Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ প্রদর্শনীর দিন।

শহরের পুরোনো জাদুঘরটির নাম ছিল ‘স্মৃতির ঘর’। সেখানে রাজাদের অস্ত্র, পুরোনো মুদ্রা, মাটির বাসন, হাতে লেখা দলিল থেকে শুরু করে বহু বছরের পুরোনো নানা জিনিস সাজানো ছিল। প্রতিদিন অল্প কিছু মানুষ আসতেন। কেউ ইতিহাস জানতে, কেউ স্কুলের প্রকল্প করতে, আবার কেউ নিছক সময় কাটাতে।

জাদুঘরের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন অমলবাবু। বয়স প্রায় ষাট। জীবনের তিরিশটি বছর তিনি এই জাদুঘরেই কাটিয়েছেন। কোন জিনিসটি কোথা থেকে এসেছে, কোনটির সঙ্গে কোন ইতিহাস জড়িয়ে আছে—সব তাঁর নখদর্পণে।

কিন্তু একদিন সকালে একটি বিজ্ঞপ্তি এল। আর্থিক সমস্যার কারণে জাদুঘরটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। পরের মাস থেকে সমস্ত সংগ্রহ অন্য শহরের বড় জাদুঘরে পাঠানো হবে।

খবরটা শুনে অমলবাবুর বুকটা কেমন খালি হয়ে গেল। তাঁর কাছে জাদুঘরটি কেবল একটি চাকরির জায়গা ছিল না। এই ঘরগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর জীবনের অসংখ্য স্মৃতি।

কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিল, জিনিসপত্র সরানোর আগে শেষবারের মতো একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। সেই প্রদর্শনীর নাম রাখা হল—‘যে ইতিহাস আমাদের ঘরে’।

প্রস্তুতি শুরু হল। কর্মীরা কাচের বাক্স পরিষ্কার করলেন, জিনিসগুলোর তালিকা তৈরি করলেন, দেয়ালে নতুন পরিচিতি লেখা হল। অমলবাবু প্রতিটি প্রদর্শনীর পাশে দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের কথা মনে করতে লাগলেন।

প্রদর্শনীর আগের দিন এক কিশোর এল। নাম তার ঋজু। সে স্কুলের ইতিহাসের প্রকল্পের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে এসেছিল।

ঋজু একটি পুরোনো কাঠের লাঙলের সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? এখন তো কেউ এমন লাঙল ব্যবহার করে না।”

অমলবাবু হেসে বললেন, “তুমি ঠিকই বলেছ। এখন যন্ত্রের সাহায্যে অনেক কাজ হয়। কিন্তু একসময় এই লাঙলই ছিল কৃষকের জীবিকার অন্যতম ভরসা। এর প্রতিটি দাগে লেগে আছে মানুষের পরিশ্রমের ইতিহাস।”

ঋজু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “কিন্তু এসব জিনিস তো এখন আর কেউ ব্যবহার করে না। এগুলো দেখে আমাদের কী লাভ?”

অমলবাবু উত্তর দিলেন, “যে মানুষ নিজের অতীতকে জানে না, সে নিজের বর্তমানকেও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। আজ আমরা যে সুবিধাগুলো পাচ্ছি, তার পেছনে কত মানুষের শ্রম আর সংগ্রাম আছে, তা ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়।”

কথাগুলো ঋজুর মনে দাগ কাটল।

পরদিন প্রদর্শনী শুরু হল। প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এলেন। কেউ পুরোনো মুদ্রার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দাদুর কথা বললেন, কেউ কৃষিকাজের সরঞ্জাম দেখে নিজের গ্রামের স্মৃতি মনে করলেন। একটি পুরোনো সেলাইয়ের যন্ত্র দেখে এক বৃদ্ধা বললেন, তাঁর মা এমন যন্ত্রেই সংসারের খরচ চালাতেন।

অমলবাবু লক্ষ করলেন, মানুষ শুধু জিনিস দেখতে আসেনি। প্রত্যেকটি জিনিস যেন তাদের নিজের জীবনের কোনও না কোনও অধ্যায় খুলে দিচ্ছে।

ঋজুও সেদিন আবার এল। তার সঙ্গে ছিল কয়েকজন সহপাঠী। তারা নিজেদের উদ্যোগে প্রদর্শনীর নানা অংশের ছবি তুলেছিল এবং প্রতিটি জিনিসের ইতিহাস সহজ ভাষায় লিখে রাখছিল। তাদের পরিকল্পনা, স্কুলের দেওয়ালপত্রে এই ইতিহাস প্রকাশ করবে।

প্রদর্শনী শেষ হওয়ার আগে ঋজু অমলবাবুর কাছে এসে বলল, “জাদুঘর বন্ধ হয়ে গেলেও আমরা যদি এগুলোর গল্প মানুষকে জানাতে থাকি, তাহলে কি ইতিহাস বেঁচে থাকবে?”

অমলবাবু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “অবশ্যই। কোনও ঘর বন্ধ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানুষের মনে কৌতূহল বেঁচে থাকলে ইতিহাসকে পুরোপুরি বন্ধ করা যায় না।”

কয়েক সপ্তাহ পরে জাদুঘরটির দরজা সত্যিই বন্ধ হয়ে গেল। সংগ্রহের বেশির ভাগ জিনিস অন্যত্র চলে গেল। অমলবাবু অবসর নিলেন।

কিন্তু গল্পটি সেখানেই শেষ হল না।

ঋজু ও তার সহপাঠীরা স্কুলে একটি ছোট ইতিহাসের ক্লাব গড়ে তুলল। তারা গ্রামের প্রবীণ মানুষদের সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করল, পুরোনো পেশার কথা লিখে রাখল, হারিয়ে যেতে বসা ব্যবহার্য জিনিসের ছবি সংগ্রহ করল। তাদের কাজ দেখে অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও আগ্রহী হল।

একদিন ঋজু অমলবাবুর বাড়িতে এসে একটি খাতা তাঁর হাতে দিল। খাতাটির প্রথম পাতায় লেখা—‘আমাদের চারপাশের ইতিহাস’।

অমলবাবু পাতাগুলো উল্টে দেখলেন। সেখানে কৃষকের কথা, তাঁতির কথা, মৃৎশিল্পীর কথা, পুরোনো বাজারের ইতিহাস—কত কিছু লেখা!

তাঁর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি বুঝলেন, যে প্রদর্শনীকে তিনি শেষ বলে ভেবেছিলেন, সেটিই আসলে নতুন একটি যাত্রার শুরু।

শিক্ষা: অতীতকে সংরক্ষণ করা মানে শুধু পুরোনো জিনিসকে আগলে রাখা নয়; তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *