Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না (তৃতীয় পর্ব: শেষ দরজার ওপারে)

শেষ পর্ব

“যে জন্মেছিল, সে ফিরবে। যে তৈরি হয়েছিল, সে মুছে যাবে।”

নীলকুঠির প্রতিটি দরজায় একই বাক্য জ্বলজ্বল করছিল। দেয়ালের চুন খসে পড়ছিল, ছাদের কাঠ ভেঙে আসছিল, আর উত্তর জানালার ওপারে নদী যেন উল্টো দিকে বয়ে চলেছিল। তবু অদ্বৈতের মনে হচ্ছিল, বাড়িটা ভাঙছে না—বরং তার চারপাশের পৃথিবীটাকেই ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে।

মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে অরিন্দম নিজের মুখ ঢেকে রেখেছিল। তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে কালো ধোঁয়ার মতো কিছু বেরিয়ে আসছিল।

“দাদা, আমাকে বাঁচা।”

অদ্বৈত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

এই প্রথম অরিন্দম তাকে দাদা বলে ডাকল। অথচ সেই ডাকের মধ্যে কোনও স্নেহের চেয়ে বেশি ছিল আতঙ্ক, যেন এতদিন ধরে সে যে সত্যিটাকে আড়াল করে রেখেছিল, তা এখন তার নিজের শরীরকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

“তুই আসলে কে, অরিন্দম?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।

অরিন্দম মুখ তুলল। তার চোখ দুটো আবার নীল হয়ে উঠেছে, কিন্তু সেই নীলের মধ্যে অদ্ভুত এক শূন্যতা।

“আমি তোর ভাই।”

“তাহলে এতক্ষণ বলছিলি, তুই আমার স্মৃতি থেকে তৈরি!”

“দুটো কথাই সত্যি হতে পারে।”

“একসঙ্গে কীভাবে?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কারণ আমাদের বাবা-মা যা লুকিয়ে রেখেছিলেন, তা শুধু আমাদের জন্মের ঘটনা নয়। তাঁরা আমাদের জন্মের আগেই আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করে দিতে চেয়েছিলেন।”

“কে ঠিক করেছিল?”

“বাবা।”

অদ্বৈত তার সামনে বসে পড়ল।

“সব খুলে বল। আর একটাও মিথ্যে বলবি না।”

অরিন্দম দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“অনেক বছর আগে, এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। তোর জন্মেরও আগে। তোর মা তখন অন্তঃসত্ত্বা। বাবা নীলকুঠির পুরোনো দলিলপত্র ঘাঁটতে গিয়ে একটি ডায়েরি পেয়েছিলেন। ডায়েরিটা ছিল এই বাড়ির প্রথম মালিকের।”

“প্রথম মালিক কে ছিলেন?”

“অমরেশ রায়চৌধুরী। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের মৃত্যু আসলে শরীরের মৃত্যু নয়। মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে তার স্মৃতি। আর স্মৃতিকে যদি শরীরের বাইরে ধরে রাখা যায়, তাহলে মৃত মানুষকেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”

অদ্বৈত বলল, “এগুলো তো কুসংস্কার।”

“বাবাও প্রথমে তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু ডায়েরিতে এমন কিছু বিবরণ ছিল, যেগুলো তাঁর নিজের জীবনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। তারপর তিনি এই বাড়িতে পরীক্ষা শুরু করেন।”

“কী পরীক্ষা?”

অরিন্দমের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“একজন মানুষের স্মৃতি আরেকজনের মধ্যে রাখা যায় কি না, সেই পরীক্ষা।”

অদ্বৈত চুপ করে রইল।

“তোর বাবা প্রথমে ভেবেছিলেন, মৃত মানুষের স্মৃতি ধরে রাখবেন। কিন্তু পরে তাঁর ধারণা বদলে গেল। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, একটি মানুষের স্মৃতির মধ্যে আরেকটি মানুষকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব। আর সেই আশ্রয় যদি যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, তাহলে স্মৃতির মানুষটিও একদিন জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে।”

“তাহলে আমাকে দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন?”

“শুধু তোকে নয়।”

অদ্বৈত তাকাল।

অরিন্দম নিচু গলায় বলল, “আমাকেও।”

ঘরের বাতাস আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কিন্তু তুই তো বলেছিলি, আমি তোকে তৈরি করেছি!”

“আমি বলেছিলাম, তোর স্মৃতি থেকে আমাকে তৈরি করা হয়েছিল। সেটা পুরো সত্যি নয়। আমি জন্মেছিলাম তোর আগেই, কিন্তু আমার শরীর পৃথিবীতে বেশিদিন টেকেনি।”

অদ্বৈত হতভম্ব হয়ে গেল।

“তুই কী বলতে চাইছিস?”

অরিন্দমের চোখে জল জমল।

“আমরা যমজ ছিলাম, অদ্বৈত। আমাদের জন্ম একই দিনে। কিন্তু জন্মের পর আমি বেঁচে ছিলাম মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ডাক্তাররা বলেছিলেন, আমার শরীর আর বাঁচবে না। মা আমাকে বুকে নিয়ে কেঁদেছিলেন। বাবা আমাকে মৃত ভেবেই সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।”

“কিন্তু তুই তো এখানে আছিস!”

“আমার শরীর মারা গিয়েছিল। কিন্তু বাবা আমাকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, আমি এখনও কোথাও আছি—তোর স্মৃতির মধ্যে, মায়ের কণ্ঠের মধ্যে, এই বাড়ির দেয়ালের মধ্যে। তিনি আমাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।”

অদ্বৈত মাথা নাড়ল।

“না। এটা হতে পারে না।”

“আমি জানি, বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু মনে করে দেখ, ছোটবেলায় তুই কতবার এমন কাউকে দেখেছিস, যার অস্তিত্ব অন্য কেউ স্বীকার করেনি। তুই কতবার নিজের সঙ্গে কথা বলেছিস, অথচ পরে মনে করতে পারিসনি কী বলেছিলি। তোর কতগুলো স্বপ্নে এমন ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো তোর জীবনে কোনও দিন ঘটেনি।”

অদ্বৈত ধীরে ধীরে সেইসব স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করল।

একটি অন্ধকার ঘর। দুটি শিশু। একজন জানালার কাছে দাঁড়িয়ে। আরেকজন বিছানায় শুয়ে কাঁদছে।

তারপর বাবার কণ্ঠ—“একজনকে বাঁচাতে গেলে অন্যজনকে মুছে ফেলতেই হবে।”

“তাহলে তুই আমার স্মৃতিতে কীভাবে এলি?”

অরিন্দম বলল, “বাবা তোর স্মৃতি থেকে আমাকে তৈরি করেননি। তিনি তোর স্মৃতিকে আমার আশ্রয় বানিয়েছিলেন। আমার যে জীবনটা শেষ হয়ে গিয়েছিল, তার বাকি অংশটুকু তিনি তোর মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।”

“আর মা?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই উত্তর জানালা থেকে মাধবীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

“এবার আমার কথা শোনার সময় হয়েছে, অদ্বৈত।”

দুজনেই জানালার দিকে তাকাল।

মাধবী আর সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। তিনি এখন ঘরের ভেতরে। তাঁর কোলে কোনও শিশু নেই। পরনে সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ। মুখে ক্লান্তি, চোখের নিচে গভীর কালো ছাপ।

অদ্বৈত ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরতে চাইল।

কিন্তু মাঝপথে থেমে গেল।

কারণ মাধবীর পায়ের নিচে কোনও ছায়া ছিল না।

“তুমি কি সত্যিই আমার মা?” অদ্বৈত জিজ্ঞেস করল।

মাধবী চোখ বন্ধ করলেন।

“আমি তোর মা। কিন্তু তুই যে মাকে মনে রেখেছিস, আমি শুধু সেই মানুষটি নই।”

“তাহলে তুমি কে?”

“আমি মাধবী মুখার্জি। যে তোকে জন্ম দিয়েছিল। যে নিজের সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে এমন একটি দরজা খুলেছিল, যেটা কোনও দিন খোলা উচিত ছিল না।”

অদ্বৈত তাঁর দিকে এগিয়ে গেল।

“আমাদের সঙ্গে কী হয়েছিল? সব বলো।”

মাধবী ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করলেন।

“তোর জন্মের দিন আমি তিনটি শিশুর কান্না শুনেছিলাম।”

অদ্বৈত অবাক হয়ে বলল, “তিনটি?”

“তুই, অরিন্দম, আর আমার মেয়ে তিতলি।”

“কিন্তু তিতলি তো—”

“তিতলি জন্মের পর কয়েক দিন বেঁচেছিল। তারপর অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তোর বাবা তাকে হারানোর শোক সহ্য করতে পারেননি। তার আগেই অরিন্দমকে হারিয়েছিলেন। পরপর দুটি সন্তানকে হারিয়ে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন।”

মাধবী থামলেন। তাঁর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তারপর তিনি সেই ডায়েরির কথা মনে করলেন। বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, মৃত মানুষকে স্মৃতির মধ্যে ধরে রাখা যায়। প্রথমে তিনি তিতলির স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিতলি ফিরে আসেনি। তারপর অরিন্দমকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন।”

অদ্বৈত ফিসফিস করে বলল, “আর আমাকে ব্যবহার করেছিলেন?”

“হ্যাঁ। তোর মধ্যে ছিল সেই অদ্ভুত ক্ষমতা, যা বাবা বুঝতে পারেননি। তুই খুব ছোটবেলা থেকেই মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর আর অনুভূতি নিজের মধ্যে ধরে রাখতে পারতিস। তোর বাবা ভেবেছিলেন, তোর স্মৃতি হবে অরিন্দমের আশ্রয়।”

“তাহলে তিতলি?”

“তিতলি এই বাড়ির স্মৃতির মধ্যে রয়ে গিয়েছিল। ওকে ফিরিয়ে আনার কোনও উপায় ছিল না। কিন্তু বাড়িটা ওর অস্তিত্ব ধরে রেখেছিল। তুই যাকে দেখেছিস, সে তিতলির স্মৃতি, তার কষ্ট, তার শেষ ইচ্ছা—সব মিলিয়ে তৈরি হওয়া এক উপস্থিতি।”

অদ্বৈত স্তব্ধ হয়ে গেল।

“তাহলে উত্তর জানালার ওপারে যে শিশুটিকে দেখেছি?”

মাধবীর মুখ মুহূর্তে বদলে গেল।

“সেই শিশুটির কথা তুই আর জিজ্ঞেস করিস না।”

“কেন?”

“কারণ ও তোর ভাই নয়। ও তোর বোনও নয়। ও সেই শূন্যতা, যেটা আমরা সবাই মিলে তৈরি করেছি।”

অরিন্দম হঠাৎ চিৎকার করে উঠল।

“মিথ্যে বলছ! তুমি এখনও সব লুকোচ্ছ!”

মাধবী তার দিকে তাকালেন।

“তুই কী জানতে চাস, অরিন্দম? যে তোকে ফিরিয়ে আনার জন্য তোর মায়ের স্মৃতি থেকে কী কী কেড়ে নেওয়া হয়েছিল? নাকি জানতে চাস, তুই ফিরে আসার পর কেন এই বাড়িতে কেউ শান্তিতে ঘুমোতে পারেনি?”

অরিন্দম দাঁত চেপে বলল, “আমি জানতে চাই, তুমি আমাকে কেন গ্রহণ করোনি!”

মাধবী কেঁদে ফেললেন।

“কারণ তুই ফিরে আসার পর আর আমার সন্তান ছিলি না। তুই আমার সন্তানের স্মৃতি নিয়ে তৈরি হওয়া এক অস্তিত্ব ছিলি। তুই আমার কাছে এসে ‘মা’ বলে ডাকতিস, কিন্তু তোর চোখে আমি এমন কিছু দেখেছিলাম, যা কোনও শিশুর চোখে থাকার কথা নয়।”

“কী দেখেছিলে?”

“তুই আমাকে চিনতিস না। তুই শুধু জানতিস, আমি তোর মা। তুই আমার মুখ চিনতিস, আমার কণ্ঠ চিনতিস, কিন্তু আমার স্পর্শ চিনতিস না।”

অরিন্দম পিছিয়ে গেল।

মাধবী বললেন, “তুই যখন আমার কাছে আসতিস, আমি তোকে জড়িয়ে ধরতাম। কিন্তু আমার মনে হত, আমি যেন এমন কাউকে আলিঙ্গন করছি, যে আমার সন্তানকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

অদ্বৈত অনুভব করল, তার বুকের ভেতরে জমে থাকা রাগ ধীরে ধীরে অন্য এক অনুভূতিতে বদলে যাচ্ছে। এতদিন সে ভেবেছিল, তার বাবা-মা তাকে ঠকিয়েছেন। এখন বুঝতে পারছে, তারা নিজেরাই এমন এক সত্যির মধ্যে আটকে পড়েছিলেন, যার কোনও সহজ সমাধান ছিল না।

তবু একটি প্রশ্ন রয়ে গেল।

“মা, তুমি যদি জানতে অরিন্দম ফিরে আসেনি, তাহলে আমাকে কেন কিছু বলোনি?”

মাধবী অদ্বৈতের দিকে তাকালেন।

“কারণ তুই তখন বারো বছরের শিশু। তোর বাবা তোর স্মৃতি থেকে অনেক কিছু সরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, তুই স্বাভাবিক জীবন কাটাস। কিন্তু তিনি জানতেন না, স্মৃতি মুছে ফেললেই তার ছায়া মুছে যায় না।”

“আর তুমি?”

“আমি তোকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তাই নীলকুঠির উত্তর ঘর বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু অরিন্দমকে সেখানে আটকে রাখার পর বাড়িটা আর কখনও স্বাভাবিক হয়নি।”

অদ্বৈত ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে আমাকে এখানে ডেকে এনেছ কে?”

মাধবী চুপ করে রইলেন।

অরিন্দমের মুখে আবার সেই অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।

“এবার বুঝলি? তোকে এখানে কেউ ডেকে আনেনি। তুই নিজেই ফিরেছিস।”

“কীভাবে?”

“কারণ তোর স্মৃতি জেগে উঠছিল। তুই যত বড় হয়েছিস, ততই আমার অস্তিত্ব তোর মধ্যে শক্তিশালী হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তুই নিজেই সেই চিঠি লিখেছিস।”

অদ্বৈত অবিশ্বাসে তাকিয়ে রইল।

“আমি? আমি চিঠি লিখেছি?”

“হ্যাঁ। তোর হাতেই লেখা হয়েছিল। কিন্তু তুই মনে রাখতে পারিসনি। তোর মধ্যে যে অংশটা আমাকে চিনত, সেই অংশটাই তোকে এখানে ফিরিয়ে এনেছে।”

অদ্বৈত পকেট থেকে চিঠিটি বের করল। কাগজের ওপর লেখা অক্ষরগুলো যেন চোখের সামনে নড়ে উঠল। হাতের লেখা তার নিজের মতোই, কিন্তু একটি অক্ষরও তার মনে পড়ছে না।

সে ফিসফিস করে বলল, “তাহলে আমি নিজেকেই এখানে ডেকে এনেছি।”

মাধবী মাথা নাড়লেন।

“এখন তোর সামনে দুটো পথ। তুই যদি এই বাড়ির সমস্ত স্মৃতি মুক্ত করে দিস, তাহলে অরিন্দম, তিতলি আর আমার এই অসম্পূর্ণ অস্তিত্ব—সব শেষ হয়ে যাবে। তুই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবি। কিন্তু তোর শৈশবের অনেক স্মৃতি আর কোনও দিন ফিরে পাবি না।”

“আর অন্য পথ?”

মাধবী চোখ নামিয়ে বললেন, “তুই যদি অরিন্দমকে নিজের মধ্যে জায়গা দিস, তাহলে ও বেঁচে থাকবে। কিন্তু তোর নিজের স্মৃতি, তোর নিজের পরিচয় ধীরে ধীরে মুছে যাবে। একদিন তুই আর বুঝতে পারবি না, তুই অদ্বৈত, না অরিন্দম।”

অরিন্দম তাড়াতাড়ি বলল, “আমাকে বেছে নে, দাদা। আমি তোকে কখনও কষ্ট দেব না।”

অদ্বৈত তার দিকে তাকাল।

“তুই কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস?”

অরিন্দমের মুখে বিস্ময়।

“কী প্রশ্ন করছিস?”

“তুই যদি আমাকে ভালোবাসিস, তাহলে আমার জীবন কেড়ে নিতে চাইছিস কেন?”

অরিন্দম কিছু বলতে পারল না।

অদ্বৈত ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“আমি তোকে মুছে ফেলতে চাই না। কিন্তু নিজের জীবনও তোকে দিতে পারব না।”

অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।

“তাহলে আমি আবার একা হয়ে যাব।”

অদ্বৈত তার কাছে গিয়ে হাত বাড়াল।

“না। তুই একা হবি না। তুই আমার ভাই। কিন্তু তোকে আমার মধ্যে বেঁচে থাকতে হবে না। তোর নিজের অস্তিত্বের সত্যিটাকে মেনে নিতে হবে।”

অরিন্দম তার হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব ধীরে হাত বাড়িয়ে অদ্বৈতের হাত ধরল।

সঙ্গে সঙ্গে ঘরের সমস্ত আয়না ভেঙে পড়ল।

নীলকুঠির দেয়াল কেঁপে উঠল। ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়ল। দূরে কোথাও একটি শিশুর কান্না শোনা গেল।

মাধবী চিৎকার করে বললেন, “না! এখনই নয়!”

অদ্বৈত বুঝতে পারল না কী হচ্ছে।

অরিন্দম তার হাত শক্ত করে ধরে বলল, “দাদা, আমার কথা মন দিয়ে শোন। তুই যা দেখেছিস, সব সত্যি নয়। মা অনেক কিছু জানে, কিন্তু সবটা জানে না। বাবা যে দরজাটা বন্ধ করেছিলেন, তার ওপারে শুধু আমাদের স্মৃতি নেই।”

“তাহলে কী আছে?”

অরিন্দম উত্তর দিল, “যে প্রথম এই বাড়িতে ফিরে এসেছিল।”

মাধবী আতঙ্কে পিছিয়ে গেলেন।

“অরিন্দম, চুপ কর!”

কিন্তু ততক্ষণে উত্তর জানালার ওপার থেকে সেই অচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এসেছে।

“অনেক দেরি হয়ে গেছে, মাধবী।”

জানালার কাচের ওপরে একটি শিশুর হাতের ছাপ ফুটে উঠল।

তারপর আরেকটি।

তারপর তৃতীয়টি।

কাচের ওপারে কোনও মুখ দেখা যাচ্ছিল না। শুধু একটি ছায়া, যার মাথা মানুষের মতো, কিন্তু শরীরের দৈর্ঘ্য জানালার চেয়ে অনেক বেশি।

অদ্বৈত অনুভব করল, তার হাতের মধ্যে অরিন্দমের হাত ক্রমশ ঠান্ডা হয়ে আসছে।

“ওটা কী?” সে জিজ্ঞেস করল।

অরিন্দম ফিসফিস করে বলল, “ও সেই স্মৃতি, যেটাকে বাবা কোনও দিন মুছতে পারেননি।”

“কার স্মৃতি?”

“এই বাড়ির প্রথম মৃত মানুষের।”

জানালার ওপারের ছায়াটি এবার কথা বলল।

“অদ্বৈত, তুমি কি জানো, তোমার নামের অর্থ কী?”

অদ্বৈত উত্তর দিল না।

“অদ্বৈত মানে, যার দ্বিতীয় কেউ নেই। অথচ তোমার জীবন শুরু হয়েছিল তিনটি শিশুর গল্প দিয়ে। তোমার বাবা তোমাকে একমাত্র সন্তান বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সত্যিকে মুছে ফেললেই সত্যি শেষ হয়ে যায় না।”

ঘরের মেঝে ফেটে গেল।

তার নিচে দেখা গেল একটি সরু সিঁড়ি, যা নেমে গেছে অন্ধকারে।

মাধবী কাঁপতে কাঁপতে বললেন, “এই সিঁড়ি তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল!”

অদ্বৈত তাঁর দিকে তাকাল।

“কোথায় যায় এটা?”

মাধবী উত্তর দিলেন না।

জানালার ওপারের কণ্ঠস্বর বলল, “নিচে নেমে যাও, অদ্বৈত। সেখানে তুমি জানতে পারবে, তোমার বাবা কেন আমাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।”

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এটাই সেই শেষ দরজা। যে দরজার কথা বাবার ডায়েরিতে লেখা ছিল না, যে দরজার অস্তিত্ব নীলকুঠির নকশায় ছিল না।

সে সিঁড়ির দিকে এগোল।

মাধবী তার হাত চেপে ধরলেন।

“যাস না। তুই যদি নিচে নামিস, তাহলে আর ফিরে আসতে পারবি না।”

অদ্বৈত শান্ত গলায় বলল, “আমি এত বছর ধরে অর্ধেক সত্যি নিয়ে বেঁচেছি। আর নয়।”

“কিন্তু তুই যা খুঁজছিস, তা জানার পর হয়তো নিজের জীবনকেই ক্ষমা করতে পারবি না।”

অদ্বৈত মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “নিজের জীবনকে ক্ষমা করতে না পারার চেয়ে নিজের জীবন সম্পর্কে কিছুই না জানা অনেক বেশি ভয়ংকর।”

সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।

অরিন্দম তার পেছনে এল। মাধবী কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে তাঁদের অনুসরণ করলেন।

সিঁড়ির নিচে ছিল একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ ঘর। চারদিকে পাথরের দেয়াল। মাঝখানে গোলাকার একটি কালো পুকুর, যার জল একেবারেই স্থির। পুকুরের ওপরে ঝুলছে অসংখ্য ছোট ছোট কাচের বোতল। প্রতিটি বোতলের ভেতরে ক্ষীণ আলো জ্বলছে।

কোনওটায় একটি শিশুর হাসি।

কোনওটায় একজন বৃদ্ধের কান্না।

কোনওটায় কোনও মহিলার গান।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এগুলো সাধারণ বোতল নয়। প্রতিটি বোতলের মধ্যে যেন কারও স্মৃতি বন্দি।

ঘরের এক কোণে একটি কাঠের টেবিল। তার ওপর খোলা ডায়েরি, কয়েকটি পুরোনো ছবি, আর একটি চিঠি।

চিঠির ওপর লেখা—‘আমার শেষ সন্তানের জন্য’।

অদ্বৈত চিঠিটি তুলে নিল।

লেখা অনিরুদ্ধের।

“যে-ই এই চিঠি পড়ছিস, জেনে রাখিস, আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি। আমি ভেবেছিলাম, মৃত্যুকে হারানো যায়। ভেবেছিলাম, স্মৃতি ধরে রাখলে মানুষকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু আমি বুঝিনি, স্মৃতি কোনও মানুষ নয়। স্মৃতি শুধু তার ছায়া।

আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছি। তারপর তাদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে গিয়ে আমার জীবিত সন্তানকেও হারানোর পথে ঠেলে দিয়েছি।

আমি যে দরজাটি খুলেছিলাম, তার ওপারে কোনও মৃত মানুষ ছিল না। ছিল এমন এক শূন্যতা, যা মানুষের সবচেয়ে গভীর আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয়। সেই শূন্যতা আমাদের হারানো মানুষদের মুখ ধার করে। তাদের কণ্ঠ ধার করে। তারপর আমাদের বিশ্বাস করায়, তারা ফিরে এসেছে।

যদি কখনও আমার ছেলে এই ঘরে আসে, তাকে বলিস—সে যেন কাউকে ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ না করে। মৃতদের ভালোবাসতে হলে তাদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়, নিজেদের জীবনকে মুছে ফেলতে হয় না।”

চিঠির শেষে লেখা ছিল—

“অদ্বৈত, যদি তুই এই চিঠি পড়িস, তবে বুঝব আমি তোকে বাঁচাতে পারিনি। তবু শেষবারের মতো বলছি, তুই যা-ই দেখিস, নিজের নাম ভুলিস না।”

অদ্বৈতের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

“বাবা জানতেন,” সে ফিসফিস করে বলল। “তিনি জানতেন, সবকিছু ভুল ছিল।”

মাধবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“তিনি শেষ জীবনে বুঝেছিলেন। কিন্তু ততদিনে এই বাড়ি অনেক স্মৃতি নিজের মধ্যে ধরে ফেলেছিল।”

অদ্বৈত পুকুরের দিকে তাকাল।

“এই বোতলগুলোতে কী আছে?”

মাধবী বললেন, “যাদের হারানোর শোক আমরা মেনে নিতে পারিনি, তাদের স্মৃতি। তোর বাবা ভেবেছিলেন, এই স্মৃতিগুলো একত্র করলে মৃত মানুষদের ফিরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু এই স্মৃতিগুলোই ধীরে ধীরে বাড়িটাকে জীবন্ত করে তুলেছে।”

“আর সেই অন্ধকারের অস্তিত্ব?”

“ও কোনও একজনের স্মৃতি নয়। ও তৈরি হয়েছে অনেক মানুষের হারানোর যন্ত্রণা থেকে। এই বাড়িতে যারা প্রিয়জনকে হারিয়ে এসেছে, তাদের প্রত্যেকের শোক ওর মধ্যে জমেছে। যত মানুষ ওকে বিশ্বাস করেছে, ও তত শক্তিশালী হয়েছে।”

অদ্বৈত পুকুরের দিকে তাকিয়ে রইল।

জলের মধ্যে এবার একটি মুখ ফুটে উঠল।

তার নিজের মুখ।

কিন্তু সেই মুখের চোখ নীল।

পুকুরের প্রতিবিম্ব বলল, “তুমি কি সত্যিই ভাবছ, আমাকে মুছে দিলে সব শেষ হয়ে যাবে?”

অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।

প্রতিবিম্বটি হাসল।

“তোমার মা আমাকে ভুলে যেতে চেয়েছিল। তোমার বাবা আমাকে বন্দি করতে চেয়েছিল। অরিন্দম আমাকে নিজের শরীর দিতে চেয়েছিল। আর তুমি আমাকে ধ্বংস করতে চাও। কিন্তু তোমাদের কেউই বুঝতে পারছ না, আমি তোমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই আছি।”

“তুই কে?” অদ্বৈত চিৎকার করে উঠল।

পুকুরের জল কেঁপে উঠল।

“আমি সেই ইচ্ছা, যা মানুষকে মৃতদের ফিরিয়ে আনতে বাধ্য করে। আমি সেই শূন্যতা, যা প্রিয়জন চলে যাওয়ার পর বুকের মধ্যে থেকে যায়। আমি সেই প্রশ্ন, যার উত্তর কেউ পায় না—যদি আর একবার দেখা হতো, যদি আর একবার কথা বলা যেত, যদি আর একবার হাতটা ধরা যেত!”

অদ্বৈত চোখ বন্ধ করল।

তার সামনে ভেসে উঠল মায়ের মুখ। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাওয়া। অসুখের রাতে মায়ের কপালে ঠান্ডা কাপড়। দুর্গাপুজোর সকালে মায়ের শাঁখ বাজানো। বাবার সঙ্গে বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখা।

তারপর সেই স্মৃতির মধ্যে অরিন্দমের মুখও ভেসে উঠল—যে ভাইকে সে কোনও দিন চিনতে পারেনি, তবু যার অস্তিত্ব তার নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এই অন্ধকারকে শক্তিশালী করেছে তার নিজের আকাঙ্ক্ষাও। সে চেয়েছিল মাকে ফিরে পেতে। সে চেয়েছিল বাবার কথার অর্থ বুঝতে। সে চেয়েছিল অতীতের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে।

কিন্তু ভালোবাসা আর কাউকে ফিরিয়ে আনার আকাঙ্ক্ষা এক নয়।

সে পুকুরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“আমি তোকে ধ্বংস করতে আসিনি,” অদ্বৈত বলল। “আমি এসেছি তোকে আর আমার জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে না দিতে।”

প্রতিবিম্বের মুখ বদলে গেল।

“তাহলে তুই আমাকে কী দিবি?”

“কিছুই না।”

“তুই আমাকে তোর মায়ের স্মৃতি দিবি না?”

“না।”

“তোর ভাইয়ের অস্তিত্ব দিবি না?”

“না।”

“তোর নিজের শৈশবও না?”

অদ্বৈত দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমার শৈশবের কিছু স্মৃতি ফিরে নাও। কিছু স্মৃতি আমার কাছে থাক। কিছু স্মৃতি হয়তো কোনও দিন আর মনে পড়বে না। তবু আমি আমার জীবন বেছে নেব।”

পুকুরের জল হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল।

ঘরের সমস্ত বোতল কাঁপতে লাগল। একের পর এক বোতল মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। তাদের ভেতর থেকে আলো বেরিয়ে এসে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

সেই আলোয় অদ্বৈত দেখতে পেল অসংখ্য মুখ—যারা বহু বছর আগে এই বাড়িতে এসেছিল। কেউ তার মৃত স্ত্রীকে খুঁজছিল, কেউ হারানো সন্তানকে, কেউ এমন এক ভাইকে, যার সঙ্গে শেষবার কথা বলা হয়নি। তাদের মুখে দুঃখ ছিল, কিন্তু ভয় ছিল না।

একজন বৃদ্ধ তার স্ত্রীর হাত ধরে হাসলেন।

একটি শিশু তার মায়ের কোলে মাথা রাখল।

একজন তরুণ তার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি।”

তারপর তারা একে একে আলো হয়ে মিলিয়ে গেল।

মাধবী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “অদ্বৈত, তুই পারছিস!”

কিন্তু সেই মুহূর্তে অরিন্দমের শরীর কেঁপে উঠল।

তার নীল চোখের রং মুছে যেতে লাগল। হাতের আঙুলগুলো ক্রমশ স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।

“দাদা…”

অদ্বৈত ছুটে গেল।

“না! তোকে কিছু হতে দেব না!”

অরিন্দম দুর্বল হাসল।

“তুই তো বলেছিলি, আমাকে তোর মধ্যে বাঁচতে হবে না। এবার আমাকে আমার মতো চলে যেতে দে।”

“কিন্তু তুই আমার ভাই!”

“হ্যাঁ। আর সেই সত্যিটা কোনও দরজা, কোনও বাড়ি, কোনও স্মৃতি মুছে দিতে পারবে না।”

অদ্বৈত তার হাত ধরল।

“আমি তোকে কখনও চিনতেই পারলাম না।”

অরিন্দম বলল, “তুই আমাকে চিনেছিস। এটাই যথেষ্ট।”

তারপর সে অদ্বৈতের কপালে হাত রাখল।

সঙ্গে সঙ্গে অদ্বৈতের মনে একটি স্মৃতি ফিরে এল।

সে খুব ছোট। মায়ের কোলে বসে আছে। পাশে আরেকটি শিশু। দুজনের মাঝখানে শুয়ে আছে ছোট্ট একটি মেয়ে। মাধবী তিনজনের মাথায় হাত বুলিয়ে গান গাইছেন।

“ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি…”

স্মৃতিটি ছিল উষ্ণ, শান্ত, ভালোবাসায় ভরা।

অদ্বৈত বুঝতে পারল, এই স্মৃতিটাই এতদিন তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তার ভাই আর বোনের অস্তিত্ব মুছে যায়নি। শুধু তাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো তার মনে ছিল না।

“অরিন্দম,” সে কাঁদতে কাঁদতে বলল।

অরিন্দমের মুখে শেষবারের মতো হাসি ফুটল।

“আমাকে ভুলে যাস না, দাদা। কিন্তু আমাকে ধরে রাখার জন্য নিজের জীবন থামিয়ে রাখিস না।”

তারপর অরিন্দমের শরীর আলো হয়ে ভেঙে গেল।

আলোটি অদ্বৈতের বুকের মধ্যে প্রবেশ করল না। বরং জানালার দিকে উঠে গিয়ে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

অদ্বৈত হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

সে জানত না, তার ভাই সত্যিই চলে গেল কি না। সে শুধু বুঝতে পারল, প্রথমবারের মতো অরিন্দমকে নিজের জীবন কেড়ে না নিয়েই বিদায় জানাতে পেরেছে।

পুকুরের জল শান্ত হয়ে এল।

শেষ বোতলটি তখনও অক্ষত ছিল।

তার ভেতরে বন্দি ছিল মাধবীর স্মৃতি।

মাধবী বোতলটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবার আমারও যাওয়ার সময় হয়েছে।”

অদ্বৈত উঠে দাঁড়াল।

“তুমি কি আর ফিরবে না?”

মাধবী মৃদু হাসলেন।

“আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না। তোর মনে আমার যে স্মৃতিগুলো আছে, সেগুলো নিয়েই তুই বাঁচবি। কিন্তু আমি যদি এই বাড়ির মধ্যে থেকে যাই, তাহলে তুই কোনও দিন এই রাত থেকে বেরোতে পারবি না।”

“আমি তোমাকে আর একবার মা বলে ডাকতে চাই।”

মাধবী এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত রাখলেন।

“ডাক, বাবা।”

অদ্বৈতের গলা ভেঙে গেল।

“মা!”

মাধবী তাকে বুকে টেনে নিলেন।

দীর্ঘ বহু বছর পর অদ্বৈত যেন সত্যিই মায়ের স্পর্শ অনুভব করল। কোনও শীতলতা নেই, কোনও ভয় নেই, কোনও রহস্য নেই। শুধু একজন মায়ের আলিঙ্গন।

মাধবী তার কানে কানে বললেন, “তুই আমার সন্তান। তোর জন্মের সত্যি যা-ই হোক, তোর জীবনের অধিকার তোরই। কাউকে তোকে নিজের স্মৃতির বন্দি করতে দিস না।”

তারপর তিনি ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেলেন।

তাঁর শরীরের চারপাশে নরম আলো ছড়িয়ে পড়ল।

অদ্বৈত হাত বাড়িয়ে তাঁকে ধরে রাখতে চাইল, কিন্তু মাধবী মাথা নাড়লেন।

“আমাকে যেতে দে।”

অদ্বৈত হাত নামিয়ে নিল।

মাধবী শেষবারের মতো হাসলেন।

তারপর তিনিও আলো হয়ে মিলিয়ে গেলেন।

সঙ্গে সঙ্গে নীলকুঠির গভীর থেকে এক ভয়ংকর শব্দ উঠল। পাথরের দেয়াল ভেঙে পড়তে শুরু করল। ছাদ থেকে ধুলো ঝরে পড়ল। পুকুরের জল শুকিয়ে গেল। কাচের বোতলগুলো একে একে ফেটে গেল।

অদ্বৈত সিঁড়ির দিকে দৌড়ল।

কিন্তু সিঁড়ির মুখে এসে দেখল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে তিতলি।

“তুমি এখনও যাওনি?” অদ্বৈত হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করল।

তিতলি হাসল।

“আমি তো অনেক আগেই চলে গেছি। তুমি শুধু আমাকে দেখতে পাচ্ছিলে।”

“তুমি কি সত্যিই আমার বোন ছিলে?”

তিতলি মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। আর তুই আমার দাদা।”

অদ্বৈত তার হাত ধরতে গেল। তিতলি নিজেই তার হাত বাড়িয়ে দিল।

এক মুহূর্তের জন্য অদ্বৈত অনুভব করল, সে সত্যিই তার বোনের হাত ধরেছে।

তিতলি বলল, “দাদা, বাড়ির বাইরে গিয়ে একবার নদীর দিকে তাকাবি। কিন্তু ফিরে আসার চেষ্টা করিস না।”

“কেন?”

“কারণ এই বাড়ি তোর জন্য আর অপেক্ষা করবে না।”

তিতলির মুখ ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে গেল।

“তিতলি!”

“ভালো থাকিস, দাদা।”

তারপর সে মিলিয়ে গেল।

অদ্বৈত একা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।

উত্তর ঘরের দরজা খোলা। জানালার ওপারে নদী আবার স্বাভাবিক দিকে বইছে। আকাশে ভোরের প্রথম আলো ফুটছে।

বাড়ির প্রধান দরজার কাছে পৌঁছে অদ্বৈত শেষবারের মতো পিছনে তাকাল।

নীলকুঠির উত্তর জানালায় কেউ দাঁড়িয়ে নেই।

দেয়ালে কোনও লেখা নেই।

মেঝেতে কোনও ভাঙা আয়না নেই।

শুধু একটি পুরোনো পারিবারিক ছবি পড়ে আছে টেবিলের ওপর। ছবিতে মাধবী, অনিরুদ্ধ, ছোট্ট অদ্বৈত, অরিন্দম আর তিতলি—পাঁচজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।

ছবির পেছনে একটি বাক্য লেখা।

“যাদের আমরা ভালোবাসি, তারা চলে গেলেও ভালোবাসা থেকে যায়।”

অদ্বৈত ছবিটি পকেটে রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

বাইরে তখন ভোর।

নদীর ওপর কুয়াশা। দূরে কয়েকটি নৌকা ভেসে যাচ্ছে। পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। পৃথিবী যেন আগের মতোই আছে, অথচ অদ্বৈতের কাছে সবকিছু নতুন।

সে একবার নীলকুঠির দিকে তাকাল।

বাড়িটি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার জানালাগুলো বন্ধ, দরজাগুলো নিঃশব্দ। বহু বছরের জমে থাকা অন্ধকার যেন এক রাতেই ফুরিয়ে গেছে।

অদ্বৈত নদীর ধারে বসে পড়ল।

তার চোখে জল এল।

এই প্রথম সে মায়ের জন্য কাঁদল।

বাবার জন্য কাঁদল।

অরিন্দম আর তিতলির জন্য কাঁদল।

কিন্তু সেই কান্নার মধ্যে এবার কোনও আতঙ্ক ছিল না। কোনও রহস্য ছিল না। ছিল হারানোর বেদনা, আর সেই বেদনাকে মেনে নেওয়ার সাহস।

কলকাতায় ফিরে এসে অদ্বৈত অনেক দিন নীলকুঠির কথা কাউকে বলেনি। সে নিজের কাজ শুরু করল, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করল, বহু বছর পরে মায়ের ছবি ঘরের দেয়ালে টাঙাল। বাবার ডায়েরির কিছু অংশ সে সংরক্ষণ করল, আর বাকিটা নদীর জলে ভাসিয়ে দিল।

কখনও কখনও রাতে তার ঘুম ভেঙে যেত। মনে হতো, কেউ যেন তার নাম ধরে ডাকছে।

কিন্তু সে আর জানালা খুলত না।

সে জানত, সব ডাকের উত্তর দিতে হয় না। কিছু কণ্ঠস্বর স্মৃতি হয়ে থাকলেই সুন্দর।

প্রায় এক বছর পর, এক বর্ষার সকালে, অদ্বৈত নিজের পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে একটি খাম পেল। খামের ওপর তার নিজের হাতের লেখা।

ভেতরে একটি ছোট চিঠি।

“অদ্বৈত,

তুই যদি এই চিঠি পড়িস, তাহলে বুঝব তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিস। আমি জানি না, তোর মনে আমার কতটা স্মৃতি রয়ে গেছে। হয়তো কোনও দিন তুই আমাকে ভুলে যাবি। হয়তো আমার মুখটাও আর মনে পড়বে না।

তবু একটা কথা মনে রাখিস—তুই আমাকে বাঁচাতে পারিসনি বলে তোর কোনও অপরাধ নেই। তুই আমাকে ভালোবেসেছিলি। সেটাই যথেষ্ট।

তোর ভাই, অরিন্দম।”

অদ্বৈত চিঠিটা বুকে চেপে ধরল।

তারপর জানালার বাইরে তাকাল।

আকাশে বৃষ্টি থেমেছে। রাস্তার পাশে একটি ছোট ছেলে মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। ছেলেটি হঠাৎ পিছনে ফিরে তাকিয়ে হাসল।

এক মুহূর্তের জন্য অদ্বৈতের মনে হল, ছেলেটির চোখ নীল।

সে চোখের পলক ফেলল।

ছেলেটি তখন মায়ের হাত ধরে দূরে চলে যাচ্ছে।

অদ্বৈত আর তাকে অনুসরণ করল না।

সে জানালাটি বন্ধ করে দিল।

তারপর নিজের ঘরের টেবিলে বসে একটি নতুন গল্প লিখতে শুরু করল।

গল্পের নাম দিল—যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না।

গল্পের শেষ লাইনে সে লিখল—

“কোনও কোনও বাড়ি মানুষকে ফিরিয়ে আনে না। তারা শুধু অপেক্ষা করে, যতক্ষণ না মানুষ বুঝতে শেখে—যারা চলে গেছে, তাদের ভালোবাসতে হলে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার দরকার নেই।”

কলম নামিয়ে অদ্বৈত চোখ বন্ধ করল।

তার মনে এবার মায়ের মুখ স্পষ্ট।

বাবার হাসিও।

আর খুব দূরে, স্মৃতির এক শান্ত কোণে, অরিন্দম ও তিতলি হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।

তারা আর তাকে ডাকছে না।

তারা শুধু হাসছে।

আর সেই হাসির মধ্যে কোনও রহস্য নেই।

শুধু বিদায়।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *