১. রাত বারোটার অতিথি
রাত তখন বারোটা পেরিয়ে গেছে।
বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশের বুক চিরে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে, আর সেই আলোয় নদীর ধারের পুরোনো বাড়িটাকে মনে হচ্ছে কোনও মৃত মানুষের স্মৃতিস্তম্ভ।
বাড়িটার নাম ‘নীলকুঠি’।
একসময় এই বাড়িতে আলো জ্বলত রাতভর। উঠোনে বসত গানের আসর, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত মশলার গন্ধ, আর বারান্দায় বসে বাড়ির বৃদ্ধ কর্তা হরিনারায়ণ চৌধুরী সন্ধ্যায় অতিথিদের সঙ্গে গল্প করতেন। কিন্তু আজ সেই বাড়ির দরজায় মরচে পড়েছে, জানালার পাল্লা ভেঙে গেছে, বাগানের পথ আগাছায় ঢেকে গেছে।
গত পনেরো বছর ধরে বাড়িটিতে কেউ থাকে না।
অন্তত গ্রামের মানুষ তাই জানে।
সেই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল একটি সাদা গাড়ি। গাড়ি থেকে নামল তিরিশ বছর বয়সি এক যুবক। নাম অদ্বৈত মুখার্জি। পেশায় সাংবাদিক। কলকাতার একটি সংবাদপত্রে কাজ করে সে।
আজ থেকে তিন দিন আগে তার কাছে একটি অদ্ভুত চিঠি এসেছিল।
চিঠিতে লেখা ছিল—
‘অদ্বৈত,
তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও, তোমার মায়ের মৃত্যু কীভাবে হয়েছিল, তাহলে অমাবস্যার রাতে নীলকুঠিতে এসো।
তোমার জন্য একটি ঘর খোলা থাকবে।
কিন্তু মনে রেখো, রাত বারোটার পর বাড়ির উত্তর দিকের জানালা খুলবে না।
আর যদি কেউ তোমাকে তোমার নিজের নামে ডাকে, উত্তর দেবে না।
— একজন পুরোনো পরিচিত।’
চিঠির নীচে কোনও ঠিকানা নেই, প্রেরকের নাম নেই। শুধু নীল কালিতে আঁকা একটি ছোট্ট চাবির ছবি।
অদ্বৈত প্রথমে চিঠিটাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু খামের ভিতরে মায়ের একটি পুরোনো ছবি পাওয়ার পর তার কৌতূহল বেড়ে যায়।
ছবিতে তার মা মাধবী মুখার্জি দাঁড়িয়ে আছেন নীলকুঠির সামনে।
ছবির পিছনে লেখা—‘যে বাড়িতে কেউ ফিরে আসে না, সেখানেই একদিন সবাইকে ফিরতে হয়।’
অদ্বৈতের মা মারা গিয়েছিলেন সে যখন মাত্র বারো বছরের। সরকারি নথিতে লেখা ছিল, রাতে গাড়ি দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। কিন্তু অদ্বৈত কোনও দিন মায়ের দেহ দেখেনি। তার বাবা তাকে বলেছিলেন, দুর্ঘটনার পর দেহ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে শেষবারের মতো দেখানো সম্ভব হয়নি।
বাবা মারা যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই কথাই বলেছিলেন।
কিন্তু মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তিনি অদ্বৈতকে একটি বাক্য বলেছিলেন, যা তার মনে গেঁথে আছে—
‘তোর মা মারা যায়নি, অদ্বৈত। ওকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।’
তখন অদ্বৈত কথাটার অর্থ বুঝতে পারেনি।
আজ সে সেই অর্থ খুঁজতেই নীলকুঠিতে এসেছে।
গাড়ির দরজা বন্ধ করে সে বাড়ির দিকে এগোল। প্রধান ফটকটি আধখোলা। ঠেলে দিতেই কড়কড় শব্দে খুলে গেল।
ভিতরে ঢুকে সে দেখল, উঠোনের মাঝখানে একটি পুরোনো কুয়ো। কুয়োর চারপাশে শ্যাওলা জমেছে। তার পাশে একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়া গাছ। অথচ বৃষ্টির মধ্যে গাছটির একটি ডালে ঝুলছে টাটকা লাল ফুলের মালা।
অদ্বৈত থমকে দাঁড়াল।
এই বাড়িতে তো কেউ থাকে না!
তাহলে ফুলের মালাটা কে ঝুলিয়েছে?
ঠিক সেই সময় বাড়ির ভিতর থেকে একটি নারীকণ্ঠ ভেসে এল—
‘এত দেরি করলে কেন, অদ্বৈত?’
অদ্বৈতের বুকের ভিতরটা হিম হয়ে গেল।
কণ্ঠস্বরটি তার মায়ের।
যে কণ্ঠস্বর সে পনেরো বছর ধরে কোনও দিন শোনেনি, সেই কণ্ঠস্বর আজ তাকে নাম ধরে ডাকছে।
সে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
কেউ নেই।
তারপর আবার সেই কণ্ঠস্বর—
‘ভিতরে এসো। তোমার ঘর তৈরি আছে।’
অদ্বৈত নিজেকে সামলে নিল। সে একজন সাংবাদিক। অজানা ঘটনার পিছনে ছুটে বেড়ানো তার কাজ। ভূতপ্রেতের গল্পে সে বিশ্বাস করে না।
কিন্তু মায়ের কণ্ঠস্বর?
সেটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে?
সে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল।
বাড়ির ভিতর আশ্চর্যজনকভাবে পরিষ্কার। মেঝেতে ধুলো নেই, দেওয়ালে মাকড়সার জাল নেই। হলঘরের মাঝখানে একটি বড় ঝাড়বাতি জ্বলছে। চারদিকে পুরোনো আসবাবপত্র, দেওয়ালে তেলরঙের ছবি, আর সিঁড়ির মাথায় ঝুলছে একটি বিশাল ঘড়ি।
ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে বারোটা সাত মিনিটে।
অদ্বৈত নিজের ঘড়ি দেখল।
বারোটা সাত মিনিট।
হলঘরের এক কোণে একটি মহিলা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাদা শাড়ি, খোলা চুল, মুখটা আধো অন্ধকারে ঢাকা।
অদ্বৈত এগিয়ে গেল।
‘আপনি কে?’
মহিলাটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
অদ্বৈতের হাত থেকে ব্যাগ পড়ে গেল।
এ তো তার মা!
ছবিতে দেখা সেই মুখ। কপালের বাঁদিকে ছোট্ট তিল। চোখের পাশে হালকা ভাঁজ। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত হাসি।
মাধবী মুখার্জি।
পনেরো বছর আগে যাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
মহিলাটি এগিয়ে এসে অদ্বৈতের মাথায় হাত রাখলেন।
‘কত বড় হয়ে গেছিস, বাবা।’
অদ্বৈতের গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।
মহিলাটি মৃদু হেসে বললেন, ‘ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো তোর মা।’
অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।
‘আপনি আমার মা হতে পারেন না। মা মারা গেছেন।’
মহিলাটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
‘কে বলেছে?’
‘বাবা। সরকারি নথি। সবাই জানে।’
মাধবী কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘তোর বাবা অনেক মিথ্যে বলেছিল। কিন্তু সব মিথ্যের পিছনে একটা কারণ ছিল।’
‘কী কারণ?’
‘তোকে বাঁচিয়ে রাখা।’
অদ্বৈত কাঁপা গলায় বলল, ‘কিসের থেকে?’
মাধবী উত্তর দিলেন না। তিনি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন।
‘চল। তোর ঘর দেখাব।’
অদ্বৈত তাঁর পিছনে হাঁটতে শুরু করল।
সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখতেই তার চোখ পড়ল দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবির দিকে।
ছবিতে নীলকুঠির পরিবারের সবাই দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝখানে হরিনারায়ণ চৌধুরী, তাঁর পাশে স্ত্রী সরযূবালা, আর সামনে কয়েকজন তরুণ-তরুণী।
ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে বারো-তেরো বছরের একটি ছেলে।
ছেলেটির মুখ অবিকল অদ্বৈতের মতো।
শুধু চোখ দুটো অস্বাভাবিক কালো।
অদ্বৈত ছবির সামনে থেমে গেল।
‘এই ছেলেটি কে?’
মাধবী ছবিটার দিকে তাকালেন না।
‘ওর কথা এখন থাক।’
‘কেন? ও আমার মতো দেখতে কেন?’
মাধবী এবার পিছন ফিরে তাকালেন।
‘কারণ ও তুই।’
অদ্বৈতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
‘অসম্ভব!’
‘সব অসম্ভব জিনিসই একদিন সত্যি হয়ে ওঠে, অদ্বৈত।’
তিনি আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
উপরতলায় পৌঁছে একটি ঘরের দরজা খুললেন। ঘরের ভিতরে একটি পুরোনো খাট, কাঠের টেবিল, আলমারি এবং জানালার পাশে একটি ছোট্ট দোলনা।
দোলনাটির ভিতরে রাখা একটি পুতুল।
অদ্বৈত পুতুলটা হাতে তুলে নিল। পুতুলটির চোখে কালো কাচ বসানো। মাথার চুল একপাশে পুড়ে গেছে।
তার মনে পড়ল, ছোটবেলায় মায়ের কাছে এমন একটি পুতুল ছিল। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পর সেটি আর সে কোনও দিন দেখেনি।
‘এটা এখানে এল কীভাবে?’
মাধবী বললেন, ‘তুই যখন এই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলি, তখন পুতুলটা এখানেই ছিল।’
‘আমি কখনও এই বাড়িতে আসিনি।’
মাধবী মৃদু হেসে বললেন, ‘তোর মনে নেই।’
অদ্বৈত প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক তখনই ঘরের উত্তর দিকের জানালায় তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
মাধবীর মুখের রং বদলে গেল।
তিনি দ্রুত অদ্বৈতের হাত থেকে পুতুলটা কেড়ে নিয়ে আলমারির ভিতর ঢুকিয়ে দিলেন।
‘যাই হোক না কেন, জানালাটা খুলবি না।’
‘কেন?’
‘কারণ ও জানে তুই ফিরে এসেছিস।’
‘কে?’
মাধবী উত্তর দিলেন না। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন—
‘আর একটা কথা। রাত বারোটার পর কেউ যদি তোকে তোর নিজের নামে ডাকে, কোনও উত্তর দিবি না।’
অদ্বৈত চমকে উঠল।
চিঠিতেও ঠিক এই কথাই লেখা ছিল।
মাধবী চলে গেলেন।
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
অদ্বৈত একা দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর জানালার ওপার থেকে একটি শিশুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
‘দাদা, দরজাটা খোলো।’
অদ্বৈতের বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
কেউ তাকে কোনও দিন দাদা বলে ডাকেনি।
তার কোনও ভাই বা বোন নেই।
তাহলে জানালার বাইরে কে?
২. মৃত শিশুর ডায়েরি
অদ্বৈত সারারাত ঘুমোতে পারল না।
জানালার বাইরে থেকে আর কোনও শব্দ আসেনি। কিন্তু ভোরের দিকে সে লক্ষ্য করল, জানালার নীচের কাঠে ছোট ছোট নখের আঁচড়ের মতো দাগ রয়েছে। দাগগুলো নতুন। কাঠের গায়ে জমে থাকা ধুলোও যেন কেউ আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিয়েছে।
সে জানালাটা খুলল না।
সকালে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, বাড়ির হলঘরে একটি বৃদ্ধ লোক বসে আছেন। ধূসর ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি, চোখে মোটা চশমা। সামনে একটি চায়ের কাপ।
বৃদ্ধ তাকে দেখে বললেন, ‘তুমি অদ্বৈত?’
‘হ্যাঁ। আপনি কে?’
‘আমি নীলকুঠির পুরোনো তত্ত্বাবধায়ক। আমার নাম নিতাই পাল।’
‘আপনি এখানে থাকেন?’
‘থাকি না। তবু মাঝেমধ্যে আসতে হয়।’
‘কেন?’
নিতাই পাল চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন।
‘এই বাড়ি কাউকে বেশিদিন দূরে থাকতে দেয় না।’
অদ্বৈত চেয়ার টেনে বসল।
‘আমার মা কোথায়?’
‘তোমার মা?’
বৃদ্ধের মুখে বিস্ময় দেখা গেল।
‘তুমি কি মাধবী দেবীকে দেখেছ?’
‘গত রাতে।’
নিতাই পাল দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি যা দেখেছ, তার সবটাকে সত্যি বলে ধরে নিও না।’
অদ্বৈত বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সবাই একই কথা বলছে। কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলছে না কেন?’
‘কারণ এই বাড়ির সত্যি একবারে বলা যায় না।’
‘তাহলে ধীরে ধীরে বলুন।’
নিতাই পাল উঠে দাঁড়ালেন।
‘প্রথমে তোমাকে একটা জিনিস দেখাতে হবে।’
তিনি অদ্বৈতকে বাড়ির পিছনের দিকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি ছোট ঘর। দরজায় তালা ঝুলছে। নিতাই পাল পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললেন।
ঘরের ভিতরে পুরোনো আলমারি, বইয়ের তাক, কিছু ভাঙা খেলনা এবং কাগজের স্তূপ। দেওয়ালে একটি বড় মানচিত্র ঝুলছে। মানচিত্রে নীলকুঠির বিভিন্ন ঘর চিহ্নিত করা হয়েছে।
নিতাই পাল আলমারির নীচ থেকে একটি কালো ডায়েরি বের করলেন।
‘এটা তোমার বাবার।’
অদ্বৈত ডায়েরিটা হাতে নিল।
বাবা অনিরুদ্ধ মুখার্জি জীবনের শেষ কয়েক বছর খুব কম কথা বলতেন। মৃত্যুর আগে তিনি সমস্ত পুরোনো কাগজ পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। অদ্বৈত তখন ভেবেছিল, বাবা হয়তো নিজের ব্যক্তিগত স্মৃতি মুছে ফেলতে চাইছেন।
আজ বুঝতে পারছে, হয়তো তিনি অন্য কিছু লুকোচ্ছিলেন।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
‘নীলকুঠি, ১৭ অক্টোবর ২০০৯।
আজ আবার উত্তর দিকের জানালায় শব্দ শুনলাম। মাধবী বলেছে, জানালাটা খুলতে নেই। কিন্তু আমি জানি, ওখানে কেউ আছে।’
অদ্বৈত পাতা উল্টোল।
‘২১ অক্টোবর।
অদ্বৈতকে আজ প্রথমবার এই বাড়িতে নিয়ে এলাম। সে কিছুই মনে করতে পারছে না। ডাক্তার বলেছে, তার স্মৃতির কিছু অংশ হারিয়ে গেছে। কিন্তু আমি জানি, শুধু স্মৃতি হারায়নি। তার মধ্যে অন্য একজনের স্মৃতিও জেগে উঠছে।’
অদ্বৈত থমকে গেল।
‘অন্য একজনের স্মৃতি?’
নিতাই পাল বললেন, ‘পড়ো।’
পরের পাতায় লেখা—
‘২৫ অক্টোবর।
আজ রাতে অদ্বৈত ঘুমের মধ্যে অন্য একটি নাম বলেছে—অরিন্দম। বলেছে, অরিন্দমকে খুঁজে বের করতে হবে। আমি জানি না, এই নাম কোথা থেকে এসেছে।’
আরেকটি পাতায়—
‘২ নভেম্বর।
মাধবী আজ স্বীকার করেছে, সে উত্তর দিকের ঘরে গিয়েছিল। সেখানে সে একটি শিশুকে দেখেছে। শিশুটি অদ্বৈতের মতো দেখতে। কিন্তু তার চোখের রং কালো নয়, নীল।’
অদ্বৈত ডায়েরি থেকে মুখ তুলল।
‘অরিন্দম কে?’
নিতাই পাল বললেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না।’
‘আপনি কি জানেন, আমার মা সত্যিই মারা গিয়েছিলেন কি না?’
বৃদ্ধ জানালার দিকে তাকালেন।
‘মাধবী দেবীকে শেষবার দেখা গিয়েছিল এই বাড়ির উত্তর দিকের ঘরে। তারপর থেকে তাঁর কোনও খোঁজ নেই।’
‘কিন্তু আমার মা তো পনেরো বছর আগে মারা গেছেন!’
‘তোমার বাবা সেটাই বলেছিলেন।’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
নিতাই পাল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘আমি বলতে চাইছি, এই বাড়িতে যাদের মৃত্যু ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের সবাইকে আমরা সত্যিই মৃত দেখিনি।’
অদ্বৈত ডায়েরির শেষ পাতাগুলো দ্রুত উল্টোল।
শেষের দিকে একটি পাতায় লাল কালিতে লেখা—
‘যদি অদ্বৈত কখনও ফিরে আসে, তাকে উত্তর দিকের ঘরে যেতে দিতে হবে। কিন্তু তার আগে তাকে জানতে হবে, অরিন্দম কে। কারণ অরিন্দম ফিরে এলে নীলকুঠির দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।’
অদ্বৈত মাথা তুলল।
‘উত্তর দিকের ঘর কোথায়?’
নিতাই পাল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘উপরতলায়। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পথ কেউ জানে না।’
‘কেন?’
‘কারণ বাড়ির নকশায় ওই ঘরটির কোনও অস্তিত্ব নেই।’
অদ্বৈত মানচিত্রটা নামিয়ে ভালো করে দেখল।
উপরতলার পশ্চিম দিকে তিনটি ঘর চিহ্নিত। পূর্ব দিকে দুটি। কিন্তু উত্তর দিকে একটি ফাঁকা অংশ রয়েছে। সেখানে কোনও দরজা বা জানালা আঁকা নেই।
অথচ গত রাতে তার ঘরের উত্তর দিকের জানালায় কেউ টোকা দিয়েছিল।
তার মানে, ঘরটি মানচিত্রের বাইরে।
অদ্বৈত ডায়েরিটা ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।
‘আমি ওই ঘর খুঁজে বের করব।’
নিতাই পাল তার হাত চেপে ধরলেন।
‘একবার ওই ঘরে ঢুকলে তুমি আর আগের মানুষ থাকবে না।’
অদ্বৈত শান্ত গলায় বলল, ‘আমি আগের মানুষ আছি কি না, সেটাই তো জানতে এসেছি।’
৩. যে মেয়েটির কোনও ছায়া নেই
দুপুরের দিকে বৃষ্টি থেমে গেল।
অদ্বৈত বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখতে শুরু করল। পুরোনো বসার ঘর, রান্নাঘর, অতিথিশালা, লাইব্রেরি—সব জায়গায় ধুলোহীন অদ্ভুত পরিচ্ছন্নতা। যেন বাড়িটি সত্যিই পরিত্যক্ত নয়, বরং কেউ প্রতিদিন যত্ন করে পরিষ্কার করে রাখে।
লাইব্রেরিতে ঢুকে সে একটি বইয়ের তাকের সামনে থামল।
তাকের মাঝখানে রাখা একটি বইয়ের নাম—‘হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি’।
বইটি খুলতেই ভিতর থেকে একটি ছোট্ট কাগজ পড়ে গেল।
কাগজে লেখা—
‘অদ্বৈত, তুমি যদি এই লেখা পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি এখনও অপেক্ষা করছি।
তুমি আমাকে ভুলে গেছ। কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।
আমার নাম অরিন্দম নয়। অরিন্দম আমার ভাইয়ের নাম।
আমার নাম—অদ্বৈত।
আমাদের মধ্যে একজন সত্যি, আর একজন শুধু স্মৃতি।
কিন্তু কোনজন সত্যি, তা জানার অধিকার তোমার নেই।
— তোমারই একজন।’
অদ্বৈত কাগজটা বারবার পড়ল।
তার নাম অদ্বৈত।
যে লিখেছে, সেও নিজেকে অদ্বৈত বলছে।
এ কেমন রহস্য?
ঠিক তখন লাইব্রেরির দরজায় একটি মেয়েকে দেখা গেল। বয়স চৌদ্দ-পনেরো। পরনে নীল ফ্রক, চুল দুদিকে বিনুনি করা। তার মুখে এমন এক শান্ত ভাব, যেন এই বাড়ির অন্ধকারের সঙ্গে সে বহুদিন ধরে পরিচিত।
মেয়েটি বলল, ‘তুমি কি অদ্বৈতদা?’
অদ্বৈত চমকে তাকাল।
‘তুমি কে?’
‘আমি তিতলি।’
‘তুমি এখানে থাকো?’
তিতলি মাথা নাড়ল।
‘এই বাড়িতেই।’
‘কিন্তু এখানে তো কেউ থাকে না।’
মেয়েটি হেসে বলল, ‘তোমাকে সবাই তাই বলেছে?’
অদ্বৈত কোনও উত্তর দিল না।
তিতলি এগিয়ে এসে বইয়ের তাক থেকে একটি পুরোনো ছবির অ্যালবাম নামাল। অ্যালবাম খুলে একটি ছবি দেখাল।
ছবিতে অদ্বৈত দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট মেয়ের পাশে। দুজনের বয়সই পাঁচ-ছয় বছরের বেশি নয়। অদ্বৈতের হাতে একটি খেলনা গাড়ি। মেয়েটির হাতে পুতুল।
ছবির পিছনে লেখা—‘অদ্বৈত ও তিতলি, নীলকুঠি, ২০০৪।’
অদ্বৈত ছবিটা হাতে নিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল।
‘এটা অসম্ভব। আমি তো কোনও দিন এখানে আসিনি।’
তিতলি বলল, ‘তুমি এসেছিলে।’
‘তুমি আমার বোন?’
তিতলি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
‘তুমি আমাকে কী মনে করতে চাও, সেটাই বড় কথা।’
‘তোমার বাবা-মা কে?’
‘এই বাড়িতে যাদের বাবা-মা ছিল, তারা কেউ এখন নেই।’
অদ্বৈত মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকাল। তার চোখে অদ্ভুত নীল আভা।
‘তুমি কি অরিন্দমকে চেনো?’
তিতলির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
‘তুমি ওই নাম কোথায় শুনেছ?’
‘বাবার ডায়েরিতে।’
‘ওর কথা আর কখনও বলবে না।’
‘কেন?’
তিতলি কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘কারণ অরিন্দম এই বাড়ির সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ।’
‘সে কোথায়?’
‘উত্তর দিকের ঘরে।’
অদ্বৈতের বুকের ভিতর ধক করে উঠল।
‘সেখানে যাওয়ার পথ কোথায়?’
তিতলি আঙুল তুলে লাইব্রেরির শেষ দেওয়াল দেখাল।
‘ওই দেওয়ালের পিছনে।’
অদ্বৈত দেওয়ালটা পরীক্ষা করতে শুরু করল। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। তারপর বইয়ের তাকের পিছনে একটি ছোট্ট লোহার হাতল দেখতে পেল। হাতলটা টানতেই দেওয়ালের একটি অংশ ধীরে ধীরে সরে গেল।
ভিতরে অন্ধকার সরু পথ।
দূরে কোথাও জল পড়ার শব্দ।
তিতলি বলল, ‘তুমি যদি ভিতরে যাও, একটা কথা মনে রেখো।’
‘কী?’
‘ওখানে যে তোমার মুখ দেখাবে, সে তোমার মতো দেখতে হলেও তোমার মতো মানুষ নয়।’
অদ্বৈত টর্চ জ্বালাল।
‘তুমি আমার সঙ্গে আসবে?’
তিতলি মাথা নাড়ল।
‘আমি ওই পথ দিয়ে যেতে পারি না।’
‘কেন?’
মেয়েটি নিচের দিকে তাকাল।
অদ্বৈত প্রথমবার লক্ষ্য করল, তার পায়ের নীচে কোনও ছায়া নেই।
জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আসছে, টেবিলের ছায়া মেঝেতে পড়েছে, অদ্বৈতের নিজের ছায়াও স্পষ্ট। কিন্তু তিতলির কোনও ছায়া নেই।
অদ্বৈত এক পা পিছিয়ে গেল।
তিতলি মৃদু হেসে বলল, ‘ভয় পেয়ো না। আমি তোমার শত্রু নই।’
‘তুমি কি মানুষ?’
তিতলি উত্তর দিল না।
সে শুধু বলল, ‘আজ রাত বারোটা সাত মিনিটে উত্তর দিকের ঘরে যেয়ো। তার আগে নয়।’
দেওয়ালের পিছনের পথ থেকে হঠাৎ একটি শিশুর হাসি ভেসে এল।
তিতলি দ্রুত পিছিয়ে গেল।
‘ও জেগে উঠেছে!’
‘কে?’
‘যে তোমার জায়গা নিতে চায়।’
পরের মুহূর্তে লাইব্রেরির সমস্ত বই একসঙ্গে মেঝেতে পড়ে গেল।
অদ্বৈত চোখ বন্ধ করেছিল মাত্র এক মুহূর্তের জন্য।
চোখ খুলে দেখল, তিতলি নেই।
দেওয়ালের গোপন পথটিও বন্ধ।
শুধু মেঝেতে পড়ে থাকা অ্যালবামের শেষ পাতায় একটি নতুন ছবি দেখা যাচ্ছে।
ছবিতে অদ্বৈত দাঁড়িয়ে আছে নীলকুঠির কুয়োর পাশে।
তার পাশে তিতলি।
আর তাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে আরও একজন—অদ্বৈতের অবিকল প্রতিচ্ছবি।
ছবির নীচে লেখা—
‘একজন বাড়ি ফিরেছে। অন্যজন এখনও বাইরে।’
৪. রাত বারোটা সাত মিনিট
সন্ধ্যা নামতেই নীলকুঠির পরিবেশ বদলে গেল।
দুপুরে যে বাড়িকে শান্ত মনে হচ্ছিল, সন্ধ্যার পর সেই বাড়ির প্রতিটি কোণ থেকে অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসতে লাগল। কখনও মনে হচ্ছিল, কেউ সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছে। কখনও মনে হচ্ছিল, রান্নাঘরে বাসন নাড়াচাড়া হচ্ছে। আবার কখনও দূরের ঘর থেকে কেউ কান্না করছে।
অদ্বৈত নিতাই পালকে খুঁজতে গেল।
বৃদ্ধকে কোথাও পাওয়া গেল না।
তার ঘরে একটি কাগজ পড়ে ছিল।
‘আমি চলে যাচ্ছি। তুমি যদি রাত বারোটা সাত মিনিটে উত্তর দিকের ঘরে যাও, মনে রেখো—প্রথম যে দরজাটি খুলবে, সেটি বন্ধ করে দেবে। দ্বিতীয় দরজাটি খুলবে না। তৃতীয় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের নাম তিনবার বলবে।
কিন্তু যদি নিজের কণ্ঠস্বর অন্য কোথাও থেকে শুনতে পাও, কোনও উত্তর দেবে না।’
অদ্বৈত কাগজটা পকেটে রাখল।
রাত এগারোটা পঞ্চান্ন মিনিটে সে উপরের ঘরে ফিরে এল। টেবিলের ওপর টর্চ, বাবার ডায়েরি, মায়ের ছবি আর একটি ছোট ছুরি রাখল। ছুরিটি আত্মরক্ষার জন্য এনেছিল।
ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে।
এগারোটা ঊনষাট।
তারপর ঠিক বারোটা।
বাড়ির সমস্ত আলো একসঙ্গে নিভে গেল।
অদ্বৈত টর্চ জ্বালাল।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিকের জানালায় তিনবার টোকা পড়ল।
ঠক।
ঠক।
ঠক।
তারপর মায়ের কণ্ঠস্বর—
‘অদ্বৈত, জানালাটা খোলো।’
অদ্বৈত চুপ করে রইল।
‘বাবা, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।’
সে চোখ বন্ধ করল।
‘আমাকে ভিতরে আসতে দে।’
অদ্বৈত উত্তর দিল না।
হঠাৎ জানালার ওপার থেকে আরেকটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
তার নিজের কণ্ঠস্বর।
‘অদ্বৈত, তুই ভিতরে আছিস কেন? বাইরে আয়। তোর জন্য অপেক্ষা করছি।’
অদ্বৈতের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে টর্চ নিয়ে দেওয়ালের দিকে এগোল। লাইব্রেরির গোপন পথের মুখ খুঁজে পেল। দেওয়ালের হাতল টানতেই পথ খুলে গেল।
ভিতরে সরু সিঁড়ি নীচের দিকে নেমে গেছে।
সে ধীরে ধীরে নামতে লাগল।
প্রথম দরজাটি কাঠের। দরজার ওপরে লেখা—‘শৈশব’।
অদ্বৈত দরজা খুলতেই দেখতে পেল, একটি ছোট্ট ঘর। মেঝেতে খেলনা, দেওয়ালে রঙিন ছবি, জানালার পাশে দোলনা। দোলনার মধ্যে বসে আছে পাঁচ বছরের একটি শিশু।
শিশুটির মুখ অবিকল অদ্বৈতের ছোটবেলার ছবির মতো।
শিশুটি মাথা তুলে বলল, ‘দাদা, তুমি ফিরে এসেছ?’
অদ্বৈত কোনও উত্তর দিল না।
নিতাই পালের নির্দেশ মনে পড়ল—প্রথম দরজাটি খুলবে, তারপর বন্ধ করে দেবে।
সে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
দ্বিতীয় দরজাটি লোহার। তার ওপরে লেখা—‘স্মৃতি’।
অদ্বৈত দরজার সামনে দাঁড়াতেই ভিতর থেকে কান্নার শব্দ এল। তারপর বাবার কণ্ঠস্বর—
‘অদ্বৈত, আমাকে বাঁচা।’
সে দরজায় হাত রাখল।
ভিতর থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর—
‘আমি তোর বাবা। দরজাটা খোল।’
অদ্বৈত চোখ বন্ধ করে পিছিয়ে এল। দ্বিতীয় দরজাটি খুলল না।
এবার সে তৃতীয় দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
দরজাটি সাদা। কোনও হাতল নেই। শুধু মাঝখানে একটি ছোট গোল আয়না।
অদ্বৈত আয়নায় নিজের মুখ দেখল।
তারপর নিতাই পালের নির্দেশ অনুযায়ী নিজের নাম তিনবার বলল।
‘অদ্বৈত।’
‘অদ্বৈত।’
‘অদ্বৈত।’
দরজার ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
‘মিথ্যে।’
অদ্বৈত জমে গেল।
‘তোর নাম অদ্বৈত নয়।’
‘কে তুমি?’
ওপাশ থেকে হাসির শব্দ এল।
‘আমি সেই মানুষ, যার জীবন তুই চুরি করেছিস।’
দরজাটি ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভিতরে একটি বড় ঘর। চারদিকে আয়না। প্রতিটি আয়নায় অদ্বৈতের প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিচ্ছবির মুখের অভিব্যক্তি আলাদা—কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ রাগে দাঁত চেপে আছে।
ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ারে বসে আছে একটি যুবক।
অদ্বৈতের অবিকল মুখ।
একই উচ্চতা, একই চোখ, একই চুল।
শুধু তার চোখের মণি নীল।
যুবকটি উঠে দাঁড়াল।
‘এতদিনে এলি?’
অদ্বৈত পিছিয়ে গেল।
‘তুমি কে?’
যুবকটি মৃদু হেসে বলল, ‘আমি অরিন্দম।’
‘তুমি আমার মতো দেখতে কেন?’
‘কারণ তুই আমার মতো দেখতে।’
‘অসম্ভব!’
অরিন্দম টেবিলের ওপর থেকে একটি পুরোনো জন্মসনদ তুলে ধরল।
‘এটা দেখ।’
অদ্বৈত কাগজটা হাতে নিল।
নাম—অদ্বৈত মুখার্জি।
জন্মতারিখ—একই।
পিতার নাম—অনিরুদ্ধ মুখার্জি।
মাতার নাম—মাধবী মুখার্জি।
অন্য একটি জন্মসনদ।
নাম—অরিন্দম মুখার্জি।
জন্মতারিখ—একই।
পিতার নাম—অনিরুদ্ধ মুখার্জি।
মাতার নাম—মাধবী মুখার্জি।
দুটি জন্মসনদ।
একই বাবা-মা।
একই জন্মতারিখ।
একই মুখ।
অদ্বৈতের মাথা ঘুরতে লাগল।
‘আমরা কি যমজ?’
অরিন্দম বলল, ‘যমজ হলে সবকিছু এত সহজ হত।’
‘তাহলে কী?’
অরিন্দম তার কাছে এগিয়ে এল।
‘আমাদের মধ্যে একজন জন্মেছিল। অন্যজন তৈরি হয়েছিল।’
অদ্বৈত হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।
‘কীভাবে?’
অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই ঘরের সমস্ত আয়না একসঙ্গে ফেটে গেল।
কাচের টুকরো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
অন্ধকারের মধ্যে মাধবীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
‘অদ্বৈত, ওর কথা বিশ্বাস করিস না!’
অরিন্দম চিৎকার করে উঠল—
‘মা, এবার আর আমাকে থামাতে পারবে না!’
দরজাটা প্রচণ্ড শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
অদ্বৈত ঘুরে দেখল, ঘরের একমাত্র দরজার ওপরে নতুন করে একটি বাক্য ফুটে উঠেছে।
‘এই বাড়ি থেকে একজনই বেরোবে।’
তারপর অন্ধকারের ভিতর অরিন্দমের হাত এগিয়ে এল।
‘এবার বল, অদ্বৈত—তুই বাঁচতে চাস, না সত্যিটা জানতে চাস?’
অদ্বৈত তার দিকে তাকিয়ে রইল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে, বহু বছর আগে মৃত বলে ঘোষিত তার মায়ের কণ্ঠস্বর শেষবারের মতো শোনা গেল—
‘তোমাদের দুজনের মধ্যে যে সত্যি, সে যেন কোনও দিন এই বাড়ি থেকে বেরোতে না পারে।’
চলবে…