Categories
গল্প

চায়ের দোকানের শেষ কাপ।

শীতের সকাল।

গ্রামের বাসস্ট্যান্ডের পাশে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালাত গোপাল।

দোকান বলতে বাঁশের খুঁটি, টিনের চাল আর সামনে তিনটে কাঠের বেঞ্চ।

সকাল হলেই সেখানে ভিড় জমত।

কেউ চা খেতে আসত, কেউ খবরের কাগজ পড়তে, কেউ আবার শুধু গল্প করতে।

গোপালের দোকানের একটা নিয়ম ছিল।

যে-ই আসুক, প্রথম কাপ চা বাকিতে দেওয়া যায়।

গ্রামের লোকেরা হাসত।

“এই নিয়ম করে ব্যবসা চলে?”

গোপাল বলত,

“চা এক কাপের দাম বেশি নয়। কিন্তু কারও যদি পকেটে টাকা না থাকে, তাকে খালি মুখে ফেরানো যায়?”

একদিন সকালে দোকানে এলেন এক বৃদ্ধ।

পরনে পুরনো ধুতি-পাঞ্জাবি।

কাঁধে একটি কাপড়ের ব্যাগ।

চুপচাপ এসে শেষ বেঞ্চটায় বসে বললেন,

“এক কাপ চা হবে?”

“অবশ্যই।”

গোপাল চা বানিয়ে দিল।

বৃদ্ধ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,

“কত?”

“পাঁচ টাকা।”

বৃদ্ধ পকেট হাতড়ালেন।

তারপর মুখটা একটু নিচু করে বললেন,

“আজ টাকা নেই।”

গোপাল হেসে বলল,

“কাল দেবেন।”

বৃদ্ধ তাকালেন।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

“না।”

“তাহলে বিশ্বাস করছেন?”

গোপাল চায়ের কেটলি নামাতে নামাতে বলল,

“চা খাওয়ার জন্য মানুষকে আগে চিনতে হয় নাকি?”

বৃদ্ধ কিছু বললেন না।

পরদিন আবার এলেন।

আবার এক কাপ চা।

আবার টাকা নেই।

এভাবে টানা সাত দিন।

গ্রামের লোকজন এবার মজা করতে শুরু করল।

“গোপাল, লোকটা তোকে বোকা বানাচ্ছে।”

“সাত দিনের টাকা একসঙ্গে নিয়ে পালাবে!”

গোপাল শুধু হাসত।

অষ্টম দিন বৃদ্ধ এলেন না।

নবম দিনও না।

দশম দিনও না।

গোপালের কেমন যেন খারাপ লাগতে শুরু করল।

সে বুঝতে পারছিল না কেন।

লোকটাকে সে চিনত না।

তবুও যেন প্রতিদিন দোকানে একটা পরিচিত মুখের অপেক্ষা করছিল।

এক সপ্তাহ পর দুপুরে একটি বড় গাড়ি এসে দোকানের সামনে দাঁড়াল।

গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন ভদ্রলোক।

সঙ্গে দু’জন কর্মচারী।

তিনি গোপালকে জিজ্ঞেস করলেন,

“আপনিই গোপাল?”

“হ্যাঁ।”

“আপনার সঙ্গে একজন বৃদ্ধ প্রতিদিন চা খেতে আসতেন?”

গোপালের বুক ধক করে উঠল।

“হ্যাঁ। কী হয়েছে?”

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“উনি আমার বাবা।”

গোপাল অবাক।

“আপনার বাবা কোথায়?”

ভদ্রলোক ধীরে বললেন,

“দশ দিন আগে উনি মারা গেছেন।”

গোপাল স্তব্ধ হয়ে গেল।

“কিন্তু… উনি তো তার পরের দিনও এখানে এসেছিলেন!”

ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন।

“জানি।”

তিনি পকেট থেকে একটি খাম বের করলেন।

“বাবা মৃত্যুর কয়েকদিন আগে আমাকে একটা কথা বলেছিলেন।”

“কী?”

“বলেছিলেন—‘আমার মৃত্যুর পর বাসস্ট্যান্ডের গোপালের কাছে যেও।’”

গোপাল খামটা নিল।

ভেতরে একটি ছোট্ট চিঠি।

“গোপাল,

তুই আমাকে চেনিস না।

কিন্তু আমি তোকে অনেকদিন ধরে দেখেছি।

প্রতিদিন দোকানে বসে দেখতাম—কেউ টাকা না দিলে তুই তাকে চা খেতে দিস।

একদিন একজন বৃদ্ধকে বিনা পয়সায় চা খেতে দেখে বুঝলাম, মানুষের কাছে এখনও মানুষের দাম আছে।

তাই গত কয়েকদিন ইচ্ছে করেই টাকা না দিয়ে চা খেয়েছি।

তোর বিশ্বাসটা পরীক্ষা করার জন্য নয়।

নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য—এই পৃথিবী এখনও পুরোপুরি বদলে যায়নি।

আমার ছেলে বড় ব্যবসায়ী।

অনেক টাকা আছে।

কিন্তু আমি চাই, আমার মৃত্যুর পর কিছু টাকা এমন কাজে লাগুক, যার মূল্য টাকায় মাপা যায় না।

তাই এই দোকানটার সামনে একটা পাকা ছাউনি করে দিস।

আর পাশে একটা বেঞ্চ।

যাতে বৃষ্টির দিনে পথের মানুষ দাঁড়াতে পারে।

টাকাটা আমার ছেলে দেবে।

শুধু একটা শর্ত—

চায়ের দাম যেন কোনওদিন মানুষের সামর্থ্য দেখে ঠিক না করিস।

যার আছে, সে দেবে।

যার নেই, সে শুধু চা খেয়ে যাবে।

—একজন অচেনা চা-খোর।”

চিঠি পড়ে গোপালের চোখ ভিজে গেল।

বৃদ্ধের ছেলে বললেন,

“বাবা আপনার দোকানটা খুব পছন্দ করতেন।”

গোপাল নিচু গলায় বলল,

“উনি প্রতিদিন শেষ বেঞ্চটায় বসতেন।”

“জানি।”

“ওই বেঞ্চটা আমি কাউকে বসতে দেব না।”

ভদ্রলোক অবাক হয়ে তাকালেন।

“কেন?”

গোপাল বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে বলল,

“কারণ উনি হয়তো আবার চা খেতে আসবেন।”

ভদ্রলোকের চোখও ভিজে গেল।

কয়েক মাস পর দোকানটার সামনে পাকা ছাউনি হলো।

একটি নতুন বেঞ্চও বসানো হলো।

বেঞ্চটির পাশে ছোট্ট একটি কাঠের ফলক।

তাতে লেখা—

“যার পকেটে টাকা নেই, তার জন্য এই বেঞ্চ আর এক কাপ চা সবসময় আছে।”

সেদিন থেকে গোপালের দোকানে আরও অনেক মানুষ আসতে লাগল।

কেউ পাঁচ টাকা দিত।

কেউ দশ টাকা।

কেউ কিছুই দিত না।

গোপাল কাউকে জিজ্ঞেস করত না।

শুধু চা এগিয়ে দিত।

আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে সে শেষ বেঞ্চটার দিকে একবার তাকিয়ে বলত,

“কাকা, আজও চা বাকি রইল।”

তারপর কেটলিটা নামিয়ে রাখত।

কারণ কিছু ঋণ টাকা দিয়ে শোধ হয় না।

কিছু মানুষ চলে গেলেও,

তাদের রেখে যাওয়া এক কাপ চায়ের উষ্ণতা অনেকদিন থেকে যায়।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *