রাত তখন বারোটা সাত মিনিট পেরিয়ে গেছে।
নীলকুঠির উত্তর দিকের গোপন ঘরটিতে দাঁড়িয়ে অদ্বৈত মুখার্জি নিজেরই মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আয়নার ওপারে দাঁড়ানো যুবকটির মুখ তার মুখের অবিকল প্রতিচ্ছবি। শুধু চোখ দুটো আলাদা—অদ্বৈতের চোখ কালো, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অরিন্দমের চোখ অস্বাভাবিক নীল।
দুজনের মাঝখানে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে ভাঙা আয়নার টুকরো। প্রতিটি টুকরোয় যেন আলাদা আলাদা মুখ দেখা যাচ্ছে। কোথাও অদ্বৈত, কোথাও অরিন্দম, কোথাও আবার এমন একটি শিশুর মুখ, যার চোখের মণি সম্পূর্ণ কালো।
দরজার ওপার থেকে মাধবীর কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল।
“তোমাদের দুজনের মধ্যে যে সত্যি, সে যেন কোনও দিন এই বাড়ি থেকে বেরোতে না পারে।”
অদ্বৈত কেঁপে উঠল।
“মা! তুমি কোথায়? সামনে এসো!”
কোনও উত্তর এল না।
অরিন্দম ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত হাসি নিয়ে বলল, “এখনও মাকে খুঁজছিস? যে মানুষটা তোকে বারো বছর ধরে মিথ্যে বলে বড় করেছে, তার কথাও বিশ্বাস করিসনি। অথচ এই বাড়ির দেয়ালের মধ্যে যে কণ্ঠস্বর ঘুরে বেড়ায়, তাকেই মা বলে ডাকছিস!”
“তুই আমার বাবার কথা জানিস কী করে?”
“কারণ তোর বাবার সঙ্গে আমারও সম্পর্ক ছিল।”
“কী সম্পর্ক?”
“যে সম্পর্কের কথা জানলে তুই নিজের নামটাও আর ব্যবহার করতে চাইবি না।”
অদ্বৈত অরিন্দমের দিকে এগিয়ে গেল। “ধাঁধা বন্ধ কর। জন্মের শংসাপত্র দুটো একই রকম কেন? আমাদের বাবা-মায়ের নাম এক কেন? জন্মতারিখও একই কেন?”
অরিন্দম এবার গম্ভীর হল।
“কারণ কাগজে আমরা দুজনেই একই দিনে জন্মেছি। কিন্তু পৃথিবীতে জন্মানো আর পৃথিবীতে উপস্থিত হওয়া এক জিনিস নয়।”
“স্পষ্ট করে বল।”
“তোর বাবা আমাকে তৈরি করেছিলেন।”
কথাটা শুনে অদ্বৈত থমকে গেল।
“তৈরি করেছিলেন মানে?”
“মানুষ যেমন নিজের সন্তানের জন্ম দেয়, তেমন নয়। তিনি আমাকে তৈরি করেছিলেন তোর স্মৃতি থেকে, তোর ভয় থেকে, তোর সেইসব স্বপ্ন থেকে যেগুলো তুই ছোটবেলায় দেখতিস কিন্তু সকালে উঠে মনে রাখতে পারতিস না।”
অদ্বৈত হেসে উঠল। হাসিটা ছিল আতঙ্ক ঢাকার চেষ্টা।
“তুই পাগল।”
“হতে পারে। কিন্তু পাগল মানুষও কখনও কখনও সত্যি কথা বলে।”
অরিন্দম হাত বাড়িয়ে পাশের দেয়ালে স্পর্শ করল। সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের ওপর একটি দৃশ্য ফুটে উঠল—পুরোনো কলকাতার একটি বাড়ি, বৃষ্টিভেজা উঠোন, কাঠের দোলনা। দোলনায় বসে আছে পাঁচ বছরের একটি ছেলে। তার পাশে বসে এক মহিলা গান গাইছেন।
মহিলাটি মাধবী।
ছেলেটি অদ্বৈত।
কিন্তু দৃশ্যের মধ্যে আরও একটি শিশু ছিল। সে দাঁড়িয়ে ছিল জানালার পাশে। তার চোখ নীল।
অদ্বৈত নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
“এটা কী?”
“তোর প্রথম স্মৃতি,” অরিন্দম বলল। “যেটা তোকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”
দৃশ্যটি বদলে গেল। এবার দেখা গেল, মাধবী দুটি শিশুকে নিয়ে একটি অন্ধকার ঘরে ঢুকছেন। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধ। তাঁর হাতে একটি ছোট কাচের শিশি। ঘরের মাঝখানে গোলাকার একটি চিহ্ন আঁকা, আর চারদিকে জ্বলছে মোমবাতি।
মাধবী কাঁদছেন।
“না, অনিরুদ্ধ! ওদের আলাদা কোরো না। ওরা একে অপরকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না।”
অনিরুদ্ধের মুখ পাথরের মতো শক্ত।
“একজনকে বাঁচাতে গেলে অন্যজনকে মুছে ফেলতেই হবে।”
তারপর আলো নিভে গেল।
অদ্বৈত চিৎকার করে উঠল।
“বন্ধ কর! এসব বন্ধ কর!”
দেয়ালের দৃশ্য মিলিয়ে গেল। ঘরের বাতাস হঠাৎ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে উঠল।
অরিন্দম বলল, “তোর মনে নেই, কারণ তোর স্মৃতির একটা অংশ আমার কাছে রাখা হয়েছিল। তুই বড় হয়েছিস সেই অংশ ছাড়া। আর আমি বড় হয়েছি তোর ফেলে দেওয়া স্মৃতি নিয়ে।”
“তা হলে তুই মানুষ নোস?”
“মানুষ কী দিয়ে তৈরি, অদ্বৈত? শরীর দিয়ে? রক্ত দিয়ে? নাকি স্মৃতি দিয়ে?”
অদ্বৈত উত্তর দিতে পারল না।
ঠিক সেই সময় ঘরের পেছনের দেয়ালে তিনবার টোকা পড়ল।
টক। টক। টক।
অরিন্দমের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল।
“ও এসেছে।”
“কে?”
“যাকে তুই মা বলে ডাকছিস।”
দরজার ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে একটি সাদা হাত বেরিয়ে এল। হাতটি অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। আঙুলের ডগায় কালো দাগ, যেন বহুদিন ধরে কালি মাখানো।
তারপর দরজার ওপাশ থেকে মাধবী বললেন, “অদ্বৈত, ওর কথা শুনিস না। ও তোকে বাইরে যেতে দিতে চায় না।”
অরিন্দম তীব্র স্বরে বলল, “মিথ্যে! তুমি আমাকে আটকে রেখেছ!”
“আমি তোকে বাঁচিয়েছি।”
“কাকে বাঁচিয়েছ? আমাকে, না নিজেকে?”
দরজার ওপাশে নীরবতা।
অদ্বৈত দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল। তার মনের মধ্যে যেন একসঙ্গে বহু মানুষের কণ্ঠস্বর কথা বলতে শুরু করেছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ বারবার বলছে—‘ফিরে আয়’, ‘দরজা খোল’, ‘আমাকে ভুলে যাস না’।
তারপর হঠাৎ সে একটি শিশুর কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।
“দাদা, তুমি আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে কেন?”
অদ্বৈত চোখ তুলে তাকাল।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে সেই শিশুটি, যাকে সে প্রথম রাতে উত্তর জানালার ওপারে দেখেছিল। তার গায়ে ময়লা সাদা জামা, কপালের ওপর এলোমেলো চুল। চোখ দুটো এত কালো যে মণি আর সাদা অংশ আলাদা করা যায় না।
“তুমি কে?” অদ্বৈত ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
শিশুটি উত্তর দিল না। শুধু হাত বাড়িয়ে দেখাল মেঝের একটি আয়নার টুকরোর দিকে।
সেখানে অদ্বৈত নিজের মুখ দেখতে পেল না।
দেখল একটি শিশুকে—যে কাঁদতে কাঁদতে একটি বন্ধ দরজায় ঘুষি মারছে।
দরজার ওপাশ থেকে আরেকটি শিশু চিৎকার করছে, “আমাকে বেরোতে দাও!”
তারপর দৃশ্যের মধ্যে আগুন জ্বলে উঠল।
অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।
“আমি এই স্মৃতি দেখতে চাই না!”
শিশুটি বলল, “কিন্তু এই স্মৃতিই তো তোমাকে তৈরি করেছে।”
পরের মুহূর্তেই সে অদৃশ্য হয়ে গেল।
অরিন্দম অদ্বৈতের কাঁধ চেপে ধরল।
“শোন। আমাদের হাতে সময় খুব কম। রাত একটা বাজলে এই ঘর বদলে যাবে। তখন তুই আর আমি যে যার স্মৃতির মধ্যে আটকে পড়ব। বাইরে বেরোনোর একটাই উপায়।”
“কী উপায়?”
“উত্তরের দরজা খুলতে হবে।”
“মা তো বলেছে দরজা খুলতে না।”
“তোর মা অনেক কিছুই বলেছে। কিন্তু কখনও কি বলেছে, কেন তুই বারো বছর বয়সে তার মৃত্যুর খবর শুনেও একবারও কাঁদতে পারিসনি?”
অদ্বৈত স্তব্ধ হয়ে গেল।
সত্যিই তো। মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল। চোখে জল আসেনি। আত্মীয়রা বলেছিল, শোকের ধাক্কায় সে বাকরুদ্ধ। বাবা বলেছিলেন, সে নাকি মায়ের শেষ মুখ দেখতে চায়নি।
কিন্তু তার নিজের মনে পড়ে, মায়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার আগের রাতে সে একটি স্বপ্ন দেখেছিল।
স্বপ্নে মাধবী তার হাত ধরে বলেছিলেন, “তুই যদি আমাকে ভুলে যাস, তা হলে তুই বেঁচে থাকবি। আর যদি সব মনে রাখিস, তা হলে তোর আর আমার মধ্যে একজনকেই বেছে নিতে হবে।”
পরদিন সকালে বাবা তাকে বলেছিলেন, মা আর নেই।
“আমি কেন কাঁদিনি?” অদ্বৈত নিজের কাছেই প্রশ্ন করল।
অরিন্দম উত্তর দিল, “কারণ তোর শোকটাও আমার মধ্যে রাখা হয়েছিল।”
ঘরের কোথাও একটা ঘড়ি বেজে উঠল।
বারোটা পঞ্চান্ন।
অরিন্দম অদ্বৈতের হাত ধরে উত্তর দিকের দেয়ালের দিকে এগোল। সেখানে আগে কোনও দরজা ছিল না। কিন্তু এখন দেয়ালের মাঝখানে সরু কালো রেখা দেখা যাচ্ছে।
“ওই দরজার ওপারে কী আছে?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।
“আমাদের জন্মের আগের সত্যি।”
“জন্মের আগেও কি স্মৃতি থাকে?”
অরিন্দম মৃদু হাসল।
“যে স্মৃতি মানুষের নয়, বাড়ির—সেটা জন্মের আগেও থাকে।”
দরজার ওপার থেকে এবার মাধবীর কণ্ঠস্বর এল না। বরং শোনা গেল অনিরুদ্ধের গলা।
“অদ্বৈত, দরজাটা খুলিস না। তোর মাকে বিশ্বাস করিস না, অরিন্দমকেও না। তুই যদি সত্যিই আমার ছেলে হোস, তা হলে আমার কথা শুনে ফিরে যা।”
অদ্বৈত জমে গেল।
তার বাবা তো বহু বছর আগে মারা গেছেন।
তবু কণ্ঠস্বরটি একেবারে জীবন্ত। এমনকি সেই পরিচিত কাশি, বাক্যের শেষে নিঃশ্বাস ফেলার অভ্যাস—সবই একই।
“বাবা?”
“হ্যাঁ, বাবা। আমি এখানেই আছি।”
দরজার ওপাশে ধীরে ধীরে কারও পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।
“তুই জানিস না, আমি তোকে কতটা ভালোবাসতাম। তোকে বাঁচানোর জন্যই সব করেছিলাম। তোর মা যা করেছে, তা জানলে তুই কোনও দিন ওকে ক্ষমা করতে পারবি না।”
অদ্বৈত দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
অরিন্দম তার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “থাম!”
“ও আমার বাবা!”
“তোর বাবার মৃত্যু হয়েছিল ছয় বছর আগে। তুই নিজে তাঁর শেষকৃত্যে ছিলি।”
“তা হলে এই কণ্ঠস্বর?”
“এই বাড়িতে কণ্ঠস্বর কখনও মরে না। স্মৃতি মরে না। কিন্তু সব স্মৃতির মালিক জীবিত মানুষ হয় না।”
দরজার ওপাশ থেকে অনিরুদ্ধ আবার বললেন, “অদ্বৈত, ও তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। তুই যদি দরজা না খোলিস, তা হলে তোর সত্যিটা চিরদিন অন্ধকারে থাকবে।”
অদ্বৈতের বুকের মধ্যে একটা তীব্র টান অনুভূত হল। বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে শুনতে তার মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় অসুখের রাতে বাবার কপালে হাত রাখা, স্কুলে প্রথম পুরস্কার পাওয়ার পর বাবার হাসি, মায়ের ছবি লুকিয়ে রাখার সময় বাবার কাঁপা হাত।
যদি এই বাড়ি তার স্মৃতি দিয়ে তৈরি হয়ে থাকে, তবে কোন স্মৃতিটা সত্যি?
যে স্মৃতিতে বাবা তাকে ভালোবেসেছিলেন?
নাকি যে স্মৃতিতে বাবা মাকে বন্দি করেছিলেন?
“আমি দরজা খুলব,” অদ্বৈত বলল।
অরিন্দমের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“তাহলে আমাদের কেউই বেরোতে পারব না।”
“আমি সত্যিটা জানতে চাই।”
“সত্যি জানার জন্য সব সময় দরজা খোলা লাগে না। কখনও কখনও দরজা বন্ধ রাখাই শেষ বেঁচে থাকার উপায়।”
অদ্বৈত হাত ছাড়িয়ে দরজার কালো রেখায় আঙুল রাখল।
দরজাটি ঠান্ডা ছিল না, গরমও ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল, তার ওপারে কেউ নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে ঠেলল।
দরজা খুলে গেল।
ওপারে কোনও ঘর ছিল না।
ছিল এক দীর্ঘ করিডর, যার দুপাশে সারি সারি কাঠের দরজা। প্রতিটি দরজার ওপর একটি করে নাম লেখা—মাধবী, অনিরুদ্ধ, অদ্বৈত, অরিন্দম, তিতলি, নিতাই।
সবশেষের দরজায় লেখা ছিল—‘যে ফিরে আসেনি’।
করিডরের মেঝেতে জল জমে আছে। জল এত স্বচ্ছ যে তাতে নিজের মুখ দেখা যায়। কিন্তু অদ্বৈত যখন নিচে তাকাল, সে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল না। দেখল এক মধ্যবয়স্ক মানুষকে, যার মুখ অনিরুদ্ধের মতো, কিন্তু চোখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ।
মানুষটি জল থেকে মুখ তুলে বলল, “তুই দেরি করে ফেলেছিস।”
অদ্বৈত কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কে?”
“আমি সেই মানুষ, যে এই বাড়িতে প্রথম দরজা খুলেছিল।”
“আপনি আমার বাবা?”
লোকটি মাথা নাড়ল।
“আমি তোর বাবার স্মৃতি। আর তোর বাবা যে মানুষ ছিলেন, তাঁকে তুই কোনও দিন পুরোপুরি চিনতে পারিসনি।”
অদ্বৈত এক পা পিছিয়ে গেল।
“তাহলে আসল বাবা কোথায়?”
“যে ঘরে কেউ ফিরে আসে না।”
লোকটি করিডরের শেষ দরজাটির দিকে আঙুল তুলল।
অদ্বৈত এগোতে শুরু করল। অরিন্দম তার পেছনে এল, কিন্তু কয়েক পা যেতেই থেমে গেল।
“আমি যেতে পারব না।”
“কেন?”
“ওই দরজার ওপারে যা আছে, তা আমার স্মৃতি নয়।”
“তাহলে কার?”
অরিন্দম উত্তর দিল না।
অদ্বৈত শেষ দরজার সামনে দাঁড়াল। দরজার গায়ে অসংখ্য নখের আঁচড়। নিচের দিকে শুকনো রক্তের মতো বাদামি দাগ। হাতলটি শিশুর হাতের উচ্চতায় লাগানো।
সে হাতল ধরতেই ভেতর থেকে মেয়েলি কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
“অদ্বৈত, তুমি অবশেষে এসেছ।”
তিতলি।
অদ্বৈত দরজা খুলে ফেলল।
ঘরটি ছিল ছোট। মাঝখানে একটি লোহার খাট। দেয়ালে শিশুর আঁকা ছবি—একটি বাড়ি, বাড়ির সামনে নদী, আর বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে তিনটি মানুষ। একজন মহিলার পাশে দুটি শিশু। এক শিশুর চোখ কালো, অন্যটির নীল।
খাটের ওপর বসে আছে তিতলি।
কিন্তু এবার তার শরীরের কোনও স্বচ্ছতা নেই। সে সম্পূর্ণ জীবন্ত দেখাচ্ছে। চোখে জল, ঠোঁট কাঁপছে।
“তুমি এখানে কীভাবে?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।
তিতলি বলল, “আমি কখনও এখান থেকে বেরোইনি।”
“তুমি তো বলেছিলে এই বাড়িতে থাকতে।”
“আমি থাকতাম। কিন্তু আমি যে মেয়ে ছিলাম, সে অনেক আগেই চলে গেছে।”
অদ্বৈত ধীরে ধীরে তার সামনে বসে পড়ল।
“তুমি কে, তিতলি?”
মেয়েটি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি সেই তৃতীয় শিশুটি, যার কথা তোমাদের কেউ মনে রাখতে চায়নি।”
অদ্বৈতের মাথার ভেতর যেন বজ্রপাত হল।
“তৃতীয় শিশু?”
তিতলি দেয়ালের ছবিটির দিকে আঙুল তুলল।
“তোমাদের দুজনের মাঝখানে যে শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে, সে আমি। মাধবী আমাকে জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু তোমাদের জন্মের গল্পে আমার নাম নেই।”
“এটা অসম্ভব। আমার মা—”
“তোমার মা তিনটি সন্তানকে জন্ম দিয়েছিলেন, অদ্বৈত। কিন্তু তিনজনকে একসঙ্গে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতা এই বাড়ির ছিল না।”
অদ্বৈত অনুভব করল, তার পায়ের নিচের মেঝে দুলছে।
“কেন? কেন আমাদের আলাদা করা হয়েছিল?”
তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ তোমাদের মধ্যে একজনের জন্মের সঙ্গে এই বাড়ির একটি পুরোনো অভিশাপ জড়িয়ে ছিল। তোমাদের বাবা ভেবেছিলেন, একজনকে সরিয়ে দিলে বাকি দুজন বেঁচে যাবে। কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন। যে শিশুটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সে আসলে কোনও শিশু ছিল না।”
“তাহলে সে কী ছিল?”
তিতলি উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের দরজা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল।
দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো একে একে মাটিতে পড়তে লাগল। লোহার খাটের নিচ থেকে জল বেরিয়ে এল। সেই জলের মধ্যে ভেসে উঠল তিনটি ছোট হাত।
একটি কালো চোখের শিশুর।
একটি নীল চোখের শিশুর।
আর একটি মেয়ের হাত।
তিতলি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, “না! ও আবার জেগে উঠেছে!”
ঘরের কোণে অন্ধকার জমাট বাঁধতে লাগল। সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি অবয়ব বেরিয়ে এল। মুখ দেখা যায় না, কিন্তু তার পায়ের শব্দ স্পষ্ট। ধীরে ধীরে সে অদ্বৈতের সামনে এসে দাঁড়াল।
তারপর এমন একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, যা অদ্বৈত আগে কখনও শোনেনি—তবু মনে হল, জন্মের পর থেকেই সে এই কণ্ঠস্বর চেনে।
“তোমরা সবাই আমার নাম ভুলে গেছ।”
অদ্বৈত শুকনো গলায় বলল, “তুমি কে?”
অন্ধকারের অবয়বটি মাথা নিচু করল।
“আমি সেই সন্তান, যার জন্য তোমাদের মা প্রথমবার এই বাড়ির উত্তর জানালা খুলেছিলেন।”
তিতলি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “অদ্বৈত, ওর নাম জিজ্ঞেস কোরো না!”
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি ছোট হাত বেরিয়ে এল। হাতটি অদ্বৈতের কপালে স্পর্শ করল।
তারপর সে দেখতে পেল—
একটি ঝড়ের রাত।
নদীর জল ফুলে উঠেছে। নীলকুঠির জানালায় আলো জ্বলছে। মাধবী একটি নবজাতককে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অনিরুদ্ধ তাঁর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কাঁদছেন।
“ওকে রেখে দাও, মাধবী। ওকে বাঁচতে দাও। বাকিদের আমি সামলে নেব।”
মাধবী মাথা নাড়ছেন।
“তুমি বুঝতে পারছ না, অনিরুদ্ধ। ও যদি এই বাড়িতে থাকে, তা হলে একদিন ও আমাদের সবার স্মৃতি খেয়ে ফেলবে।”
“ও তো আমাদেরই সন্তান!”
মাধবী শিশুটিকে জানালার কাছে নিয়ে গেলেন।
বাইরে নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো বাড়ি—নীলকুঠিরই মতো, কিন্তু উল্টো প্রতিচ্ছবি। সেই বাড়ির জানালায় দাঁড়িয়ে তিনটি ছায়া।
একটি ছায়া হাত বাড়িয়ে আছে।
মাধবী শিশুটিকে বুকের কাছে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন, “আমি তোমাকে ভুলে যাব, কিন্তু তোমাকে ছেড়ে দেব না।”
তারপর তিনি জানালা খুললেন।
দৃশ্যটি ভেঙে গেল।
অদ্বৈত মেঝেতে পড়ে গেল। তিতলি তাকে ধরে বসাল।
“তুমি কী দেখলে?” সে জিজ্ঞেস করল।
অদ্বৈত কাঁপতে কাঁপতে বলল, “একটি শিশু। মা তাকে জানালা দিয়ে কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছিল।”
তিতলি চোখ বন্ধ করল।
“না। মা তাকে পাঠাননি। মা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।”
“কোথায়?”
তিতলি ধীরে ধীরে উত্তর জানালার দিকে তাকাল।
“যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না।”
দূরে ঘড়ির ঘণ্টা বাজল।
একটা।
তারপর নীলকুঠির সমস্ত জানালা একসঙ্গে খুলে গেল।
বাইরে নদীর জল উল্টো দিকে বইতে শুরু করেছে। আকাশে চাঁদ নেই, তবু বাড়ির ছাদে সাদা আলো পড়ছে। উত্তর জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে মাধবী। তাঁর কোলে একটি শিশু।
তিনি অদ্বৈতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার তুই বেছে নে। তুই কি নিজের জন্মের সত্যিটা জানতে চাস, নাকি সেই শিশুটিকে ফিরিয়ে আনতে চাস, যাকে তোর জন্য হারিয়ে যেতে হয়েছিল?”
অদ্বৈত উঠে দাঁড়াল।
“দুটোই চাই।”
মাধবীর মুখে অদ্ভুত এক দুঃখের হাসি ফুটল।
“তাহলে তোর হাতে আর কোনও সময় নেই।”
তিনি শিশুটিকে জানালার ওপার থেকে তুলে ধরলেন।
শিশুটি চোখ খুলল।
একটি চোখ কালো।
অন্যটি নীল।
আর তার কপালের মাঝখানে ছিল তৃতীয় একটি চোখ—বন্ধ, কিন্তু তার পাতার নিচে যেন কেউ নড়াচড়া করছে।
অদ্বৈত বুঝতে পারল, অরিন্দম এতক্ষণ যা বলেছে, তার কোনওটাই সম্পূর্ণ সত্যি নয়।
সে নিজেও জানে না, সে আসলে কে।
হঠাৎ পেছন থেকে অরিন্দমের কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
“অদ্বৈত, ওর দিকে তাকাস না!”
অদ্বৈত ঘুরে দাঁড়াল।
অরিন্দমের নীল চোখের জায়গায় এখন দুটো গভীর কালো গর্ত।
সে নিজের মুখে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ও আমার মুখ নিয়ে নিচ্ছে।”
তারপর অরিন্দম মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
“দাদা,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাকে বাঁচা।”
অদ্বৈত স্তব্ধ হয়ে গেল।
প্রথমবার অরিন্দম তাকে ‘দাদা’ বলে ডাকল।
ঠিক সেই মুহূর্তে উত্তর জানালার ওপার থেকে শিশুটির হাসি শোনা গেল।
আর নীলকুঠির সমস্ত দরজায় একসঙ্গে লেখা ফুটে উঠল—
“যে জন্মেছিল, সে ফিরবে। যে তৈরি হয়েছিল, সে মুছে যাবে।”
অদ্বৈত জানত না, এই কথার মধ্যে তার নিজের জন্য কোন পরিণতি লুকিয়ে আছে।
কিন্তু সে বুঝতে পারল, রাত এখনও শেষ হয়নি।
আর এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য তাদের কাউকে না কাউকে সত্যিই মুছে যেতে হবে।
চলবে…