
সুব্রত বাবার ঘরটা পরিষ্কার করছিল।
বাবা মারা যাওয়ার পর প্রায় তিন মাস হয়ে গেছে। এতদিন ঘরটা খোলেনি। দরজা খুললেই পুরনো কাঠ, বই আর চন্দনের গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি করত।
সুব্রত খুব বেশি কথা বলত না।
বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কও শেষ কয়েক বছর ভালো ছিল না।
বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। নিয়মকানুনের ব্যাপারে কঠোর। আর সুব্রত ছোটবেলা থেকেই একটু স্বাধীনচেতা।
কলেজে পড়ার সময় একদিন বাবার সঙ্গে প্রচণ্ড ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে।
তারপর শহরে চাকরি।
বিয়ে।
সংসার।
বছরে দু-একবার বাড়ি আসা।
বাবার সঙ্গে কথা হতো, কিন্তু আগের মতো নয়।
বাবা কখনও বলেননি, “আমাকে দেখতে এসো।”
সুব্রতও কখনও বলেনি, “বাবা, তোমাকে মিস করি।”
এই না-বলা কথাগুলোই হয়তো তাদের মধ্যে একটা দেওয়াল তৈরি করেছিল।
ঘর পরিষ্কার করতে করতে সুব্রতের হাতে পড়ল একটা পুরনো কাঠের বাক্স।
বাক্সটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটি হাতঘড়ি।
ঘড়িটা বহু পুরনো।
কালো চামড়ার বেল্ট।
কাঁচে ছোট্ট একটি আঁচড়।
সুব্রত ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখল।
কাঁটা থেমে আছে—
রাত ৮টা ১৭ মিনিটে।
সে অবাক হলো।
এই সময়টা কি কোনও বিশেষ সময়?
ঘড়ির পেছনে ছোট্ট করে খোদাই করা—
“S-এর জন্য।”
সুব্রত ভাবল, S মানে হয়তো তার নাম—সুব্রত।
কিন্তু বাবা তাকে এই ঘড়ি কখনও দেননি।
পরদিন সে পাশের বাড়ির পুরনো বন্ধু অশোককাকুর কাছে গেল।
ঘড়িটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাকু, এটা বাবার ছিল?”
অশোককাকু কিছুক্ষণ ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
“তুই এটা কোথায় পেলি?”
“বাবার বাক্সে।”
অশোককাকু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“তোর বাবার একটা অভ্যাস ছিল।”
“কী?”
“প্রতি বছর তোর জন্মদিনের রাতে এই ঘড়িটা বের করে দেখতেন।”
সুব্রত অবাক।
“কেন?”
অশোককাকু বললেন,
“ওটা তোর বাবার ঘড়ি ছিল না।”
“তাহলে?”
“তোর জন্মের দিন হাসপাতালের এক নার্স তাঁকে ঘড়িটা দিয়েছিলেন।”
সুব্রত কিছু বুঝতে পারল না।
“কেন?”
অশোককাকু এবার ধীরে ধীরে বললেন,
“তুই জন্মানোর সময় তোর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তাররা বলেছিলেন, দু’জনের মধ্যে একজনকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।”
সুব্রত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
“শেষ পর্যন্ত তোর মা বাঁচেননি।”
তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল।
“আর তুই?”
অশোককাকু বললেন,
“তুই বেঁচে গিয়েছিলি।”
সুব্রত ঘড়িটার দিকে তাকাল।
“তাহলে ৮টা ১৭ মিনিট…?”
অশোককাকু বললেন,
“তুই জন্মেছিলি ওই সময়।”
সুব্রত কিছু বলতে পারল না।
বাড়ি ফিরে সে আবার বাবার ঘরে গেল।
বাক্সটা খুলে ঘড়িটার নিচে রাখা পুরনো কাগজগুলো বের করল।
একটি ডায়েরি।
প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা—
“আজ আমার ছেলে পৃথিবীতে এল। আর একই দিনে আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারালাম।”
সুব্রতের বুকটা ভার হয়ে গেল।
সে পড়তে লাগল।
“আজ ডাক্তার বললেন, ওকে বাঁচাতে হলে ওর মাকে বাঁচানো যাবে না।
আমি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব?
একজন আমার স্ত্রী।
আর একজন আমার সন্তান।
শেষ পর্যন্ত ডাক্তাররা যা করার করলেন।
সুমিতা চলে গেল।
আমার ছেলে রয়ে গেল।
আমি জানি না, কোনও বাবা কীভাবে এই শূন্যতা নিয়ে বাঁচে।”
পরের পাতায় লেখা—
“আজ ও প্রথমবার আমাকে বাবা বলেছে।
আমি ওকে কিছুতেই বুঝতে দেব না, ওর জন্মের সঙ্গে তার মায়ের মৃত্যুর কোনও সম্পর্ক আছে।
ও যেন কোনওদিন নিজেকে দোষী না ভাবে।”
সুব্রতের চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
আরও কয়েক পাতা পরে—
“আজ সুব্রত আমার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল।
ও হয়তো মনে করছে আমি ওকে বুঝি না।
আসলে আমি ওকে এতটাই ভালোবাসি যে, নিজের কষ্টটাও ওকে বলতে পারি না।”
সুব্রত ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল।
এত বছর সে ভেবেছে, বাবা তাকে ভালোবাসতেন না।
অথচ বাবা নিজের সমস্ত কষ্ট লুকিয়ে তাকে বড় করেছেন।
ঘড়িটা হাতে নিয়ে সে বাবার চেয়ারে বসে পড়ল।
রাত ৮টা ১৭ মিনিট।
সুব্রত মোবাইলের দিকে তাকাল।
হঠাৎ মনে হল, ঘড়িটা ঠিক করার দরকার নেই।
এটা যেমন থেমে আছে, তেমনই থাকুক।
কারণ ওই মুহূর্তটাই ছিল তার বাবার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ এবং সবচেয়ে বড় দুঃখের মুহূর্ত।
পরদিন সুব্রত ঘড়িটা একজন ঘড়িওয়ালার কাছে নিয়ে গেল।
লোকটি বলল,
“ঘড়িটা ঠিক করে দেব?”
সুব্রত মাথা নাড়ল।
“না।”
“কেন?”
সুব্রত মৃদু হেসে বলল,
“এটা থেমেই থাকুক।”
তারপর ঘড়িটা সে নিজের হাতে পরে নিল।
বাড়ি ফেরার সময় তার মনে হচ্ছিল—
বাবার সঙ্গে শেষবার যখন কথা হয়েছিল, তখন সে শুধু বলেছিল,
“তুমি কিছুই বোঝো না।”
আজ সে বুঝতে পারছে—
বাবা হয়তো সবকিছুই বুঝতেন।
শুধু নিজের ভালোবাসাটা কখনও মুখে বলতে পারেননি।
সুব্রত আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
“বাবা, আমিও তোমাকে ভালোবাসতাম।”
কথাটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
কিন্তু তার কবজিতে তখনও ঘড়িটা চলছে না।
কাঁটা থেমে আছে—
৮টা ১৭ মিনিটে।
আর সেই থেমে থাকা সময়ের মধ্যেই সুব্রত খুঁজে পেল তার বাবার সারাজীবনের ভালোবাসা।
সমাপ্ত।