানে নতুন করে কয়েকটি লাইন ফুটে উঠেছে।
“যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনবে, সে তোমার বাবা নয়।
যে মানুষটি তোমাকে বাঁচাতে চাইবে, সে-ই তোমাকে এই ট্রেনে এনেছে।
আর যে মানুষটি তোমাকে বারো বছর ধরে খুঁজতে বলেছে, সে আসলে তোমার অপেক্ষায় নেই।
সে অপেক্ষা করছে তোমার মৃত্যুর।”
অদিতি মাথা তুলল।
দরজার বাইরে দাঁড়ানো মানুষটির মুখে এবার আর বাবার চেহারা নেই।
তার মুখের চামড়া যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। চোখের নিচে কালো দাগ, ঠোঁটের কোণে শুকনো রক্ত, কপালে গভীর ক্ষত।
কিন্তু চোখ দুটি এখনও অনিরুদ্ধ সেনের।
লোকটি মৃদুস্বরে বলল—
“এবার বলো, মিঠি। তুমি কি বাড়ি ফিরবে?”
ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে অদিতি অনুভব করল, কেউ তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করছে।
সেই কণ্ঠস্বর তার নিজের।
“বাবাকে খুঁজতে এসেছ? তাহলে আগে নিজের মৃত্যুর দিনটা মনে করো।”
ট্রেনের চাকা হঠাৎ থেমে গেল।
দূরে কোনও এক অদৃশ্য স্টেশনের মাইকে ঘোষণা হলো—
“যাত্রী অদিতি সেনকে জানানো যাচ্ছে, তাঁর গন্তব্য এসে গেছে। তিনি দয়া করে ট্রেন থেকে নেমে আসুন।”
তারপর ঘোষণা শেষ হওয়ার আগেই আরও একটি কথা শোনা গেল।
“মৃত যাত্রীদের আত্মীয়দের জানানো হচ্ছে—আজ রাতেই তাঁদের একজনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।”
অদিতি বুঝতে পারল না, তার হাত কে ধরে আছে।
কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে সেই হাতের স্পর্শ সে চিনতে পারল।
এটা তার বাবার হাত।
আর সেই হাতের কবজিতে বাঁধা ঘড়িটা থেমে আছে—
রাত ১২টা ১৭ মিনিটে।
চলবে…