তৃতীয় পর্ব — শেষ চিঠি
অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধি ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিল।
হাতে ধরা টর্চের আলো কাঁপছিল।
ছবির চারজন মানুষ।
একজন যুবক।
একজন তরুণী।
একটি নবজাতক শিশু।
আর শিশুটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে নীলার বাবা।
ছবির পেছনে তারিখ লেখা—
১২ জুন, ১৯৯৮।
ঋদ্ধির বুকের মধ্যে অদ্ভুত একটা চাপ অনুভূত হলো।
১৯৯৮।
তার জন্মের বছর।
সে ছবিটা আরও কাছে নিয়ে এল।
যুবকটির মুখের দিকে তাকাতেই তার বুক কেঁপে উঠল।
এই মুখ সে কোথায় যেন দেখেছে।
পুরনো একটা অ্যালবামে।
তার মায়ের ঘরে।
মায়ের ডায়েরির পাতায়।
অমিতাভ সেন।
তাহলে এটাই কি সেই মানুষ?
তার আসল বাবা?
কিন্তু ছবিতে নীলার বাবার হাতে শিশুটি কেন?
আর নীলার বাবা কেন তাকে এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছিলেন?
হঠাৎ সুড়ঙ্গের বাইরে একটা শব্দ হলো।
ঋদ্ধি ঘুরে তাকাল।
দরজার ওপাশে কেউ যেন হাঁটছে।
“নীলা?”
কোনও উত্তর নেই।
সে দরজার কাছে গেল।
কান পেতে শুনল।
নীরবতা।
তারপর খুব ক্ষীণ একটা শব্দ—
“ঋদ্ধি…”
নীলার গলা।
ঋদ্ধি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
নীলা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে।
তার কপালে সামান্য রক্ত।
কিন্তু সে দাঁড়িয়ে আছে।
“তুমি ঠিক আছ?”
ঋদ্ধি ছুটে গেল।
নীলা মাথা নাড়ল।
“আমি ঠিক আছি।”
“গুলিটা?”
“দেয়ালে লেগেছে।”
ঋদ্ধি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
“তোমার বাবা?”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“চলে গেছে।”
“কোথায়?”
“জানি না।”
ঋদ্ধি তার হাত ধরে বলল,
“আমাদের এখন এখান থেকে বেরোতে হবে।”
নীলা মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
“কারণ এত বছর আমরা সত্যি থেকে পালিয়েছি। এবার পালালে আর কখনও শেষ হবে না।”
ঋদ্ধি ছবিটা দেখাল।
“এটা কী?”
নীলা ছবিটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“এটাই সেই রাতের শুরু।”
“১৯৯৮ সালের ১২ জুন?”
“হ্যাঁ।”
“আমার জন্মের রাত?”
নীলা মাথা নাড়ল।
“তোমার জন্মের রাত।”
ঋদ্ধি গভীর শ্বাস নিল।
“সব বলো।”
নীলা ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ল।
“তোমার মা—মাধবী—অমিতাভ সেনকে ভালোবাসতেন।”
ঋদ্ধি চুপ করে শুনছিল।
“অমিতাভ তখন সাংবাদিক ছিলেন। দুর্নীতি আর বেআইনি জমি দখলের বিরুদ্ধে লিখতেন। তোমার মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল বহুদিনের।”
“তাহলে?”
“কিন্তু অমিতাভের শত্রু ছিল অনেক।”
নীলা একটু থামল।
“তোমার মায়ের পরিবার সেই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। পরে পরিস্থিতির চাপে তোমার মা অন্য একজনকে বিয়ে করেন।”
ঋদ্ধি বলল,
“যাকে আমি বাবা বলে জেনেছি।”
“হ্যাঁ।”
“তিনি কি জানতেন আমি অমিতাভের ছেলে?”
“জানতেন।”
“তাহলে আমাকে নিজের ছেলে হিসেবে বড় করলেন কেন?”
নীলা চোখ নামিয়ে বলল,
“প্রথমে তোমার জন্য।”
“আর পরে?”
“পরে ভয় থেকে।”
ঋদ্ধি চুপ করে রইল।
নীলা বলল,
“অমিতাভ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেছিলেন। একটা বড় জমি দখল চক্রের বিরুদ্ধে। সেই নথিতে তোমার বাবার নামও ছিল।”
ঋদ্ধি চমকে উঠল।
“আমার বাবার?”
“হ্যাঁ।”
“তিনি তাহলে অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন?”
“তিনি সরাসরি সবকিছুর পরিকল্পনাকারী ছিলেন না। কিন্তু তিনি এমন কিছু লোকের সঙ্গে কাজ করতেন, যাদের বিরুদ্ধে অমিতাভ প্রমাণ জোগাড় করেছিলেন।”
“তাহলে অমিতাভ?”
“অমিতাভ সেই প্রমাণ প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।”
নীলা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কিন্তু তার আগেই তিনি নিখোঁজ হয়ে যান।”
ঋদ্ধি বলল,
“মারা গিয়েছিলেন?”
“না।”
ঋদ্ধি তাকাল।
“তুমি নিশ্চিত?”
নীলা বলল,
“আমি জানি।”
“কীভাবে?”
“কারণ তিনি আমাকে একবার চিঠি লিখেছিলেন।”
ঋদ্ধির চোখ বড় হয়ে গেল।
“কোথায় সেই চিঠি?”
নীলা তার ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো খাম বের করল।
খামটা বহু বছরের পুরোনো।
কাগজের রং হলদে হয়ে গেছে।
ঋদ্ধি চিঠিটা খুলল।
লেখা—
“নীলা, যদি কখনও ঋদ্ধি সত্য জানতে চায়, তাকে বলবে আমি তাকে ছেড়ে যাইনি। আমি তাকে বাঁচানোর জন্য দূরে আছি।”
ঋদ্ধির চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
চিঠির শেষে লেখা—
“তার জন্মের রাতে যে মানুষটি তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিল, সে একদিন বুঝবে—একটি শিশুকে নিজের সন্তান বলে দাবি করলেই সে তার বাবা হয়ে যায় না।”
ঋদ্ধি চিঠিটা নামিয়ে রাখল।
“অমিতাভ কোথায়?”
নীলা বলল,
“আমি জানি না।”
“তাহলে এত বছর ধরে তুমি কীভাবে নিশ্চিত ছিলে তিনি বেঁচে আছেন?”
নীলা তার দিকে তাকাল।
“কারণ প্রতি বছর আমার জন্মদিনে কেউ একজন আমার কাছে একটা চিঠি পাঠাত।”
“অমিতাভ?”
“হয়তো।”
“চিঠিগুলো কোথায়?”
“আমার কাছে নেই।”
“কেন?”
নীলা মৃদু হাসল।
“কারণ তোমার বাবা সবগুলো নিয়ে নিয়েছিলেন।”
ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।
ঠিক তখনই সুড়ঙ্গের অন্য প্রান্ত থেকে একটা শব্দ এল।
লোহার দরজা খোলার শব্দ।
দুজনেই তাকাল।
কেউ আসছে।
নীলা দ্রুত বলল,
“আমাদের যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“পুরনো ছাপাখানায়।”
“ছাপাখানা?”
“তোমার বাবার পুরনো ব্যবসা।”
“সেখানে কী আছে?”
“অমিতাভের শেষ প্রমাণ।”
বৃষ্টি তখন আরও জোরে পড়ছে।
নীলা আর ঋদ্ধি নীলকুঠির পেছনের জঙ্গল পেরিয়ে এগিয়ে চলেছে।
প্রায় আধঘণ্টা পর তারা একটা পরিত্যক্ত ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল।
ভাঙা সাইনবোর্ডে লেখা—
“সেন প্রেস।”
ঋদ্ধি অবাক হয়ে তাকাল।
“এটা কি অমিতাভের?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু এতদিন বন্ধ?”
“প্রায় তিরিশ বছর।”
নীলা একটা ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকল।
ভেতরে পুরোনো মেশিন।
ধুলো।
ছেঁড়া কাগজ।
আর দেয়ালে পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।
ঋদ্ধি একটা কাটিং তুলে নিল।
শিরোনাম—
“তরুণ সাংবাদিক অমিতাভ সেন নিখোঁজ।”
তার নিচে ছবি।
সেই একই মুখ।
ঋদ্ধির হাত কেঁপে উঠল।
“এটা কত বছরের?”
“আটাশ।”
“তাহলে আমার জন্মের আগে।”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে অমিতাভ আমাকে চিনতেন কীভাবে?”
নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই একটা শব্দ হলো।
টিক।
তারপর—
টিক।
একটা পুরোনো দেয়ালঘড়ি চলতে শুরু করেছে।
ঘড়িটা এত বছর বন্ধ থাকার কথা।
ঋদ্ধি ঘড়িটার দিকে তাকাল।
কাঁটা থেমে আছে—
রাত ২টা ১৭ মিনিটে।
নীলা বলল,
“তোমার জন্মের সময়।”
ঋদ্ধি স্তব্ধ হয়ে গেল।
“তুমি কীভাবে জানো?”
“তোমার জন্মসনদে এই সময়টাই লেখা।”
ঘড়ির নিচে একটা ছোট্ট কাঠের তাক।
সেখানে একটা বাক্স।
ঋদ্ধি বাক্সটা নামাল।
ভেতরে একটা ক্যাসেট।
আর একটা চিঠি।
চিঠির ওপর লেখা—
“ঋদ্ধির জন্য।”
ঋদ্ধির হাত কাঁপতে লাগল।
সে চিঠিটা খুলল।
“ঋদ্ধি,
যদি তুমি এই চিঠি পড়ো, তাহলে সম্ভবত আমি তোমার সামনে নেই।
কিন্তু মনে রেখো—তোমাকে কেউ চুরি করেনি।
তোমাকে কেউ ত্যাগও করেনি।
তোমাকে বাঁচানোর জন্য তোমাকে অন্য নামে বড় হতে হয়েছে।
আমি তোমার বাবা।
আমার নাম অমিতাভ সেন।
তোমার জন্মের রাতে আমি হাসপাতালে ছিলাম।
তোমাকে প্রথমবার কোলে নিয়েছিলাম।
তারপর আমি জানতে পারি, আমার বিরুদ্ধে যারা আছে তারা তোমাকে ব্যবহার করে আমাকে চুপ করাতে চায়।
তোমার মাকে নিয়ে আমি পালাতে পারতাম।
কিন্তু তোমাকে নিয়ে পারতাম না।
তাই তোমার মা সিদ্ধান্ত নেন, তুমি অন্য পরিবারের সন্তান হিসেবে বড় হবে।
যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে চিনেছ, সে তোমাকে নিজের সন্তান হিসেবে গ্রহণ করেছিল।
তার অপরাধ ছিল—সে সত্যিটা লুকিয়েছিল।
কিন্তু তোমার প্রতি তার ভালোবাসা মিথ্যে ছিল না।
তাকে ঘৃণা কোরো না।
একদিন যদি সত্যি জানতে পারো, তাকে বিচার করার আগে মনে রেখো—ভয় মানুষকে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
আর নীলার কথা—
তাকে কখনও ছেড়ে দিও না।
কারণ এই মেয়েটা তোমার বোন নয়।
সে আমার সন্তান নয়।
তাকে ছোটবেলায় তার মা আমার বন্ধু সুশীলের কাছে রেখে যান। সুশীল তাকে নিজের মেয়ে হিসেবে বড় করেন।
তোমাদের মধ্যে কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই।
যদি কখনও তোমাদের দুজনের পথ আবার এক হয়, তাহলে অতীতের মিথ্যেগুলোকে তোমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে দিও না।
—অমিতাভ।”
ঋদ্ধি চিঠিটা পড়ে স্থির হয়ে বসে রইল।
তার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল।
নীলা ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“তাহলে…”
ঋদ্ধি মাথা তুলল।
“তুমি আমার বোন নও।”
নীলার চোখেও জল।
“না।”
“তোমার বাবা অমিতাভ নন।”
“না।”
“আমাদের বাবা আলাদা?”
নীলা মৃদু হাসল।
“আমাদের বাবা-মায়ের গল্পও আলাদা।”
ঋদ্ধি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
সাত বছর ধরে যে সম্পর্ককে পাপ ভেবে দুজনেই নিজেদের থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল—
সেটা ছিল একটা মিথ্যার ওপর দাঁড়ানো।
কিন্তু এখনও একটা প্রশ্ন বাকি।
ঋদ্ধি বলল,
“আমার যে বাবা আমাকে বড় করেছেন?”
নীলা বলল,
“তোমার পালক বাবা।”
“তিনি এখন কোথায়?”
“আমি জানি।”
“কোথায়?”
নীলা উত্তর দেওয়ার আগেই ছাপাখানার দরজা খুলে গেল।
দুজনেই ঘুরে তাকাল।
দরজায় দাঁড়িয়ে একজন বৃদ্ধ।
চোখে ক্লান্তি।
চুল সাদা।
হাতে একটা লাঠি।
ঋদ্ধির শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
“বাবা?”
বৃদ্ধ লোকটি মাথা নিচু করলেন।
“হ্যাঁ।”
ঋদ্ধি তার দিকে এগিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর ঋদ্ধি বলল,
“আপনি বেঁচে আছেন।”
“হ্যাঁ।”
“আপনি আমাকে কেন মিথ্যে বলেছিলেন?”
বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল।
“কারণ আমি কাপুরুষ ছিলাম।”
ঋদ্ধি চুপ।
“আমি অমিতাভকে থামাতে পারিনি। তাকে রক্ষা করতে পারিনি। তোমাকে রক্ষা করার জন্য তোমার পরিচয় বদলেছিলাম।”
“আর নীলাকে?”
বৃদ্ধ নীলার দিকে তাকালেন।
“আমি ওকেও ব্যবহার করেছি।”
নীলা বলল,
“আপনি আমাকে বলেছিলেন ঋদ্ধির কাছ থেকে দূরে থাকতে।”
“হ্যাঁ।”
“বলেছিলেন আমরা ভাই-বোন।”
বৃদ্ধ চোখ বন্ধ করলেন।
“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”
ঋদ্ধির গলা কেঁপে উঠল।
“কেন?”
“কারণ আমি জানতাম, তুমি যদি অমিতাভের সত্য জানতে পারো, তাহলে তুমি তাকে খুঁজবে। আর যারা অমিতাভকে শেষ করতে চেয়েছিল, তারা তোমাকে খুঁজে পাবে।”
“তাহলে অমিতাভ কোথায়?”
বৃদ্ধ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“আমি জানি না।”
ঋদ্ধি অবাক।
“আপনি জানেন না?”
“না।”
“তিনি বেঁচে আছেন?”
“আমি শেষবার তাকে দেখেছিলাম তোমার জন্মের কয়েক মাস পর।”
“কোথায়?”
“রেলস্টেশনে।”
“তারপর?”
“সে চলে গিয়েছিল।”
“কোথায়?”
“আমি জানি না।”
হঠাৎ বৃদ্ধের পকেটের ফোন বেজে উঠল।
তিনি ফোন ধরলেন।
কয়েক সেকেন্ড শুনলেন।
তারপর ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
তার মুখ সাদা হয়ে গেছে।
ঋদ্ধি বলল,
“কী হয়েছে?”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“অমিতাভের খবর পাওয়া গেছে।”
ঘর নিস্তব্ধ।
“কোথায়?”
“দক্ষিণের একটা ছোট শহরে।”
“কে খবর দিয়েছে?”
“একজন ডাক্তার।”
নীলা এগিয়ে এল।
“তিনি বেঁচে আছেন?”
বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।
“সম্ভবত।”
ঋদ্ধির চোখে জল এসে গেল।
এত বছর ধরে যে মানুষটির অস্তিত্ব শুধু চিঠি, ছবি আর স্মৃতিতে ছিল—
তিনি হয়তো সত্যিই বেঁচে আছেন।
কিন্তু তার আগেই আরেকটা কাজ বাকি।
নীলা বলল,
“তোমার পালক বাবা?”
ঋদ্ধি তার দিকে তাকাল।
“আমি তাকে ক্ষমা করতে পারব কি না জানি না।”
বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“ক্ষমা চেয়ো না।”
ঋদ্ধি তাকাল।
“কেন?”
“আগে সত্যিটা বুঝে নাও। তারপর সিদ্ধান্ত নিও।”
ঋদ্ধি কিছু বলল না।
বাইরে তখন বৃষ্টি একটু কমেছে।
ভোরের আলো আকাশে ফুটতে শুরু করেছে।
সকালে তারা নদীর ধারে ফিরে এল।
সেই বৃদ্ধা এখনও সেখানে বসে ছিলেন।
ঋদ্ধি তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল।
“আপনি বেঁচে আছেন!”
বৃদ্ধা হাসলেন।
“বলেছিলাম না, যদি সকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”
ঋদ্ধি তার পাশে বসে পড়ল।
“আপনি সব জানতেন?”
বৃদ্ধা বললেন,
“সব না। যতটা দরকার ছিল, ততটা।”
“আপনি আমাকে এখানে কেন এনেছিলেন?”
“কারণ তোমার নিজের গল্প তোমাকেই জানতে হতো।”
“নীলা?”
বৃদ্ধা নীলার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
“ওরও।”
ঋদ্ধি নদীর দিকে তাকাল।
বৃষ্টি থেমে গেছে।
জলে ভোরের আলো পড়ছে।
নীলা তার পাশে এসে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ দুজনেই কিছু বলল না।
তারপর নীলা ধীরে বলল,
“তুমি কি আমাকে ক্ষমা করেছ?”
ঋদ্ধি তার দিকে তাকাল।
“কিসের জন্য?”
“সাত বছর চলে যাওয়ার জন্য।”
“তুমি আমাকে ছেড়ে যাওনি।”
নীলা চোখ নামিয়ে নিল।
“তাহলে?”
ঋদ্ধি মৃদু হাসল।
“তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলে।”
নীলার চোখে জল এসে গেল।
“তুমি এখনও আমাকে ভালোবাসো?”
ঋদ্ধি উত্তর দিতে একটু সময় নিল।
তারপর বলল,
“সাত বছর ধরে আমি তোমাকে ভুলতে চেষ্টা করেছি।”
“পারোনি?”
“না।”
নীলা মৃদু হেসে বলল,
“আমিও না।”
ঋদ্ধি তার হাত ধরল।
কোনও প্রতিশ্রুতি দিল না।
কোনও বড় কথা বলল না।
শুধু হাতটা ধরে রাখল।
কারণ কখনও কখনও বহু বছরের বিচ্ছেদের পরে মানুষকে নতুন করে ভালোবাসতে হয় না।
শুধু বুঝতে হয়—
ভালোবাসাটা আসলে কোথাও যায়নি।
ছয় মাস পরে।
শহরের একটা ছোট প্রকাশনা সংস্থার অফিস।
ঋদ্ধি জানালার পাশে বসে পুরোনো চিঠিগুলো সাজাচ্ছিল।
তার সামনে একটা খাম।
দক্ষিণের সেই শহর থেকে আসা।
চিঠির ওপর লেখা—
“ঋদ্ধির জন্য।”
সে খাম খুলল।
ভেতরে অমিতাভ সেনের চিঠি।
“ঋদ্ধি,
তোমাকে প্রথম দেখার পর থেকে আমার একটা আফসোস ছিল—তোমার হাত ধরে হাঁটতে পারিনি।
কিন্তু তোমার জীবনে যারা ছিল, তারা প্রত্যেকে তাদের মতো করে তোমাকে ভালোবাসার চেষ্টা করেছে।
তোমার পালক বাবা ভুল করেছে।
তোমার মা ভয় পেয়েছে।
আমি পালিয়ে গেছি।
আর নীলা তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে।
কেউই সম্পূর্ণ নির্দোষ নয়।
কেউই সম্পূর্ণ দোষীও নয়।
জীবন কখনও সাদা-কালো হয় না।
তুমি শুধু নিজের জীবনটা নিজের মতো করে বাঁচো।
আর যদি কখনও বৃষ্টির দিনে পুরোনো চিঠির গন্ধ পাও, মনে রেখো—
কিছু চিঠি মানুষের কাছে পৌঁছতে অনেক বছর সময় নেয়।
কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা—
তার থেকেও বেশি সময় অপেক্ষা করতে পারে।
—তোমার বাবা, অমিতাভ সেন।”
ঋদ্ধি চিঠিটা ভাঁজ করল।
জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
ঠিক সেই সময় নীলা দরজা খুলে ভেতরে এল।
হাতে একটা পুরোনো নীল খাম।
“এটা তোমার জন্য।”
ঋদ্ধি অবাক হয়ে বলল,
“আবার চিঠি?”
নীলা হাসল।
“হ্যাঁ।”
“কার?”
“আমার।”
ঋদ্ধি খামটা খুলল।
ভেতরে মাত্র দুটো লাইন—
“সাত বছর অপেক্ষা করেছি। এবার সারাজীবন পাশাপাশি হাঁটতে চাই।”
ঋদ্ধি চিঠিটার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর নীলার দিকে তাকাল।
জানালার বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
শহর ভিজছে।
আর বহু বছরের ভুল বোঝাবুঝি, ভয়, গোপনীয়তা আর বিচ্ছেদের পরে—
দুজন মানুষ অবশেষে নিজেদের সত্যিটাকে ফিরে পেয়েছে।
সেই দিন ঋদ্ধি বুঝেছিল—
সব চিঠির উত্তর শব্দে দিতে হয় না।
কিছু চিঠির উত্তর হয়—
কারও হাত শক্ত করে ধরে থাকা।
আর কিছু ভালোবাসার শেষ হয় না।
শুধু দীর্ঘ অপেক্ষার পর—
তার নতুন শুরু হয়।
— সমাপ্ত —