শীতের শেষ বিকেল। কলকাতার আকাশে তখন মেঘের ছায়া, রাস্তায় হালকা ধুলো উড়ছে। কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকানগুলো একে একে বন্ধ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঠিক সেই সময়, একটি ছোট্ট ডাকঘরের সামনে এসে দাঁড়াল তিরিশ বছরের যুবক অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়।
তার হাতে একটি নীল খাম।
খামের ওপর কাঁপা কাঁপা অক্ষরে লেখা—
“প্রাপক: অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা: যে বাড়িতে আমার জন্য আজও একটি জানালা খোলা থাকে।”
এমন অদ্ভুত ঠিকানা সে আগে কখনও দেখেনি। অথচ খামের ওপর তার নামটি একেবারে স্পষ্ট। আরও আশ্চর্যের বিষয়, খামের পেছনে লেখা তার নিজের জন্মতারিখ—যে তারিখটি সে ছাড়া আর কেউ জানে না বলে তার ধারণা ছিল।
ডাকঘরের বৃদ্ধ কর্মচারী খামটি দেখে চশমা নামিয়ে তাকালেন।
“এটা কোথায় পেলেন?”
“আমার বাড়ির দরজার সামনে। সকালে বেরোনোর সময় দেখলাম, মেঝেতে পড়ে আছে।”
“বাড়ি কোথায় আপনার?”
“উত্তর কলকাতায়। শ্যামবাজারের কাছে।”
বৃদ্ধ কর্মচারী খামের ওপরের ডাকঘরের সিলটি দেখলেন। তারপর তাঁর মুখের রং বদলে গেল।
“এটা তো বিশ বছর আগের সিল!”
অনির্বাণ হেসে বলল, “তা কী করে সম্ভব? আজকের দিনে বিশ বছর আগের চিঠি আমার দরজায় এল কীভাবে?”
বৃদ্ধ হাসলেন না।
তিনি খামটি উল্টে দেখলেন। সিলের পাশে তারিখ লেখা—১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬।
“এই চিঠি বিশ বছর আগে পাঠানো হয়েছিল,” বৃদ্ধ বললেন। “আর ঠিকানার জায়গায় যে কথাটা লেখা আছে, সেটা আমাদের পুরোনো ডাক বিভাগের একটি বিশেষ নথির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।”
“কোন নথি?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আপনি কি আপনার মাকে চিনতেন?”
প্রশ্নটা শুনে অনির্বাণের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
তার মা, মধুমিতা মুখোপাধ্যায়, মারা গিয়েছিলেন সে যখন মাত্র দশ বছরের। পরিবারের লোকেরা বলেছিল, দীর্ঘ অসুস্থতার পর তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বাবার কাছে মায়ের স্মৃতি নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সব সময় চুপ করে যেতেন।
“অবশ্যই চিনতাম,” অনির্বাণ বলল। “কিন্তু আপনি হঠাৎ আমার মায়ের কথা জিজ্ঞাসা করছেন কেন?”
বৃদ্ধ খামটি তার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।
“চিঠিটা বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খুলুন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—যে মানুষটি এই চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তিনি চিঠি পাঠানোর সময় জানতেন না, সেটা কবে আপনার হাতে পৌঁছবে।”
অনির্বাণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“আপনি কী বলতে চাইছেন?”
বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না। শুধু ডাকঘরের শাটার নামিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কিছু প্রশ্নের উত্তর চিঠির ভেতরেই থাকে। সব উত্তর অন্য মানুষের কাছে খুঁজবেন না।”
১. বন্ধ আলমারির চাবি
অনির্বাণের বাড়িটি উত্তর কলকাতার এক পুরোনো গলির মধ্যে। তিনতলা বাড়ি, লোহার রেলিং, সবুজ রঙের কাঠের জানালা আর উঠোনের মাঝখানে একটি তুলসীমঞ্চ। বাড়িটির মালিক ছিল তার ঠাকুরদার পরিবার। এখন সেখানে থাকে অনির্বাণ এবং তার বাবা অরুণাভ মুখোপাধ্যায়।
বাড়ির দোতলায় একটি ঘর আছে, যেটি বিশ বছর ধরে বন্ধ।
সেই ঘরেই থাকতেন অনির্বাণের মা।
মায়ের মৃত্যুর পর অরুণাভ ঘরটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অনির্বাণ বহুবার জানতে চেয়েছে, কেন ঘরটি খোলা হয় না। প্রতিবারই বাবা একই উত্তর দিয়েছেন—“ওখানে পুরোনো জিনিস আছে। ধুলো জমেছে। দরকার নেই।”
কিন্তু অনির্বাণ জানত, বিষয়টা শুধু ধুলো বা পুরোনো আসবাবের নয়।
কারণ ছোটবেলায় সে একবার সেই ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে মায়ের কণ্ঠ শুনেছিল।
মা তখন বলেছিলেন, “অনু, জানালাটা বন্ধ কোরো না। ও ফিরে আসবে।”
অনির্বাণ ভেবেছিল, মা হয়তো তার সঙ্গেই কথা বলছেন। কিন্তু দরজা খুলে সে দেখেছিল, ঘরের মধ্যে কেউ নেই।
সেদিনের পর থেকেই ঘরটি বন্ধ।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে অনির্বাণ নীল খামটি টেবিলের ওপর রাখল। বাবা তখন বসার ঘরে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
“বাবা, একটা অদ্ভুত চিঠি এসেছে।”
অরুণাভ খবরের কাগজ নামালেন।
“কার চিঠি?”
“জানি না। আমার নাম লেখা আছে। কিন্তু চিঠির সিল বিশ বছর আগের।”
“ফেলে দাও।”
উত্তরটা এত দ্রুত এল যে অনির্বাণ অবাক হয়ে গেল।
“চিঠিটা না পড়েই ফেলে দিতে বলছ কেন?”
“কারণ পুরোনো চিঠি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।”
“কিন্তু এটা আমার নামে।”
অরুণাভ উঠে দাঁড়ালেন।
“অনির্বাণ, আমি বলেছি চিঠিটা ফেলে দাও।”
বাবার গলায় এমন কঠোরতা অনির্বাণ আগে খুব কম শুনেছে। তিনি সাধারণত শান্ত স্বভাবের মানুষ। কিন্তু মায়ের প্রসঙ্গ উঠলেই তাঁর আচরণ বদলে যায়।
অনির্বাণ কিছু বলল না।
অরুণাভ নিজের ঘরে চলে যাওয়ার পর সে খামটি হাতে তুলে নিল। খামের ভেতর থেকে খুব ক্ষীণ একটি সুগন্ধ বেরিয়ে আসছিল। চন্দন আর পুরোনো কাগজের মিশ্র গন্ধ।
এই গন্ধ তার পরিচিত।
মায়ের আলমারিতে রাখা শাড়িগুলো থেকে এমন গন্ধ আসত।
খামটি খোলার জন্য সে টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটি ছোট ছুরি বের করল। কিন্তু খাম কাটার আগেই তার চোখ পড়ল খামের মুখে আঠার নিচে লুকিয়ে থাকা একটি চাবির মাথায়।
খামটি সাবধানে ছিঁড়ে খুলতেই বেরিয়ে এল একটি ছোট পিতলের চাবি।
চাবির সঙ্গে বাঁধা কাগজে লেখা—
“যে ঘরে জানালা খোলা থাকে, সেই ঘরেই সত্যি ঘুমিয়ে আছে।”
অনির্বাণের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
মায়ের বন্ধ ঘর।
২. চিঠির প্রথম পাতা
রাত তখন সাড়ে দশটা।
বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। অনির্বাণ নিঃশব্দে দোতলায় উঠল। করিডরের শেষ প্রান্তে মায়ের ঘর। দরজায় পুরোনো তালা। সে পিতলের চাবিটি তালায় ঢোকাল।
খট করে শব্দ হল।
দরজা খুলে গেল।
ঘরের ভেতর ঢুকতেই ধুলোর গন্ধ নাকে এল। জানালার পর্দা এখনও আগের মতোই ঝুলছে। কাঠের টেবিল, বইয়ের তাক, ড্রেসিং টেবিল—সবকিছু যেন সময়ের মধ্যে আটকে আছে।
কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে।
জানালাটি খোলা।
অথচ বাইরে থেকে লোহার শিক লাগানো। এত বছর ধরে বন্ধ থাকা ঘরে জানালাটি কে খুলল?
অনির্বাণ ধীরে ধীরে জানালার কাছে গেল। বাইরে গলির আলো পড়েছে। জানালার পাশে রাখা একটি ছোট কাঠের বাক্সের ওপর তার চোখ পড়ল। বাক্সটি সে আগে কখনও দেখেনি।
বাক্সের ঢাকনায় খোদাই করা—‘মধু’।
মায়ের ডাকনাম।
সে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো ছবি, একটি ডায়েরি এবং ভাঁজ করা চিঠি। ছবিগুলোর মধ্যে একটি ছবিতে তার মা এক যুবকের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। যুবকটি অনির্বাণের বাবা নন। তার বয়স তখন সম্ভবত পঁচিশ বা ছাব্বিশ। মুখে হালকা দাড়ি, চোখে গভীর বিষণ্ণতা।
ছবির পেছনে লেখা—
“যদি কোনো দিন ফিরে আসতে পারি, এই জানালার সামনে দাঁড়াব। —সৌম্য, ২০০৫।”
অনির্বাণ নামটা উচ্চারণ করল।
“সৌম্য?”
সে লোকটিকে কখনও দেখেনি। কিন্তু ছবির পেছনের লেখাটি পড়ে মনে হল, তার মা লোকটিকে খুব ভালোভাবে চিনতেন।
ডায়েরিটি খুলতেই প্রথম পাতায় লেখা পেল—
“অনু যখন এই ডায়েরি পড়বে, তখন হয়তো আমি আর তার পাশে থাকব না। আমি চাই না, সে আমাকে ভুল বুঝুক। কিন্তু তার কাছে সত্যিটা পৌঁছতেই হবে। কারণ আমার মৃত্যুর গল্পটি সম্পূর্ণ সত্য নয়।”
অনির্বাণের হাত কেঁপে উঠল।
মায়ের মৃত্যুর গল্পটি সম্পূর্ণ সত্য নয়!
সে তাড়াতাড়ি পরের পাতা খুলল।
“১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬।
আজ সৌম্যর কাছ থেকে শেষ চিঠিটা পেলাম। সে লিখেছে, আর মাত্র কয়েক দিন। তারপর সে ফিরে আসবে। কিন্তু আমি জানি, এই বাড়িতে তার ফিরে আসা সহজ হবে না। অরুণাভ সব জেনে গেছে। সে বলেছে, সৌম্য যদি এই বাড়িতে আসে, তাহলে অনুর জীবন বিপন্ন হবে।
আমি জানি না, কাকে বিশ্বাস করব।
একদিকে আমার অতীত, অন্যদিকে আমার সন্তান।
আমি শুধু চাই, অনু যেন বড় হয়ে নিজের জীবনের সত্যিটা জানতে পারে।”
অনির্বাণ ডায়েরি বন্ধ করে দিল।
তার মায়ের অতীতের সঙ্গে সৌম্য নামে এক ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল। বাবা সেই সম্পর্কের কথা জানতেন। আর সেই কারণেই কি ঘরটি বন্ধ করে রেখেছিলেন?
কিন্তু চিঠিটি বিশ বছর আগে পাঠানো হয়েছিল। সেই সময় অনির্বাণের বয়স ছিল মাত্র দশ বছর।
তার মা কি জানতেন, তিনি মারা যাবেন?
আর যদি জানতেন, তবে কেন?
হঠাৎ করিডর থেকে পায়ের শব্দ এল।
অনির্বাণ দ্রুত ডায়েরি বন্ধ করে তাকের আড়ালে সরে দাঁড়াল।
দরজার সামনে তার বাবা এসে দাঁড়িয়েছেন।
অরুণাভ ঘরের ভেতর ঢুকে প্রথমেই জানালার দিকে তাকালেন। তারপর ধীরে ধীরে কাঠের বাক্সটির কাছে গেলেন।
বাক্সটি খোলা দেখে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“অনির্বাণ,” তিনি নিচু গলায় ডাকলেন, “তুই এখানে আছিস?”
অনির্বাণ আর লুকিয়ে থাকতে পারল না।
“হ্যাঁ, বাবা।”
অরুণাভ ঘুরে দাঁড়ালেন।
“তুই ঘরটা খুলেছিস?”
“হ্যাঁ। চাবিটা চিঠির মধ্যে ছিল।”
বাবা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন।
“তাহলে সময় এসে গেছে।”
“কিসের সময়?”
অরুণাভ চোখ বন্ধ করলেন।
“তোর মায়ের সত্যিটা জানার সময়।”
৩. বাবার স্বীকারোক্তি
অরুণাভ অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর কথা বলতে শুরু করলেন।
“তোর মা মধুমিতাকে আমি ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। বিয়ের আগে তার জীবনে সৌম্য নামে একজন ছিল। তারা একে অপরকে ভালোবাসত। কিন্তু সৌম্য হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যায়। মধুমিতা ভেবেছিল, সে আর ফিরবে না। তারপর আমাদের বিয়ে হয়।”
অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল।
“তাহলে মা কি বাবার সঙ্গে সুখী ছিলেন না?”
অরুণাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“সুখী ছিলেন। অন্তত আমি তাই বিশ্বাস করতাম। তোর জন্মের পর মধুমিতা তোকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিল। আমি কখনও তার অতীত নিয়ে প্রশ্ন করিনি। কিন্তু ২০০৫ সালের শেষদিকে একটা চিঠি আসে। সৌম্য ফিরে আসতে চাইছে।”
“তারপর?”
“আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, সে ফিরে এলে মধুমিতা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। আমি তাকে চিঠিটা দেখাইনি। কিন্তু সে নিজেই অন্যভাবে খবর পেয়ে যায়।”
“আপনি চিঠি লুকিয়ে রেখেছিলেন?”
“হ্যাঁ। এটা আমার ভুল ছিল।”
অনির্বাণের গলায় ক্ষোভ জমল।
“তাহলে মায়ের ডায়েরিতে লেখা, আপনি বলেছিলেন সৌম্য এলে আমার বিপদ হবে। কেন বলেছিলেন?”
অরুণাভ মাথা নিচু করলেন।
“কারণ সৌম্য শুধু মধুমিতার পুরোনো প্রেমিক ছিল না। সে এমন একটি সত্য জানত, যা তোর জীবন বদলে দিতে পারত।”
“কী সত্য?”
অরুণাভ ঠোঁট কামড়ে ধরলেন।
“আমি এখনও জানি না, সেটা তোকে বলা উচিত কি না।”
“আমার নামে চিঠি এসেছে। মায়ের ঘর বিশ বছর ধরে বন্ধ ছিল। আপনি আমাকে সত্যিটা না বললে আমি নিজেই খুঁজে বের করব।”
বাবা ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে ক্লান্তি।
“সৌম্য নিখোঁজ হওয়ার আগে মধুমিতাকে একটা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সে ফিরে এলে তাদের জীবনের একটি অসমাপ্ত অধ্যায় শেষ করবে। কিন্তু সেই অধ্যায়ের সঙ্গে তোর জন্মের সম্পর্ক ছিল।”
“আমার জন্মের সম্পর্ক?”
“তুই জন্মানোর আগে মধুমিতা কয়েক মাসের জন্য কলকাতার বাইরে ছিল। সে কোথায় ছিল, কেন ছিল—এসব কথা সে আমাকে কখনও বিস্তারিত বলেনি। আমি শুধু জানতাম, তোর জন্মের পর তার মনে একটা ভয় কাজ করত। মাঝেমধ্যে সে ঘুমের মধ্যে বলত, ‘ও যদি ফিরে আসে, অনুকে নিয়ে যাবে।’”
অনির্বাণের মনে হল, ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
“সৌম্য কি আমার বাবা?”
প্রশ্নটা শুনে অরুণাভ যেন পাথর হয়ে গেলেন।
তিনি অনেকক্ষণ কোনো উত্তর দিলেন না।
শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে বললেন, “আমি জানি না।”
অনির্বাণের বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে গেল।
“আপনি জানেন না?”
“আমি তোর বাবা কি না, সেটা নিয়ে আমার কখনও সন্দেহ ছিল না। তোকে আমি নিজের সন্তান হিসেবে বড় করেছি। তোর অসুখে রাত জেগেছি, স্কুলে নিয়ে গেছি, তোর প্রতিটি জন্মদিনে পাশে থেকেছি। কিন্তু মধুমিতা তার অতীতের যে অংশটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল, তার সবটা আমি জানতাম না।”
অনির্বাণ বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
সারা জীবন যে মানুষটিকে সে নিজের বাবা বলে জেনেছে, সেই মানুষটির চোখে আজ এমন অসহায়তা, যা সে আগে কখনও দেখেনি।
“তাহলে সত্যিটা খুঁজে বের করতেই হবে,” অনির্বাণ বলল।
অরুণাভ মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—সত্যি জানতে গিয়ে যেন ভালোবাসাকে ভুলে যাস না। মানুষ সব সময় রক্তের সম্পর্ক দিয়ে পরিবার তৈরি করে না। কখনও কখনও সম্পর্ক তৈরি হয় পাশে থাকার মধ্য দিয়ে।”
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে ডাকপিয়নের ঘণ্টার মতো একটা শব্দ হল।
টিং!
দুজনেই চমকে উঠল।
দরজার নিচ দিয়ে আরেকটি খাম ভেতরে ঢুকে এসেছে।
এবার খামটি সাদা।
তার ওপর লেখা—
“অনির্বাণের হাতে পৌঁছবে ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬।”
তারিখটি আজকের।
অনির্বাণ খামটি খুলল। ভেতরে একটি ছোট্ট কাগজ।
তাতে লেখা—
“সৌম্য বেঁচে আছে। সে আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় শোভাবাজারের পুরোনো ঘাটে অপেক্ষা করবে। একা এসো। তোমার বাবাকে সঙ্গে আনবে না।”
নিচে স্বাক্ষর—
“মা।”
অনির্বাণের হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
“বাবা,” সে ফিসফিস করে বলল, “মা যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে এই চিঠি পাঠালেন কে?”
অরুণাভ কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
জানালার বাইরে তখন হালকা বাতাস বইছে। পর্দা ধীরে ধীরে দুলছে।
আর জানালার কাচে এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল একজন মহিলার মুখ।
মধুমিতা মুখোপাধ্যায়ের মুখ।
তিনি মৃদু হাসলেন।
তারপর মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারে।
চলবে…