“তুমি যে জীবনটা বেঁচে আছ, সেটা আসলে আমার জীবন। তোমার মা আমাকে মেরে তোমাকে বাঁচিয়েছিলেন।”
অন্ধকার ঘরের ভেতর কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
ঋত্বিক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে তার মা, অন্যদিকে তার নিজের মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক। দুজনের চোখেই আতঙ্ক। দুজনেই তাকে নিজের কাছে ডাকছে।
কিন্তু কাকে বিশ্বাস করবে সে?
যুবকটি এগিয়ে এসে বলল, “তুমি কি কখনও ভেবেছ, তোমার মা কেন তোমার বাবার ছবি দেখাতেন না? কেন তোমার জন্মদিনে তিনি কখনও আনন্দ করতে পারতেন না? কেন প্রতি বছর আঠারোই অক্টোবর তিনি সারারাত জেগে থাকতেন?”
ঋত্বিকের মনে পড়ল, সত্যিই তো! ছোটবেলায় জন্মদিনের কেক কাটার সময় মা হাসতেন, কিন্তু রাত বারোটার পর তাঁর মুখ বিষণ্ণ হয়ে যেত। কখনও কখনও তিনি নিঃশব্দে কাঁদতেন। ঋত্বিক জিজ্ঞেস করলে বলতেন, পুরোনো কথা মনে পড়ছে।
“তুমি এসব জানলে কীভাবে?” ঋত্বিক প্রশ্ন করল।
যুবকটি মৃদু হাসল।
“কারণ ওই স্মৃতিগুলো আমারও।”
“তুমি কে?”
“আমার নামও ঋত্বিক সেন। তোমার জন্মের বারো বছর আগে আমার জন্ম হয়েছিল। আমি এই বাড়িতে বড় হয়েছি। আমার মা আমাকে গান শোনাতেন, আমার বাবা আমাকে গল্প বলতেন। আমি স্কুলে যেতাম, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম। তারপর এক রাতে সবকিছু বদলে গেল।”
“কীভাবে?”
যুবকটি মায়ের দিকে তাকাল।
“ওঁকে জিজ্ঞেস করো।”
ঋত্বিক মায়ের দিকে ফিরল। কিন্তু তিনি মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন।
“মা, সত্যিটা বলো। আমি আর মিথ্যে শুনতে চাই না।”
মা ধীরে ধীরে মুখ তুললেন।
“তুমি কি সত্যিটা সহ্য করতে পারবে?”
“আমার সতেরো বছরের জীবনে তুমি যা যা গোপন করেছ, তার চেয়ে ভয়ংকর আর কী হতে পারে?”
মা চোখ বন্ধ করলেন।
“তাহলে শোনো।”
সতেরো বছর আগে, শিউলিবাড়িতে বাস করতেন অমিয়েশ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী। তাঁদের নিজের কোনও সন্তান ছিল না। বহু চিকিৎসার পরও সন্তান না হওয়ায় তাঁরা একটি অনাথ শিশুকে দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
সেই শিশুটির নাম ছিল ঋত্বিক।
তার জন্মের নথিতে বাবার নাম লেখা ছিল না। মায়ের পরিচয়ও অজানা। একটি ছোট্ট হাসপাতালের সামনে শিশুটিকে পাওয়া গিয়েছিল। তার সঙ্গে ছিল লাল সুতোয় বাঁধা একটি চিঠি।
চিঠিতে লেখা ছিল—
“যে এই শিশুকে নিজের সন্তান বলে গ্রহণ করবে, সে যেন কখনও তার জন্মের রাত সম্পর্কে প্রশ্ন না করে।”
অমিয়েশ চিঠিটিকে গুরুত্ব দেননি। তিনি শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। মৃণালিনী তাকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে শুরু করেন।
কিন্তু কয়েক মাস পর থেকেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে।
রাতে শিশুটি ঘুমিয়ে পড়লে বাড়ির সমস্ত আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখা যেত না। কখনও দেখা যেত, শিশুটি বিছানায় শুয়ে আছে, অথচ আয়নায় তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি কিশোর।
একদিন মৃণালিনী রান্নাঘরে কাজ করছিলেন। হঠাৎ দোতলার ঘর থেকে শিশুর কান্না শুনে ছুটে গেলেন। দেখলেন, দোলনায় শিশু নেই। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছে বারো বছরের একটি ছেলে।
ছেলেটি তাঁকে দেখে বলেছিল, “মা, আমি ফিরে এসেছি।”
তারপর সে অদৃশ্য হয়ে যায়।
সেদিনের পর থেকে মৃণালিনী বুঝতে পারেন, এই শিশুর জন্মের সঙ্গে এমন একটি রহস্য জড়িয়ে আছে, যা তাঁর জানা নেই।
অমিয়েশ অবশ্য ঘটনাটিকে কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সবকিছুর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাই বাড়ির নিচে একটি গোপন ঘর তৈরি করান। সেখানে সময়, স্মৃতি এবং মানুষের পরিচয় নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।
কিন্তু গবেষণা যত এগোতে থাকে, ততই বাড়িতে অস্বাভাবিক ঘটনা বাড়তে থাকে।
এক রাতে তিনি মৃণালিনীকে বলেছিলেন, “মানুষের জীবন একটাই নয়। প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে অসংখ্য সম্ভাব্য জীবন অপেক্ষা করে। আমরা যদি সেই সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারি, তবে হারিয়ে যাওয়া মানুষকেও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
মৃণালিনী তাঁকে থামাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু অমিয়েশ শোনেননি।
১৮ অক্টোবর, ১৯৮৭।
সেই রাতেই শিউলিবাড়ির নিচের ঘরে পরীক্ষাটি হয়েছিল।
তারপর অমিয়েশ আর কখনও স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ফিরে আসেননি।
“কিন্তু আমি তো ১৯৯৯ সালে জন্মেছি!” ঋত্বিক বলে উঠল।
মৃণালিনী মাথা নাড়লেন।
“তোমার জন্মের তারিখ সেইভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তুমি আসলে কে, তা আমি আজও নিশ্চিতভাবে জানি না।”
যুবকটি হেসে উঠল।
“তুমি জানো, মা। তুমি শুধু স্বীকার করতে চাও না।”
“চুপ কর!” মৃণালিনী কেঁদে উঠলেন। “আমি যা করেছি, তোমাদের বাঁচানোর জন্য করেছি!”
“কাকে বাঁচিয়েছ? আমাকে, না ওকে?”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
ঋত্বিক বুঝতে পারছিল, এখানে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল, যার সম্পূর্ণ সত্য এখনও কেউ বলেনি।
সে মায়ের সামনে দাঁড়াল।
“তুমি কি আমাকে দত্তক নিয়েছিলে?”
মৃণালিনী দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়লেন।
“হ্যাঁ।”
“আর ওই ছেলেটি?”
“সে-ও আমার সন্তান।”
ঋত্বিকের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
“কীভাবে? তুমি তো বলেছিলে, তোমার কোনও সন্তান ছিল না!”
“আমি বলেছিলাম, আমার নিজের গর্ভে কোনও সন্তান জন্মায়নি। কিন্তু ভালোবাসার জন্য জন্মের প্রমাণ লাগে না।”
যুবকটি এগিয়ে এল।
“তাহলে এবার ওকে বলো, সেদিন রাতে কী হয়েছিল।”
মৃণালিনী কাঁপতে লাগলেন।
“আমি চাইনি কেউ মরুক।”
“কিন্তু একজন মারা গিয়েছিল!”
“আমি জানি!”
“তুমি জানো, সে কে ছিল?”
মৃণালিনী উত্তর দিলেন না।
যুবকটি এবার ঋত্বিকের দিকে ফিরল।
“সেদিন রাতের পরীক্ষায় দুজন মানুষ একই ঘরে ছিল। একজন ছিল আমি। অন্যজন ছিল অমিয়েশ চৌধুরী। পরীক্ষার সময় একটা বিস্ফোরণ ঘটে। যখন ধোঁয়া সরে গেল, তখন অমিয়েশ মেঝেতে পড়ে ছিলেন। আর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম তাঁর সামনে।”
ঋত্বিক বলল, “তুমি তাঁকে হত্যা করেছিলে?”
যুবকটি মাথা নাড়ল।
“আমি কিছুই করিনি। কিন্তু সবাই ভেবেছিল, আমি তাঁকে মেরেছি। কারণ তাঁর হাতের মধ্যে ছিল একটি ছুরি, আর আমার জামায় লেগে ছিল রক্ত।”
“তারপর?”
“তারপর মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। বললেন, আমি অমিয়েশকে মেরে ফেলেছি। আমাকে আর কখনও ফিরতে দেওয়া হবে না।”
মৃণালিনী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আমি তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম!”
“কী থেকে? সত্যি থেকে?”
যুবকটির কণ্ঠ ভেঙে গেল।
“আমি তো তোমার সন্তান ছিলাম, মা।”
ঋত্বিকের বুকের ভেতর ব্যথা শুরু হল। সে বুঝতে পারছিল না, এই যুবক সত্যি বলছে, নাকি তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ লোকটি আবার ঘরে ঢুকলেন।
তিনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন, কেউ জানে না।
“সময় শেষ হয়ে আসছে,” তিনি বললেন।
ঋত্বিক তাঁর দিকে ফিরল।
“আপনি সব জানেন, তাই না?”
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন।
“আমি অমিয়েশের বন্ধু ছিলাম। তাঁর গবেষণায় সাহায্য করতাম। কিন্তু সেই রাতে যা ঘটেছিল, তা আমাদের কারও পরিকল্পনায় ছিল না।”
“অমিয়েশ কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?”
বৃদ্ধ একটি চেয়ারে বসলেন।
“অমিয়েশ মারা যাননি।”
ঘরের মধ্যে নীরবতা নেমে এল।
“কী বললেন?”
“যে দেহটি পাওয়া গিয়েছিল, সেটি অমিয়েশের ছিল না। সেটি ছিল এমন একজন মানুষের দেহ, যার কোনও জন্মনিবন্ধন ছিল না, কোনও অতীত ছিল না। সে পরীক্ষাগারের দরজা দিয়ে এসেছিল।”
ঋত্বিকের মাথা ঘুরতে লাগল।
“তাহলে অমিয়েশ কোথায়?”
বৃদ্ধ দেওয়ালের দিকে তাকালেন।
“তিনি দরজার ওপারে।”
“কোন দরজা?”
“যে দরজার ওপাশে তোমার আরেকটি জীবন আটকে আছে।”
যুবকটি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “আপনি সব কথা ঘুরিয়ে বলছেন! ওকে বলুন, কে আসল ঋত্বিক!”
বৃদ্ধ এবার দুজনের দিকে তাকালেন।
“এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না।”
“কেন?”
“কারণ তোমরা দুজনেই সত্যি। একজন জন্মেছে সময়ের এক ধারায়, অন্যজন আরেক ধারায়। তোমাদের স্মৃতি আলাদা, কিন্তু তোমাদের অস্তিত্বের উৎস একই। একজনকে মুছে ফেললে অন্যজনের জীবনও অসম্পূর্ণ হয়ে যাবে।”
ঋত্বিক ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, ব্যাপারটি শুধু তার জন্মপরিচয়ের নয়। এখানে সময়ের এমন একটি জট রয়েছে, যার মধ্যে তার মা, অমিয়েশ এবং এই রহস্যময় যুবক সবাই জড়িয়ে আছেন।
“তাহলে এই জট খুলবে কীভাবে?”
বৃদ্ধ বললেন, “অমিয়েশের শেষ চিঠি পড়ে।”
“চিঠি কোথায়?”
“তোমার পকেটে।”
ঋত্বিক অবাক হয়ে পকেটে হাত দিল। সত্যিই, সেখানে একটি ছোট্ট ভাঁজ করা কাগজ রয়েছে। সে আগে সেটি খেয়াল করেনি।
চিঠিটি খুলতেই ভেতর থেকে একটি চাবি পড়ে গেল।
চাবির মাথায় খোদাই করা—
১৮–১০–১৯৮৭।
চিঠিতে লেখা—
“যে এই চিঠি পড়ছ, সে হয়তো আমার ছেলে, হয়তো আমার তৈরি করা ভুলের ফল।
আমি জানি না, তুমি কোন সময় থেকে এসেছ। কিন্তু যদি তুমি এই বাড়ির নিচের ঘরে পৌঁছোতে পারো, তাহলে বুঝবে, আমার পরীক্ষা সফল হয়েছে—অথবা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
ঘরের শেষ দরজাটি খুললে তুমি আমাকে দেখতে পাবে। কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে আনতে গেলে তোমাদের মধ্যে একজনকে নিজের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি ত্যাগ করতে হবে।
মনে রেখো, মানুষ তার নাম হারালে বেঁচে থাকতে পারে। নিজের অতীত হারালে নতুন জীবন শুরু করতে পারে। কিন্তু যে মানুষ ভালোবাসার স্মৃতি হারায়, সে আর আগের মানুষ থাকে না।
তোমরা দুজনের মধ্যে যে নিজের প্রিয় স্মৃতি ত্যাগ করতে পারবে, সেই দরজাটি খুলবে।
— অমিয়েশ চৌধুরী।”
চিঠি পড়ে ঋত্বিকের হাত কেঁপে উঠল।
“সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি?”
বৃদ্ধ বললেন, “হ্যাঁ।”
যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে বলল, “আমি রাজি।”
ঋত্বিক তার দিকে তাকাল।
“তুমি জানো, কী ত্যাগ করতে হবে?”
যুবকটি মাথা নাড়ল।
“আমি সব হারিয়েছি। আমার কাছে আর কিছু নেই।”
মৃণালিনী ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
“না! তুমি আর কিছু হারাবে না!”
যুবকটি মায়ের হাত সরিয়ে দিল।
“তুমি তো আমাকে সতেরো বছর আগেই হারিয়েছ।”
কথাটি শুনে মৃণালিনী ভেঙে পড়লেন।
ঋত্বিক তাঁর দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু মা তার হাত ধরে থামিয়ে দিলেন।
“তুমি ওর কথা বিশ্বাস কোরো না। ওর সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি এখনও আছে।”
“কোন স্মৃতি?”
মৃণালিনী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “ওর ছোটবেলার শেষ জন্মদিন। সেদিন ওর বাবা ওকে একটি গল্পের বই দিয়েছিলেন। বইটির প্রথম পাতায় লিখেছিলেন—‘আমার ছেলের জন্য, যে একদিন নিজের পথ নিজেই খুঁজে নেবে।’”
যুবকটির চোখে জল এসে গেল।
“মা, তুমি এখনও মনে রেখেছ?”
“মা কি নিজের সন্তানকে ভুলতে পারে?”
ঘরের দেওয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটি হঠাৎ বেজে উঠল।
রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।
বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
“এবার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।”
ঋত্বিক চাবিটি হাতে নিল। ঘরের শেষ প্রান্তে একটি কালো দরজা দেখা যাচ্ছে। দরজার গায়ে কোনও হাতল নেই। মাঝখানে খোদাই করা দুটি নাম—
ঋত্বিক।
অমিয়েশ।
সে দরজার দিকে এগোল।
কিন্তু দরজায় চাবি ঢোকানোর আগেই পেছন থেকে তার মা বলে উঠলেন—
“ঋত্বিক, দাঁড়াও!”
সে ঘুরে তাকাল।
মৃণালিনী এবার আর কাঁদছেন না। তাঁর মুখে এমন এক কঠিন অভিব্যক্তি, যা ঋত্বিক আগে কখনও দেখেনি।
তিনি বললেন, “তোমাকে একটা কথা এখনও বলিনি।”
“কী কথা?”
“অমিয়েশের কোনও সন্তান ছিল না।”
ঋত্বিকের বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল।
মা ধীরে ধীরে যুবকটির দিকে তাকালেন।
“এই ছেলেটি অমিয়েশের সন্তান নয়। আর তুমিও নও।”
যুবকটি পিছিয়ে গেল।
“মা, তুমি কী বলছ?”
মৃণালিনী চোখ বন্ধ করলেন।
“সতেরো বছর আগে আমি যে শিশুটিকে বাড়িতে এনেছিলাম, সে ছিল আমার হারিয়ে যাওয়া ছেলের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু সে আমার ছেলে ছিল না। আমি তাকে নিজের সন্তান ভেবেছিলাম, কারণ তাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারতাম না।”
ঋত্বিকের গলা শুকিয়ে গেল।
“তাহলে আমি কে?”
মৃণালিনী তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুমি সেই শিশুটি, যাকে আমি সত্যিই জন্ম দিয়েছিলাম।”
“কিন্তু তুমি তো বললে, তোমার নিজের গর্ভে কোনও সন্তান জন্মায়নি!”
“আমি মিথ্যে বলেছিলাম।”
ঘরের মধ্যে যেন সমস্ত বাতাস থেমে গেল।
মৃণালিনী এবার কাঁপা গলায় বললেন, “তোমার জন্ম হয়েছিল ১৯৮৭ সালে। তুমি মারা গিয়েছিলে জন্মের পরপরই। কিন্তু আমি তোমাকে হারাতে পারিনি। অমিয়েশের পরীক্ষার সাহায্যে আমি তোমাকে ফিরিয়ে এনেছিলাম। আর সেই সঙ্গে ফিরেছিল তোমার আরেকটি রূপ।”
ঋত্বিকের চোখে জল জমে উঠল।
“তাহলে আমি কি মৃত?”
মা তার মুখ দুহাতে ধরে বললেন, “না, বাবা। তুমি বেঁচে আছ। কিন্তু তোমার জীবন স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়নি।”
যুবকটি হঠাৎ পিছিয়ে গিয়ে দরজার দিকে ছুটল।
“তাহলে আমি কে? আমি কোথা থেকে এসেছি?”
মৃণালিনী কোনও উত্তর দিলেন না।
যুবকটি দরজায় হাত রাখতেই দরজার গায়ে নতুন একটি নাম ফুটে উঠল—
অমিয়েশ চৌধুরী।
তারপর ঘরের সমস্ত আলো নিভে গেল।
অন্ধকারের মধ্যে ঋত্বিক শুনতে পেল, কেউ তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে—
“এবার সত্যিটা জানার সময় হয়েছে। তোমার মা তোমাকে জন্ম দিয়েছিলেন, কিন্তু যে মানুষটি তোমাকে বড় করেছে, সে তোমার মা নয়।”
ঋত্বিক চমকে উঠল।
অন্ধকারের মধ্যে একটি ছায়া এগিয়ে আসছে।
তার হাতে সেই পুরোনো গল্পের বই।
আর ছায়াটি যখন মুখ তুলল, ঋত্বিক দেখল—
তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার মৃত মা।
যিনি তিন দিন আগে দাহ হয়েছেন।
তিনি মৃদু হেসে বললেন, “বাবা, এবার বাড়ি চলো। তোমার আসল মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
চলবে…