শহরের এক প্রান্তে ছিল একটি বিশাল বাজার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে মানুষের ভিড় লেগেই থাকত। রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে মানুষ বাজার করত, রিকশা চালাত, দোকান সামলাত। কিন্তু বাজারের এক কোণে এমন একটি দোকান ছিল, যার কোনও চাল ছিল না, দেওয়াল ছিল না, এমনকি কোনও সাইনবোর্ডও ছিল না।
সেই দোকানে বসতেন এক বৃদ্ধ মানুষ। তাঁর নাম ছিল মাধব। প্রতিদিন দুপুরে তিনি একটি বড় গাছের নিচে বসে থাকতেন। তাঁর সামনে রাখা থাকত একটি কাঠের বাক্স। বাক্সের ওপর সাদা কাগজে লেখা—‘ছায়া বিক্রি হয়’।
প্রথম দিন লেখাটি দেখে সবাই হেসেছিল।
একজন সবজিবিক্রেতা বলেছিল, “মাধব কাকা, ছায়াও আবার কেউ বিক্রি করে নাকি?”
মাধব হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, “কেন নয়? যার প্রয়োজন, সে তো ছায়ার মূল্য বোঝে।”
লোকজন কথাটিকে মজা ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ তাঁকে পাগল বলেও ঠাট্টা করত।
কিন্তু মাধবের কাছে প্রতিদিন দুপুরে কয়েকজন মানুষ আসত। একজন বৃদ্ধ রিকশাচালক, একজন পথশিশু, কখনও কোনও ক্লান্ত ফেরিওয়ালা। তারা গাছের নিচে বসত, জল খেত, একটু বিশ্রাম নিত। যাওয়ার সময় কেউ টাকা দিতে চাইলে মাধব বলতেন, “যখন পারবে, অন্য কাউকে একটু স্বস্তি দিও। আমার দাম মিটে যাবে।”
একদিন বাজারে এল এক তরুণ ব্যবসায়ী, নাম বিক্রম। শহরে তার একাধিক দোকান ছিল। সে বাজারের ওই জমিতে একটি বড় বাণিজ্যিক ভবন তৈরি করতে চাইছিল। জমির মালিকের সঙ্গে কথাও প্রায় পাকা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল মাধবের গাছটি।
বিক্রম গাছের নিচে এসে বলল, “কাকা, এই গাছটা কেটে ফেলতে হবে। এখানে ভবন তৈরি হবে। আপনাকে অন্য কোথাও বসার ব্যবস্থা করে দেব।”
মাধব শান্ত গলায় বললেন, “গাছটা শুধু আমার বসার জায়গা নয়। অনেক মানুষের একটু বিশ্রামের জায়গা।”
বিক্রম হেসে বলল, “বিশ্রামের জন্য বাজারে আরও অনেক জায়গা আছে। উন্নয়নের পথে আবেগ দিয়ে বাধা দেওয়া যায় না।”
মাধব আর তর্ক করলেন না।
পরের কয়েক দিন বাজারে নানা আলোচনা চলল। কেউ বলল, ভবন তৈরি হলে ব্যবসা বাড়বে। কেউ বলল, গাছটি থাকলে বাজারের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। আবার কেউ কেউ মাধবের পক্ষে কথা বলল, কিন্তু বিক্রমের প্রভাবের সামনে তাদের কথা খুব জোর পেল না।
অবশেষে গাছ কাটার দিন ঠিক হল।
সেদিন সকালে মাধব যথারীতি গাছের নিচে বসেছিলেন। তাঁর পাশে বসেছিল এক ছোট্ট মেয়ে, নাম পিউ। সে প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে এখানে একটু বিশ্রাম নিত। পিউয়ের বাবা বাজারে মাল বহনের কাজ করতেন।
পিউ মাধবকে জিজ্ঞাসা করল, “কাকা, গাছটা কেটে দিলে আপনি কোথায় বসবেন?”
মাধব মেয়েটির মাথায় হাত রেখে বললেন, “আমি অন্য কোথাও বসব মা। কিন্তু তোমরা কোথায় বসবে, সেটাই ভাবছি।”
পিউ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সে নিজের স্কুলব্যাগ থেকে একটি খাতা বের করল। সেখানে সে বাজারের গাছটির ছবি এঁকেছিল। ছবির নিচে লেখা—‘আমাদের বিশ্রামের বাড়ি’।
পিউ ছবিটি নিয়ে বাজারের দোকানিদের কাছে গেল। সে সবাইকে দেখিয়ে বলল, “এই গাছটা শুধু মাধব কাকার নয়। এখানে কত মানুষ বিশ্রাম নেয়। আমরা কি সবাই মিলে গাছটাকে বাঁচাতে পারি না?”
শিশুটির সরল প্রশ্নে অনেকেই থমকে গেলেন।
একজন দোকানি বললেন, “ঠিকই তো। আমরা প্রতিদিন এখানে বসি, অথচ গাছটার কথা কখনও ভাবিনি।”
আরেকজন বললেন, “ভবন তৈরি হলে লাভ হবে, কিন্তু এমন ছায়া তৈরি হতে কত বছর লাগে?”
কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে বিক্রমের সঙ্গে কথা বলতে গেলেন। তাঁরা প্রস্তাব দিলেন, জমির নকশা সামান্য বদলে গাছটিকে রেখে ভবন তৈরি করা যায় কি না।
প্রথমে বিক্রম রাজি হল না। কিন্তু যখন সে দেখল, বাজারের অধিকাংশ মানুষ গাছটি বাঁচানোর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তখন সে নতুন করে পরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত নিল। স্থপতির সঙ্গে আলোচনা করে ভবনের নকশা এমনভাবে বদলানো হল, যাতে গাছটি অক্ষত থাকে এবং তার চারপাশে বসার জায়গা তৈরি হয়।
কয়েক মাস পর ভবন তৈরি হল। তার সামনের খোলা অংশে গাছটিকে ঘিরে বেঞ্চ বসানো হল। একটি ছোট পানীয় জলের ব্যবস্থাও করা হল। সেখানে কোনও প্রবেশমূল্য ছিল না।
উদ্বোধনের দিন বিক্রম নিজে মাধবের কাছে এসে বলল, “কাকা, এত দিন ভেবেছিলাম, জমির মূল্য শুধু টাকায় মাপা যায়। এখন বুঝছি, মানুষের উপকারে লাগলে একটি জায়গার মূল্য আরও অনেক বেড়ে যায়।”
মাধব মৃদু হেসে বললেন, “আপনি গাছটা বাঁচিয়েছেন, এটাই বড় কথা। তবে মনে রাখবেন, ছায়া কখনও একজনের সম্পত্তি হতে পারে না।”
সেদিন বিকেলে পিউ আবার গাছের নিচে বসেছিল। তার পাশে এক ক্লান্ত রিকশাচালক এসে বসলেন। পিউ একটু সরে তাঁকে জায়গা করে দিল।
মাধব দূর থেকে দৃশ্যটি দেখলেন। তাঁর মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
তিনি জানতেন, তাঁর কাঠের বাক্সে কোনও ছায়া ছিল না। ছায়া ছিল গাছের পাতায়, আর তার চেয়েও বেশি ছিল মানুষের মনে—যখন তারা নিজের সুবিধার বাইরে গিয়ে অন্যের প্রয়োজন বুঝতে শেখে।
শিক্ষা: প্রকৃতি রক্ষা করা শুধু পরিবেশের দায়িত্ব নয়, মানুষের প্রতি দায়িত্বও। যে সম্পদ সবার উপকারে আসে, তাকে বাঁচিয়ে রাখার দায়ও সবার।