Categories
গল্প

তাঁতের ঘরে ভোরের শব্দ।

নবগ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল একটি ছোট্ট তাঁতপাড়া। ভোর হলেই সেখানে এক অদ্ভুত শব্দ শোনা যেত—

খটাং… খটাং… খটাং…

শব্দটা আসত নীলিমা দেবীর ঘর থেকে।

বয়স ষাটের কাছাকাছি। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি তাঁত বুনছেন।

একসময় তাঁর তৈরি শাড়ি দূরের শহরেও যেত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাতে বোনা কাপড়ের বাজার ছোট হতে লাগল। বড় কারখানার তৈরি সস্তা কাপড়ে মানুষ অভ্যস্ত হয়ে গেল।

নীলিমার স্বামী বহু বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। একমাত্র ছেলে সৌরভ শহরে ছোট চাকরি করত।

সৌরভ প্রায়ই মাকে বলত,

—“মা, তাঁতটা বন্ধ করে দাও। এত কষ্ট করে আর কী লাভ?”

নীলিমা হাসতেন।

—“কষ্ট তো সব কাজেই আছে।”

—“কিন্তু টাকা?”

—“সবকিছু কি টাকায় মাপা যায়?”

সৌরভ উত্তর দিত না।

একদিন দুপুরে সে বাড়ি ফিরে মায়ের ঘরে ঢুকল।

তাঁত তখন থেমে আছে।

নীলিমা জানালার পাশে বসে সুতো গুছাচ্ছেন।

সৌরভ বলল,

—“মা, তোমার চোখে আগের মতো দেখতে পাচ্ছ?”

নীলিমা একটু থেমে বললেন,

—“কিছুটা কমেছে।”

—“তাহলে আর তাঁতে বসবে না।”

নীলিমা কিছু বললেন না।

সেদিন রাতে তিনি অনেকক্ষণ তাঁতের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

চল্লিশ বছরের সঙ্গী।

কত শাড়ি তার ওপর দিয়ে গেছে!

কত উৎসবের কাপড়!

কত মেয়ের বিয়ের শাড়ি!

কত মায়ের জন্য পুজোর নতুন শাড়ি!

তাঁতটা যেন তাঁর জীবনেরই একটা অংশ।

কিন্তু পরদিন তিনি সত্যিই তাঁতে বসা বন্ধ করে দিলেন।

কয়েকদিন পর তাঁতঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

যে ঘরে প্রতিদিন খটাং খটাং শব্দে সকাল শুরু হতো, সেখানে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ।

পাশের বাড়ির বারো বছরের মেয়ে মিতালি বিষয়টা লক্ষ্য করেছিল।

সে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে নীলিমার তাঁতঘরের সামনে দাঁড়াত।

একদিন সে সাহস করে জিজ্ঞেস করল,

—“ঠাম্মি, তাঁত চলছে না কেন?”

নীলিমা বললেন,

—“চোখে আর আগের মতো দেখতে পাই না।”

মিতালি বলল,

—“আমি সুতো ধরব।”

নীলিমা হেসে ফেললেন।

—“তুই?”

—“হ্যাঁ।”

—“তুই তো তাঁত চালাতেই জানিস না।”

—“শিখব।”

সেদিন থেকেই মিতালির শেখা শুরু হল।

প্রথম দিন সে সুতো জট পাকিয়ে ফেলল।

দ্বিতীয় দিন সুতো ছিঁড়ে গেল।

তৃতীয় দিন পুরো নকশাটাই ভুল করে ফেলল।

মিতালি হতাশ হয়ে বলল,

—“আমি পারব না।”

নীলিমা বললেন,

—“তাঁত তোকে প্রথমেই ভালোবাসবে কেন?”

মিতালি অবাক।

—“মানে?”

—“তাকে সময় দিতে হয়। হাতকে ধৈর্য শেখাতে হয়।”

মিতালি আবার চেষ্টা করল।

দিনের পর দিন।

সপ্তাহের পর সপ্তাহ।

ধীরে ধীরে সে শিখে গেল।

একদিন নীলিমা বললেন,

—“এবার তুই নিজের একটা নকশা বানাস।”

মিতালি বলল,

—“কী নকশা?”

—“যেটা তোর ভালো লাগে।”

মিতালি কাগজে একটি নকশা আঁকল।

নকশাটিতে ছিল গ্রামের ধানখেত, নদী আর ভোরের সূর্য।

নীলিমা অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

—“এটা শাড়িতে তুলতে চাইছিস?”

—“হ্যাঁ।”

—“মানুষ কিনবে?”

—“জানি না।”

নীলিমা হাসলেন।

—“তাহলে চেষ্টা করে দেখ।”

মিতালির নকশা তাঁতে উঠল।

তৈরি হতে কয়েকদিন লাগল।

শেষ পর্যন্ত যখন শাড়িটি বেরিয়ে এল, দু’জনেই চুপ করে তাকিয়ে রইল।

ধানের সবুজ, নদীর নীল, আর সূর্যের কমলা রেখা—সব মিলিয়ে যেন একটা গ্রাম শাড়ির ওপর ফুটে উঠেছে।

মিতালি বলল,

—“ঠাম্মি, এটা তো সুন্দর!”

নীলিমা বললেন,

—“সুন্দর হয়েছে কারণ তুই নিজের গল্প এঁকেছিস।”

মিতালি শাড়িটির ছবি তুলে তার স্কুলের শিক্ষিকাকে দেখাল।

শিক্ষিকা ছবিটি দেখে বললেন,

—“এটা শুধু শাড়ি নয়। এটা তো একটা গ্রামের গল্প।”

তিনি ছবিটি স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পেজে প্রকাশ করলেন।

কয়েকদিনের মধ্যে ছবিটি অনেকের কাছে পৌঁছে গেল।

একজন শহরের পোশাক ব্যবসায়ী যোগাযোগ করলেন।

তিনি বললেন,

—“এমন আরও শাড়ি তৈরি করা সম্ভব?”

মিতালি দৌড়ে নীলিমার কাছে গেল।

—“ঠাম্মি! অর্ডার এসেছে!”

নীলিমা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলেন না।

—“কতগুলো?”

—“বিশটা।”

নীলিমার চোখে জল চলে এল।

তাঁতঘর আবার খুলল।

এবার শুধু নীলিমা আর মিতালি নয়—পাড়ার আরও কয়েকজন মহিলা এলেন।

কেউ সুতো কাটলেন।

কেউ রং করলেন।

কেউ নকশা আঁকলেন।

কেউ তাঁতে বসলেন।

সৌরভও শহর থেকে এসে মায়ের কাজ দেখে অবাক হয়ে গেল।

সে বলল,

—“মা, তুমি এতদিন এটা একা করেছ?”

নীলিমা হেসে বললেন,

—“একাই তো ছিলাম না। মিতালি ছিল।”

সৌরভ মিতালির দিকে তাকিয়ে বলল,

—“তুই আমার মাকে আবার তাঁতের কাছে ফিরিয়ে এনেছিস।”

মিতালি বলল,

—“ঠাম্মি আমাকে তাঁত শিখিয়েছে। আসলে আমরা দু’জনেই দু’জনকে ফিরিয়ে এনেছি।”

কথাটা শুনে নীলিমা মৃদু হেসে ফেললেন।

কয়েক মাসের মধ্যে নবগ্রামের তাঁতপাড়ায় নতুন কাজ শুরু হল।

তারা পুরোনো নকশার পাশাপাশি নতুন নকশা তৈরি করতে লাগল।

শাড়িতে উঠল নদী।

ধানখেত।

পাখি।

গ্রামের মেলা।

শিউলি ফুল।

বৃষ্টির রেখা।

প্রতিটি কাপড় যেন একটি করে গল্প।

মিতালি স্কুলে পড়তে পড়তেও কাজ চালিয়ে যেতে লাগল।

একদিন সে নীলিমাকে বলল,

—“ঠাম্মি, আমি বড় হয়ে ডিজাইনার হব।”

নীলিমা বললেন,

—“হবি।”

—“তুমি থাকবে?”

—“আমি কোথায় যাব?”

মিতালি হেসে বলল,

—“তাহলে আমার প্রথম ডিজাইনের নাম হবে ‘নীলিমার তাঁত’।”

নীলিমা চোখ মুছে বললেন,

—“নাম যা খুশি দিস। শুধু একটা কথা মনে রাখিস।”

—“কী?”

—“নতুন কিছু তৈরি করবি, কিন্তু পুরোনো শিকড়টা ভুলিস না।”

সেদিন ভোরে আবার তাঁতঘর থেকে শব্দ ভেসে এল—

খটাং… খটাং… খটাং…

অনেকদিন পর সেই শব্দ শুনে পুরো পাড়া যেন বুঝল, একটা ঐতিহ্য শুধু বেঁচে নেই—সে নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন ভাষা পেয়েছে।

আর জানালার পাশে বসে নীলিমা দেবী চোখে কম দেখলেও মনে মনে দেখতে পাচ্ছিলেন আরও অনেক দূরের একটি সকাল।

যেখানে তাঁর শেখানো হাতের কাজ মিতালির হাতে আরও বহু বছর বেঁচে থাকবে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *