শীতের সকাল। গ্রামের চারপাশে তখনও কুয়াশার পাতলা চাদর। পুকুরের জলে সূর্যের আলো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। দূরের তালগাছগুলোর মাথা কুয়াশার মধ্যে অর্ধেক দেখা যাচ্ছে।
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি ছোট্ট মাটির বাড়ি। বাড়ির উঠোনে সারি সারি মাটির পাত্র, ছোট ছোট প্রদীপ, পুতুল আর নানা রকমের খেলনা।
সেখানেই থাকতেন হরিপদ কুমোর।
বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি। সারাজীবন মাটি নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল মাটির বাঁশি তৈরি করা।
বাঁশি খুব সাধারণ দেখতে।
কিন্তু হরিপদ বলতেন,
—“মাটির বাঁশির শব্দের মধ্যে গ্রামের মাটির গন্ধ আছে।”
তার ছেলে শহরে চাকরি করত। সে চাইত বাবা যেন আর কাজ না করেন।
প্রায়ই ফোন করে বলত,
—“বাবা, আপনার বয়স হয়েছে। কাজটা ছেড়ে আমার কাছে চলে আসুন।”
হরিপদ হেসে বলতেন,
—“আমি শহরে গেলে আমার মাটিগুলো কে দেখবে?”
ছেলে বিরক্ত হয়ে বলত,
—“মাটি কি মানুষ?”
হরিপদ উত্তর দিতেন,
—“যে মাটিতে মানুষ জন্মায়, তাকে মানুষ না ভাবলে মানুষ হওয়া যায় না।”
ছেলে আর কথা বাড়াত না।
হরিপদের নাতনি তুলি ছিল অন্যরকম।
সে দাদুর কাজ খুব পছন্দ করত।
স্কুল থেকে ফিরেই দৌড়ে চলে আসত উঠোনে।
—“দাদু, আজ কী বানাবে?”
—“তুই বল।”
—“একটা পাখি।”
—“পাখি তো কাল বানিয়েছিলাম।”
—“তাহলে একটা ঘোড়া।”
—“ঘোড়াও বানিয়েছি।”
তুলি একটু ভেবে বলত,
—“তাহলে এমন কিছু বানাও, যা আগে কখনও বানাওনি।”
হরিপদ হাসতেন।
—“এটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।”
একদিন তুলি দাদুর কাছে বসে বাঁশির দিকে তাকিয়ে বলল,
—“দাদু, তুমি মাটির বাঁশি বানাও কেন?”
—“কারণ বাঁশি বাজলে মানুষ হাসে।”
—“সব বাঁশি কি বাজে?”
হরিপদ মাথা নাড়লেন।
—“না।”
—“তাহলে?”
—“মাটি ভালো হতে হয়, ছিদ্রের মাপ ঠিক হতে হয়, আগুনের তাপ বুঝতে হয়। একটু ভুল হলেই শব্দ বেরোবে না।”
তুলি বলল,
—“তাহলে একটা বাঁশি বানানোও পরীক্ষা?”
হরিপদ বললেন,
—“জীবনের মতোই।”
কথাটা তুলির মনে গেঁথে গেল।
সেই বছর গ্রামে বড় মেলা বসবে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল গ্রামের কারুশিল্পের প্রদর্শনী।
হরিপদকে বলা হল কিছু মাটির জিনিস নিয়ে যেতে।
তিনি বাঁশি, পুতুল, ঘোড়া আর কয়েকটি ছোট প্রদীপ তৈরি করলেন।
কিন্তু মেলার আগের দিন বিপদ হল।
ভোরে প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল।
উঠোনে রাখা কাঁচা মাটির অনেক জিনিস ভিজে নষ্ট হয়ে গেল।
হরিপদ ছুটে এসে দেখলেন, অর্ধেক কাজ শেষ।
তুলি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“দাদু, সব নষ্ট হয়ে গেল!”
হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“সব নয়।”
তুলি অবাক হয়ে তাকাল।
—“কোথায় আছে?”
হরিপদ ঘরের ভেতর থেকে একটা কাপড়ে মোড়া বাঁশি বের করলেন।
—“এটা।”
বাঁশিটা কয়েকদিন আগে তৈরি করেছিলেন।
কিন্তু এখনও বাজিয়ে দেখেননি।
তুলি বলল,
—“এটা কি বাজবে?”
হরিপদ মৃদু হেসে বললেন,
—“আজ পরীক্ষা হবে।”
তিনি বাঁশিটা ঠোঁটে তুললেন।
ফুঁ দিলেন।
কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।
তুলি হতাশ হয়ে বলল,
—“বাজল না!”
হরিপদ আবার চেষ্টা করলেন।
এবারও শুধু বাতাসের শব্দ।
তৃতীয়বারও একই।
তুলি বলল,
—“দাদু, এটা ফেলেই দাও।”
হরিপদ বাঁশিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ দেখলেন।
তারপর বললেন,
—“না। যে জিনিস একবার ব্যর্থ হয়েছে, তাকে শেষ সুযোগ না দিয়ে ফেলে দিতে নেই।”
তিনি বাঁশির ছিদ্রগুলো পরীক্ষা করলেন।
একটির মাপ সামান্য ভুল।
ছোট্ট বাটালি দিয়ে তিনি সেটি একটু ঠিক করলেন।
আবার ফুঁ দিলেন।
এইবার—
মিষ্টি একটা শব্দ উঠল।
খুব ছোট।
কিন্তু পরিষ্কার।
তুলির চোখ আনন্দে বড় হয়ে গেল।
—“দাদু! বাজছে!”
হরিপদ হাসলেন।
—“দেখলি? একটু ভুল ছিল। তাই বলে বাঁশিটা খারাপ ছিল না।”
পরদিন মেলা বসলো।
চারদিকে মানুষের ভিড়।
হরিপদের স্টলের সামনে তেমন লোক ছিল না।
বড় দোকানগুলোতে রঙিন খেলনা, প্লাস্টিকের পুতুল, আলো জ্বলা গাড়ি—সবকিছুই ছিল।
তুলির মনে হচ্ছিল, দাদুর মাটির জিনিস কেউ কিনবে না।
হঠাৎ এক ছোট্ট ছেলে স্টলের সামনে এসে দাঁড়াল।
তার হাতে ছিল বাবার দেওয়া কয়েকটা টাকা।
সে একটা মাটির বাঁশি তুলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—“কাকু, এটা বাজে?”
তুলি বলল,
—“হ্যাঁ।”
ছেলেটি বলল,
—“কত?”
হরিপদ দাম বললেন।
ছেলেটি টাকা গুনে দেখল।
কিছু টাকা কম।
সে বাঁশিটা নামিয়ে রেখে চলে যেতে লাগল।
হরিপদ ডাকলেন,
—“এই যে, দাঁড়াও।”
ছেলেটি ফিরে তাকাল।
হরিপদ বাঁশিটা তার হাতে দিয়ে বললেন,
—“নাও।”
ছেলেটি অবাক।
—“কিন্তু টাকা কম।”
—“তুই বাজাতে শিখবি। সেটাই দাম।”
ছেলেটির মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সে বাঁশি নিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
তুলি বলল,
—“দাদু, তুমি টাকা নিলে না কেন?”
হরিপদ বললেন,
—“সব জিনিস টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয় না।”
মেলার শেষ বিকেলে সেই ছেলেটি আবার ফিরে এল।
তার সঙ্গে তার বাবা-মা।
ছেলেটি বাঁশিটা বাজানোর চেষ্টা করছিল।
শব্দ ঠিক বেরোচ্ছিল না।
হরিপদ তাকে পাশে বসিয়ে বললেন,
—“জোরে ফুঁ দিস না। আস্তে। বাঁশির সঙ্গে লড়াই করবি না। ওকে সময় দে।”
ছেলেটি চেষ্টা করল।
একটু পর—
ফুঁউউ…
একটা ভাঙা, কাঁপা শব্দ বেরোল।
ছেলেটি আনন্দে চিৎকার করে উঠল।
তুলি হাততালি দিল।
হরিপদ বললেন,
—“এই তো! প্রথম শব্দ।”
ছেলেটির বাবা বললেন,
—“কাকু, আপনি কি ওকে শেখাবেন?”
হরিপদ একটু থেমে বললেন,
—“শেখাব। যদি ও শিখতে চায়।”
সেই ঘটনা থেকেই নতুন কিছু শুরু হল।
মেলার পর গ্রামের আরও কয়েকটি শিশু হরিপদের কাছে আসতে শুরু করল।
কেউ মাটি দিয়ে পুতুল বানাতে চায়।
কেউ বাঁশি।
কেউ ছোট্ট পাখি।
হরিপদ সপ্তাহে দুদিন শিশুদের শেখাতে শুরু করলেন।
তুলি পাশে বসে তাদের সাহায্য করত।
ধীরে ধীরে উঠোনটা ছোট্ট কর্মশালায় পরিণত হল।
একদিন হরিপদের ছেলে শহর থেকে এল।
সে অবাক হয়ে দেখল, বাড়ির উঠোনে দশ-বারোটা শিশু বসে মাটি নিয়ে কাজ করছে।
সে বাবাকে বলল,
—“এগুলো কী হচ্ছে?”
হরিপদ হাসলেন।
—“তোর প্রশ্নের উত্তর তুই নিজেই দেখছিস।”
ছেলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর একটা মাটির বাঁশি হাতে তুলে নিল।
—“এটা কি তুমি বানিয়েছ?”
—“হ্যাঁ।”
ছেলে বাঁশিটা ঠোঁটে তুলল।
ফুঁ দিল।
শব্দ বেরোল না।
তুলি হেসে ফেলল।
হরিপদ বললেন,
—“জোরে নয়। আস্তে।”
ছেলে আবার চেষ্টা করল।
এইবার খুব ক্ষীণ একটা শব্দ বেরোল।
সবাই হেসে উঠল।
হরিপদের ছেলে অনেক বছর পর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
—“বাবা, তুমি ঠিকই বলেছিলে।”
—“কী?”
—“মাটিরও প্রাণ আছে।”
হরিপদ কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।
সন্ধ্যায় যখন সবাই চলে গেল, উঠোনে পড়ে রইল কিছু ভাঙা মাটির পুতুল, অসম্পূর্ণ বাঁশি আর শুকোতে দেওয়া ছোট ছোট মাটির পাখি।
তুলি দাদুকে বলল,
—“দাদু, তোমার বাঁশি এখন অনেকেই বাজাবে।”
হরিপদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আমার বাঁশি নয় রে। আমাদের মাটির গল্প বাজবে।”
দূরে তখন সন্ধ্যার পাখির ডাক।
উঠোনে হালকা বাতাস।
আর হরিপদের কর্মশালার ভেতর থেকে ভেসে এল এক শিশুর প্রথম শেখা বাঁশির সুর।
সুরটা নিখুঁত ছিল না।
কোথাও ভাঙা, কোথাও কাঁপা।
তবু সেই সুরের মধ্যে ছিল নতুন শুরুর আনন্দ।
হরিপদ চোখ বন্ধ করে শুনলেন।
তিনি জানতেন—
একজন কারিগরের আসল সাফল্য নিজের হাতে তৈরি জিনিসের সংখ্যা নয়।
তার হাতে তৈরি জ্ঞান যখন অন্যের হাতে বেঁচে থাকে, তখনই তার কাজ সত্যিকার অর্থে অমর হয়ে যায়।