Categories
গল্প বিবিধ

মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা রং।

বিষ্ণুপুর থেকে কিছুটা দূরে ছিল শালবন নামে একটি ছোট্ট গ্রাম। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করতেন। তবে একসময় এই গ্রামের পরিচিতি ছিল মাটির তৈরি রঙিন ফলক ও নকশাদার অলংকরণের জন্য। গ্রামের পুরোনো বাড়িগুলির দেওয়ালে, মন্দিরের প্রবেশপথে এবং কিছু ঐতিহ্যবাহী দালানে আজও সেই শিল্পের চিহ্ন দেখা যেত।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। যাঁরা এই কাজ জানতেন, তাঁদের অনেকেই মারা গিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের কেউ কেউ কাজটি শিখলেও নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা না থাকায় অন্য পেশায় চলে গিয়েছিল।

সেই গ্রামের মেয়ে তিথি ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসত। দেওয়ালে, খাতায়, এমনকি উঠোনের ধুলোতেও সে নকশা আঁকত। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। মেয়ের প্রতিভায় তিনি খুশি হলেও মনে মনে চিন্তা করতেন, ছবি এঁকে কি সত্যিই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়?

তিথি অবশ্য নিজের স্বপ্ন নিয়ে খুব একটা কথা বলত না। সে জানত, শুধু স্বপ্ন দেখলে হবে না, নিজের কাজের মূল্যও প্রমাণ করতে হবে।

একদিন বর্ষার পরে গ্রামের পুরোনো পুকুরপাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে একটি ভাঙা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়িটির একাংশ অনেক দিন ধরে পরিত্যক্ত ছিল। চারদিকে আগাছা, দেওয়ালে শ্যাওলা, আর ভাঙা চালের নিচে জমে থাকা শুকনো পাতা।

বাড়িটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার চোখে পড়ল মাটির মধ্যে অর্ধেক ঢাকা একটি ছোট্ট রঙিন টুকরো।

তিথি নিচু হয়ে সেটি তুলে নিল।

টুকরোটি ছিল পোড়ামাটির। তার গায়ে লালচে বাদামি রঙের ওপর নীল, হলুদ ও সাদা রঙে আঁকা ছিল একটি অদ্ভুত নকশা। নকশাটির একাংশ ভেঙে গিয়েছিল, তবু তার সৌন্দর্য স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।

তিথি বিস্ময়ে টুকরোটির দিকে তাকিয়ে রইল।

এমন শিল্প সে আগে দেখেছে, কিন্তু এত সূক্ষ্ম নকশা খুব কমই দেখেছে।

পরদিন সে টুকরোটি নিয়ে গেল গ্রামের প্রবীণ শিল্পী নীলমাধব পালের কাছে। তিনি একসময় পোড়ামাটির ফলক তৈরি করতেন। বয়সের কারণে এখন আর নিয়মিত কাজ করেন না। তাঁর বাড়ির এক কোণে এখনও কয়েকটি পুরোনো সরঞ্জাম যত্ন করে রাখা ছিল।

তিথি টুকরোটি দেখাতেই বৃদ্ধের মুখ বদলে গেল।

তিনি সেটিকে হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “এটা সাধারণ মাটির টুকরো নয়, মা। এই নকশা আমাদের গ্রামের পুরোনো শিল্পীদের হাতের কাজ হতে পারে।”

তিথি জিজ্ঞাসা করল, “এত সুন্দর জিনিস মাটির নিচে পড়ে ছিল কেন?”

নীলমাধববাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কারণ আমরা অনেক সময় যে জিনিসের মূল্য বুঝি, সেটাকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করি না। একসময় আমাদের গ্রামে বহু মানুষ এই কাজ করতেন। তারপর বাজার বদলাল, মানুষের চাহিদা বদলাল, আর শিল্পীরা অন্য কাজ খুঁজতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে কাজের কৌশলও হারিয়ে যেতে লাগল।”

তিথির মনে প্রশ্ন জাগল—যে শিল্প একসময় এত মানুষের জীবিকার অংশ ছিল, তাকে কি আবার নতুন করে পরিচিত করা যায় না?

সেদিন থেকেই তার অনুসন্ধান শুরু হলো।

১. রঙের রহস্য

পরের কয়েক সপ্তাহ তিথি গ্রামের পুরোনো বাড়ি, মন্দির এবং সংরক্ষিত স্থাপনার দেওয়ালে থাকা নকশাগুলি দেখতে লাগল। সে ছবি তুলত, খাতায় নকশা আঁকত এবং কোথায় কোন ধরনের অলংকরণ রয়েছে, তার বিবরণ লিখে রাখত।

তবে সে কোনও পুরোনো স্থাপনার গায়ে হাত দিত না। নীলমাধববাবু তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার সময় সাবধান থাকা দরকার। অনুমতি ছাড়া কোনও অংশ খুঁড়ে তোলা বা রং ঘষে পরীক্ষা করা উচিত নয়।

তিথি তাই নিজের পাওয়া ছোট্ট টুকরোটির বিষয়েও গ্রামের প্রবীণদের সঙ্গে আলোচনা করল। তাঁরা জানালেন, বাড়িটির মালিকানা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া দরকার। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন বা প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিতে হবে।

এদিকে নীলমাধববাবু তাকে পুরোনো নকশার কয়েকটি নমুনা দেখালেন। সেগুলির মধ্যে ছিল পদ্মফুল, লতাপাতা, পাখি, জ্যামিতিক রেখা এবং লোককথার চরিত্র।

তিথি জিজ্ঞাসা করল, “এই রংগুলো কীভাবে তৈরি হতো?”

বৃদ্ধ বললেন, “সব রং একভাবে তৈরি হতো না। মাটি, পোড়ানোর তাপমাত্রা, ব্যবহৃত উপাদান—সবকিছুর ওপর ফল নির্ভর করত। কিছু পদ্ধতি আমরা জানি, কিছু পদ্ধতি এখন আর ঠিকমতো মনে নেই।”

“তাহলে সেগুলো আবার শেখা যাবে?”

“শেখা যাবে কি না, তা জানতে গবেষণা করতে হবে। পুরোনো জিনিস দেখে আন্দাজ করে সবকিছু বানানো যায় না।”

তিথি বুঝল, শুধু সুন্দর ছবি আঁকতে জানলেই হবে না। এই শিল্পকে জানতে হলে ইতিহাস, উপকরণ এবং কারিগরি পদ্ধতি সম্পর্কেও শিখতে হবে।

সে বই পড়তে শুরু করল। শিল্পকলার শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। মাটির কাজ করেন এমন কয়েকজন কারিগরের কাছেও গেল। প্রত্যেকের কাছ থেকে কিছু না কিছু শিখতে লাগল।

২. একটি নতুন পরিকল্পনা

একদিন তিথি নীলমাধববাবুর বাড়িতে গিয়ে বলল, “আমরা যদি গ্রামের পুরোনো নকশাগুলি নিয়ে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করি?”

বৃদ্ধ অবাক হলেন।

“প্রদর্শনী করবে কী দিয়ে? তোমার কাছে তো কয়েকটি আঁকা ছবি ছাড়া আর কিছু নেই।”

তিথি বলল, “আমরা প্রথমে পুরোনো শিল্পের ছবি, নকশার নথি এবং শিল্পীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু করতে পারি। পাশাপাশি নতুন করে কিছু নমুনাও তৈরি করা যায়। তবে সবকিছু মূল ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হবে না। নতুন কাজ হলে সেটাকে নতুন কাজ বলেই দেখাব।”

নীলমাধববাবু মুগ্ধ হয়ে তাকালেন।

“তুই ঠিক কথা বলেছিস। পুরোনোকে বাঁচাতে হলে সত্যিটাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হয়।”

তিথি গ্রামের কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সঙ্গে কথা বলল। তাদের মধ্যে কেউ কম্পিউটারে ভালো, কেউ ছবি আঁকতে পারে, কেউ আবার অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজে দক্ষ।

তারা একটি ছোট দল তৈরি করল। দলের কাজ ভাগ করা হলো তিনটি অংশে—পুরোনো নকশার তথ্য সংগ্রহ, নতুন নমুনা তৈরি এবং প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা।

তারা গ্রামের পঞ্চায়েত ও স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনের কাছে প্রস্তাব দিল। প্রাথমিকভাবে একটি ছোট ঘর ব্যবহার করার অনুমতি পাওয়া গেল। ঘরটি ছিল পুরোনো সমবায় ভবনের একটি অব্যবহৃত কক্ষ, যা পরিষ্কার করে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা সম্ভব ছিল।

কিন্তু অর্থের সমস্যা থেকেই গেল।

কাগজ, রং, মাটির নমুনা, আলো, প্রদর্শনীর বোর্ড—সবকিছুর জন্য টাকা লাগবে। দলটির কারও কাছে বড় অঙ্কের অর্থ ছিল না।

তখন তিথি একটি সহজ উপায় বের করল। সে সিদ্ধান্ত নিল, প্রথমে খুব ছোট পরিসরে কাজ হবে। গ্রামের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করবেন। প্রতিটি খরচের হিসাব লিখে রাখা হবে, আর যে অর্থ আসবে ও যে অর্থ খরচ হবে, তা সবার সামনে পরিষ্কারভাবে জানানো হবে।

গ্রামের কয়েকজন এগিয়ে এলেন। কেউ কাগজ দিলেন, কেউ পুরোনো টেবিল, কেউ আবার ঘর পরিষ্কারের জন্য শ্রম দিলেন।

একজন বৃদ্ধা তাঁর বাড়িতে যত্ন করে রাখা পুরোনো নকশার একটি ছবি নিয়ে এসে বললেন, “এটা আমার শ্বশুরমশাইয়ের সময়কার। মূল জিনিসটি নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু ছবিটা আছে। তোমরা চাইলে এর প্রতিলিপি তৈরি করতে পারো।”

তিথি ছবিটি হাতে নিয়ে বুঝল, মানুষের স্মৃতির মধ্যেও কত ইতিহাস লুকিয়ে থাকে।

৩. প্রথম ব্যর্থতা

সবকিছু এগোচ্ছিল, এমন সময় প্রথম বড় সমস্যাটি দেখা দিল।

তিথি ও তার বন্ধুদের তৈরি করা কয়েকটি নতুন মাটির ফলক পোড়ানোর পর ফেটে গেল। কিছু ফলকের রংও প্রত্যাশামতো থাকল না। অনেক পরিশ্রম করে বানানো নকশাগুলি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দলের সদস্যরা হতাশ হয়ে পড়ল।

একজন বলল, “আমাদের দিয়ে হবে না। পুরোনো শিল্পীরা যে কাজ করতেন, সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

আরেকজন বলল, “প্রদর্শনীর দিন পিছিয়ে দিই। এত ভুল নিয়ে মানুষের সামনে যাওয়া ঠিক হবে না।”

তিথিও মন খারাপ করেছিল। সে ভেবেছিল, আঁকার দক্ষতা থাকলেই মাটির কাজে সফল হওয়া যাবে। এখন বুঝতে পারছিল, বাস্তব কাজের জটিলতা অনেক বেশি।

নীলমাধববাবু ফলকগুলি দেখে বললেন, “ব্যর্থ হওয়া মানে সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। তবে একই ভুল বারবার করলে শেখা হয় না। কোথায় সমস্যা হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করতে হবে।”

তাঁরা অভিজ্ঞ একজন মৃৎশিল্পীর সাহায্য নিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, মাটি প্রস্তুত করা, শুকোনোর সময়, ফলকের পুরুত্ব এবং পোড়ানোর পদ্ধতিতে ভুল থাকলে ফাটল ধরতে পারে। শুধু রং লাগালেই ফলক তৈরি হয় না।

দলটি নতুন করে কাজ শুরু করল। এবার তারা প্রথমে ছোট নমুনা তৈরি করল। প্রতিটি নমুনার মাটির ধরন, শুকোনোর সময় এবং ফলাফল লিখে রাখল। নিরাপদভাবে ও অভিজ্ঞ কারিগরের তত্ত্বাবধানে কাজ করে তারা ধীরে ধীরে নিজেদের ভুল কমাতে পারল।

সব ফলক নিখুঁত হলো না। কিন্তু কিছু নমুনা সুন্দরভাবে তৈরি হলো। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলটি বুঝতে পারল—শিল্প শুধু প্রতিভার বিষয় নয়, নিয়মিত অনুশীলন, ধৈর্য এবং অভিজ্ঞতা থেকেও দক্ষতা তৈরি হয়।

৪. প্রদর্শনীর দিন

অবশেষে নির্ধারিত দিনে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। ঘরের এক পাশে রাখা হলো পুরোনো নকশার প্রতিলিপি ও ছবি। অন্য পাশে সাজানো হলো নতুন তৈরি মাটির ফলক। প্রতিটি নমুনার সঙ্গে লেখা ছিল সেটি কীভাবে তৈরি হয়েছে, কোথায় পুরোনো নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া হয়েছে এবং কোন অংশটি সম্পূর্ণ নতুন।

দরজার কাছে একটি বোর্ডে লেখা ছিল—

“ঐতিহ্যকে ভালোবাসা মানে শুধু অতীতকে মনে রাখা নয়, তার সত্যিকারের পরিচয়কে সম্মান করে ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করা।”

প্রথম দিকে দর্শক খুব বেশি আসেনি। তিথির বুকের ভেতর চাপা দুশ্চিন্তা কাজ করছিল। এত দিন ধরে পরিশ্রম করার পর যদি মানুষ আগ্রহই না দেখায়?

কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্রামের স্কুলের শিক্ষক, কয়েকজন প্রবীণ মানুষ এবং আশপাশের গ্রামের দর্শকেরা আসতে শুরু করলেন।

একজন শিল্পকলার শিক্ষক একটি নকশা দেখে বললেন, “এখানে রেখাগুলির পুনরাবৃত্তি খুব সুন্দরভাবে ধরা হয়েছে। তবে এটাকে পুরোনো আসল ফলক বলে দেখানো হয়নি, সেটাই ভালো লেগেছে। তোমরা কোথা থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছ, তা পরিষ্কার করে লিখেছ।”

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নতুন ফলকগুলির কয়েকটি কিনতে আগ্রহ দেখালেন। তবে তিনি শর্ত দিলেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি পরিমাণে তৈরি করতে হবে।

তিথি বিনয়ের সঙ্গে বলল, “আমরা চেষ্টা করব, কিন্তু আগে মান বজায় রাখা শিখতে হবে। শুধু বেশি তৈরি করার জন্য তাড়াহুড়ো করলে কাজের ক্ষতি হবে।”

ব্যবসায়ী তার উত্তরে সন্তুষ্ট হলেন। তিনি জানালেন, মান বজায় থাকলে ভবিষ্যতে আবার আলোচনা করা যাবে।

প্রদর্শনীর শেষে নীলমাধববাবুকে কয়েকটি কথা বলার অনুরোধ করা হলো।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ালেন।

“আমি বহু বছর ধরে এই কাজ করেছি। তারপর একসময় মনে হয়েছিল, আর কেউ এই শিল্পের কথা জানতে চাইবে না। আজ এই ছেলেমেয়েদের দেখে বুঝলাম, কোনও শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু পুরোনো মানুষদের স্মৃতি যথেষ্ট নয়। নতুনদের প্রশ্ন করতে হবে, শিখতে হবে, আবার নিজেদের মতো করে কাজও করতে হবে।”

তিনি একটু থেমে তিথির দিকে তাকালেন।

“তবে একটা কথা মনে রেখো—ঐতিহ্যকে নতুন করে পরিচিত করতে গিয়ে তার সত্যিটা যেন হারিয়ে না যায়।”

সবাই হাততালি দিল।

তিথির চোখে আনন্দের জল এসে গেল। সে বুঝল, এই প্রদর্শনী শুধু তার নিজের সাফল্য নয়। গ্রামের বহু মানুষের স্মৃতি, সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা একসঙ্গে এসে এখানে জায়গা করে নিয়েছে।

৫. রঙের নতুন ঠিকানা

প্রদর্শনীর পর দলটির কাজ থেমে গেল না। তারা পুরোনো নকশাগুলির ছবি ও বিবরণ সুশৃঙ্খলভাবে সংরক্ষণ করতে শুরু করল। যাঁদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনুমতি ও পরিচয় যথাসম্ভব নথিভুক্ত করা হলো। কোনও নকশার উৎস নিশ্চিত না হলে সেটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক নিদর্শন বলে প্রচার করা হলো না।

তারা স্থানীয় বিদ্যালয়ে ছোট কর্মশালার আয়োজন করল। সেখানে শিশুদের মাটির কাজ শেখানো হতো, পাশাপাশি বোঝানো হতো কেন পুরোনো স্থাপনা ভাঙা, ঘষে পরিষ্কার করা বা অনুমতি ছাড়া কোনও অংশ তুলে নেওয়া উচিত নয়।

নীলমাধববাবু সপ্তাহে একদিন এসে তাদের কাজ দেখতেন। কখনও কোনও রেখা কীভাবে আঁকতে হয় তা শেখাতেন, কখনও নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতেন।

তিথির বাবা একদিন প্রদর্শনীর ঘরে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। মেয়ের তৈরি ফলকগুলির দিকে তাকিয়ে তাঁর মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠল।

তিনি বললেন, “আমি আগে ভাবতাম, ছবি আঁকা শুধু শখ। এখন বুঝছি, মন দিয়ে শিখলে এই কাজেরও মূল্য আছে। তবে তুই যেন নিজের কাজের সম্মান বজায় রাখিস।”

তিথি বাবার হাত ধরল।

“তোমার কথাটা মনে রাখব।”

কয়েক মাস পরে দলটি ছোট পরিসরে নতুন কাজ বিক্রি করতে শুরু করল। তারা প্রতিটি পণ্যে কাজের বিবরণ ও মূল্য স্পষ্ট করে দিত। পুরোনো নিদর্শনের প্রতিলিপি এবং নতুন নকশার কাজ আলাদা করে চিহ্নিত করত। আয় থেকে কিছু অর্থ উপকরণ কেনার জন্য রাখা হতো, আর কিছু অর্থ প্রশিক্ষণ ও নথি সংরক্ষণের কাজে ব্যয় করা হতো।

গ্রামের মানুষও বুঝতে শুরু করলেন, শিল্পের মূল্য শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্যে নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, শ্রম, জ্ঞান এবং পরিচয়।

একদিন বিকেলে তিথি আবার সেই পুরোনো বাড়িটির পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। বাড়িটি এখনও পরিত্যক্ত, কিন্তু এখন তার মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং ভাঙা অংশগুলিকে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাটির মধ্যে পড়ে থাকা সেই রঙিন টুকরোটির কথা তার মনে পড়ল।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল, কত রংই তো মানুষের চোখের আড়ালে হারিয়ে যায়। সব রংকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, সব ইতিহাসও সম্পূর্ণ জানা যায় না। কিন্তু যা জানা যায়, তাকে যত্ন করে সংরক্ষণ করা যায়। আর যা হারিয়ে গেছে, তার খোঁজ করতে গিয়ে নতুন প্রজন্ম নিজের পথও খুঁজে পেতে পারে।

তার হাতে তখন একটি ছোট্ট নতুন ফলক। তাতে আঁকা ছিল একটি পদ্মফুল, যার চারপাশে ছড়িয়ে ছিল সূক্ষ্ম রেখার নকশা।

তিথি জানত, এই ফলকটি কোনও হারিয়ে যাওয়া অতীতের হুবহু প্রতিরূপ নয়। এটি তার শেখা, দেখা এবং কল্পনার মিলনে তৈরি একটি নতুন সৃষ্টি।

আর সেই সত্যিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিচ্ছিল।

নৈতিক শিক্ষা: অতীতের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে শুধু আবেগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জ্ঞান, গবেষণা, সততা ও যত্ন। ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং পুরোনো অভিজ্ঞতাকে সম্মান করে নতুন প্রজন্ম নিজেদের সৃষ্টিশীলতায় হারিয়ে যেতে বসা শিল্পকে নতুন পরিচিতি দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *