অর্কর মনে হলো, তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ, চোখ, কপালের ডান পাশে পুরোনো কাটা দাগ—সবকিছু অবিকল তার বাবা অমিতাভ সেনের মতো। যে মানুষটিকে বারো বছর আগে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যার মৃত্যুর পর মা দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন, সেই মানুষটি আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে!
অর্ক কাঁপা গলায় বলল, —আপনি কে?
লোকটি মৃদু হাসল।
—নিজের বাবাকে চিনতে পারছিস না?
—আমার বাবা মারা গেছেন!
—তোর কাছে যে গল্পটা বলা হয়েছিল, সেটা সত্যি নয়।
অর্ক পিছিয়ে গেল। তার হাতের মোবাইলটা কাঁপছে। সে চিৎকার করতে চেয়েও পারল না। লোকটির চোখে এমন এক গভীর ক্লান্তি ছিল, যা অভিনয় করে তৈরি করা যায় না।
—আপনি যদি আমার বাবা হন, তাহলে এতদিন কোথায় ছিলেন? মা কেন বলেছিলেন আপনি মারা গেছেন? আর এই বাড়িতে কী হচ্ছে?
লোকটি উত্তর দেওয়ার আগে দরজার দিকে তাকাল।
—সময় খুব কম। ওরা ফিরে আসার আগেই তোকে সব বলতে হবে।
—কারা ওরা?
—যারা আমাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছিল। যারা তোর মাকে এই বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিল। আর যারা আজও এই বাড়ির একটা গোপন ঘর খুঁজছে।
অর্কর মনে পড়ল, একটু আগেই তিনজন লোক ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাদের একজন বলেছিল, চতুর্থ মানুষটিও আর বেশিদিন লুকিয়ে থাকবে না।
—চতুর্থ মানুষটা কে?
অমিতাভ উত্তর দিলেন না। বরং অর্কর হাত ধরে তাকে ঘরের এক কোণে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেওয়ালে ঝোলানো একটি পুরোনো ঘড়ি। ঘড়িটা বহুদিন ধরে বন্ধ। কাঁটা থেমে আছে রাত বারোটা সতেরো মিনিটে।
অমিতাভ ঘড়ির নিচের কাঠের পাটাতনে চাপ দিতেই একটা গোপন খোপ খুলে গেল।
তার ভেতরে ছিল ছোট্ট একটি ডায়েরি, একটি পুরোনো ক্যাসেট এবং একটি শিশুর ছবি।
ছবিতে দুই বছরের একটি ছেলে। ছেলেটির মুখ অর্কর ছোটবেলার মতোই। তবে তার ডান হাতে একটি কালো সুতো বাঁধা।
অর্ক ছবিটা হাতে নিয়ে বলল, —এ কে?
অমিতাভ ধীরে ধীরে বললেন, —তোর ভাই।
অর্কর মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।
—আমার কোনো ভাই নেই!
—ছিল। তোর জন্মের তিন বছর আগে তোর মা একটি ছেলের জন্ম দিয়েছিলেন। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা জানতে পারি, ছেলেটির একটি বিরল অসুখ রয়েছে। চিকিৎসার জন্য তাকে অন্য শহরে নিয়ে যেতে হয়েছিল। সেই সময় আমাদের পরিচিত এক চিকিৎসক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছেলেটিকে নিয়ে যাওয়ার পর আর ফিরিয়ে দেননি।
অর্ক ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
—তাহলে মা জানতেন?
—হ্যাঁ। তোর মা কোনোদিন বিশ্বাস করেননি যে আমাদের প্রথম সন্তান মারা গেছে। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো প্রমাণ ছিল না। কয়েক বছর পরে আমি কিছু নথি খুঁজে পাই, যেখানে দেখা যায়, ছেলেটির চিকিৎসার নামে অন্য একটি পরিচয় তৈরি করা হয়েছে। তার নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। জন্মের নথিও পাল্টে ফেলা হয়েছে।
—তাহলে আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?
অমিতাভ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে আমাকে শুরু থেকে বলতে হবে।
বারো বছর আগে, অর্ক যখন ষোলো বছরের, তখন অমিতাভ একটি পুরোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এমন কিছু নথি খুঁজে পান, যা প্রমাণ করছিল, তাঁর ছেলেকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নিছক ভুল বোঝাবুঝি ছিল না। ওই চিকিৎসক আরও কয়েকটি পরিবারের সন্তানদের পরিচয় বদলানোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সন্তানদের চিকিৎসা বা দত্তক দেওয়ার নামে পরিবারগুলোর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হতো, আর কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের অন্য পরিচয়ে বড় করা হতো।
অমিতাভ বিষয়টি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু খবরটা ফাঁস হয়ে যায়।
এক রাতে বাড়ি ফেরার পথে তাঁর গাড়ির ব্রেক কাজ করেনি। গাড়িটি রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। গাড়িতে আগুন ধরে যায়। উদ্ধারকারীরা একটি দেহ পান, কিন্তু মুখ এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন ছিল।
পরিবারকে জানানো হয়, দেহটি অমিতাভর।
কিন্তু অমিতাভ বেঁচে গিয়েছিলেন।
দুর্ঘটনার পর কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তি তাঁকে উদ্ধার করে গোপনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নথি জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত লোকেরা নিশ্চিন্ত হয়ে গেছে। তাঁরা ধরে নিয়েছিল, সত্য জানার মতো আর কেউ বেঁচে নেই।
অমিতাভ তখনই সিদ্ধান্ত নেন, কিছুদিন আড়ালে থাকবেন। কিন্তু সেই আড়ালে থাকা দীর্ঘ হয়ে যায়। যারা তাঁকে উদ্ধার করেছিল, তাদের মধ্যেও একজন বিশ্বাসঘাতক ছিল। তাঁর পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি নিজের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
—কিন্তু মা? —অর্কর গলায় ক্ষোভ। —মা তো আপনার মৃত্যুর শোকে ভেঙে পড়েছিলেন!
অমিতাভ চোখ বন্ধ করলেন।
—আমি জানি। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ। আমি ভেবেছিলাম, দূরে থাকলে তোদের নিরাপদ রাখতে পারব। কিন্তু বুঝিনি, আমার নীরবতাও তোদের কষ্ট দেবে।
অর্ক চোখের জল মুছে বলল, —আপনি কি একবারও আমাকে দেখতে চাননি?
—চেয়েছি। প্রতিটি জন্মদিনে, প্রতিটি উৎসবে। তোর স্কুলের ফল বেরোনোর দিনেও আমি দূর থেকে খবর নিয়েছি। কিন্তু কাছে আসিনি। কারণ যারা আমাকে খুঁজছিল, তারা তোকে ব্যবহার করতে পারত।
—তাহলে আজ কেন ফিরলেন?
অমিতাভ ডায়েরিটা অর্কর হাতে দিলেন।
—কারণ আজ আর লুকিয়ে থাকার সময় নেই। তোর কাছে যে চিঠিটা এসেছে, সেটা আমি পাঠাইনি।
অর্ক চমকে উঠল।
—তাহলে কে পাঠিয়েছে?
—যে মানুষটি বারো বছর ধরে এই বাড়ির গোপন রহস্য পাহারা দিচ্ছে।
—চতুর্থ মানুষটি?
অমিতাভ মাথা নাড়লেন।
—হ্যাঁ। কিন্তু সে আমাদের পরিবারের কেউ নয়। অন্তত রক্তের সম্পর্কে নয়।
অর্ক ডায়েরিটা খুলল। প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখা।
“যদি কোনোদিন আমার ছেলে এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে তাকে জানতে হবে—মানুষের পরিচয় শুধু জন্মের কাগজে লেখা থাকে না। কখনও কখনও পরিচয় বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে মানুষকে নিজের অস্তিত্বই মুছে ফেলতে হয়।”
পরের পাতাগুলোতে কয়েকটি নাম, তারিখ এবং হাসপাতালের রেকর্ডের উল্লেখ ছিল। একটি নাম বারবার ফিরে এসেছে—ডা. শৌভিক বসু।
অর্ক নামটা চিনতে পারল। ছোটবেলায় এই মানুষটিকে তাদের বাড়িতে আসতে দেখেছে। তিনি ছিলেন বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অর্কর অসুস্থ হলে তিনিই চিকিৎসা করতেন। বাবার মৃত্যুর পর তিনিই মাকে সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
—ডা. বসু? উনি তো আমাদের পরিবারের বন্ধু ছিলেন!
অমিতাভ বললেন, —সেই কারণেই তাঁকে সন্দেহ করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল। কিন্তু তিনিই প্রথম আমার বড় ছেলেকে অন্য পরিচয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রথমে বলেছিলেন, চিকিৎসার জন্য ছেলেটিকে কয়েক মাস দূরে রাখতে হবে। পরে জানালেন, ছেলেটি মারা গেছে। কিন্তু আমি যখন হাসপাতালের নথি খুঁজে পেলাম, তখন বুঝলাম সবকিছু মিথ্যে।
অর্কর চোখে রাগ জমল।
—তাহলে তাঁকে পুলিশে দেননি কেন?
—দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রমাণ অসম্পূর্ণ ছিল। তার ওপর তিনি প্রভাবশালী মানুষের সাহায্য পেতেন। অভিযোগ তদন্তের আগেই গুরুত্বপূর্ণ নথি উধাও হয়ে যায়। এরপরই আমার দুর্ঘটনা ঘটে।
অর্ক ডায়েরির পাতা উল্টাতে লাগল। শেষের দিকে একটি ঠিকানা লেখা।
“বর্ধমান, পুরোনো রেল কলোনি। বাড়ি নম্বর ১৭। নাম—অরুণ।”
অর্ক তাকাল।
—অরুণ কে?
অমিতাভর গলা ভারী হয়ে এল।
—তোর বড় ভাইয়ের নতুন নাম।
হঠাৎ নিচের তলায় দরজা খোলার শব্দ হলো।
তারপর কারও গলা।
—অমিতাভ! আমরা জানি তুমি ওপরে আছ!
অমিতাভর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
—ওরা ফিরে এসেছে।
অর্ক ফিসফিস করে বলল, —এখন কী করব?
অমিতাভ ডায়েরি, ক্যাসেট এবং ছবিটা একটি কাপড়ের ব্যাগে ভরে অর্কর হাতে দিলেন।
—পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে যা। সেখানে একটা পুরোনো কুয়ো আছে। কুয়োর পাশে মাটির নিচে ছোট্ট লোহার বাক্স পুঁতে রাখা হয়েছে। তার মধ্যে আরও প্রমাণ আছে। সবকিছু ঋদ্ধি নামের একজন সাংবাদিকের হাতে পৌঁছে দিবি।
—ঋদ্ধি কে?
—সে সত্যিটা প্রকাশ করতে চায়। কিন্তু তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করার আগে প্রমাণ যাচাই করিস।
অর্ক বাবার হাত চেপে ধরল।
—আপনি আমার সঙ্গে চলুন।
অমিতাভ মাথা নাড়লেন।
—আমাকে আজ এখানেই থাকতে হবে।
—না! আমি আর কাউকে হারাতে চাই না!
অমিতাভ ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন।
—তুই আমাকে হারাসনি, অর্ক। তুই শুধু আমার অনুপস্থিতির কষ্ট পেয়েছিস। আমি সেই কষ্ট মুছে দিতে পারব না। কিন্তু এবার আমি পালাব না।
দরজার বাইরে পায়ের শব্দ আরও কাছে এল।
কেউ চিৎকার করে বলল, —দরজা ভাঙো!
অমিতাভ অর্ককে পেছনের দরজার দিকে ঠেলে দিলেন।
—যা! আর একটা কথা মনে রাখিস। তোর ভাই যদি বেঁচে থাকে, তাকে খুঁজে বের করিস। কিন্তু তাকে জোর করে নিজের পরিবারে ফিরিয়ে আনতে যাস না। সে কী চায়, সেটা আগে শুনবি।
অর্কর চোখে জল এসে গেল।
—আমি আবার আপনার কাছে ফিরব।
অমিতাভ মৃদু হাসলেন।
—আমি অপেক্ষা করব।
অর্ক পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে অন্ধকার বাগানে পৌঁছল। ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এগোতে গিয়ে তার পা পিছলে গেল। কাদায় পড়ে গিয়ে হাত কেটে গেল, কিন্তু সে থামল না।
কুয়োর কাছে পৌঁছে মাটির নিচে লোহার বাক্সটা খুঁজে পেল। বাক্সের ভেতরে ছিল কয়েকটি পুরোনো ছবি, হাসপাতালের নথি এবং একটি ছোট্ট চিঠি।
চিঠির ওপর লেখা—
“অর্কর জন্য। যদি তুমি এটা পড়ো, তাহলে বুঝবে আমি আর তোমার কাছ থেকে কিছু লুকোতে চাই না।”
অর্ক কাঁপা হাতে চিঠিটা খুলল।
“বাবা, তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি তোমার সামনে থাকব না। কিন্তু তোমাকে একটা সত্যি জানানো দরকার। তোমার বড় ভাই অরুণ শুধু আমাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তান নয়। সে এমন একটি ঘটনার সাক্ষী, যার কথা জানলে অনেক মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে। তার স্মৃতিতে এমন কিছু আছে, যা সে নিজেও জানে না। তাকে খুঁজে পেলে তার শৈশবের কথা জিজ্ঞেস করো। বিশেষ করে সেই রাতের কথা, যেদিন সে শেষ বাড়ির জানালায় আলো দেখেছিল।”
অর্ক চিঠিটা নামিয়ে তাকাল।
শেষ বাড়ির জানালায় আলো!
অর্থাৎ তার ভাইও এই বাড়িতে এসেছিল?
কিন্তু কখন?
আর কী দেখেছিল সে?
ঠিক তখনই বাড়ির দিক থেকে একটা বিস্ফোরণের মতো শব্দ হলো। অর্ক ঘুরে তাকিয়ে দেখল, দোতলার একটি জানালা দিয়ে আগুনের আলো বেরিয়ে আসছে।
তার বুকের মধ্যে ধক করে উঠল।
—বাবা!
সে বাড়ির দিকে দৌড়তে যাচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে কেউ তার হাত শক্ত করে ধরল।
একজন বৃদ্ধা।
ভেজা শাড়ি, সাদা চুল, কাঁপতে থাকা হাত।
তিনি অর্কর মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, —ওখানে গেলে তুমিও মরবে।
অর্ক হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
—আমার বাবা ভেতরে আছেন!
বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
—তোমার বাবা সেখানে নেই। যাকে তুমি দেখেছ, সে অমিতাভ নয়।
অর্ক যেন কিছুই বুঝতে পারল না।
—কী বলছেন আপনি?
বৃদ্ধা তার হাতের মুঠোয় একটা পুরোনো ছবি গুঁজে দিলেন।
ছবিতে অমিতাভ সেন দাঁড়িয়ে আছেন এক অপরিচিত লোকের পাশে। দুজনের মুখ প্রায় একই রকম।
কিন্তু ছবির পিছনে লেখা নামটা দেখে অর্কর সমস্ত শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“অমিতাভ সেন এবং তার যমজ ভাই—অভিজিৎ সেন।”
অর্কর জীবনে বাবার কোনো যমজ ভাইয়ের কথা সে কখনও শোনেনি।
বৃদ্ধা বললেন, —তোমার বাবা বারো বছর আগে মারা গিয়েছিলেন। আর যে মানুষটি তোমার সামনে দাঁড়িয়েছিল, সে তোমার বাবার ভাই।
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল।
—তাহলে তিনি এত কিছু জানলেন কীভাবে?
বৃদ্ধা চোখ নামিয়ে বললেন, —কারণ এই ষড়যন্ত্রের শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই।
অর্কর কানে তখনও আগুনের শব্দ বাজছে। তার সামনে নতুন এক সত্যির দরজা খুলে গেছে। কিন্তু সেই দরজার ওপারে কী অপেক্ষা করছে, সে জানে না।
বৃদ্ধা ধীরে ধীরে বললেন, —আমার নাম কমলা। আমি এই বাড়িতে কাজ করতাম। তোমার জন্মের আগেও, তোমার বাবার মৃত্যুর পরেও। আমি জানি তোমার ভাই কোথায় আছে। কিন্তু তাকে খুঁজতে গেলে তোমাকে আগে জানতে হবে, তোমার মা কেন তোমাকে এই বাড়ির চাবি দিয়েছিলেন।
অর্ক কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, —কেন?
কমলা উত্তর দিলেন, —কারণ তোমার মা জানতেন, একদিন এই বাড়িতে তোমার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে।
অর্কর চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
—আমার নিজের কণ্ঠস্বর?
কমলা মাথা নাড়লেন।
—যে শিশুটি এতক্ষণ তোমাকে দাদা বলে ডাকছিল, সে কোনো ভূত নয়। সে এই বাড়ির মধ্যে আটকে থাকা একটি পুরোনো রেকর্ডিং। বারো বছর আগে তোমার ভাই তোমার জন্য একটা বার্তা রেখে গিয়েছিল। আর সেই বার্তায় এমন একটি নাম আছে, যা শুনলে তুমি বুঝতে পারবে—তোমার পরিবারের মধ্যে আসল বিশ্বাসঘাতক কে।
দূরে আবার সাইরেন বাজল।
অর্ক কমলার হাত শক্ত করে ধরল।
—আমাকে সব বলুন।
কমলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
—বলব। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তুমি কি তোমার ভাইকে ফিরে পেতে চাও, নাকি জানতে চাও তোমার বাবার মৃত্যুর জন্য কে দায়ী?
অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর দৃঢ় গলায় বলল, —আমি দুটোই জানতে চাই।
কমলা অন্ধকার বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন, —তাহলে আগামীকাল সূর্য ওঠার আগে আমাদের বর্ধমান যেতে হবে। কারণ তোমার ভাই অরুণ আজ রাতেই কলকাতায় আসছে।
ঠিক তখনই অর্কর মোবাইলে আরেকটি বার্তা এল।
অজানা নম্বর।
“অরুণকে খুঁজতে যেয়ো না। সে তোমার ভাই নয়।”
বার্তার নিচে একটি ছবি।
ছবিতে অরুণ দাঁড়িয়ে আছে একটি রেলস্টেশনে। তার পাশে সেই কালো টুপিওয়ালা লোকটি।
আর ছবির পেছনে দেখা যাচ্ছে একটি বড় ঘড়ি, যেখানে সময় রাত বারোটা সতেরো মিনিট।
অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
শেষ বাড়ির দোতলার জানালায় তখনও আলো জ্বলছে।
কিন্তু বাড়ির ভেতর থেকে এবার যে কণ্ঠস্বর ভেসে এল, তা কোনো শিশুর নয়।
সেটা তার মায়ের কণ্ঠস্বর।
—অর্ক, দরজাটা খুলিস না। আমি এখনও ভেতরে আছি!
চলবে…