রাত তখন প্রায় বারোটা। শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে যাওয়া শেষ লোকাল ট্রেনটা প্রায় ফাঁকা।
অভ্র জানালার পাশে বসে ছিল। ক্লান্ত চোখে বাইরে অন্ধকার শহরটা দেখছিল সে। সারাদিনের কাজের পর এই নিঃশব্দ ট্রেনযাত্রাটুকুই যেন তার নিজের সময়।
হঠাৎ পরের স্টেশনে এক মেয়ে উঠে এসে তার সামনের সিটে বসল।
কালো শাল জড়ানো, ভেজা চুল, আর হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ। মেয়েটা বারবার জানালার বাইরে তাকাচ্ছিল, যেন কাউকে খুঁজছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করল,
— “এই ট্রেনটা কি কৃষ্ণনগর যাবে?”
অভ্র মাথা নেড়ে বলল,
— “না, এর আগেই শেষ স্টপেজ।”
মেয়েটার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।
— “তাহলে আমি ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছি…”
বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। রাতও অনেক।
অভ্র একটু দ্বিধা করে বলল,
— “আপনি চাইলে শেষ স্টপেজ পর্যন্ত যান। তারপর আমি একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দেব।”
মেয়েটা মৃদু হেসে ধন্যবাদ জানাল।
ট্রেন চলতে লাগল। দু’জনের মধ্যে ছোট ছোট কথা হতে লাগল— পছন্দের বই, বৃষ্টি, পুরোনো গান…
অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছিল, যেন তারা বহুদিনের পরিচিত।
শেষ স্টেশনে পৌঁছে অভ্র ঘুরে বলল,
— “চলুন, নেমে—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই সে থেমে গেল।
সামনের সিটটা খালি।
মেয়েটা নেই।
অভ্র অবাক হয়ে চারপাশে তাকাল। পুরো কামরা ফাঁকা।
ঠিক তখনই বৃদ্ধ টিকিট পরীক্ষক ধীরে ধীরে এসে বললেন,
— “কাউকে খুঁজছেন?”
অভ্র বলল,
— “এই তো একটা মেয়ে ছিল…”
বৃদ্ধ লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
— “পাঁচ বছর আগে এই একই ট্রেনে এক মেয়ের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল। তারপর থেকে নাকি মাঝে মাঝে শেষ ট্রেনে তাকে দেখা যায়…”
অভ্র কিছু বলল না।
শুধু দেখল, সামনের সিটে এখনও কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল পড়ে আছে।
Categories
শেষ ট্রেনের যাত্রী।