Categories
গল্প

শেষ বেঞ্চের ছেলেটা।

স্কুলের শেষ বেঞ্চটায় সবসময় একাই বসত অর্ণব।

ক্লাসের অন্য ছেলেরা তাকে খুব একটা পছন্দ করত না। কেউ বলত, সে পড়াশোনায় দুর্বল। কেউ বলত, সবসময় চুপ করে থাকে বলে নিশ্চয়ই অহংকারী।

শিক্ষকরাও তাকে নিয়ে খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না।

শুধু বাংলা শিক্ষক অনিরুদ্ধবাবু মাঝে মাঝে তার পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন,

—“অর্ণব, তুই এত চুপ করে থাকিস কেন?”

অর্ণব মৃদু হেসে বলত,

—“কথা বলার মতো কেউ নেই স্যার।”

অনিরুদ্ধবাবু আর কিছু বলতেন না।

একদিন ক্লাসে রচনা লিখতে দেওয়া হল—
‘আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।’

সবাই লিখতে শুরু করল।

কেউ লিখল বাবা।
কেউ মা।
কেউ দাদু-ঠাকুমার কথা।

অর্ণব অনেকক্ষণ খাতা ফাঁকা রেখে বসে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে লিখতে শুরু করল।

পরদিন খাতা দেখতে গিয়ে অনিরুদ্ধবাবু অর্ণবের লেখাটা পড়ে থমকে গেলেন।

মাত্র কয়েকটি লাইন—

“আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির নাম আমি জানি না।

প্রতিদিন সকালে স্কুলে আসার সময় গেটের বাইরে একজন বৃদ্ধকে দেখি। তিনি আমাকে দেখে হাসেন। কোনওদিন কথা বলেননি। কিন্তু যেদিন আমার টিফিন থাকে না, সেদিন তিনি নিজের রুটির অর্ধেকটা আমার হাতে দেন।

আমি জানি না তিনি আমার কে।

কিন্তু পৃথিবীতে যিনি না জেনেও আমার ক্ষুধা বোঝেন, তিনিই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।”

অনিরুদ্ধবাবুর চোখ ভিজে উঠল।

তিনি পরদিন স্কুল ছুটির পর অর্ণবকে ডেকে বললেন,

—“ওই বৃদ্ধ মানুষটার নাম জানিস?”

অর্ণব মাথা নাড়ল।

দু’জনে স্কুলের গেটের বাইরে গেলেন।

কিন্তু সেদিন বৃদ্ধটি সেখানে ছিলেন না।

পরের দিনও না।

তৃতীয় দিনও না।

অর্ণব চুপ হয়ে গেল।

এক সপ্তাহ পর এক সকালে স্কুলে এসে অর্ণব দেখল, গেটের পাশে একটা ছোট বেঞ্চ রাখা হয়েছে।

বেঞ্চটির পাশে একটি ফলক।

লেখা—

“যে মানুষটি নিজের রুটি ভাগ করে অন্যের ক্ষুধা মেটাতেন, তাঁর স্মৃতিতে।”

অর্ণব অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

অনিরুদ্ধবাবু পাশে এসে বললেন,

—“উনি আর নেই, অর্ণব।”

অর্ণব কিছু বলল না।

—“উনার নাম ছিল হরিপদ কাকা। উনি কোনওদিন স্কুলে পড়েননি। কিন্তু তোর লেখা পড়ে বুঝলাম, উনি তোকে যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন, সেটা অনেক বড়।”

অর্ণব বেঞ্চটার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর পকেট থেকে নিজের টিফিনের বাক্সটা বের করল।

বাক্স খুলে অর্ধেক খাবার বেঞ্চের ওপর রেখে দিল।

অনিরুদ্ধবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

—“এটা কী করছিস?”

অর্ণব বলল,

—“কেউ যদি ক্ষুধার্ত হয়ে আসে…”

কথাটা শেষ করতে পারল না।

অনিরুদ্ধবাবু তার মাথায় হাত রাখলেন।

সেদিন থেকে স্কুলের সেই বেঞ্চটি আর শুধু বসার জায়গা রইল না।

প্রতিদিন সেখানে কেউ না কেউ নিজের টিফিনের কিছুটা রেখে যেত।

কেউ বিস্কুট।

কেউ ফল।

কেউ রুটি।

আর অর্ণব?

সে আর শেষ বেঞ্চে একা বসত না।

কারণ সে বুঝে গিয়েছিল—

কখনও কখনও একজন মানুষের ছোট্ট ভালোবাসা, অন্য একজন মানুষের পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *