Categories
অনুগল্প বিবিধ

শেষ মুদ্রার মূল্য।

শহরের পুরনো বাজারের এক কোণে ছিল ছোট্ট একটি মুদ্রা সংগ্রহশালা। বাইরে থেকে দেখলে সেটিকে সাধারণ দোকান বলেই মনে হতো। কাঠের তাকের ওপর সাজানো থাকত নানা দেশের পুরনো মুদ্রা, স্মারক পদক আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা কিছু ধাতব টুকরো। দোকানটির মালিক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত ইতিহাসের শিক্ষক অমরেশবাবু।

অমরেশবাবুর কাছে মুদ্রা শুধু কেনাবেচার জিনিস ছিল না। প্রতিটি মুদ্রার পেছনে তিনি খুঁজে পেতেন কোনও সময়ের গল্প, কোনও রাজ্যের উত্থান-পতন কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনের চিহ্ন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ছোট্ট একটি মুদ্রাও ইতিহাসের বড় দরজা খুলে দিতে পারে।

একদিন দোকানে এল বছর পনেরোর একটি ছেলে। নাম তার ঋজু। পরনে সাধারণ জামাকাপড়, হাতে একটি পুরনো কাপড়ের থলি। সে থলি থেকে একটি কালচে মুদ্রা বের করে অমরেশবাবুর সামনে রাখল।

ঋজু বলল, “দাদু মারা যাওয়ার আগে মুদ্রাটা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কোনও দিন বিপদে পড়লে এটা কাজে লাগবে। মা অসুস্থ, ওষুধ কেনার টাকা নেই। মুদ্রাটা বিক্রি করতে চাই।”

অমরেশবাবু মুদ্রাটি হাতে নিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলেন। সেটি বহু পুরনো একটি তামার মুদ্রা। তার গায়ে খোদাই করা লেখা প্রায় মুছে গেলেও কয়েকটি চিহ্ন স্পষ্ট ছিল।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার দাদু কোথায় পেয়েছিলেন এটা?”

ঋজু জানাল, তাঁর দাদু একসময় পুরনো জিনিস সংগ্রহ করতেন। কিন্তু মুদ্রাটির আসল ইতিহাস সে জানে না।

অমরেশবাবু মুদ্রাটি কিনতে রাজি হলেন। তবে দাম বলার আগে তিনি বললেন, “আমাকে একটু সময় দাও। এই মুদ্রার পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে এর মূল্য বলা ঠিক হবে না।”

ঋজুর মুখ ম্লান হয়ে গেল। তার আজই ওষুধ কেনা দরকার। অমরেশবাবু বিষয়টি বুঝতে পেরে নিজের পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিলেন।

“এটা ধার হিসেবে রাখো। মুদ্রার মূল্য নির্ধারণ হলে পরে হিসাব হবে। তোমার মায়ের চিকিৎসা আগে।”

ঋজু টাকা নিয়ে চলে গেল।

পরের কয়েক দিন অমরেশবাবু মুদ্রাটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পুরনো বই ঘাঁটলেন, সংগ্রাহকদের সঙ্গে কথা বললেন এবং নিজের পরিচিত এক বিশেষজ্ঞকে মুদ্রাটির ছবি পাঠালেন। অবশেষে জানা গেল, মুদ্রাটি একটি প্রাচীন স্থানীয় রাজ্যের আমলের। সেটি বিরল হলেও রাজকীয় ধনসম্পদের মতো অমূল্য কিছু নয়। তার বাজারদর মাঝারি, কিন্তু ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট।

কয়েক দিন পরে ঋজু আবার দোকানে এল। তার মুখে এবার কিছুটা স্বস্তির ছাপ। মায়ের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। সে বলল, “দাদু বলতেন, পুরনো জিনিসের দাম শুধু টাকা দিয়ে মাপা যায় না। তখন বুঝতাম না। এখন বুঝছি, মুদ্রাটা আমাকে শুধু টাকা দেয়নি, দাদুর কথাটাও মনে করিয়ে দিয়েছে।”

অমরেশবাবু মৃদু হেসে বললেন, “তোমার দাদু ঠিকই বলেছিলেন। তবে আরও একটা কথা মনে রেখো—কোনও জিনিসের প্রকৃত মূল্য জানতে হলে তার সত্যিকারের পরিচয় জানতে হয়।”

ঋজু মুদ্রাটি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিল। অমরেশবাবু ন্যায্য দাম দিলেন এবং ছেলেটিকে মুদ্রাটির ইতিহাস লিখে একটি কাগজে বুঝিয়ে দিলেন। তিনি চাইলে মুদ্রাটির বিরলত্ব বাড়িয়ে অনেক বেশি দাম দিতে পারতেন না, এমন নয়; কিন্তু ঋজুর অজ্ঞতার সুযোগ নেওয়ার কথা তাঁর মনেও আসেনি।

কয়েক মাস পরে ঋজু আবার দোকানে এল। এবার তার হাতে একটি ছোট খাতা। সে স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষকের সাহায্যে নিজের দাদুর সংগ্রহে থাকা পুরনো জিনিসগুলির পরিচয় লিখে রাখতে শুরু করেছে। অমরেশবাবুর কাছ থেকে সে শিখেছে, কোনও কিছু সংগ্রহ করা মানে শুধু নিজের কাছে জমিয়ে রাখা নয়, তার ইতিহাসকে যত্ন করে সংরক্ষণ করাও।

দোকান থেকে বেরোনোর আগে ঋজু বলল, “একদিন আমি বড় হয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়ব। মানুষের পুরনো জিনিসের আসল পরিচয় খুঁজে বের করব।”

অমরেশবাবু তার মাথায় হাত রেখে বললেন, “সেটা অবশ্যই করবে। তবে মনে রেখো, ইতিহাসের মতো মানুষের জীবনেও সত্যের মূল্য সবচেয়ে বেশি।”

বছর কয়েক পরে ঋজু সত্যিই ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করল। তার জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা কোনও পাঠ্যবই থেকে আসেনি। এসেছিল একটি কালচে তামার মুদ্রা আর একজন সৎ মানুষের কাছ থেকে।

মুদ্রাটি চলে গিয়েছিল সংগ্রহশালার কাচের বাক্সে। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সততার গল্পটি ঋজুর মনে চিরকাল অমলিন রয়ে গেল।

শিক্ষা: মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে লাভ করা সহজ, কিন্তু ন্যায্য আচরণ করে বিশ্বাস অর্জন করাই প্রকৃত মহত্ত্ব। কোনও কিছুর মূল্য নির্ধারণের আগে তার সত্যিকারের পরিচয় জানা জরুরি, আর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সততাই মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *