রাত তখন ১১টা ৪৭ মিনিট।
শীতের কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছে ছোট্ট রেলস্টেশনটি। প্ল্যাটফর্মের মাথায় ঝুলতে থাকা হলুদ আলোটা বারবার জ্বলে উঠছে, আবার নিভে যাচ্ছে। স্টেশনের ঘড়িতে সময় থমকে আছে রাত ১১টা ৪৭ মিনিটেই।
স্টেশনটির নাম শালবনি রোড।
একসময় এই স্টেশন দিয়ে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করতেন। কিন্তু বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনার পর থেকে রাতের শেষ ট্রেনটি আর কখনও এই স্টেশনে থামে না। অন্তত সরকারি রেলওয়ে রেকর্ডে তেমনটাই লেখা আছে।
কিন্তু প্রতি বছর ১৭ অক্টোবর রাত ১২টার ঠিক আগে, স্টেশনের পুরোনো মাইকে একটি ঘোষণা শোনা যায়।
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে, শেষ ট্রেনটি এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করছে। যাঁদের গন্তব্য শালবনি রোড, তাঁরা প্রস্তুত হোন।”
ঘোষণাটি শোনার পর স্টেশনমাস্টার থেকে শুরু করে এলাকার বৃদ্ধ বাসিন্দারাও দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন।
কারণ তাঁরা জানেন, ওই ট্রেনে যাঁরা ওঠেন, তাঁদের কেউ আর ফিরে আসেন না।
কিন্তু কলকাতা থেকে আসা তরুণ সাংবাদিক অর্ক সেন এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করত না।
একটি জনপ্রিয় সংবাদপোর্টালে কাজ করত সে। ভূতুড়ে স্টেশন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে তার মনে হয়েছিল, এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও অপরাধচক্র অথবা মানুষের তৈরি কোনও রহস্য রয়েছে।
সেই রহস্যের খোঁজেই সে পৌঁছেছিল শালবনি রোড স্টেশনে।
রাত ১১টা ৩০ মিনিটে স্টেশনে নেমে অর্ক দেখতে পেল, গোটা প্ল্যাটফর্মে সে ছাড়া আর মাত্র একজন মানুষ রয়েছে। লোকটি স্টেশনমাস্টারের ঘরের সামনে কাঠের বেঞ্চে বসে ছিলেন। পরনে পুরোনো রেলওয়ে ইউনিফর্ম, মাথায় টুপি, আর হাতে একটি কালো রঙের ডায়েরি।
অর্ক এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কি এখানকার স্টেশনমাস্টার?”
লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
“ছিলাম।”
“মানে?”
“এখন আর কেউ আমাকে স্টেশনমাস্টার বলে না।”
অর্ক হেসে বলল, “আপনার নামটা জানতে পারি?”
“হরিপদ মুখোপাধ্যায়।”
নামটা শুনে অর্কের বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল। এই নামটাই সে পুরোনো সংবাদপত্রে পড়েছিল। বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সময় শালবনি রোড স্টেশনের দায়িত্বে ছিলেন হরিপদ মুখোপাধ্যায়।
কিন্তু দুর্ঘটনার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল।
অর্ক নিজের ফোন বের করে পুরোনো একটি খবর খুলে ধরল।
“আপনি কি এই মানুষটিই?”
হরিপদ ছবিটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“ছবিতে যাকে দেখছ, সে আর বেঁচে নেই।”
অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।
“তাহলে আপনি কে?”
বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না। শুধু ডায়েরিটা অর্কের হাতে দিয়ে বললেন, “রাত বারোটার আগে এখান থেকে চলে যাও। আজ ১৭ অক্টোবর। আজকের রাতটা তোমার জন্য নয়।”
অর্ক ডায়েরিটা খুলল।
প্রথম পাতায় লাল কালিতে লেখা—
‘১৭ অক্টোবর, রাত ১১টা ৪৭ মিনিট। আজ আবার সে ফিরবে। এবার তার সঙ্গে থাকবে সেই মানুষটি, যাকে আমি নিজের হাতে মৃত ঘোষণা করেছিলাম।’
অর্ক মাথা তুলে তাকাতেই দেখল, বেঞ্চটি ফাঁকা।
বৃদ্ধ কোথায় গেলেন, সে বুঝতেই পারল না।
ঠিক তখনই স্টেশনের পুরোনো মাইকে ঘোষণা শুরু হল।
“যাত্রীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে…”
তারপর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা।
“অর্ক সেন, আপনার জন্য একটি বিশেষ ঘোষণা রয়েছে। আপনি যে সত্যের সন্ধানে এসেছেন, সেই সত্য আপনার নিজের বাড়িতেই লুকিয়ে আছে।”
অর্কের হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল।
তার নাম এই স্টেশনের মাইকে কে ঘোষণা করল?
সে তো কাউকে নিজের পরিচয় দেয়নি!
দূরে রেললাইনের উপর একটা আলো দেখা গেল। কুয়াশার ভিতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটি ট্রেন। অথচ ট্রেনের শব্দ নেই, হুইসেল নেই, এমনকি চাকার ঘর্ষণের আওয়াজও নেই।
ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।
তার গায়ে মরচে পড়েছে। জানালার কাচ ভাঙা। দরজার উপরে লেখা রয়েছে—
১৭ অক্টোবর, ২০১৪।
বারো বছর আগের তারিখ!
অর্ক কাঁপা হাতে নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল। বর্তমান বছর ২০২৬। তারিখ ১৭ অক্টোবর।
ট্রেনের দরজা খুলে গেল।
প্রথমে নামল একটি ছোট্ট মেয়ে। বয়স আট কি নয়। সাদা ফ্রক পরা, হাতে লাল রঙের একটি পুতুল। মেয়েটি প্ল্যাটফর্মে নেমেই অর্কের দিকে তাকাল।
“তুমি অর্কদা?”
অর্ক অবাক হয়ে মাথা নাড়ল।
মেয়েটি বলল, “আমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
“তোমার মা কোথায়?”
মেয়েটি ট্রেনের ভিতরে আঙুল দেখাল।
“ওই কামরায়। তবে সাবধান, অর্কদা। মা তোমাকে দেখে খুশি হবেন না।”
অর্ক ট্রেনের ভিতরে পা রাখল।
কামরার প্রতিটি আসন খালি। শুধু একেবারে শেষের সিটে একজন মহিলা বসে আছেন। তাঁর মুখ ঘোমটায় ঢাকা। কোলে একটি পুরোনো ছবি।
অর্ক কাছে যেতেই মহিলা ছবিটি তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনজন মানুষ—একজন যুবক, একজন মহিলা এবং একটি ছোট্ট ছেলে।
যুবকটি অর্কের বাবা।
মহিলাটি তার মা।
আর ছোট্ট ছেলেটি অর্ক নিজেই।
কিন্তু ছবির পিছনে লেখা তারিখটি দেখে অর্কের পৃথিবীটা যেন থেমে গেল।
১৭ অক্টোবর, ২০১৪।
সেই দিনই তো তার বাবা-মায়ের গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল বলে তাকে জানানো হয়েছিল।
মহিলাটি ধীরে ধীরে ঘোমটা সরালেন।
অর্কের মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না।
এই মুখ সে হাজারবার ছবিতে দেখেছে। ছোটবেলায় যার কোলে মাথা রেখে ঘুমোত, যার মৃত্যুর পর থেকে প্রতি বছর নিঃশব্দে কাঁদত—
তিনি তার মা, মধুরিমা সেন।
কিন্তু তাঁর মৃত্যু তো বারো বছর আগেই হয়েছিল!
মধুরিমা ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অর্ক, তোমাকে একটা কথা জানতে হবে। তোমার বাবার দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়নি। আর আমিও মারা যাইনি।”
অর্ক পিছিয়ে গেল।
“এটা কীভাবে সম্ভব? তাহলে এত বছর আপনি কোথায় ছিলেন?”
মধুরিমার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
“কারণ তোমার বাবা এমন একটা সত্য জেনে ফেলেছিলেন, যার জন্য তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই সত্যের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ছিলে তুমি।”
“আমি? কিন্তু আমার তো কিছুই মনে নেই!”
“মনে নেই, কারণ তোমার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। তোমাকে অন্য পরিচয়ে বড় করে তোলা হয়েছিল।”
অর্ক মাথা নাড়ল।
“না, এটা মিথ্যে। আমার বাবা-মায়ের মৃত্যুর কাগজপত্র রয়েছে। পুলিশ তদন্ত করেছিল। সংবাদপত্রেও খবর বেরিয়েছিল।”
মধুরিমা শান্ত গলায় বললেন, “সব কাগজ সত্যি কথা বলে না, অর্ক। কিছু কাগজ তৈরি করা হয় সত্যকে কবর দেওয়ার জন্য।”
ঠিক তখনই ট্রেনের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে মধুরিমার কণ্ঠ শোনা গেল—
“ওরা এসে গেছে।”
“কারা?”
“যারা তোমার বাবাকে মেরেছিল। যারা আমাকে বারো বছর বন্দি করে রেখেছে। তারা জানে, তুমি আজ এখানে এসেছ।”
ট্রেনের বাইরে ভারী বুটের শব্দ।
তারপর দরজায় তিনবার আঘাত।
ঠক। ঠক। ঠক।
একটি পুরুষকণ্ঠ বলল, “অর্ক সেন, দরজা খুলুন। পুলিশ।”
অর্ক দরজার দিকে এগোতেই মধুরিমা তার হাত চেপে ধরলেন।
“না! ওরা পুলিশ নয়।”
“তাহলে কারা?”
মধুরিমা ফিসফিস করে বললেন, “তোমার বাবার হত্যাকারীরা।”
দরজার বাইরে থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।
“অর্ক, আমরা জানি তোমার মা ভিতরে আছেন। তাঁকে আমাদের হাতে তুলে দাও।”
অর্ক মায়ের দিকে তাকাল।
মধুরিমা কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি যদি সত্যিই জানতে চাও তোমার বাবা কে ছিলেন, তাহলে আমার কথা শোনো। তোমার বাবার আসল নাম অরিন্দম সেন নয়।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
“তাহলে বাবার আসল নাম কী?”
মধুরিমা উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার দরজাটি প্রচণ্ড শব্দে খুলে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে অর্কের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
লোকটির মুখ হুবহু তার বাবার মতো।
সেই চোখ, সেই নাক, সেই কপালের কাটা দাগ।
অর্ক কাঁপতে কাঁপতে বলল, “বাবা?”
লোকটি মৃদু হাসল।
“হ্যাঁ, অর্ক। আমি তোমার বাবা।”
তারপর সে মধুরিমার দিকে তাকিয়ে বলল, “অনেক লুকোচুরি হয়েছে। এবার ছেলেকে সত্যিটা বলার সময় এসেছে।”
মধুরিমা চিৎকার করে উঠলেন—
“তুমি অরিন্দম নও! তুমি আমার স্বামীর মুখোশ পরে থাকা সেই মানুষ, যে আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে!”
লোকটির হাসি মিলিয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে অর্কের দিকে এগিয়ে এল।
“অর্ক, তোমার মা তোমাকে মিথ্যে বলছেন। সত্যিটা জানতে চাইলে আমার সঙ্গে এসো।”
ট্রেনের জানালার বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। অথচ ঘড়িতে এখনও রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।
অর্ক বুঝতে পারল, এই ট্রেন সময়ের নিয়ম মেনে চলে না।
এবং সে এমন এক রহস্যের মধ্যে আটকে পড়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার জন্ম, তার বাবা-মা এবং তার নিজের পরিচয়।
ঠিক সেই মুহূর্তে মায়ের হাত থেকে একটি ছোট্ট চিরকুট মেঝেতে পড়ে গেল।
অর্ক সেটি তুলে নিল।
চিরকুটে মাত্র একটি বাক্য লেখা—
‘তোমার বাবা-মায়ের মধ্যে একজনই সত্যিকারের মানুষ। অন্যজনকে বিশ্বাস করলে তুমি কখনও বাড়ি ফিরতে পারবে না।’
অর্ক মুখ তুলে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে দুজন—একজন তার মা, অন্যজন তার বাবার মতো দেখতে মানুষ।
দুজনেই দাবি করছেন, তাঁরাই সত্যি বলছেন।
আর ট্রেনের মাইকে শেষবারের মতো ঘোষণা শোনা গেল—
“শেষ ট্রেনের যাত্রী অর্ক সেনকে জানানো যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আপনার হাতে সময় রয়েছে মাত্র বারো মিনিট।”
তারপর সব আলো নিভে গেল।
প্রথম পর্ব সমাপ্ত।