শহরের এক পুরোনো গলিতে ছিল অদ্ভুত একটি দোকান। দোকানের সামনে কোনও সাইনবোর্ড ছিল না, জানালায় কোনও বিজ্ঞাপনও ঝুলত না। শুধু কাঠের দরজার ওপর ছোট্ট করে লেখা ছিল—‘শব্দ পাওয়া যায়’।
দোকানটির মালিক ছিলেন এক বৃদ্ধ, নাম নীরদবাবু। তাঁর দোকানে চাল-ডাল, জামাকাপড় কিংবা খেলনা বিক্রি হত না। সেখানে পাওয়া যেত এমন সব শব্দ, যেগুলো মানুষ ধীরে ধীরে ব্যবহার করতে ভুলে যাচ্ছিল।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে অয়ন দোকানটির সামনে দাঁড়াল। দরজার লেখাটি দেখে তার ভীষণ কৌতূহল হল। সে ভেতরে ঢুকে দেখল, চারদিকে অসংখ্য কাচের শিশি সাজানো। প্রতিটি শিশির গায়ে আলাদা আলাদা নাম লেখা।
একটির গায়ে লেখা ‘ক্ষমা’, অন্যটিতে ‘কৃতজ্ঞতা’, আরেকটিতে ‘বিশ্বাস’। একটি ছোট শিশিতে লেখা ‘আমি ভুল করেছি’।
অয়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো কি সত্যিই বিক্রি হয়?”
নীরদবাবু মৃদু হেসে বললেন, “শব্দ তো সবাই জানে। কিন্তু সব শব্দ ব্যবহার করতে পারে না। আমার দোকানে শব্দ কিনতে টাকা লাগে না। লাগে শুধু তার অর্থ বোঝার ইচ্ছা।”
অয়ন একটি শিশি তুলে নিল। তাতে লেখা ‘ধন্যবাদ’।
সে বলল, “এই শব্দটা তো আমি প্রতিদিন বলি।”
“কাকে বলো?” বৃদ্ধ জানতে চাইলেন।
অয়ন একটু ভেবে বলল, “যখন কেউ আমাকে সাহায্য করে।”
“আর বাড়িতে মা তোমার জন্য খাবার তৈরি করলে? বাবা তোমার পড়াশোনার খরচ জোগালে? স্কুলের পরিচ্ছন্নতাকর্মী তোমার শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করলে?”
অয়ন চুপ করে গেল। এই মানুষগুলোর জন্য সে খুব কমই ধন্যবাদ বলেছে।
নীরদবাবু বললেন, “শব্দ শুধু মুখ দিয়ে বললেই হয় না। তার অর্থ আচরণে প্রকাশ পেতে হয়।”
পরদিন অয়ন স্কুলে গিয়ে একটি ছোট পরীক্ষা করল। পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাকু শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করছিলেন। অয়ন তাঁর কাছে গিয়ে বলল, “কাকু, আমাদের ঘরটা প্রতিদিন পরিষ্কার রাখার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
লোকটি প্রথমে অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর তাঁর মুখে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যা অয়ন আগে কখনও দেখেনি।
বাড়ি ফিরে সে মাকেও ধন্যবাদ জানাল। মা হেসে বললেন, “আজ হঠাৎ কী হল তোর?”
অয়ন শুধু বলল, “একটা নতুন দোকান খুঁজে পেয়েছি।”
এরপর থেকে সে প্রায়ই নীরদবাবুর দোকানে যেত। প্রতিবার একটি করে নতুন শব্দ বেছে নিত। কখনও ‘সহমর্মিতা’, কখনও ‘ধৈর্য’, কখনও ‘দায়িত্ব’।
একদিন সে দোকানে এসে দেখল, কয়েকটি শিশি খালি পড়ে আছে। তাদের গায়ে লেখা—‘সত্য’, ‘বিশ্বাস’ এবং ‘ক্ষমা’।
অয়ন উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এই শব্দগুলো কোথায় গেল?”
নীরদবাবু বললেন, “মানুষ যখন কোনও শব্দের অর্থ ভুলে যায়, তখন সেই শব্দের শিশি খালি হয়ে যায়। আবার কেউ যখন কথার বদলে কাজে তার অর্থ ফিরিয়ে আনে, তখন শিশিটি পূর্ণ হয়।”
অয়ন বুঝতে পারল না, কথাটা সত্যি কি না। তবে সে দেখল, বৃদ্ধের চোখে গভীর বিষণ্ণতা।
কয়েক দিন পর অয়নের সঙ্গে তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু রাহুলের ঝগড়া হল। রাগের মাথায় অয়ন এমন কিছু কথা বলে ফেলল, যা রাহুলকে খুব কষ্ট দিল। পরদিন রাহুল তার সঙ্গে কথা বলল না।
অয়ন দোকানে গিয়ে ‘ক্ষমা’ লেখা শিশিটি খুঁজল। শিশিটি প্রায় খালি।
সে বৃদ্ধকে বলল, “আমি বন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইতে চাই। কিন্তু কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না।”
নীরদবাবু উত্তর দিলেন, “ক্ষমা চাওয়ার জন্য সুন্দর বাক্য দরকার নেই। দরকার নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস।”
পরদিন অয়ন রাহুলের কাছে গিয়ে বলল, “আমি রাগের মাথায় তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমার ভুল হয়েছে। আমাকে ক্ষমা করবি?”
রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমিও রাগ করে তোর সঙ্গে কথা বলিনি। চল, আবার বন্ধু হই।”
সেদিন বিকেলে অয়ন যখন দোকানে ফিরল, দেখল ‘ক্ষমা’ লেখা শিশিটি আবার ভরে উঠেছে।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর দোকানটি বন্ধ হয়ে গেল। দরজায় তালা ঝুলছিল। প্রতিবেশীরা জানালেন, নীরদবাবু অন্য শহরে চলে গেছেন।
অয়ন মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। তখনই সে দরজার নিচে গোঁজা একটি কাগজ পেল।
তাতে লেখা ছিল—
“শব্দের দোকান বন্ধ হলেই শব্দ হারিয়ে যায় না। যতদিন মানুষ সত্যি করে ক্ষমা চাইবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে, অন্যের কথা শুনবে এবং নিজের ভুল স্বীকার করবে, ততদিন এই দোকান প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে খোলা থাকবে।”
অয়ন কাগজটি যত্ন করে নিজের পড়ার টেবিলে রেখে দিল।
তারপর থেকে সে আর শুধু সুন্দর শব্দ শেখেনি। সে চেষ্টা করেছিল শব্দগুলোর অর্থ নিজের কাজে প্রমাণ করতে।
কারণ সে বুঝেছিল, পৃথিবীতে অনেক শব্দ আছে, কিন্তু তাদের সত্যিকারের মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ সেগুলোকে নিজের জীবনে জায়গা দেয়।
শিক্ষা: ভালো কথা বলা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই কথার অর্থ আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ করাই প্রকৃত শিক্ষা।