Categories
গল্প বিবিধ

মাঠের শেষ দৌড়।।

গোপালপুর গ্রামের স্কুলের পেছনে একটা বড় মাঠ ছিল।

মাঠটার চারপাশে কোনো পাঁচিল নেই।

একদিকে ধানখেত, অন্যদিকে কাঁঠালগাছের সারি। বর্ষায় মাঠের অর্ধেকটা জলে ভরে যেত, শীতে শুকিয়ে ফেটে যেত মাটি।

তবু গ্রামের ছেলেমেয়েদের কাছে এই মাঠটাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।

সেখানেই প্রতিদিন বিকেলে দৌড়াত মেঘলা।

মেঘলার বয়স ষোলো।

বাবা দিনমজুর।

মা অন্যের বাড়িতে রান্নার কাজ করেন।

সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু মেঘলার চোখে ছিল অদ্ভুত এক স্বপ্ন।

সে দৌড়াতে চাইত।

শুধু গ্রামের মাঠে নয়।

জেলা পর্যায়ে।

তারপর রাজ্য পর্যায়ে।

একদিন বড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাইত।

কিন্তু গ্রামের অনেকেই হাসত।

কেউ বলত,

—“মেয়েমানুষ আবার দৌড় প্রতিযোগিতা করবে?”

কেউ বলত,

—“এসব করে পেট চলে?”

মেঘলা কোনো উত্তর দিত না।

প্রতিদিন ভোরে উঠে মাঠে যেত।

জুতো ছিল না।

খালি পায়েই দৌড়াত।

তার স্কুলের ক্রীড়াশিক্ষক অরুণবাবু একদিন বললেন,

—“তুই খালি পায়ে এত দৌড়াস কেন?”

মেঘলা বলল,

—“জুতো নেই স্যার।”

অরুণবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

পরদিন তিনি নিজের পুরোনো স্পোর্টস জুতো নিয়ে এলেন।

বললেন,

—“এগুলো আমার ছেলে ব্যবহার করত। এখন ছোট হয়ে গেছে। তুই পর।”

মেঘলা জুতো দুটো হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে জল।

—“স্যার, আমি এটা নষ্ট করব না।”

অরুণবাবু হেসে বললেন,

—“দৌড়ে নষ্ট করবি। সেটাই চাই।”

সেদিন থেকে মেঘলার দৌড় আরও দ্রুত হল।

কিন্তু একদিন বিপদ এল।

বাবা কাজে গিয়ে পায়ে চোট পেলেন।

কয়েক সপ্তাহ কাজ করতে পারবেন না।

সংসারে টাকা নেই।

মেঘলা স্কুল থেকে ফিরে মায়ের পাশে বসে বলল,

—“মা, আমি কি কিছু কাজ করতে পারি?”

মা বললেন,

—“তুই পড়াশোনা কর। তোর বাবার কষ্ট যেন তোর পড়া বন্ধ না করে।”

মেঘলা বলল,

—“কিন্তু সংসার?”

মা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন,

—“তুই দৌড়। তোর দৌড় যদি একদিন আমাদের এই কষ্টের বাইরে নিয়ে যায়, তাহলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় সাহায্য।”

মেঘলা সেদিন আরও জোরে দৌড়াল।

তারপর এল জেলার প্রতিযোগিতার খবর।

মেয়েদের ৮০০ মিটার দৌড়।

প্রথম হলে রাজ্য পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ।

মেঘলা নাম দিল।

কিন্তু যাওয়ার জন্য ভাড়া লাগবে।

বাবার কাছে টাকা নেই।

মেঘলা সিদ্ধান্ত নিল, সে যাবে না।

অরুণবাবু খবর পেয়ে বললেন,

—“কেন যাবি না?”

—“টাকা নেই স্যার।”

—“টাকার জন্য দৌড় থামাবি?”

মেঘলা চুপ।

পরদিন স্কুলের শিক্ষকরা মিলে টাকা জোগাড় করলেন।

কেউ একশো টাকা দিলেন।

কেউ পঞ্চাশ।

কেউ বাসভাড়া দিলেন।

অরুণবাবু বললেন,

—“তুই শুধু দৌড়টা ভালো করে দে।”

প্রতিযোগিতার দিন মেঘলা মাঠে দাঁড়িয়ে দেখল, অন্য মেয়েদের পায়ে দামি জুতো।

তাদের সঙ্গে কোচ আছে।

কারও হাতে পানীয়ের বোতল।

মেঘলার সঙ্গে শুধু অরুণবাবু।

তিনি বললেন,

—“ওদের দিকে তাকাস না। নিজের লাইনের দিকে তাকিয়ে থাক।”

বাঁশি বাজল।

দৌড় শুরু।

প্রথম একশো মিটার মেঘলা মাঝামাঝি ছিল।

দুশো মিটার পর কয়েকজন সামনে চলে গেল।

অরুণবাবু দূর থেকে চিৎকার করলেন,

—“ছন্দ ঠিক রাখ!”

মেঘলা শুনল।

তিনশো মিটার।

চারশো।

পাঁচশো।

তার পা ভারী হয়ে আসছে।

ফুসফুস জ্বলছে।

তবু সে দৌড়াচ্ছে।

শেষ একশো মিটার।

একজন প্রতিযোগী সামনে।

আরেকজন তার পাশে।

মেঘলা মনে মনে বলল,

“মা বল

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *