Categories
গল্প বিবিধ

গল্প : শেষ বাঁশির সুরে বদলে গেল একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ।

বিকেলের আকাশে তখন লালচে রোদ। গ্রামের মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কদমগাছটির পাতায় পাতায় হাওয়া লাগছিল। মাঠের মাঝখানে কয়েকজন কিশোর ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি করছিল। তাদের চিৎকার, হাসি আর জুতোর শব্দে চারপাশ মুখর হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু মাঠের উত্তর কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখে কোনো হাসি ছিল না।

তাঁর নাম শশাঙ্ক রায়। একসময় তিনি ছিলেন জেলার পরিচিত ক্রীড়া প্রশিক্ষক। তাঁর হাত ধরে বহু ছাত্র বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। কেউ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছে, কেউ শিক্ষক হয়েছে, কেউ আবার নিজের এলাকায় খেলাধুলার প্রশিক্ষণ দেয়। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শশাঙ্কবাবু নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাঁর বাড়িটি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। নিজের ছেলেমেয়ে কর্মসূত্রে অন্য শহরে থাকে। তাঁরা নিয়মিত ফোন করলেও শশাঙ্কবাবুর মনে হতো, জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়গুলো বুঝি পেছনে ফেলে এসেছেন।

একসময় যে বাঁশি বাজিয়ে তিনি মাঠের ছেলেদের অনুশীলন শুরু করতেন, সেটি এখন তাঁর আলমারির ড্রয়ারে পড়ে ছিল।

গ্রামের মানুষ তাঁকে সম্মান করত। কিন্তু কেউই বুঝতে পারত না, তাঁর ভেতরে জমে থাকা শূন্যতাটা কতটা গভীর।

সেই গ্রামেই থাকত সতেরো বছরের অর্ক। পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো হলেও তার মন পড়ে থাকত মাঠে। ফুটবল খেলতে সে খুব ভালোবাসত। কিন্তু বাড়ির আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বাবা দিনমজুর, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন। নতুন জুতো কেনা, ভালো বল কেনা কিংবা দূরের মাঠে খেলতে যাওয়ার খরচ জোগানো তাদের পক্ষে কঠিন ছিল।

অর্কের স্বপ্ন ছিল একদিন ভালো ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার। কিন্তু তার বন্ধুরা প্রায়ই বলত, “এসব স্বপ্ন দেখে লাভ কী? আমাদের গ্রাম থেকে কেউ কি কখনো বড় খেলোয়াড় হয়েছে?”

অর্ক কথার উত্তর দিত না। তবু কথাগুলো তার মনে বিঁধে থাকত।

একদিন বিকেলে সে মাঠে অনুশীলন করছিল। হঠাৎ বলটি গড়িয়ে গিয়ে শশাঙ্কবাবুর পায়ের কাছে থামল। অর্ক দৌড়ে এসে বলটি তুলতে গিয়ে দেখল, বৃদ্ধ মানুষটি বলের দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছেন।

শশাঙ্কবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “প্রতিদিন খেলিস?”

অর্ক বলল, “হ্যাঁ। তবে আমাদের কেউ শেখায় না। নিজেরাই খেলি।”

“কী শিখতে চাস?”

প্রশ্নটি শুনে অর্ক একটু অবাক হলো। তারপর বলল, “আমি ভালো খেলোয়াড় হতে চাই। কিন্তু কীভাবে শুরু করব, বুঝতে পারি না।”

শশাঙ্কবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “কাল বিকেলে এই সময় মাঠে আসবি। একটা বল নিয়ে আসবি, আর সঙ্গে আনবি খেলার ইচ্ছেটা।”

অর্কের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

পরদিন সে সময়ের আগেই মাঠে পৌঁছে গেল। তার সঙ্গে আরও চারজন বন্ধু এল। শশাঙ্কবাবু পুরোনো বাঁশিটি নিয়ে মাঠে এলেন। বহুদিন পরে বাঁশিটি ঠোঁটে তুলতেই একটি তীক্ষ্ণ শব্দ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল।

ছেলেরা হাসিমুখে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল।

প্রথম দিন শশাঙ্কবাবু তাদের কঠিন কোনো কৌশল শেখালেন না। তিনি বোঝালেন, কীভাবে শরীর গরম করতে হয়, কীভাবে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হয়, কীভাবে দৌড়ের সময় ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। তিনি আরও বললেন, খেলোয়াড় হওয়ার আগে নিয়মিত অনুশীলনকারী হতে হবে।

একজন ছেলে বিরক্ত হয়ে বলল, “এত সহজ জিনিস শিখে কী হবে? আমাদের তো গোল করতে হবে!”

শশাঙ্কবাবু মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, “যে খেলোয়াড় নিজের শরীর আর বলকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে গোল করার সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারবে না।”

ধীরে ধীরে ছেলেরা বুঝতে পারল, খেলার পেছনে কতটা অনুশীলন লুকিয়ে থাকে।

এরপর থেকে প্রতিদিন বিকেলে মাঠে অনুশীলন শুরু হলো। শশাঙ্কবাবু কখনো তাদের সময়মতো আসতে শেখাতেন, কখনো দলগতভাবে খেলতে। কেউ ভুল করলে তিনি বকাঝকা না করে ভুলের কারণ বুঝিয়ে দিতেন।

কিন্তু সবকিছু সহজ ছিল না।

অর্ক দ্রুত শিখছিল। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সে দলের অন্যতম ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠল। তার বন্ধু রাহুল অবশ্য বারবার ভুল করছিল। বল নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না, পাস দিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হাতে বল তুলে দিত। একদিন অনুশীলনের শেষে রাহুল রাগ করে বলল, “আমার দ্বারা হবে না। আমি আর আসব না।”

অর্ক বলল, “এভাবে ছেড়ে দিলে শিখবি কী করে?”

রাহুল বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, “তোর মতো সবার ক্ষমতা হয় না!”

কথাটি শুনে অর্কও চুপ করে গেল।

সেদিন বাড়ি ফেরার পথে শশাঙ্কবাবু অর্ককে পাশে ডেকে বললেন, “মনে রাখিস, দলের ভালো খেলোয়াড় হওয়া আর ভালো সতীর্থ হওয়া এক জিনিস নয়। তুই যদি নিজের উন্নতি নিয়েই শুধু ভাবিস, তাহলে দলের অর্ধেক কাজই অসম্পূর্ণ থাকবে।”

অর্ক কথাটির অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না। কিন্তু পরদিন সে রাহুলের বাড়িতে গেল। তাকে আবার মাঠে আসতে বলল। এরপর অনুশীলনের সময় নিজের কাজ শেষ করে রাহুলের সঙ্গে অতিরিক্ত কিছুক্ষণ পাস দেওয়ার অনুশীলন করল।

রাহুল ধীরে ধীরে উন্নতি করতে লাগল। দলের অন্যরাও একে অপরকে সাহায্য করতে শুরু করল।

একদিন শশাঙ্কবাবু জানালেন, পাশের ব্লকে একটি আন্তঃগ্রাম ফুটবল প্রতিযোগিতা হবে। বিজয়ী দল পরবর্তী পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাবে। ছেলেদের চোখে তখন নতুন স্বপ্ন।

কিন্তু সমস্যা হলো, তাদের দলের কাছে উপযুক্ত জার্সি ছিল না। ফুটবলটিও পুরোনো। যাতায়াতের খরচ জোগাড় করাও কঠিন ছিল।

অর্ক প্রস্তাব দিল, গ্রামের কয়েকজনের কাছে সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। প্রথমে সে বাবার সঙ্গে কথা বলল। বাবা বললেন, “আমাদের সামর্থ্য কম রে। তবু যা পারি, দেব।”

তারপর দলের ছেলেরা নিজেদের পাড়ায় গিয়ে মানুষের কাছে সাহায্যের কথা জানাল। কেউ সামান্য টাকা দিলেন, কেউ পুরোনো কিন্তু ভালো অবস্থার জার্সি দিলেন, কেউ আবার তাদের যাতায়াতের জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করে দিলেন।

শশাঙ্কবাবু একটি খাতায় সমস্ত সাহায্যের হিসাব লিখে রাখলেন। কে কত দিলেন, কী খরচ হলো, কত টাকা বাকি রইল—সবকিছু পরিষ্কারভাবে নথিভুক্ত করা হলো। প্রতিযোগিতা শেষে হিসাব গ্রামের মানুষের সামনে জানানো হবে বলেও তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন।

এই উদ্যোগ দেখে গ্রামের মানুষও ছেলেদের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠলেন।

প্রতিযোগিতার দিন মাঠে পৌঁছে অর্কদের বুক ধড়ফড় করছিল। অন্য দলের খেলোয়াড়দের জার্সি নতুন, বুট চকচকে, সঙ্গে প্রশিক্ষক ও সহকারী। নিজেদের দিকে তাকিয়ে রাহুল ফিসফিস করে বলল, “আমরা কি সত্যিই পারব?”

শশাঙ্কবাবু ছেলেদের কাছে ডেকে বললেন, “ওদের কাছে ভালো সরঞ্জাম আছে, অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। কিন্তু মাঠে নামার পর তোমাদের কাজ হলো নিজেদের সেরাটা দেওয়া। অন্যের জার্সি দেখে নিজের শক্তি ভুলে যেও না।”

খেলা শুরু হলো।

প্রথমার্ধে অর্কদের দল একটি গোল খেল। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা দ্রুত পাস দিচ্ছিল, আর অর্কদের রক্ষণভাগ বারবার ভুল করছিল। বিরতির সময় কয়েকজন হতাশ হয়ে পড়ল।

শশাঙ্কবাবু বললেন, “ভুল কোথায় হচ্ছে, সেটা দেখো। আতঙ্কিত হয়ে দৌড়োবে না। নিজেদের মধ্যে কথা বলো, একে অপরকে সাহায্য করো।”

দ্বিতীয়ার্ধে দলটি নতুনভাবে খেলতে শুরু করল। রাহুল এবার বল পেয়ে তাড়াহুড়ো না করে অর্কের দিকে পাস দিল। অর্ক বলটি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে গোল করল।

মাঠে আনন্দের চিৎকার উঠল।

খেলার শেষ কয়েক মিনিটে আবার একটি সুযোগ এল। অর্ক নিজে গোল করার অবস্থানে ছিল। কিন্তু তার পাশেই রাহুল আরও ভালো অবস্থানে দাঁড়িয়েছিল। অর্ক বলটি তাকে পাস দিল।

রাহুল গোল করল।

খেলা শেষ হলো সমতায়। পরে টাইব্রেকারে অর্কদের দল পরাজিত হলো। তারা প্রতিযোগিতার পরবর্তী পর্যায়ে যেতে পারল না।

ফেরার পথে ছেলেরা চুপচাপ ছিল। রাহুল বলল, “এত অনুশীলন করেও হারলাম।”

শশাঙ্কবাবু বললেন, “হারাটা কষ্টের, কিন্তু আজ তোমরা এমন কিছু শিখেছ, যা শুধু জিতলে হয়তো শিখতে না। তোমরা চাপের মধ্যে একে অপরকে সাহায্য করেছ, ভুলের পরে আবার চেষ্টা করেছ। এই শিক্ষা সঙ্গে নিয়ে ফিরবে।”

অর্কের চোখে জল ছিল। সে বলল, “স্যার, আপনি কি আমাদের আবার অনুশীলন করাবেন?”

শশাঙ্কবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “যত দিন তোমরা শিখতে চাইবে, আমি তত দিন তোমাদের পাশে থাকার চেষ্টা করব।”

কয়েক সপ্তাহ পরে গ্রামের মাঠে একটি ছোট অনুষ্ঠান হলো। ছেলেরা নিজেদের উদ্যোগে সেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। গ্রামের মানুষকে ডেকে তারা প্রতিযোগিতার খরচের হিসাব জানাল। অবশিষ্ট টাকা দলের পরবর্তী অনুশীলনের জন্য রাখা হলো।

অনুষ্ঠানের শেষে অর্ক একটি ছোট বাক্স শশাঙ্কবাবুর হাতে তুলে দিল। বাক্সের মধ্যে ছিল নতুন একটি বাঁশি।

অর্ক বলল, “স্যার, আপনার পুরোনো বাঁশিটা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। কিন্তু এটা আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য।”

শশাঙ্কবাবুর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি বাঁশিটি হাতে নিয়ে বললেন, “আমি ভেবেছিলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো পেছনে পড়ে আছে। তোমরা আমাকে আবার বুঝিয়েছ, মানুষের জীবনে কাজ করার সুযোগ কখনো শুধু বয়সের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না।”

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো পুরোনো বাঁশিটি বাজালেন। ছেলেরা তাঁর চারপাশে জড়ো হলো। কিন্তু সেই বাঁশির সুরে বিদায়ের দুঃখ ছিল না; ছিল নতুন করে শুরু করার আহ্বান।

পরের বছর অর্কদের দল আবার প্রতিযোগিতায় অংশ নিল। তারা সেবারও চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি, কিন্তু আগের চেয়ে অনেক ভালো খেলেছিল। রাহুল দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিল। আর শশাঙ্কবাবু গ্রামের আরও কয়েকজন ছোট ছেলেমেয়েকে অনুশীলনে যুক্ত করলেন।

মাঠটি ধীরে ধীরে গ্রামের তরুণদের মিলনস্থল হয়ে উঠল। কেউ খেলতে আসত, কেউ খেলা দেখতে, কেউ আবার শুধু বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে। শশাঙ্কবাবু তাদের শেখাতেন—জয় যেমন আনন্দ দেয়, তেমনই পরাজয়ও মানুষকে শেখার সুযোগ দেয়।

একদিন অর্ক তাঁকে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, আপনি কি মনে করেন, আমি একদিন বড় খেলোয়াড় হতে পারব?”

শশাঙ্কবাবু বললেন, “ভবিষ্যৎ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কিন্তু তুই যদি নিয়মিত অনুশীলন করিস, পড়াশোনার দায়িত্ব পালন করিস, নিজের শরীরের যত্ন নিস আর ভুল থেকে শিখিস, তাহলে তোর সামনে অনেক দরজা খুলতে পারে।”

অর্ক মাথা নাড়ল। সে বুঝেছিল, স্বপ্ন পূরণ করার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না; কিন্তু স্বপ্নের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার দায়িত্ব নিজের।

সেদিন বাড়ি ফেরার সময় শশাঙ্কবাবু মাঠের দিকে ফিরে তাকালেন। সূর্য ডুবে যাচ্ছিল, তবু ছেলেরা অনুশীলন শেষ করে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিল। তাঁর মনে হলো, জীবনের এতগুলো বছর ধরে তিনি শুধু খেলোয়াড় তৈরি করেননি; এখন তিনি মানুষের মধ্যে অধ্যবসায়, বন্ধুত্ব ও দায়িত্ববোধের বীজও বুনছেন।

আর সেই কাজের জন্য কোনো পদক দরকার হয় না। দরকার শুধু মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা।

গল্পের শিক্ষা: জীবনের মূল্য শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য বা জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে লাগানো, ব্যর্থতার পরেও চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং দলগতভাবে একে অপরকে সাহায্য করা—এই গুণগুলোই মানুষকে প্রকৃত অর্থে সফল করে তোলে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *