Categories
উপন্যাস বিবিধ

নীল খামের অভিশাপ (তৃতীয় পর্ব: শেষ সত্যের মুখোমুখি)।

“তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন আমার ছেলে নয়।”

অন্ধকার ঘরের মধ্যে কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল।

অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছিল না, সে ঠিক কী শুনল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা যদি সত্যিই তার মা হন, তবে তিনি এমন কথা বলবেন কেন? আর যদি তিনি তার মা না হন, তাহলে এত নিখুঁতভাবে মায়ের কণ্ঠস্বর নকল করছেন কীভাবে?

ডা. নীলাদ্রি মুখোপাধ্যায় টেবিলের ওপর হাত রেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।

অয়ন অনিরুদ্ধের কাঁধে হাত রাখল।

“শান্ত হও। আমাদের মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।”

দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ ভেসে এল।

“নীলাদ্রি, তুমি কি এখনও মনে করো, সত্যকে চিরকাল লুকিয়ে রাখা যায়?”

ডাক্তার কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি কে?”

মহিলা হেসে উঠলেন।

“এই প্রশ্নটা তোমার এত বছর আগে করা উচিত ছিল। যখন তুমি আমার চোখের সামনে একটা নিরপরাধ শিশুর পরিচয় বদলে দিয়েছিলে।”

“আমি কোনো শিশুর পরিচয় বদলাইনি!”

“মিথ্যে বলো না, নীলাদ্রি। তোমার নিজের হাতে লেখা নথি এখনও আমার কাছে আছে।”

তারপর দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। কেউ যেন ধীরে ধীরে বারান্দার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হাঁটছে।

অনিরুদ্ধ দরজার কাছে এগিয়ে গেল।

ডাক্তার তাকে থামানোর চেষ্টা করলেন।

“দরজা খুলো না!”

কিন্তু অনিরুদ্ধ এবার থামল না।

সে দরজার পাশে থাকা ছোট্ট কাচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল।

বারান্দায় একজন মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে সাদা শাড়ি, চুল পিঠ পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুখটা আধো অন্ধকারে ঢাকা।

কিন্তু তাঁর বাঁ হাতে একটি পুরোনো পোড়া দাগ।

অনিরুদ্ধের মনে পড়ল, ছোটবেলায় তার মা রান্না করতে গিয়ে একবার হাত পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। সেই দাগের কথা বাবা তাকে বহুবার বলেছিলেন।

মহিলা ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।

এবার অনিরুদ্ধ স্পষ্ট দেখতে পেল তাঁর চোখ।

সেই চোখ সে পুরোনো ছবিতে দেখেছে। সেই চোখ সে নিজের মুখেও খুঁজে পেয়েছে।

“মা!”

শব্দটা তার অজান্তেই বেরিয়ে এল।

মহিলা দরজার ওপাশ থেকে বললেন, “অনি, আমাকে একবার দেখতে দেবে না?”

অনিরুদ্ধের চোখে জল চলে এল।

সতেরো বছর ধরে যে মুখটাকে সে শুধু ছবিতে দেখেছে, যে কণ্ঠস্বরকে স্মৃতির মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছে, সেই মুখ আর কণ্ঠস্বর আজ তার সামনে।

কিন্তু ডা. নীলাদ্রি হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন।

“ও মাধবী নয়!”

অনিরুদ্ধ থমকে গেল।

ডাক্তার তার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিলেন।

“ওর হাতে যে দাগটা দেখছ, সেটা আসল নয়। মাধবীর বাঁ হাতে দাগ ছিল না। দাগটা ছিল ডান হাতে।”

অনিরুদ্ধের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল।

মহিলা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।

“বাহ, নীলাদ্রি। এত বছর পরেও তুমি কিছু জিনিস মনে রেখেছ।”

পরের মুহূর্তে তিনি দরজার সামনে থেকে সরে গেলেন।

বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

তারপর ইঞ্জিনের আওয়াজ দূরে মিলিয়ে গেল।

অনিরুদ্ধ দরজার কাছে ছুটে গিয়ে বাইরে তাকাল। বারান্দা ফাঁকা। রাস্তার ওপর বৃষ্টির জল জমে আছে। গাড়ির কোনো চিহ্ন নেই।

“উনি কে ছিলেন?” অনিরুদ্ধ প্রশ্ন করল।

ডাক্তার কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “কেয়া।”

“কিন্তু আপনি তো বললেন, কেয়া আপনার স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি মারা গেছেন!”

“আমি বলেছিলাম, সরকারি নথিতে তিনি মৃত। কিন্তু তাঁর দেহ আমি কোনোদিন দেখিনি।”

অয়ন বিস্ময়ে বলল, “তাহলে আপনি এত বছর ধরে নিজের স্ত্রীকে খুঁজছিলেন?”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো মারা গেছেন। কিন্তু আজ বুঝলাম, তিনি বেঁচে আছেন। আর তিনি আমাদের এমন একটা সত্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন, যা আমি এত বছর ধরে এড়িয়ে গেছি।”

অনিরুদ্ধ বলল, “আপনি কি জানেন, তিনি কেন আমাদের একজনকে নিজের ছেলে বলে অস্বীকার করলেন?”

ডাক্তার চুপ করে রইলেন।

অনিরুদ্ধ এবার তাঁর সামনে দাঁড়াল।

“আমরা আর কোনো মিথ্যে শুনতে চাই না। আপনি যা জানেন, সব বলুন।”

ডাক্তার চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।

“সতেরো বছর আগে, বারোই জুলাইয়ের রাতে, মাধবী সেন যমজ সন্তানের জন্ম দেন। তোমাদের দুজনের জন্মের আগে থেকেই হাসপাতালটির ওপর একটি অপরাধচক্রের নজর ছিল। তারা বিভিন্ন পরিবারের নবজাতকদের পরিচয় বদলে অর্থের বিনিময়ে অন্যদের হাতে তুলে দিত। এই কাজে কয়েকজন চিকিৎসক, হাসপাতালের কর্মী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত ছিলেন।”

“আমাদের বাবা কি তাদের একজন ছিলেন?” অয়ন জিজ্ঞেস করল।

“দেবব্রত সেই চক্রের কিছু লোককে চিনতেন। কিন্তু তিনি নিজে শিশু পাচার করতেন, এমন প্রমাণ আমি দেখিনি। বরং একটা সময়ে তিনি ওই চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।”

অনিরুদ্ধ অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।

“তাহলে ভিডিওতে তাঁকে পরিচয় বদলাতে দেখা গেল কেন?”

ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ তিনি দুটো শিশুর মধ্যে একজনকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। জন্মের পর তোমাদের মধ্যে একজনের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিল। চিকিৎসকরা আশঙ্কা করেছিলেন, শিশুটি হয়তো বাঁচবে না। অন্য শিশুটি সুস্থ ছিল। কিন্তু হাসপাতালের এক কর্মী ভুল চিকিৎসার নথি তৈরি করে জানায়, অসুস্থ শিশুটি মারা গেছে।”

“কোন শিশুটি অসুস্থ ছিল?”

“আমি জানি না। কারণ আসল নথি বদলে দেওয়া হয়েছিল।”

“আপনি তো তখন হাসপাতালে ছিলেন!”

“ছিলাম। কিন্তু আমি যখন বুঝতে পারলাম কী ঘটছে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। দুটি শিশুকে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল। একটিকে দেবব্রত নিজের কাছে নিয়ে যান, অন্যটিকে এমন এক পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যারা চক্রটির বিরুদ্ধে কোনো প্রশ্ন তুলবে না।”

অয়ন ফিসফিস করে বলল, “সেই পরিবারটাই কি আমার পালক পরিবার?”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“সম্ভবত। তবে নিশ্চিত হতে হলে আমাদের সেই পরিবারের দত্তক নেওয়ার নথি খুঁজে বের করতে হবে।”

অনিরুদ্ধ হঠাৎ একটা কথা মনে করে বলল, “কিন্তু মা কোথায় গেলেন? ভিডিওতে তো তাঁকে একটা শিশুকে নিয়ে চলে যেতে দেখা গেছে।”

ডাক্তার বললেন, “মাধবী বুঝেছিলেন, হাসপাতালের ভেতরে থেকে তিনি তোমাদের দুজনকে রক্ষা করতে পারবেন না। তিনি একজন শিশুকে নিয়ে পালিয়ে যান। অন্য শিশুটিকে দেবব্রতের কাছে রেখে যান। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, পরে ফিরে এসে দুজনকেই নিয়ে যাবেন।”

“কিন্তু তিনি ফিরে আসেননি কেন?”

ডাক্তার চোখ বন্ধ করলেন।

“কারণ পরের দিন থেকেই তাঁকে খুনি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কেয়া মুখোপাধ্যায়ের হত্যার দায় তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। তিনি পালিয়ে থাকতে বাধ্য হন।”

“কেয়াকে কে খুন করেছিল?”

ডাক্তার এবার চোখ খুললেন।

“সেটাই আমি জানি না।”

ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।

বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। জানলার কাচ দিয়ে ধূসর আলো ঢুকছে।

অয়ন বলল, “আমাদের নদীর ধারের বাড়িতে যেতে হবে। মায়ের চিঠিতে সেখানকার কথা লেখা আছে।”

ডাক্তার মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু তার আগে একটা জিনিস তোমাদের দেখাতে চাই।”

তিনি ব্যাগ থেকে একটি ছোট্ট ধাতব বাক্স বের করলেন। বাক্সটি বহু পুরোনো। ওপরের দিকে সেই একই চিহ্ন—একটি বৃত্তের মধ্যে তিনটি বিন্দু।

অয়ন সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে পিতলের চাবিটা বের করল।

চাবিটা বাক্সের তালায় ঢুকে গেল।

একবার ঘোরাতেই বাক্স খুলে গেল।

ভেতরে কয়েকটি কাগজ, একটি পুরোনো পেনড্রাইভ এবং একটি ছোট্ট রুপোর লকেট।

লকেটটি দেখে অনিরুদ্ধের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

এটা সে আগে দেখেছে।

ছোটবেলায় তার মা সবসময় গলায় এই লকেট পরতেন। মা নিখোঁজ হওয়ার পর বাবা বলেছিলেন, লকেটটি হারিয়ে গেছে।

অনিরুদ্ধ লকেটটা হাতে নিল।

ভেতরে দুটি ছোট্ট ছবি। একদিকে মাধবী, অন্যদিকে দেবব্রত। কিন্তু মাঝখানে আরেকটি ছবি থাকার কথা ছিল। সেখানে শুধু কাগজের একটি ছেঁড়া টুকরো রয়ে গেছে।

লকেটের ভেতরে ছোট্ট অক্ষরে লেখা—

‘দুইয়ের মধ্যে যে তৃতীয় সত্যকে চিনবে, সেই মুক্তি পাবে।’

অয়ন বলল, “এটার মানে কী?”

ডাক্তার উত্তর দিলেন, “আমি জানি না। কিন্তু এই লকেটটা তোমাদের মায়ের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।”

অনিরুদ্ধ পেনড্রাইভটা তুলে নিল।

“এটার মধ্যে কী আছে?”

“একটি ভিডিও। আমি কখনও চালাইনি। কারণ এর পাসওয়ার্ড আমার জানা নেই।”

“কিন্তু এটা এখানে কেন?”

ডাক্তার বললেন, “কেয়া আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সঠিক সময় না এলে যেন এটা না খুলি।”

অনিরুদ্ধ পেনড্রাইভটা নিজের পকেটে রেখে দিল।

“আমরা নদীর ধারের বাড়িতে গিয়ে এটা দেখব।”


শালবন থেকে নদীর ধারের বাড়িটা প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে।

সকাল আটটার দিকে তারা একটি ভাড়া গাড়ি নিয়ে রওনা দিল। চালকের নাম ছিল রহিম। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। সে প্রথমে খুব বেশি কথা বলছিল না। কিন্তু যখন ডাক্তার বাড়ির ঠিকানাটা বললেন, তখন সে রিয়ারভিউ মিররে কয়েকবার তাকাল।

“ওই বাড়িতে যাবেন?” সে জিজ্ঞেস করল।

ডাক্তার বললেন, “হ্যাঁ। কেন?”

রহিম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “বাড়িটা অনেক বছর ধরে বন্ধ। লোকজন বলে, রাতে ওখানে আলো জ্বলে। কখনও কখনও একটা মহিলার কান্নার শব্দও শোনা যায়।”

অনিরুদ্ধ হালকা বিরক্ত হয়ে বলল, “এসব গুজব।”

রহিম আর কথা বাড়াল না।

গাড়ি গ্রামের রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। দুই পাশে ধানখেত, ছোট ছোট পুকুর, মাটির বাড়ি। দূরে নদীর ওপর কুয়াশার পাতলা আস্তরণ।

প্রায় এক ঘণ্টা পর তারা একটি নির্জন বাঁশবাগানের সামনে এসে থামল।

সামনে সরু পথ নদীর দিকে চলে গেছে।

ডাক্তার বললেন, “এই পথ দিয়ে গেলে বাড়িটা পাওয়া যাবে।”

তারা হেঁটে এগিয়ে গেল।

নদীর ধারে পুরোনো একটি দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনের বাগান আগাছায় ভরে গেছে। বারান্দার কাঠের রেলিং ভেঙে পড়েছে। জানলাগুলো বন্ধ। কিন্তু বাড়ির সামনের দরজার কাছে তাজা পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে।

অয়ন নিচু হয়ে ছাপগুলো দেখল।

“কেউ এখানে এসেছে।”

অনিরুদ্ধ বলল, “সম্ভবত সেই মহিলা।”

তারা দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

দরজায় তালা নেই।

অনিরুদ্ধ হাতল ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল।

ভেতরে ধুলোমাখা আসবাব, দেওয়ালে পুরোনো ছবি, আর ঘরের মাঝখানে একটি কাঠের টেবিল। টেবিলের ওপর রাখা একটি কেরোসিনের বাতি, একটি গ্লাস জল এবং একটি সাদা কাপড়ে মোড়া প্যাকেট।

ঘরটা দেখে মনে হচ্ছিল, কেউ নিয়মিত এখানে আসে।

ডাক্তার প্যাকেটটা খুললেন।

ভেতরে একটি ডায়েরি।

প্রথম পাতায় লেখা—

‘মাধবী সেনের ব্যক্তিগত ডায়েরি। কেউ যদি এটি পড়ে, তবে বুঝবে, আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে।’

অনিরুদ্ধ ডায়েরিটা হাতে নিল।

পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে। বেশিরভাগ লেখাই মায়ের হাতের লেখা।

প্রথম কয়েকটি পাতায় সাধারণ পারিবারিক কথা—অনিরুদ্ধের জন্মের আগে তাঁর আশা, দেবব্রতের সঙ্গে সংসার, নতুন বাড়িতে ওঠার পরিকল্পনা।

তারপর হঠাৎ লেখার ধরন বদলে গেল।

‘আজ দেবব্রত আমাকে জানাল, হাসপাতালের কয়েকজন কর্মী নবজাতকদের পরিচয় বদলে দিচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস করিনি। কিন্তু গত রাতে নিজের চোখে এমন একটি ঘটনা দেখেছি, যা আমার বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছে।’

পরের পাতায় লেখা—

‘আমি বুঝতে পারছি, আমাদের সন্তানদেরও তারা ব্যবহার করতে পারে। দেবব্রত বলছে, আমাকে ভয় পেতে হবে না। কিন্তু আমি জানি, সে সব কথা আমাকে বলছে না।’

আরেকটি পাতায়—

‘আজ কেয়া আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সে বলেছে, এই চক্রের মূল মাথা এমন একজন, যাকে আমরা দুজনেই চিনি। আমি তার নাম লিখতে ভয় পাচ্ছি। কারণ এই ডায়েরি যদি ভুল মানুষের হাতে পড়ে, তবে আমার সন্তানদের জীবন বিপন্ন হবে।’

অনিরুদ্ধ পাতাটা উল্টে দেখল।

পরের পাতাগুলো ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

শুধু শেষ পাতায় কয়েকটি লাইন লেখা ছিল।

‘আমি যদি ফিরে না আসি, তবে আমার ছেলেদের বলো, তারা যেন একে অপরকে শত্রু মনে না করে। তাদের মধ্যে একজনকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যজনকে হারানোর সিদ্ধান্ত আমি নিইনি। আমি দুজনকেই বাঁচাতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল, আমি এমন একজনকে বিশ্বাস করেছিলাম, যে আমার পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষ।’

অনিরুদ্ধ ডায়েরিটা বন্ধ করল।

“মা কাকে বিশ্বাস করেছিলেন?”

ডাক্তার বললেন, “হয়তো কেয়াকে। হয়তো দেবব্রতকে। অথবা অন্য কাউকে।”

অয়ন টেবিলের নিচে হাত ঢুকিয়ে একটি ছোট্ট ড্রয়ার খুলল।

ভেতরে একটি খাম।

খামের ওপর লেখা—

‘যে নিজের পরিচয় নিয়ে সন্দেহ করে, সে যেন আগে এই চিঠি পড়ে।’

অয়ন খামটা অনিরুদ্ধের হাতে দিল।

চিঠির ভেতরে লেখা ছিল—

“অনি,

তুমি যদি এই চিঠি পড়ো, তাহলে হয়তো তোমার মনে হচ্ছে, তুমি কে, তা তুমি জানো না। কিন্তু মনে রেখো, মানুষ শুধু রক্তের সম্পর্ক দিয়ে তৈরি হয় না। সে তৈরি হয় তার সিদ্ধান্ত, তার ভালোবাসা এবং তার কাজ দিয়ে।

তোমার জন্মের সময় যা ঘটেছিল, তা তোমার দোষ নয়। তোমার বাবা কী করেছিলেন, তা-ও তোমার দোষ নয়।

কিন্তু তুমি যদি সত্য জানার পরও অন্যায়ের পাশে দাঁড়াও, তাহলে সেই দোষ তোমার নিজের হবে।

তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি নাম মনে রেখো—সুবর্ণা।

সে তোমাদের দুজনকে চিনত, তোমাদের জন্মের আগেও।

তাকে খুঁজে বের করো।

— মা”

চিঠিটা পড়ে অনিরুদ্ধ অয়নের দিকে তাকাল।

“সুবর্ণা কে?”

অয়ন মাথা নাড়ল।

“আমি জানি না।”

ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “সুবর্ণা নামটা আমার পরিচিত মনে হচ্ছে।”

“কোথায় শুনেছেন?”

“হাসপাতালে আমাদের একজন নার্স ছিলেন। নাম সুবর্ণা দত্ত। তিনি তোমাদের জন্মের রাতে ডিউটিতে ছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পরে হঠাৎ চাকরি ছেড়ে চলে যান।”

“তিনি এখন কোথায়?”

“জানি না।”

অয়ন বলল, “আমাদের তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে।”

ঠিক তখনই বাড়ির পেছনের ঘর থেকে কাচ ভাঙার শব্দ হলো।

তিনজন একসঙ্গে ঘুরে দাঁড়াল।

অনিরুদ্ধ দ্রুত পেছনের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। দরজার কাছে পৌঁছেই সে থেমে গেল।

ঘরের ভেতরে একটি পুরোনো কাঠের আলমারি খোলা। মেঝেতে ভাঙা কাচ ছড়িয়ে আছে। জানলার পর্দা বাতাসে উড়ছে।

কিন্তু ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মহিলা।

পরনে সাদা শাড়ি।

চুলে পাক ধরেছে।

ডান হাতে পুরোনো পোড়া দাগ।

এবার অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল—এটাই সেই আসল দাগ, যার কথা ডাক্তার বলেছিলেন।

মহিলা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন।

“অনি?”

অনিরুদ্ধের ঠোঁট কেঁপে উঠল।

“মা?”

মহিলার চোখে জল এসে গেল।

তিনি দুহাত বাড়িয়ে দিলেন।

অনিরুদ্ধ আর নিজেকে আটকাতে পারল না। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল।

সতেরো বছর পর মায়ের শরীরের গন্ধ, তাঁর কাঁধের উষ্ণতা, তাঁর কাঁপতে থাকা হাত—সবকিছু যেন এক মুহূর্তে ফিরে এল।

“মা, তুমি কোথায় ছিলে? কেন আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলে?”

মাধবী ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমি তোমাদের ছেড়ে যাইনি, অনি। তোমাদের বাঁচানোর জন্য দূরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম।”

অয়ন কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।

মাধবী তার দিকে তাকালেন।

তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

“তুমি কে?”

অয়ন বিস্মিত হয়ে বলল, “আমি অয়ন।”

মাধবী ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।

“না। তোমার নাম অয়ন নয়।”

অয়নের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“আপনি কী বলছেন?”

মাধবী তার কাছে এগিয়ে এলেন। অয়নের মুখ দুহাতে ধরে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

তারপর কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমার ছোট্ট অনিরুদ্ধ!”

অয়ন স্থির হয়ে গেল।

“তাহলে আমি—”

“হ্যাঁ। তোমার নাম অনিরুদ্ধ। তোমার জন্মের পর আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু যারা তোমাদের খুঁজছিল, তাদের হাত থেকে বাঁচাতে তোমার পরিচয় বদলে দিতে হয়েছিল।”

অনিরুদ্ধ মায়ের দিকে তাকাল।

“তাহলে আমি কে?”

মাধবী তার হাত ধরলেন।

“তুমিও আমার ছেলে।”

“কিন্তু আমাদের মধ্যে একজন তো—”

মাধবী মাথা নাড়লেন।

“কেউ তোমাদের সত্যিটা বলেনি। তোমরা দুজনেই আমার সন্তান। কিন্তু তোমাদের জন্মের রাতের গল্প শুধু পরিচয় বদলের গল্প নয়। এর পেছনে এমন একটা ঘটনা রয়েছে, যা তোমাদের বাবা আমাকে কোনোদিন জানতে দেননি।”

ডা. নীলাদ্রি সামনে এগিয়ে এলেন।

“মাধবী, তুমি কি জানো, কেয়া বেঁচে আছে?”

মাধবী তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আমি জানি।”

“তাহলে এত বছর ধরে তুমি আমাদের কিছু জানাওনি কেন?”

মাধবীর চোখ কঠিন হয়ে উঠল।

“কারণ কেয়া শুধু বেঁচে নেই, নীলাদ্রি। সে-ই সেই মানুষ, যে দেবব্রতকে তোমাদের পরিচয় বদলাতে বাধ্য করেছিল।”

ঘরের মধ্যে নিস্তব্ধতা নেমে এল।

ডাক্তার অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।

“কেয়া? আমার স্ত্রী?”

মাধবী মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। সে নিজের সন্তানকে হারিয়েছিল। সেই শোক থেকে সে এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যার জন্য আমাদের চারজনের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।”

অনিরুদ্ধের মাথা ঘুরছিল।

“কেয়ার সন্তান?”

মাধবী চোখ বন্ধ করলেন।

“তোমাদের জন্মের রাতে কেয়ারও একটি সন্তান জন্মেছিল। কিন্তু সেই শিশুটি মারা যায়। কেয়া সেই সত্য মেনে নিতে পারেনি। সে চেয়েছিল, তোমাদের মধ্যে একজনকে নিজের সন্তান হিসেবে বড় করতে।”

অয়ন কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমাকে কি কেয়ার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?”

“না। তোমাকে আমি নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু কেয়া বিশ্বাস করত, তার সন্তান বেঁচে আছে এবং তাকে অন্য একটি পরিবারের কাছে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সে সেই শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে একের পর এক অপরাধ করে বসে।”

ডা. নীলাদ্রি মাথায় হাত দিলেন।

“আমি এত বছর ধরে ভেবেছি, কেয়া নির্দোষ ছিল।”

মাধবী বললেন, “কেয়া নির্দোষ ছিল না। কিন্তু সে একা সবকিছু করেনি। দেবব্রতও সব সত্য জানত না।”

অনিরুদ্ধ এবার মায়ের হাত শক্ত করে ধরল।

“মা, তুমি আমাদের কাছ থেকে কী লুকিয়ে রেখেছ?”

মাধবী কিছুক্ষণ নীরব রইলেন।

তারপর ঘরের কোণে থাকা কাঠের বাক্সটা খুললেন।

ভেতরে একটি পুরোনো হাসপাতালের নথি, কয়েকটি ছবি এবং একটি খাম।

খামের ওপর লেখা—

‘ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল—গোপনীয়।’

অনিরুদ্ধ কাগজটা খুলল।

প্রথম পাতায় দুটি নাম।

অনিরুদ্ধ সেন।

অয়ন দত্ত।

নিচে লেখা—‘জৈবিক সম্পর্কের পরীক্ষা।’

ফলাফলের দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধের চোখ বড় হয়ে গেল।

দুজনের মধ্যে যমজ ভাইয়ের জৈবিক সম্পর্ক নিশ্চিত হয়েছে।

কিন্তু রিপোর্টের শেষ অংশে আরও একটি তথ্য ছিল।

‘মাধবী সেনের সঙ্গে জৈবিক মাতৃত্বের সম্পর্ক—নিশ্চিত।’

তার নিচে আরেকটি লাইন।

‘দেবব্রত সেনের সঙ্গে জৈবিক পিতৃত্বের সম্পর্ক—অনিরুদ্ধ সেনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়।’

অনিরুদ্ধ কাগজটা মুঠো করে ধরল।

“তাহলে আমার বাবা কে?”

মাধবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন।

“সেই উত্তরটা আমি তোমাকে এখনই দিতে পারব না।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটি প্রতিশ্রুতি দিতে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তুমি যদি কোনোদিন সত্য জানতে পারো, তবে যেন প্রথমে নিজের জীবনকে বেছে নাও। তারপর নিজের পরিচয়কে।”

অনিরুদ্ধের চোখে রাগ জমে উঠল।

“আমি আর কোনো প্রতিশ্রুতি শুনতে চাই না! আমি শুধু জানতে চাই, আমার প্রকৃত বাবা কে!”

মাধবী ধীরে ধীরে বললেন, “তোমার প্রকৃত বাবা হলেন সেই মানুষ, যিনি তোমাকে জন্ম দিয়েছেন। কিন্তু যিনি তোমাকে মানুষ করেছেন, তাঁর ভালোবাসাকে অস্বীকার কোরো না।”

“এটা কোনো উত্তর নয়!”

“আমি জানি।”

মাধবী চোখ মুছলেন।

“তোমার বাবা সম্পর্কে সত্যিটা জানতে হলে তোমাকে কলকাতায় ফিরতে হবে। তোমাদের বাড়ির পুরোনো স্টাডি রুমে একটি গোপন আলমারি আছে। সেখানে দেবব্রত সব নথি রেখে গিয়েছিলেন।”

অয়ন বলল, “আমরা সেখানে যাব।”

মাধবী মাথা নাড়লেন।

“যাবে। কিন্তু তার আগে তোমাদের একটা কথা জানতে হবে। কেয়া এখনও তোমাদের পিছু ছাড়েনি। সে শুধু তোমাদের পরিচয় জানতে চায় না। সে চায়, তোমাদের দুজনের মধ্যে একজন যেন অন্যজনকে বিশ্বাস না করে।”

“কেন?” অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল।

মাধবী তার দুই ছেলের হাত একসঙ্গে ধরে বললেন, “কারণ সে জানে, তোমরা একসঙ্গে থাকলে তার এত বছরের মিথ্যে ভেঙে পড়বে।”

ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির সামনের দরজায় ধাক্কা পড়ল।

একবার।

দুবার।

তারপর বাইরে থেকে একটি পুরুষকণ্ঠ ভেসে এল।

“মাধবী, দরজা খোলো।”

অনিরুদ্ধের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

এই কণ্ঠস্বরও তার পরিচিত।

বাবার কণ্ঠস্বর।

কিন্তু তার বাবা তো পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন!

মাধবী ধীরে ধীরে দরজার দিকে তাকালেন।

তাঁর মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।

“না… সে এখানে আসতে পারে না।”

অয়ন জিজ্ঞেস করল, “কে?”

মাধবী কাঁপা গলায় বললেন—

“দেবব্রত।”

দরজার ওপাশ থেকে আবার কণ্ঠ এল।

“মাধবী, আমি জানি, তোমার দুই ছেলে তোমার সঙ্গে আছে। তাদের বলো, আজ রাতেই সত্যিটা জানতে হবে।”

অনিরুদ্ধ দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

মাধবী তার হাত ধরে থামালেন।

“অনি, দরজা খুলো না!”

কিন্তু এবার দরজার ওপাশ থেকে এমন একটি কথা শোনা গেল, যা শুনে মাধবীর হাত থেকে ছেলের হাত ছুটে গেল।

দেবব্রতের কণ্ঠ বলল—

“মাধবী, আমি জানি তুমি কী লুকিয়ে রেখেছ। অনিরুদ্ধ আমার ছেলে নয়, সেটা আমি বহু আগেই জানতাম। কিন্তু অয়নও আমার ছেলে নয়।”

এক মুহূর্তের জন্য পৃথিবী যেন থেমে গেল।

তারপর দরজার ওপাশ থেকে শেষ কথাটা ভেসে এল—

“তোমাদের দুজনের প্রকৃত বাবা এখনও বেঁচে আছেন। আর তিনি এই মুহূর্তে তোমাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন।”

অনিরুদ্ধ, অয়ন এবং ডা. নীলাদ্রি একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকাল।

ঘরের মধ্যে আর কেউ নেই।

শুধু মাধবী দাঁড়িয়ে আছেন।

তাঁর চোখে জল।

আর তাঁর ঠোঁটে কাঁপতে থাকা একটি নাম।

“শশাঙ্ক…”

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *