Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (দ্বিতীয় পর্ব: মৃত মানুষের টিকিট)।

অন্ধকারের মধ্যে অদিতি বুঝতে পারছিল না, তার হাত ধরে থাকা মানুষটি সত্যিই তার বাবা কি না।

স্পর্শটা পরিচিত। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় বাবা ঠিক এভাবেই তার হাত ধরতেন। বিপদ দেখলে আঙুলগুলো আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরতেন। কিন্তু আজকের স্পর্শে অদ্ভুত একটা শীতলতা।

যেন কোনও জীবিত মানুষের হাত নয়, বরফের তৈরি কিছু।

“বাবা?” অদিতি ফিসফিস করে ডাকল।

অন্ধকারের মধ্যে উত্তর এল, “আমি আছি, মিঠি।”

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর?”

“তুমি যেখানে আমাকে খুঁজেছ, আমি সেখানে ছিলাম না।”

“তাহলে কোথায় ছিলে?”

“এই ট্রেনেই।”

অদিতি হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল। কিন্তু মানুষটি তার হাত আরও শক্ত করে ধরল।

“এখনও সময় আছে, মিঠি। আমার সঙ্গে নেমে এসো।”

“কোথায়?”

“বাড়ি।”

“আমাদের বাড়ি তো নেই। মা মারা গেছেন। তুমি বারো বছর ধরে নিখোঁজ।”

কয়েক মুহূর্ত কোনও উত্তর এল না।

তারপর সেই কণ্ঠস্বর বলল, “তোমার মা মারা যাননি।”

অদিতির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“কী বললে?”

“তোমার মা এখনও অপেক্ষা করছেন। তুমি শুধু তাঁকে খুঁজে পাওনি।”

“মা তো তিন বছর আগে মারা গেছেন! আমি নিজে তাঁর শেষকৃত্য করেছি!”

“তুমি যাকে শেষকৃত্য করেছিলে, সে তোমার মা ছিল না।”

অদিতির মাথার ভেতর যেন বিস্ফোরণ হলো।

ঠিক তখনই কামরার সমস্ত আলো জ্বলে উঠল।

সে দেখল, তার সামনে কোনও মানুষ নেই।

তার হাত ধরে আছে প্রবীর ঘোষ।

বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে একটি লাল রঙের টিকিট।

প্রবীর বললেন, “তোমাকে সতর্ক করেছিলাম।”

অদিতি হাত সরিয়ে নিল।

“আপনারা সবাই আমার সঙ্গে কী করছেন? আমার বাবা কোথায়? আমার মা কোথায়? এই ট্রেনটা কী?”

বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন।

“সব প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে পাওয়া যায় না। কখনও কখনও উত্তর পাওয়ার আগে প্রশ্নকারীকে জানতে হয়, সে নিজে কে।”

অদিতি রাগে কাঁপছিল।

“আমাকে ধাঁধা দেবেন না। আমি পুলিশে খবর দেব।”

বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

“আপনার ফোনে নেটওয়ার্ক নেই। এই ট্রেনের বাইরে কোনও পুলিশ আপনাকে শুনতে পাবে না। আর আপনি যদি মনে করেন, ট্রেন থেকে নেমে স্টেশনে চলে যাবেন, তাহলে ভুল করছেন।”

“কেন?”

“কারণ এই ট্রেন এখন আর শিয়ালদহে নেই।”

অদিতি জানালার বাইরে তাকাল।

সত্যিই, বাইরে সেই অচেনা স্টেশন। ভাঙা প্ল্যাটফর্ম, জং ধরা বেঞ্চ, অর্ধেক ভেঙে পড়া সাইনবোর্ড। দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের আলো বারবার জ্বলছে আর নিভছে।

প্ল্যাটফর্মের এক কোণে একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন।

লাল শাড়ি।

খোলা চুল।

অদিতির মা।

মহিলাটি জানালার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন।

“মিঠি!”

এবার অদিতি স্পষ্ট শুনতে পেল।

তার মা ঠিক এইভাবেই তাকে ডাকতেন। অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকার সময়ও এই নামেই ডাকতেন।

অদিতি জানালার কাচে হাত রাখল।

“মা!”

মহিলাটি কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “নেমে আয়, মা। আর দেরি করিস না।”

অদিতি দরজার দিকে ছুটল।

বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক তাকে আটকাতে গেলেন না। শুধু বললেন, “একবার নেমে গেলে আর ফিরে আসতে পারবেন না।”

অদিতি থেমে গেল।

“আপনি আমাকে থামাচ্ছেন না কেন?”

“কারণ কাউকে জোর করে বাঁচিয়ে রাখা যায় না।”

“আপনি কি জানেন, আমার মা কোথায়?”

“জানি।”

“আমার বাবা?”

“তাঁর কথাও জানি।”

“তাহলে বলুন!”

বৃদ্ধ নিজের টুপিটা খুললেন।

তাঁর কপালের বাঁ দিকে একটা পুরোনো ক্ষতচিহ্ন। চোখের নিচে গভীর বলিরেখা। কিন্তু মুখের দিকে ভালো করে তাকাতেই অদিতির মনে হলো, এই মানুষটিকে সে আগে কোথাও দেখেছে।

অনেক আগে।

একটি পুরোনো ছবিতে।

তার বাবার অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবিতে।

সেখানে রেলওয়ের কয়েকজন কর্মচারী একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাঝখানে অনিরুদ্ধ সেন, তাঁর পাশে প্রবীর ঘোষ, আর একেবারে পেছনে এই বৃদ্ধ।

অদিতি ফিসফিস করে বলল, “আপনি কি হরিপদ কাকু?”

বৃদ্ধের চোখে অদ্ভুত একটা আলো ফুটল।

“অবশেষে মনে পড়েছে।”

“আপনি তো পঁচিশ বছর আগে মারা গিয়েছিলেন!”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনি এখানে কী করছেন?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“যে ট্রেনে আমি কাজ করতাম, সেই ট্রেনেই আমার শেষ যাত্রা হয়েছিল। আমার মৃত্যুর আগে একটা ভুল করেছিলাম। সেই ভুলের হিসাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি কোথাও যেতে পারিনি।”

“কী ভুল?”

হরিপদ উত্তর দিলেন না। তিনি পকেট থেকে একটি পুরোনো খাম বের করে অদিতির হাতে দিলেন।

“এটা তোমার বাবার লেখা। তুমি একা পড়বে।”

অদিতি খাম খুলল।

ভেতরে এক পাতার চিঠি।

“মিঠি,

তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার কাছে থাকব না। একটা কথা তোমাকে কখনও বলা হয়নি। তোমার জন্মের রাতে তোমাকে নিয়ে আমরা হাসপাতালে গিয়েছিলাম। তুমি অসুস্থ ছিলে। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন, তোমাকে বাঁচানো কঠিন।

সেই রাতে হাসপাতালের পুরোনো রেকর্ডে তোমার নাম লেখা হয়েছিল মৃতদের তালিকায়।

কিন্তু পরদিন সকালে তুমি জীবিত ছিলে।

কেউ বুঝতে পারেনি, রাতের মধ্যে কী ঘটেছিল।

আমি তোমাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। তোমার মা বলেছিলেন, তোমাকে আর কখনও ওই হাসপাতালের কাছে নিয়ে যাবেন না।

তারপর থেকে আমি প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর রাতে সেই ট্রেনে যেতাম। কারণ ওই রাতেই আমি প্রথম বুঝেছিলাম, তোমার জীবনের সঙ্গে এই ট্রেনের একটা সম্পর্ক আছে।

আমি সত্যিটা খুঁজতে গিয়ে এমন একজনের দেখা পাই, যে নিজেকে তোমার ভবিষ্যৎ বলে পরিচয় দিয়েছিল।

আমি জানি, কথাটা বিশ্বাস করা কঠিন।

কিন্তু মনে রেখো, মিঠি—এই ট্রেনে কেউ নিজের অতীত থেকে পালাতে পারে না।

— বাবা”

চিঠির নিচে একটি তারিখ লেখা।

১৭ অক্টোবর, ১৯৯৭।

অদিতি চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

তার জন্ম ১৯৯৭ সালের ১৮ অক্টোবর।

অর্থাৎ বাবার চিঠিটি লেখা হয়েছিল তার জন্মের ঠিক আগের রাতে।

কিন্তু বাবার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ২০১৪ সালের।

বারো বছর আগে।

তাহলে এত পুরোনো চিঠি এতদিন কোথায় ছিল?

আর বাবা কীভাবে তার জন্মের আগেই তার জীবনের সঙ্গে এই ট্রেনের সম্পর্ক জানতেন?

হরিপদ বললেন, “আপনি যা পড়লেন, সেটা পুরো সত্যি নয়। আপনার বাবা কিছু কথা লিখতে পারেননি।”

“কেন?”

“কারণ তিনি জানতেন, তাঁর লেখা পড়লে আপনি তাঁকে খুঁজতে আসবেন। আর তিনি চাননি আপনি আসুন।”

অদিতি চিঠিটা শক্ত করে ধরে বলল, “আমি এসেছি। এখন আমাকে সব জানতে হবে।”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“তাহলে দ্বিতীয় কামরার শেষ দরজাটা খুলুন।”


দ্বিতীয় কামরার শেষ দরজাটি বাইরে থেকে তালাবন্ধ ছিল। তালার গায়ে মরচে জমেছে। দরজার ওপরে সাদা রঙে লেখা—

কামরা ১৩।

অদিতি এর আগে ট্রেনে এমন কোনও কামরা দেখেনি। প্রথম কামরার পর দ্বিতীয়, তারপর তৃতীয়। কিন্তু কামরা ১৩-এর অবস্থান যেন ট্রেনের শেষ প্রান্তে নয়, মাঝখানে।

হরিপদ একটি চাবি বের করে তালায় লাগালেন।

দরজা খুলতেই অদিতির নাকে একটা পুরোনো হাসপাতালের গন্ধ এল—ফিনাইল, ওষুধ, স্যাঁতসেঁতে কাপড় আর বহুদিন বন্ধ থাকা ঘরের গন্ধ।

ভেতরে সারি সারি খাট।

প্রতিটি খাটের মাথায় একটি করে নামের ফলক।

প্রথম খাটে লেখা—ঋজু মিত্র।

দ্বিতীয় খাটে—প্রবীর ঘোষ।

তৃতীয় খাটে—হরিপদ পাল।

চতুর্থ খাটে—

অদিতি সেন।

অদিতি পিছিয়ে গেল।

“এটা কী?”

হরিপদ বললেন, “এই ট্রেনের যাত্রীরা নিজেদের সঙ্গে শুধু স্মৃতি নিয়ে আসে না। তারা নিয়ে আসে অসমাপ্ত জীবনের হিসাব। এই কামরায় সেই হিসাব রাখা হয়।”

অদিতি নিজের নামের ফলক ছুঁয়ে দেখল। কাঠের ওপর ধুলো জমেছে। তারিখ লেখা আছে—১৮ অক্টোবর, ১৯৯৭।

তার জন্মদিন।

ফলকের নিচে আরও একটি লাইন—

যাত্রার শেষ: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬।

অদিতি যেন পাথর হয়ে গেল।

“এটা অসম্ভব।”

হরিপদ শান্ত গলায় বললেন, “আপনার জন্য আজ রাতেই শেষ ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছে।”

“কে কেটেছে?”

“আপনার বাবা।”

“কেন?”

“কারণ তিনি চান আপনি সত্যিটা জানুন। কিন্তু সত্যিটা জানার পর আপনি কী করবেন, সেটা তিনি জানেন না।”

অদিতি হরিপদের দিকে তাকাল।

“আপনি বলছেন, আমার বাবা আমাকে এখানে ডেকে এনেছেন। আবার বলছেন, তিনি চাননি আমি আসি। এই দুটো কথা একসঙ্গে সত্যি হতে পারে না।”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“মানুষের ইচ্ছা অনেক সময় পরস্পরবিরোধী হয়। আপনার বাবা আপনাকে বাঁচাতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চেয়েছেন, আপনি তাঁর করা ভুলের বিচার করুন।”

“কী ভুল করেছিলেন তিনি?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগে কামরার একেবারে শেষ দিক থেকে একটা শব্দ এল।

টক।

টক।

টক।

কেউ যেন ভেতর থেকে খাটের কাঠে আঘাত করছে।

অদিতি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।

সবচেয়ে শেষ খাটটির ওপর একটি সাদা চাদর ঢাকা।

খাটের মাথায় কোনও নাম নেই।

শুধু একটি কালো দাগ।

অদিতি চাদরটা সরাল।

তার নিজের মুখ।

একটি মেয়ে খাটের ওপর শুয়ে আছে। অদিতির মতোই মুখ, একই চোখ, একই কপাল, একই ঠোঁট। কিন্তু তার গায়ের রং ফ্যাকাশে, ঠোঁট নীলচে, চোখ বন্ধ।

অদিতি চিৎকার করে পিছিয়ে গেল।

“এটা কে?”

হরিপদ ধীরে বললেন, “আপনি।”

“না! এটা আমি নই!”

“আপনার শরীরের মতো দেখতে।”

“আমি বেঁচে আছি!”

“হ্যাঁ। কিন্তু এই ট্রেনের নথিতে আপনার আরেকটি পরিচয় আছে।”

অদিতি মাথা নাড়তে লাগল।

“এটা কোনও খেলা। কেউ আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।”

ঠিক তখনই খাটের ওপর শুয়ে থাকা মেয়েটির চোখ খুলে গেল।

সে উঠে বসল।

অদিতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

“তুমি এত দেরি করলে কেন?”

অদিতি এক পা পিছিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

মেয়েটি বলল, “আমি সেই অদিতি, যে কখনও বড় হয়নি।”

“তুমি কী বলতে চাইছ?”

“তুমি যে জীবনটা বেঁচে আছ, সেটা আমার হওয়ার কথা ছিল।”

অদিতির মাথার ভেতর অসংখ্য দৃশ্য ঝলকে উঠল।

হাসপাতালের সাদা ঘর।

একটি নবজাতক শিশুর কান্না।

মায়ের মুখ।

বাবার কাঁপতে থাকা হাত।

তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার।

মেয়েটি বলল, “তুমি জানো, জন্মের রাতে কী হয়েছিল?”

অদিতি কথা বলতে পারল না।

“তুমি জন্মানোর পর কয়েক মিনিট শ্বাস নাওনি। চিকিৎসকেরা তোমাকে মৃত ঘোষণা করেছিল। তোমার বাবা তোমাকে কোলে নিয়ে কাঁদছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তুমি আবার শ্বাস নিতে শুরু করেছিলে। সবাই ভেবেছিল, অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে।”

“তারপর?”

“তারপর তোমার বাবা হাসপাতালের রেকর্ড বদলে দিয়েছিলেন।”

অদিতি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।

“কেন?”

“কারণ সেই রাতে আরেকটি শিশুও জন্মেছিল। সেই শিশুটি ছিল আমি।”

“তুমি আমার যমজ বোন?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

“আমরা একই মায়ের সন্তান নই। একই সময়ে জন্মানো দুটি শিশু। একজনের জন্মের পর মৃত্যু হয়েছিল বলে ঘোষণা করা হয়, আরেকজনের জীবন শুরু হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালের পুরোনো নথিতে আমাদের পরিচয় বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা বিশ্বাস করতেন, তিনি একটি মৃত শিশুকে জীবিত ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি চেয়েছিলেন, কেউ যেন তাঁর সেই কাজের কথা জানতে না পারে। কিন্তু সেই পরীক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল আরেকটি পরিবার।”

অদিতির চোখে জল এসে গেল।

“আমার বাবা কি আমাকে চুরি করেছিলেন?”

মেয়েটি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি জানি না। কারণ আমি যে স্মৃতিগুলো মনে করতে পারি, সেগুলোও হয়তো আমার নয়।”

তারপর সে হাত বাড়িয়ে দিল।

“তুমি যদি আমার জায়গায় থাকতে, তাহলে কি আমাকে খুঁজতে আসতে?”

অদিতি উত্তর দিতে পারল না।

কামরার বাইরে ট্রেনের ঘণ্টা বেজে উঠল।

হরিপদ তাড়াতাড়ি বললেন, “সময় শেষ হয়ে আসছে। আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

“কী সিদ্ধান্ত?”

“আপনি ট্রেন থেকে নেমে আপনার বাবার কাছে যাবেন, নাকি এখানে থেকে নিজের জন্মের সত্যিটা জানবেন?”

অদিতি মেয়েটির দিকে তাকাল।

“আমি দুটোই করতে চাই।”

মেয়েটি হাসল।

“এই ট্রেনে সবকিছু একসঙ্গে পাওয়া যায় না।”

অদিতি তার হাত ধরতে গেল।

কিন্তু হাত ছোঁয়ার আগেই মেয়েটি ধোঁয়ার মতো মিলিয়ে গেল।

খাটের ওপর পড়ে রইল একটি ছোট্ট সাদা কার্ড।

অদিতি সেটা তুলে নিল।

কার্ডে লেখা—

শিশু পরিচয়: ১৭-এ।

অবস্থা: জীবিত।

অভিভাবক: অনিরুদ্ধ সেন।

কার্ডের পেছনে লাল কালিতে লেখা—

“দ্বিতীয় শিশুটির পরিচয় এখনও গোপন রাখা হয়েছে।”


কামরা ১৩ থেকে বেরিয়ে অদিতি দেখল, ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে।

জানালার বাইরে অন্ধকারের বদলে এবার দেখা যাচ্ছে একটি নদী। নদীর ওপরে পুরোনো সেতু। দূরে মৃদু আলোয় দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট স্টেশন।

স্টেশনের নাম পড়া যাচ্ছে না।

ট্রেনের ভেতরে ঘোষণা হলো—

“পরবর্তী স্টেশন: স্মৃতিপুর। যেসব যাত্রী নিজেদের অতীতের সাক্ষাৎ পেতে চান, তাঁরা দয়া করে প্রস্তুত থাকুন।”

অদিতি হরিপদের দিকে তাকাল।

“স্মৃতিপুর কোথায়?”

“এমন একটা জায়গা, যেখানে আপনার মনে থাকা প্রতিটি স্মৃতি আবার দেখা যায়।”

“সত্যিকারের স্মৃতি?”

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কিছু সত্যি। কিছু মিথ্যে। আর কিছু এমন, যেগুলো সত্যি ছিল কি না, তা কেউ আর প্রমাণ করতে পারবে না।”

“আমি সেখানে যেতে চাই।”

“তাহলে সাবধান। সেখানে আপনি যা দেখবেন, তার সবকিছুকে সত্যি বলে বিশ্বাস করবেন না।”

ট্রেন স্টেশনে ঢুকল।

অদিতি জানালা দিয়ে দেখল, প্ল্যাটফর্মে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করছে। এক বৃদ্ধ তাঁর মৃত স্ত্রীর হাত ধরে আছেন। এক তরুণী বারবার একটা শিশুর নাম ধরে ডাকছে। এক কিশোর স্কুলব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখে জল।

সবাই যেন কোনও অসমাপ্ত মুহূর্তের মধ্যে আটকে আছে।

ট্রেন থামতেই দরজাগুলো খুলে গেল।

অদিতি নামল।

প্ল্যাটফর্মে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তার কানে একটা পরিচিত শব্দ এল।

মায়ের গুনগুন করে গান গাওয়ার শব্দ।

ছোটবেলায় মা তাকে ঘুম পাড়ানোর সময় যে গান গাইতেন, সেই গান।

সে শব্দের দিকে এগিয়ে গেল।

প্ল্যাটফর্মের শেষে একটি ছোট্ট বাড়ি। জানালা খোলা। ভেতরে আলো জ্বলছে।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অদিতি দেখল, তার মা বসে আছেন। কোলে একটি নবজাতক শিশু। পাশে তরুণ অনিরুদ্ধ সেন।

মায়ের মুখে হাসি।

বাবা শিশুটির দিকে তাকিয়ে বলছেন, “মিঠি, আমাদের মেয়েটা একদিন বড় হয়ে অনেক প্রশ্ন করবে।”

মা হেসে বলছেন, “তাহলে সব সত্যি বলে দেবে।”

বাবা মাথা নাড়ছেন।

“সব সত্যি বললে ওকে হারাতে পারি।”

“মিথ্যে বললে?”

বাবা কোনও উত্তর দিচ্ছেন না।

দৃশ্যটা হঠাৎ থেমে গেল।

অদিতি ঘরের ভেতরে ঢুকতে গেল। কিন্তু দরজার সামনে অদৃশ্য একটা বাধা তাকে আটকে দিল।

ভেতরের অনিরুদ্ধ মাথা তুললেন।

সোজা অদিতির দিকে তাকালেন।

“মিঠি, তুমি এসেছ?”

অদিতি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “বাবা, আমাকে সত্যিটা বলো।”

অনিরুদ্ধ শিশুটিকে মায়ের কোলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।

“তুমি যা জানতে চাও, তার উত্তর এই বাড়িতে নেই।”

“তাহলে কোথায়?”

“শেষ কামরায়।”

“শেষ কামরায় কী আছে?”

অনিরুদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“সেখানে আছে সেই মানুষ, যার জন্য এই ট্রেন প্রথমবার চলেছিল।”

“কে সে?”

অনিরুদ্ধ ঠোঁট নাড়লেন।

কিন্তু কোনও শব্দ শোনা গেল না।

তারপর তিনি কাচের জানালার ওপাশে হাত রাখলেন।

অদিতিও হাত রাখল।

এক মুহূর্তের জন্য তাদের হাতের ছাপ এক হয়ে গেল।

তারপর দৃশ্যটি ভেঙে অন্ধকার হয়ে গেল।

অদিতি আবার ট্রেনের কামরায় ফিরে এল।

হরিপদ তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“আপনি কী দেখলেন?”

অদিতি ধীরে বলল, “আমার বাবা আমাকে ভালোবাসতেন। কিন্তু তিনি আমার কাছ থেকে কিছু একটা লুকিয়েছিলেন।”

“হ্যাঁ।”

“আর সেই গোপন সত্যির সঙ্গে আরেকটি শিশুর সম্পর্ক আছে।”

হরিপদ মাথা নাড়লেন।

“ঠিক।”

“শেষ কামরায় কে আছে?”

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগেই ট্রেনের সমস্ত আলো লাল হয়ে উঠল।

দূরে কোথাও ধাতব দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

তারপর এক অচেনা কণ্ঠ ঘোষণা করল—

“সতর্কীকরণ। শেষ কামরার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। যাত্রী অদিতি সেনকে জানানো যাচ্ছে, তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য একজন যাত্রী অপেক্ষা করছেন।”

অদিতি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

“কে অপেক্ষা করছেন?”

হরিপদ এবার চোখ নামিয়ে নিলেন।

“আপনার মা।”

অদিতি থমকে গেল।

“কিন্তু আমি তো তাঁকে একটু আগেই দেখলাম!”

হরিপদ ফিসফিস করে বললেন—

“আপনি যে মহিলাকে দেখেছেন, তিনি আপনার স্মৃতির মা। শেষ কামরায় যিনি আছেন, তিনি আপনার জন্মের আগের সত্যিটা জানেন।”

ট্রেনের শেষ প্রান্ত থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ এগিয়ে আসতে লাগল।

একজন মহিলা।

একটি শিশু।

আর এমন এক নাম, যা অদিতি কখনও শোনেনি।

দরজার ওপাশ থেকে মহিলা বললেন—

“মিঠি, তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও তোমার বাবা কে, তাহলে আমার সঙ্গে এসো।”

অদিতি দরজার সামনে দাঁড়াল।

তারপর মহিলাটি আরও একটি কথা বললেন।

“আর একটা কথা মনে রেখো—যে মানুষটিকে তুমি বাবা বলে ডাকছ, তিনি তোমাকে জন্ম দেননি।”

অদিতির হাত থেকে চিঠিটা মেঝেতে পড়ে গেল।

দূরে ট্রেনের ঘড়িতে আবার ১২টা ১৭ বাজল।

আর এই প্রথম অদিতি বুঝতে পারল—সে যে মানুষটিকে খুঁজতে এসেছে, হয়তো সেই মানুষটির পরিচয়ই তার জীবনের সবচেয়ে বড় মিথ্যে।

চলবে…

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *