শান্তিপুর গ্রামের বাজারের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো সিনেমা হল—রূপমহল।
একসময় সেখানে সন্ধ্যা নামলেই মানুষের ভিড় জমত। টিকিট কাউন্টারের সামনে লম্বা লাইন, বাদামওয়ালার হাঁক, চায়ের দোকানে আড্ডা—সব মিলিয়ে সিনেমা হলটি ছিল গ্রামের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
কিন্তু সময় বদলেছে।
গ্রামে মোবাইল এসেছে, ইন্টারনেট এসেছে, বাড়িতে বাড়িতে টেলিভিশন এসেছে। ধীরে ধীরে রূপমহলের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
শেষ পর্যন্ত হলের মালিকও সিদ্ধান্ত নিলেন, ভবনটি ভেঙে অন্য কিছু তৈরি করবেন।
সেই খবর শুনে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেল ষোলো বছরের অর্ণব।
অর্ণবের দাদু হরিপদ একসময় ওই সিনেমা হলে প্রজেক্টর চালাতেন।
দাদুর ঘরে এখনও একটি পুরোনো প্রজেক্টর রাখা ছিল।
অর্ণব ছোটবেলা থেকেই সেটি দেখে বড় হয়েছে।
একদিন সে দাদুকে জিজ্ঞেস করল,
—“দাদু, এই মেশিনটা কী করে?”
হরিপদ হেসে বলেছিলেন,
—“এটা আলো দিয়ে গল্প দেখায়।”
—“আলো দিয়ে গল্প?”
—“হ্যাঁ। অন্ধকার ঘরে একটু আলো ফেললেই মানুষের সামনে একটা পৃথিবী তৈরি হয়ে যায়।”
অর্ণব কথাটা কখনও ভুলতে পারেনি।
রূপমহল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও সে মাঝে মাঝে হলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত।
একদিন সে দেখল, কয়েকজন শ্রমিক ভবন মাপজোক করছে।
অর্ণব দৌড়ে বাড়ি গিয়ে দাদুকে বলল,
—“ওরা সিনেমা হলটা ভেঙে ফেলবে!”
হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—“সময় কাউকে অপেক্ষা করে না রে।”
—“আমরা কিছু করতে পারি না?”
—“কী করবি?”
অর্ণবের মাথায় তখনও কোনও উত্তর ছিল না।
সেই রাতেই সে দাদুর ঘরে গিয়ে পুরোনো প্রজেক্টরটির দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ তার মাথায় একটা ভাবনা এল।
যদি সিনেমা হলটাকে সিনেমা দেখানোর জন্য নয়, অন্য কাজে ব্যবহার করা যায়?
পরদিন সে স্কুলের শিক্ষক অমিতবাবুর কাছে গেল।
সব শুনে শিক্ষক বললেন,
—“তোমার ভাবনাটা খারাপ নয়। কিন্তু একটা জায়গা বাঁচাতে হলে শুধু আবেগ দিয়ে হয় না। মানুষকে বোঝাতে হবে, জায়গাটার নতুন ব্যবহার কী হতে পারে।”
অর্ণব বলল,
—“তাহলে কী করা যায়?”
—“তোমরা একটা পরিকল্পনা বানাও।”
অর্ণব কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে কাজ শুরু করল।
তারা ঠিক করল, রূপমহলকে গ্রামের শিশুদের জন্য একটি পাঠ ও চলচ্চিত্র শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেবে।
সেখানে সিনেমা শুধু বিনোদনের জন্য দেখানো হবে না।
শিক্ষামূলক ছবি, তথ্যচিত্র, ইতিহাস, বিজ্ঞান, পরিবেশ—এসব বিষয়ের অনুষ্ঠান দেখানো হবে।
পাশাপাশি থাকবে বই পড়ার জায়গা।
প্রথমে অনেকেই হাসল।
চায়ের দোকানের একজন বলল,
—“সিনেমা হল আবার পড়াশোনার জায়গা হয় নাকি?”
অর্ণব বলল,
—“কেন হবে না?”
কেউ উত্তর দিল না।
অর্ণব থামল না।
সে গ্রামের বাড়ি বাড়ি গেল।
কেউ পুরোনো বই দিল।
কেউ পুরোনো চেয়ার।
কেউ বলল, বিদ্যুতের খরচে সাহায্য করবে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত ডাক্তার একটি পুরোনো প্রজেক্টর দান করলেন।
একজন কলেজ পড়ুয়া বলল, সে সপ্তাহে দুদিন এসে শিশুদের পড়াবে।
ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করল, অর্ণব শুধু সিনেমা হল বাঁচাতে চাইছে না।
সে একটি জায়গাকে নতুন জীবন দিতে চাইছে।
তবে বাধা এল অন্য জায়গা থেকে।
হলের মালিক বললেন,
—“আমি তো জায়গাটা বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাদের পরিকল্পনা ভালো, কিন্তু আমারও তো হিসাব আছে।”
অর্ণব মাথা নিচু করে বলল,
—“আপনি যদি একবার সুযোগ দেন?”
—“কী করবে?”
—“তিন মাস।”
মালিক অবাক হলেন।
—“তিন মাসে কী করবে?”
—“যদি তিন মাসে আমরা প্রমাণ করতে না পারি যে এই জায়গাটা গ্রামের কাজে লাগছে, তাহলে আপনি যা ঠিক করেছেন তাই করবেন।”
অনেক আলোচনার পর মালিক রাজি হলেন।
শর্ত একটাই—
তিন মাস।
প্রথম দিন পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখা গেল, হলের ভেতর ধুলোয় সব ঢেকে গেছে।
মেঝেতে ছেঁড়া পোস্টার।
ভাঙা চেয়ার।
জাল দিয়ে ঢাকা জানালা।
অর্ণব ও তার বন্ধুরা সারাদিন পরিষ্কার করল।
হরিপদ দাদু পুরোনো প্রজেক্টরটি পরিষ্কার করতে শুরু করলেন।
তিনি মেশিনটার ওপর হাত বুলিয়ে বললেন,
—“বুড়ো হয়েছে, কিন্তু এখনও পুরোপুরি মরেনি।”
অর্ণব হেসে বলল,
—“আপনার মতো।”
হরিপদও হেসে ফেললেন।
প্রথম প্রদর্শনের দিন মাত্র তেইশজন শিশু এল।
তাদের একটি ছোট বিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্র দেখানো হল।
শেষে অমিতবাবু শিশুদের জিজ্ঞেস করলেন,
—“কী শিখলে?”
একটি ছোট ছেলে হাত তুলে বলল,
—“পৃথিবী কত বড়!”
সবাই হেসে উঠল।
পরের সপ্তাহে চল্লিশজন এল।
তারপর সত্তরজন।
একদিন একশোরও বেশি শিশু ও অভিভাবক উপস্থিত হল।
গ্রামের মানুষ নিজের চোখে দেখতে পেল, পুরোনো সিনেমা হলের ভেতর আবার হাসির শব্দ ফিরেছে।
কেউ বই পড়ছে।
কেউ ছবি দেখছে।
কেউ বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করছে।
কেউ আবার দাদু-ঠাকুমার কাছ থেকে পুরোনো দিনের গল্প রেকর্ড করছে।
রূপমহল আর শুধু সিনেমা হল রইল না।
এটি হয়ে উঠল গ্রামের স্মৃতি ও শিক্ষার কেন্দ্র।
তিন মাস শেষ হওয়ার আগেই হলের মালিক অর্ণবকে ডাকলেন।
অর্ণব ভয় পেয়ে গেল।
মালিক বললেন,
—“তোমরা জায়গাটা কিনে নিতে পারবে?”
অর্ণব হতভম্ব।
—“কিনব?”
—“আমি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত বদলেছি।”
অর্ণবের চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত।”
—“কী?”
—“এই জায়গা যেন কোনওদিন শুধু তালাবন্ধ ভবন না হয়।”
অর্ণব বলল,
—“হবে না।”
কয়েক বছর কেটে গেল।
রূপমহলের সামনে নতুন সাইনবোর্ড লাগল—
“রূপমহল জ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র”
এক পাশে ছোট্ট লাইব্রেরি।
অন্য পাশে প্রজেকশন রুম।
মাঝখানে শিশুদের বসার জায়গা।
দেয়ালে টাঙানো হরিপদর পুরোনো প্রজেক্টরের ছবি।
আর কাচের বাক্সের মধ্যে রাখা ছিল একটি পুরোনো সিনেমার টিকিট।
অর্ণব সেটি যত্ন করে রেখেছিল।
টিকিটটির দাম ছিল মাত্র দুই টাকা।
হরিপদ জিজ্ঞেস করেছিলেন,
—“ওটা রেখে দিয়েছিস কেন?”
অর্ণব বলেছিল,
—“এটাই তো আমাকে প্রথম গল্পের দরজা দেখিয়েছিল।”
দাদু মৃদু হেসেছিলেন।
এক সন্ধ্যায় কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর অর্ণব একা হলের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল।
সব আলো নিভে গেছে।
শুধু প্রজেক্টরের ছোট্ট আলোটি পর্দায় পড়ছে।
অর্ণবের মনে পড়ল দাদুর কথা—
“অন্ধকার ঘরে একটু আলো ফেললেই মানুষের সামনে একটা পৃথিবী তৈরি হয়।”
সে বুঝল, ভবন পুরোনো হতে পারে।
যন্ত্র পুরোনো হতে পারে।
কিন্তু মানুষের শেখার ইচ্ছা কখনও পুরোনো হয় না।
আর কখনও কখনও একটি ছোট্ট ছেলে, একটি পুরোনো সিনেমার টিকিট আর একটু সাহস—একটি পুরো জায়গার ভাগ্য বদলে দিতে পারে।