শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে ছিল শান্তিপুর নামে একটি ছোট্ট জনপদ। সেখানে একসময় সন্ধ্যা নামলেই বিভিন্ন বাড়ি থেকে ভেসে আসত হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি আর সেতারের সুর। গ্রামের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গানবাজনার বিশেষ আয়োজন হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিবেশ বদলে গিয়েছিল। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পড়াশোনা ও চাকরির ব্যস্ততায় পুরোনো সাংস্কৃতিক চর্চা থেকে দূরে সরে গিয়েছিল।
গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় একটি পুরোনো বাড়িতে একা থাকতেন কমলিনী দেবী। একসময় তিনি সেতার বাজাতেন। তাঁর বাবা ছিলেন সংগীতপ্রেমী মানুষ। ছোটবেলা থেকেই মেয়েকে সুরের তালিম দিয়েছিলেন। কমলিনী দেবী বহু বছর নিয়মিত অনুশীলন করেছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজিয়েছেন। তাঁর সেতারের সুর শুনতে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসত।
কিন্তু বিয়ের পরে সংসারের দায়িত্ব, সন্তানদের বড় করা এবং স্বামীর দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে তাঁর সংগীতচর্চা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেমেয়েরা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কমলিনী দেবী আর সেতার হাতে তুলে নেননি।
তাঁর ঘরের এক কোণে কাপড়ে মোড়া সেতারটি পড়ে থাকত। মাঝেমধ্যে তিনি কাপড় সরিয়ে যন্ত্রটির দিকে তাকাতেন, তারপর আবার ঢেকে রাখতেন।
কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, “এখন আর ওইসব করার বয়স নেই।”
কিন্তু কথাটি বলার পর নিজের বুকের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হতো, তা কাউকে বোঝাতে পারতেন না।
সেই গ্রামেই থাকত চৌদ্দ বছরের মেয়ে মৃণালিনী, ডাকনাম মিনি। তার বাবা সাইকেল মেরামতের দোকান চালাতেন, মা বাড়িতে ছোটখাটো সেলাইয়ের কাজ করতেন। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু বাবা-মা মেয়ের পড়াশোনায় কোনো অবহেলা করতেন না।
মিনি পড়াশোনার পাশাপাশি গান শুনতে ভালোবাসত। স্কুলের অনুষ্ঠানে গান গাইত, রেডিওতে শাস্ত্রীয় সংগীত শুনত। কিন্তু সেতারের সুর তার কাছে ছিল একেবারে অন্য রকম। মনে হতো, তারের প্রতিটি কম্পনের মধ্যে যেন একটা গল্প লুকিয়ে আছে।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার সময় সে কমলিনী দেবীর বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। খোলা জানালা দিয়ে ভেসে এল কয়েকটি সেতারের সুর।
মিনি থমকে দাঁড়াল।
সুরটি খুব সংক্ষিপ্ত ছিল। যেন কেউ দীর্ঘদিন পরে যন্ত্রটির তার ছুঁয়ে দেখেছেন। তারপর আবার নীরবতা।
মিনি সাহস করে দরজায় কড়া নাড়ল।
কমলিনী দেবী দরজা খুলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী চাই মা?”
মিনি একটু ইতস্তত করে বলল, “আপনি কি একটু আগে সেতার বাজাচ্ছিলেন?”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে বললেন, “অনেক দিন পরে হাতে নিয়েছিলাম। ভালো করে বাজানো হয়নি।”
“আপনি কি আমাকে সেতার বাজানো শেখাবেন?”
প্রশ্নটি শুনে কমলিনী দেবী যেন কিছুক্ষণের জন্য অতীতে ফিরে গেলেন। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির চোখে তিনি নিজের কৈশোরের কৌতূহল দেখতে পেলেন।
তবু তিনি বললেন, “সেতার শেখা সহজ নয়। নিয়মিত অনুশীলন করতে হয়। শুধু সুর ভালো লাগলেই হবে না।”
মিনি মাথা নেড়ে বলল, “আমি চেষ্টা করব। ভুল করলে আবার শিখব।”
কমলিনী দেবী সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন না। তিনি জানতেন, সেতার শেখার জন্য সময় লাগে। যন্ত্রটির যত্ন নিতে হয়, সুরের সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে হয়, আঙুলের নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে হয়। তাছাড়া মেয়েটির পরিবার কতটা সহযোগিতা করবে, সেটাও তিনি জানতেন না।
তিনি মিনিকে বললেন, “আগে তোর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বল। তাঁদের অনুমতি নিয়ে আসিস।”
সেদিন সন্ধ্যায় মিনি বাড়ি ফিরে সব কথা জানাল। তার বাবা প্রথমে চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
“পড়াশোনার ক্ষতি হবে না তো? সেতার শিখতে গেলে তো অনেক সময় লাগবে।”
মিনি বলল, “আমি পড়াশোনা বন্ধ করব না বাবা। প্রতিদিন অল্প সময় শিখব। আমার খুব ইচ্ছে।”
মায়েরও কিছুটা সংশয় ছিল। নতুন যন্ত্র কেনার সামর্থ্য তাঁদের নেই। সেতার শেখার জন্য আলাদা খরচও হতে পারে।
মিনি সব শুনে বলল, “আমি এখনই সেতার কিনতে চাইছি না। কমলিনী দিদা বলেছেন, আগে তাঁর কাছে শিখতে পারি কি না, সেটা দেখতে।”
শেষ পর্যন্ত বাবা-মা রাজি হলেন।
পরের সপ্তাহ থেকে মিনির নতুন অধ্যায় শুরু হলো।
প্রথম দিন কমলিনী দেবী তাকে সেতারের সামনে বসিয়ে বললেন, “আজ কোনো গান শেখাব না। আগে যন্ত্রটাকে চিনে নে।”
তিনি বোঝালেন, সেতারের তার কীভাবে সাজানো থাকে, কোন অংশে হাত দিতে হয়, কীভাবে যন্ত্রটি সাবধানে রাখতে হয়। মিনি মন দিয়ে সব শুনল।
তারপর কমলিনী দেবী একটি তারে আঙুল ছোঁয়ালেন। ঘরের মধ্যে একটি পরিষ্কার সুর ছড়িয়ে পড়ল।
“এই সুরটাকে মন দিয়ে শোন,” তিনি বললেন। “যন্ত্র বাজানো মানে শুধু আঙুল চালানো নয়। নিজের কানে সুরকে চিনতে শেখাও জরুরি।”
মিনি চেষ্টা করল। প্রথম কয়েক দিন তার আঙুলে ব্যথা হলো। কখনো সুর ঠিকমতো উঠল না, কখনো হাতের চাপ বেশি হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে সে অনুশীলন করতে চাইত, কিন্তু নিজের কাছে যন্ত্র ছিল না। তাই প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে কমলিনী দেবীর বাড়িতে যেত।
একদিন স্কুলের পরীক্ষার জন্য তাকে কয়েক দিন যেতে হলো না। ফিরে এসে দেখল, কমলিনী দেবী আগের চেয়ে অনেক ক্লান্ত। তিনি বললেন, “আজ আর বেশি সময় বসতে পারব না মা।”
মিনি চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনার শরীর খারাপ?”
“বয়স হয়েছে। কখনো কখনো হাত ব্যথা করে। তুই আজ শুধু আগের অনুশীলনগুলো মনে করে বল তো, কোন তারে কীভাবে হাত রাখতিস।”
মিনি যতটুকু শিখেছিল, তা দেখানোর চেষ্টা করল। কয়েকটি ভুল হলো, কিন্তু কমলিনী দেবী তাকে ধৈর্য ধরে সংশোধন করলেন।
কিছু দিন পরে মিনি বুঝতে পারল, বৃদ্ধার কাছে শেখার বিষয় শুধু সংগীত নয়। কীভাবে মনোযোগ ধরে রাখতে হয়, কীভাবে ভুলের জন্য নিজেকে ঘৃণা না করে ভুল সংশোধন করতে হয়, কীভাবে প্রতিদিনের সামান্য অনুশীলন একদিন বড় দক্ষতা তৈরি করে—এসবও সে শিখছিল।
এদিকে স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ঘোষণা হলো। মিনির বন্ধুরা তাকে গান গাইতে বলল। কিন্তু এবার সে সেতারের সুর পরিবেশন করতে চাইল।
বন্ধুরা শুনে অবাক হয়ে বলল, “তুই তো এখনও শিখছিস! এত তাড়াতাড়ি মঞ্চে উঠবি?”
কথাটি শুনে মিনির মনে সংশয় তৈরি হলো। বাড়ি ফিরে সে কমলিনী দেবীকে জানাল।
বৃদ্ধা বললেন, “মঞ্চে ওঠার আগে প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু নিখুঁত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে অনেক সময় প্রথম পদক্ষেপটাই নেওয়া হয় না। তুই কতটা শিখেছিস, সেটা বুঝে সহজ একটি সুর বেছে নে। নিজের সামর্থ্যের বাইরে কিছু করার দরকার নেই।”
তাঁরা দুজনে মিলে একটি ছোট, সহজ সুর নির্বাচন করলেন। প্রতিদিন অনুশীলন চলতে লাগল।
কিন্তু অনুষ্ঠানের ঠিক এক সপ্তাহ আগে সমস্যা দেখা দিল। কমলিনী দেবীর সেতারের একটি তার ছিঁড়ে গেল। তিনি যন্ত্রটি পরীক্ষা করে বুঝলেন, কয়েকটি তার পুরোনো হয়ে গেছে। সবকিছু ঠিক করতে খরচ হবে।
মিনি মন খারাপ করে বলল, “তাহলে কি আর অনুষ্ঠান করা হবে না?”
কমলিনী দেবী বললেন, “যন্ত্রের যত্ন নেওয়া শেখারই অংশ। তবে আগে দেখি, কী কী মেরামত করা জরুরি।”
তিনি গ্রামের এক পরিচিত বাদ্যযন্ত্র মেরামতকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। যন্ত্রটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় মেরামত করা হলো। মিনি সেই কাজ মন দিয়ে দেখল, কীভাবে যন্ত্রের যত্ন নিতে হয় সে সম্পর্কে আরও কিছু শিখল।
অবশেষে অনুষ্ঠানের দিন এল।
স্কুলের ছোট মঞ্চে একের পর এক পরিবেশনা চলছিল। মিনির নাম ঘোষণার পর সে ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠল। সামনে শিক্ষক, অভিভাবক ও সহপাঠীরা বসে আছে। তার হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিল।
দর্শকদের মধ্যে প্রথম সারিতে বসেছিলেন কমলিনী দেবী।
তিনি চোখের ইশারায় মিনিকে সাহস দিলেন।
মিনি সেতারটি ঠিক করে বসাল। প্রথম তারে আঙুল রাখল। একটি সুর উঠল, তারপর আরেকটি। শুরুতে তার আঙুল সামান্য কেঁপে উঠেছিল। একটি জায়গায় সুরও একটু অস্পষ্ট হলো। কিন্তু সে থেমে গেল না।
ধীরে ধীরে সুরের প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে এল। হলঘরের কথাবার্তা থেমে গেল। সবাই মন দিয়ে শুনতে লাগল।
পরিবেশনা শেষ হলে হাততালি উঠল।
মিনি কোনো বড় পুরস্কার পেল না। কিন্তু মঞ্চ থেকে নামার পর তার মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের ভিতরের একটি বন্ধ দরজা খুলে ফেলেছে।
কমলিনী দেবী তার কাছে এসে বললেন, “আজ তুই শুধু সেতার বাজাসনি। তুই নিজের শেখার ওপর বিশ্বাস রাখতে শিখেছিস।”
মিনি বলল, “আপনি না শেখালে আমি পারতাম না।”
বৃদ্ধা মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “আমি তোকে পথ দেখিয়েছি। কিন্তু প্রতিদিনের অনুশীলন তুই নিজেই করেছিস।”
সেই অনুষ্ঠানের পর স্কুলের কয়েকজন ছাত্রছাত্রী কমলিনী দেবীর কাছে সংগীত শিখতে আগ্রহ প্রকাশ করল। কেউ সেতার, কেউ অন্য বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে জানতে চাইল। কমলিনী দেবী প্রথমে দ্বিধায় ছিলেন। এতজনকে শেখানোর মতো শক্তি তাঁর আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল।
কিন্তু মিনির অনুরোধে তিনি সপ্তাহে একদিন ছোট্ট একটি সংগীতচর্চার আসর শুরু করলেন। সেখানে যাঁদের নিজের যন্ত্র ছিল না, তাঁরা পালা করে অনুশীলনের সুযোগ পেতেন। শিক্ষার্থীরা যন্ত্র পরিষ্কার রাখা, নির্দিষ্ট সময়ে আসা এবং অন্যের অনুশীলনের সময় নীরব থাকার নিয়ম মেনে চলত।
কয়েক মাস পরে সেই আসরটি গ্রামের সাংস্কৃতিক জীবনে নতুন প্রাণ এনে দিল। কেউ সংগীতকে পেশা হিসেবে নিল না, তবু তারা সুরের প্রতি ভালোবাসা অর্জন করল। গ্রামের অনুষ্ঠানে আবার বাদ্যযন্ত্রের সুর শোনা যেতে লাগল।
একদিন কমলিনী দেবী আলমারি খুলে তাঁর পুরোনো নোটবই বের করলেন। পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে, তবু তাতে লেখা সুরের চিহ্নগুলো স্পষ্ট। তিনি মিনিকে বললেন, “এই নোটগুলো আমি বহু বছর আগে লিখেছিলাম। একসময় ভেবেছিলাম, আর কারও কাজে লাগবে না।”
মিনি বলল, “এগুলো তো আমাদের জন্য খুব মূল্যবান।”
বৃদ্ধা নোটবইটি তার হাতে দিলেন না; বরং দুজনে বসে একসঙ্গে সুরগুলো পরিষ্কার করে লিখে রাখলেন, যাতে অন্য শিক্ষার্থীরাও বুঝতে পারে।
কমলিনী দেবী বুঝলেন, তাঁর জীবনের পুরোনো অধ্যায়টি হারিয়ে যায়নি। সময়ের আড়ালে অপেক্ষা করছিল নতুনভাবে ফিরে আসার জন্য।
মিনিও বুঝেছিল, কোনো স্বপ্ন দেরিতে শুরু হলেই তা অর্থহীন হয়ে যায় না। আবার কারও কাছে যে জ্ঞান একসময় সাধারণ বলে মনে হয়েছিল, অন্য কারও কাছে সেটিই হতে পারে নতুন পৃথিবীর দরজা।
সন্ধ্যায় সংগীতচর্চার আসর শেষ হলে কমলিনী দেবী সেতারটি কাপড়ে মুড়ে রাখতেন। কিন্তু এবার আর সেটিকে আলমারির অন্ধকারে লুকিয়ে রাখতেন না। যন্ত্রটি থাকত তাঁর ঘরের এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে সহজেই হাতে নেওয়া যায়।
কারণ তিনি জেনে গিয়েছিলেন, স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু স্মৃতির মধ্যে রেখে দিলে চলে না; তাকে আবার সময় দিতে হয়, যত্ন করতে হয়, অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়।
গল্পের শিক্ষা: জীবনের কোনো পর্যায়েই শেখা বা নতুন করে শুরু করার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। নিজের অভিজ্ঞতা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিলে তা নতুন প্রজন্মের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আর নিয়মিত অনুশীলন, ধৈর্য ও পারস্পরিক সহযোগিতা ছোট্ট একটি স্বপ্নকেও অনেক মানুষের আনন্দের উৎস করে তুলতে পারে।