দ্বিতীয় পর্ব — নীলকুঠির পথে
রাত তখন সাড়ে দশটা।
শিউলি বাড়ির পেছনের সরু পথ ধরে ঋদ্ধি আর বৃদ্ধা এগিয়ে চলেছে।
বৃষ্টি একটু কমেছে, কিন্তু চারপাশে এখনও ভেজা মাটির গন্ধ। দূরে কোথাও ব্যাঙ ডাকছে। গাছের পাতায় জমে থাকা জল টুপটাপ করে পড়ছে।
ঋদ্ধির হাতে সেই কাগজ।
“শিউলি নদীর ওপারে, নীলকুঠি।”
নিচে নীলার হাতের লেখা—
“আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।”
সাত বছর পর প্রথমবার ঋদ্ধির মনে হলো, নীলা হয়তো সত্যিই তার জন্য অপেক্ষা করছে।
কিন্তু তার বাবার কী ভূমিকা?
যে মানুষটাকে সে সাত বছর ধরে মৃত বলে জেনে এসেছে, সে যদি সত্যিই বেঁচে থাকে, তাহলে এতদিন কোথায় ছিল?
আর কেনই বা তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?
পেছন থেকে হঠাৎ একটা শব্দ এল।
পাতা মাড়ানোর শব্দ।
ঋদ্ধি ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
“কী হয়েছে?” বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করলেন।
“কেউ আমাদের অনুসরণ করছে।”
বৃদ্ধা থেমে গেলেন।
কিছুক্ষণ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“হয়তো করছে।”
“আপনি জানেন কে?”
“জানি।”
“কে?”
বৃদ্ধা উত্তর দিলেন না।
বরং বললেন,
“তুমি যদি সত্যিই নীলাকে খুঁজতে চাও, তাহলে এখন আর পেছনে তাকাবে না।”
ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,
“কেন?”
“কারণ কিছু মানুষকে সামনে থেকে দেখা যায় না। তাদের ছায়া আগে আসে।”
ঋদ্ধি কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।
তারা এগিয়ে চলল।
প্রায় দশ মিনিট পর একটা ছোট নদীর ধারে পৌঁছল।
বর্ষায় নদী ফুলে উঠেছে।
জলের স্রোত প্রবল।
ওপারে কালো অন্ধকারের মধ্যে একটা পুরনো বাড়ির ছায়া দেখা যাচ্ছে।
বৃদ্ধা বললেন,
“ওটাই নীলকুঠি।”
ঋদ্ধি তাকিয়ে রইল।
বাড়িটা নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে।
দোতলা।
দেয়ালের বেশিরভাগ অংশ ভেঙে পড়েছে।
কিছু জানালায় এখনও কাঠের পাল্লা।
বাড়ির সামনে একটা বিশাল বটগাছ।
“ওখানে নীলা থাকে?”
“থাকত।”
ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।
“থাকত মানে?”
বৃদ্ধা বললেন,
“তুমি গিয়ে নিজেই দেখো।”
নদী পার হওয়ার জন্য একটা ছোট নৌকা বাঁধা ছিল।
ঋদ্ধি নৌকায় উঠল।
বৃদ্ধা বললেন,
“আমি যাব না।”
“কেন?”
“এই গল্পের শেষটা তোমাদের দুজনকেই লিখতে হবে।”
“আপনি ফিরবেন?”
বৃদ্ধা মৃদু হাসলেন।
“যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”
ঋদ্ধি চমকে উঠল।
“এমন কথা বলছেন কেন?”
বৃদ্ধা কোনো উত্তর দিলেন না।
নৌকাটা ধীরে ধীরে নদী পার হতে লাগল।
মাঝনদীতে পৌঁছতেই ঋদ্ধি হঠাৎ পেছনে তাকাল।
বৃদ্ধা এখনও নদীর ধারে দাঁড়িয়ে।
তার পাশে একটা ছায়ামূর্তি।
ঋদ্ধি চোখ কুঁচকে তাকাল।
লোকটা লম্বা।
কালো ছাতা হাতে।
বৃদ্ধা যেন তার সঙ্গে কথা বলছেন।
তারপর হঠাৎ লোকটা ঋদ্ধির দিকে তাকাল।
বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য তার মুখ দেখা গেল।
ঋদ্ধির বুক কেঁপে উঠল।
সে মুখ—
তার বাবার মতো।
নৌকা তখন নদীর ওপারে পৌঁছে গেছে।
ঋদ্ধি দ্রুত নৌকা থেকে নেমে পড়ল।
পেছনে তাকাতে সাহস করল না।
নীলকুঠির দরজা আধখোলা।
ঋদ্ধি ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।
“নীলা?”
কোনো উত্তর নেই।
বাড়ির ভেতর অন্ধকার।
দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে।
মেঝেতে শুকনো পাতা।
একটা পুরনো কাঠের সিঁড়ি দোতলার দিকে উঠে গেছে।
ঋদ্ধি আবার ডাকল—
“নীলা?”
হঠাৎ ওপরতলা থেকে একটা গানের সুর ভেসে এল।
খুব আস্তে।
রবীন্দ্রসঙ্গীত।
ঋদ্ধি গানটা চিনতে পারল।
এই গানটা নীলা প্রায়ই গাইত।
সে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল।
দোতলার শেষ ঘরের দরজা খোলা।
ভেতরে একটা মেয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।
লম্বা চুল।
নীল শাড়ি।
বাইরে বৃষ্টি।
ঋদ্ধির পা থেমে গেল।
“নীলা…”
মেয়েটা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
ঋদ্ধির বুকের মধ্যে যেন সাত বছর জমে থাকা সব কথা একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো।
নীলা।
একই চোখ।
একই হাসি।
শুধু মুখে এখন একটা গভীর ক্লান্তি।
নীলা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল,
“তুমি এসেছ।”
ঋদ্ধির চোখ ভিজে গেল।
“তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে।”
নীলা চুপ।
“কেন?”
“কারণ আমাকে যেতে হয়েছিল।”
“আমাকে একটা কথাও বলোনি।”
“বললে তুমি যেতে দিতে না।”
“আমি তোমাকে যেতে দিতাম না।”
“জানি।”
“তাহলে?”
নীলা ধীরে ধীরে তার কাছে এল।
“তুমি কি সত্যিই ভেবেছিলে আমি তোমাকে ভালোবাসতাম না?”
ঋদ্ধি কাঁপা গলায় বলল,
“আমি সাত বছর ধরে নিজেকে এই প্রশ্নটাই করেছি।”
নীলা তার চোখের দিকে তাকাল।
“আমি তোমাকে ভালোবাসতাম।”
ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করল।
সাত বছর ধরে বুকের মধ্যে চাপা থাকা একটা ব্যথা যেন হঠাৎ জেগে উঠল।
“তাহলে কেন?”
নীলা বলল,
“তোমার বাবা।”
ঋদ্ধি চোখ খুলল।
“আমার বাবা?”
“হ্যাঁ।”
“তিনি আমাকে কী করেছিলেন?”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর একটা পুরনো কাঠের বাক্স খুলল।
ভেতরে বেশ কয়েকটা চিঠি।
নীলা একটা চিঠি ঋদ্ধির হাতে দিল।
“এটা তোমার বাবার লেখা।”
ঋদ্ধি চিঠিটা খুলল।
প্রথম লাইন—
“নীলা, যদি তুমি ঋদ্ধিকে ভালোবাসো, তাহলে তাকে কখনও সত্যিটা বলবে না।”
ঋদ্ধির চোখ স্থির হয়ে গেল।
“এটা কবে লেখা?”
“তোমার যাওয়ার তিন মাস আগে।”
“কেন?”
“পড়ো।”
চিঠিতে লেখা—
“ঋদ্ধি আমার ছেলে নয়।”
ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।
চিঠি পড়া বন্ধ হয়ে গেল।
“এটা মিথ্যে।”
নীলা চুপ।
“এটা মিথ্যে, তাই তো?”
নীলা ধীরে বলল,
“তোমার বাবা নিজেই লিখেছেন।”
“তাহলে আমার বাবা কে?”
নীলা উত্তর দিল না।
ঋদ্ধি চিৎকার করে উঠল,
“কে আমার বাবা?”
নীলা বলল,
“নীলার বাবা।”
ঋদ্ধি স্থির হয়ে গেল।
“মানে?”
“তোমার আর আমার জন্মের গল্প এক নয়।”
“তাহলে?”
নীলা জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“তোমার মা আর আমার বাবা একসময় একে অপরকে ভালোবাসতেন।”
ঋদ্ধির মাথা ঘুরে উঠল।
“কী বলছ?”
“তোমার মা যখন তোমার জন্ম দিতে চলেছেন, তখন আমার বাবা তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন।”
“কিন্তু আমার বাবা?”
“তখন তিনি তোমার মায়ের স্বামী ছিলেন না।”
ঋদ্ধি কিছুই বুঝতে পারছিল না।
নীলা বলল,
“তোমার জন্মের পর তোমার মা তোমাকে নিয়ে চলে যান। পরে তোমার বাবার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।”
“তাহলে আমার জৈবিক বাবা—”
“আমার বাবা।”
ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা।
ঋদ্ধি ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
“তাহলে তুমি…”
“হ্যাঁ।”
নীলা চোখ নামিয়ে বলল,
“আমি তোমার সৎবোন নই।”
ঋদ্ধি তাকাল।
“তুমি আমার বোন?”
“না।”
“তাহলে?”
নীলা কাঁপা গলায় বলল,
“আমরা একই বাবার সন্তান।”
ঋদ্ধির বুকের ভেতর যেন সবকিছু থেমে গেল।
সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
“না।”
“ঋদ্ধি—”
“না!”
সে পিছিয়ে গেল।
“এটা হতে পারে না।”
“আমি জানি।”
“তাহলে তুমি আমাকে এতদিন ভালোবাসার কথা বললে কীভাবে?”
নীলার চোখে জল।
“কারণ আমি এই সত্যিটা তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে জানতাম না।”
“কখন জানতে?”
“যেদিন তুমি আমাকে সেই চিঠিটা দিয়েছিলে।”
“কোন চিঠি?”
“যেটা তুমি পাঠাওনি।”
ঋদ্ধি স্তব্ধ।
নীলা বলল,
“তোমার বাবা সেটা আমাকে দিয়েছিলেন।”
“তারপর?”
“তিনি বলেছিলেন—যদি আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাহলে আমাকে তোমার জীবন থেকে চলে যেতে হবে।”
ঋদ্ধির চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“তুমি চলে গেলে।”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু তুমি আমাকে সত্যিটা বলতে পারতে।”
“পারতাম না।”
“কেন?”
নীলা বলল,
“কারণ তোমার বাবা আমাকে একটা শর্ত দিয়েছিলেন।”
“কী শর্ত?”
“আমি যদি সত্যিটা বলি, তাহলে তিনি তোমার মাকে মেরে ফেলবেন।”
ঋদ্ধি থমকে গেল।
“আমার মা?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু মা তো—”
“তোমার মা এখনও বেঁচে আছেন।”
ঋদ্ধির চোখ বড় হয়ে গেল।
“কোথায়?”
নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
ধাম!
নীলা হঠাৎ চুপ করে গেল।
“ও এসেছে।”
ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল।
“কে?”
“তোমার বাবা।”
“তিনি এখানে?”
নীলা জানালার বাইরে তাকাল।
“হ্যাঁ।”
নিচ থেকে পুরুষের কণ্ঠ ভেসে এল—
“নীলা।”
ঋদ্ধির শরীর কেঁপে উঠল।
সেই কণ্ঠ সে চেনে।
তার বাবা।
“আমি জানি ঋদ্ধি এসেছে।”
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর—
“তাকে নিয়ে নিচে এসো।”
নীলা ঋদ্ধির হাত ধরল।
“পেছনের ঘরে যাও।”
“কেন?”
“কারণ তোমার বাবা শুধু তোমার সঙ্গে কথা বলতে আসেনি।”
“তাহলে?”
নীলা ফিসফিস করে বলল,
“সে তোমাকে মেরে ফেলতে এসেছে।”
ঋদ্ধির বুকের ভেতর বরফ জমে গেল।
“কেন?”
নীলা তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কারণ তুমি তোমার বাবার ছেলে নও।”
“আমি জানি।”
“না।”
নীলা মাথা নাড়ল।
“তুমি জানো না।”
“তাহলে?”
“তুমি তার শত্রুর ছেলে।”
ঋদ্ধি স্তব্ধ।
“কোন শত্রু?”
নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে গুলির শব্দ হলো।
ধাঁই!
দুজনেই চমকে উঠল।
নীলা দ্রুত আলো নিভিয়ে দিল।
বাইরে বৃষ্টি।
ঘরের মধ্যে অন্ধকার।
নিচ থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ উঠছে।
এক ধাপ।
দুই ধাপ।
তিন ধাপ।
তারপর সেই কণ্ঠ—
“ঋদ্ধি…”
“আমি জানি তুমি ওপরে আছ।”
পায়ের শব্দ আরও কাছে।
নীলা ঋদ্ধিকে একটা গোপন দরজার সামনে নিয়ে গেল।
“এর ভেতরে যাও।”
“তুমি?”
“আমি আসছি।”
“না, আমি তোমাকে রেখে যাব না।”
নীলা তার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“সাত বছর আগে তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম। এবার আর যাব না।”
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ থেমে গেল।
কেউ দরজার হাতলে হাত রাখল।
নীলা ঋদ্ধিকে ভেতরে ঠেলে দিল।
দরজা বন্ধ করার আগে সে ফিসফিস করে বলল—
“তোমার আসল বাবার নাম অমিতাভ সেন।”
ঋদ্ধি থমকে গেল।
এই নামটা সে চেনে।
তার মায়ের পুরনো ডায়েরিতে এই নামটা ছিল।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরে দাঁড়িয়ে নীলা।
আর দরজার ওপাশে—
তার বাবা।
ঋদ্ধি অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে শুনতে পেল—
তার বাবার কণ্ঠ,
“নীলা, শেষবারের মতো বলছি। ছেলেটাকে আমার হাতে দাও।”
নীলার উত্তর—
“না।”
তারপর—
একটা গুলির শব্দ।
ঋদ্ধি দরজা খুলতে ছুটে গেল।
কিন্তু তার আগেই সুড়ঙ্গের ভেতর কোথা থেকে একটা আলো জ্বলে উঠল।
সামনে দেয়ালে লেখা—
“অমিতাভ সেনের সত্য জানতে হলে নিজের জন্মের রাতটা মনে করো।”
আর তার নিচে একটা পুরনো ছবি।
ছবিতে—
একজন যুবক।
একজন মহিলা।
একটা নবজাতক শিশু।
আর শিশুটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে—
নীলার বাবা।
ঋদ্ধি ছবিটার দিকে তাকিয়ে বুঝল—
তার জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্যের দরজা এবার খুলতে শুরু করেছে।
কিন্তু সেই দরজার ওপারে যে সত্যি আছে—
তা হয়তো তার ভালোবাসার থেকেও বড়।
চলবে…