বৃদ্ধাশ্রমের ঘরটা পরিষ্কার করতে গিয়ে ছবিটা পেল মিতা।
ছবিটা খুব পুরনো। চারজন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে একজন বৃদ্ধা, দু’পাশে দুই তরুণী আর সামনে একটি ছোট্ট ছেলে।
ছবির পেছনে কাঁপা হাতে লেখা—
“যদি কখনও হারিয়ে যাই, আমাকে খুঁজবে এই ছবির মানুষগুলোর মধ্যে।”
মিতা বৃদ্ধাশ্রমে কাজ করত। প্রতিদিনই কত মানুষের কত গল্প শুনত। কিন্তু এই ছবিটা তার মনে অদ্ভুত একটা কৌতূহল তৈরি করল।
ছবিটা কার?
সে বৃদ্ধাশ্রমের আবাসিকদের জিজ্ঞেস করল।
কেউ জানল না।
শেষে ছবিটা নিয়ে গেলেন আশ্রমের সবচেয়ে বয়স্ক বাসিন্দা সরলা দেবীর কাছে।
ছবিটা দেখেই বৃদ্ধার চোখ কেঁপে উঠল।
—“এটা কোথায় পেলে?”
—“আপনার ঘরের পুরনো আলমারির নিচে।”
সরলা দেবী ছবিটা দু’হাতে ধরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“ছেলেটাকে চিনতে পারছ?”
মিতা মাথা নাড়ল।
—“ও আমার ছেলে।”
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
—“তাহলে উনি এখন কোথায়?”
সরলা দেবী মৃদু হেসে বললেন,
—“জানি না।”
—“কত বছর হলো?”
—“চল্লিশ।”
মিতা অবাক হয়ে গেল।
সরলা দেবী ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন।
ছেলেটির নাম ছিল অমল। ছোটবেলায় বাবার মৃত্যুর পর সংসারে অভাব নেমে এসেছিল। সরলা দেবী ছেলেকে পড়াশোনা করাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু একদিন অভিমান করে অমল বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
তারপর আর কোনও খবর নেই।
—“আপনি খুঁজেছিলেন?”
সরলা দেবী মাথা নাড়লেন।
—“অনেক।”
—“কোনও চিঠি?”
—“একবার এসেছিল। তারপর আর কিছু নয়।”
মিতা ছবিটার পেছনের লেখাটা আবার পড়ল।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল।
ছবির নিচে খুব ছোট করে আরও একটা লেখা—
“অমল, কলকাতা—চাকরি পেলে মাকে নিয়ে যাব।”
মিতা পরদিন থেকেই খোঁজ শুরু করল।
পুরনো ভোটার তালিকা, এলাকার পরিচিত মানুষ, আশ্রমের নথি—যেখানে পারল খুঁজল।
তিন সপ্তাহ পর একটা নাম পেল।
অমল কুমার সেন।
বয়স মিলে যাচ্ছে।
ঠিকানাও একসময় কলকাতার।
কিন্তু বর্তমান ঠিকানা অন্য শহরে।
মিতা ফোন করল।
ওপাশ থেকে বৃদ্ধ কণ্ঠ—
—“হ্যালো?”
মিতা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—“আপনি কি অমলবাবু?”
—“জি।”
—“আপনার মায়ের নাম সরলা দেবী?”
ওপাশে হঠাৎ নীরবতা।
তারপর কাঁপা গলা—
—“মা… বেঁচে আছেন?”
মিতার চোখ ভিজে উঠল।
—“হ্যাঁ।”
দু’দিন পর একজন বৃদ্ধ মানুষ বৃদ্ধাশ্রমের দরজায় এসে দাঁড়ালেন।
চুল সাদা।
হাতে পুরনো একটা ব্যাগ।
সরলা দেবী বারান্দায় বসেছিলেন।
মিতার ইশারায় তিনি সামনে তাকালেন।
দু’জনের চোখে চোখ পড়ল।
কেউ কিছু বলল না।
অমল ধীরে ধীরে মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন।
—“মা…”
সরলা দেবী কাঁপা হাতে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
—“এত দেরি করলি কেন রে?”
অমল কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
—“ভেবেছিলাম তুমি আমাকে ক্ষমা করবে না।”
সরলা দেবী মৃদু হেসে বললেন,
—“মায়েরা রাগ করে থাকতে পারে। কিন্তু অপেক্ষা করা বন্ধ করতে পারে না।”
মিতা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।
অমল উঠে তার হাতে একটি ছোট খাম দিলেন।
—“এটা আমার কাছে চল্লিশ বছর ধরে ছিল।”
মিতা খুলে দেখল—একটি পুরনো ছবি।
ঠিক সেই ছবি।
তবে ছবির পেছনে নতুন করে লেখা—
“মাকে ফিরিয়ে আনার রাস্তা যদি কোনওদিন ভুলে যাই, এই ছবিটা যেন আমাকে পথ দেখায়।”
মিতা ছবিটা সরলা দেবীর হাতে তুলে দিল।
বৃদ্ধা ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন।
সেদিন বৃদ্ধাশ্রমের ঘরে অনেক বছর পর একটি মা আবার তাঁর ছেলেকে কাছে পেলেন।
আর মিতা বুঝল—
কিছু সম্পর্ক হারিয়ে যায় না। শুধু তাদের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা কখনও কখনও অনেক দীর্ঘ হয়ে যায়।
সমাপ্ত।