Categories
গল্প

গল্প : বাবার পুরোনো জুতোর জোড়া।

বাবার মৃত্যুর পর বাড়ির ঘর গোছাতে গিয়ে অনির্বাণ একটি পুরোনো জুতোর জোড়া পেল।

কালো চামড়ার জুতো। বহু বছরের পুরোনো। সামনের অংশ ঘষে সাদা হয়ে গেছে। তবু অদ্ভুতভাবে যত্ন করে রাখা।

মা বললেন,

“ওগুলো ফেলে দিস না।”

অনির্বাণ হেসে বলল,

“এত পুরোনো জুতো রেখে কী হবে?”

মা শুধু বললেন,

“তোর বাবা ওগুলো খুব যত্ন করে রাখত।”

অনির্বাণ জানত, তার বাবা রমেশবাবু ছিলেন স্কুলের শিক্ষক। সারা জীবন সাধারণ জীবনযাপন করেছেন। নিজের জন্য কখনও দামি জিনিস কেনেননি।

কিন্তু জুতোর সঙ্গে এমন কী স্মৃতি?

উত্তর পেল কয়েকদিন পর।

জুতোর ভেতরে হাত ঢোকাতে গিয়ে অনির্বাণ একটি ছোট কাগজ পেল।

তাতে লেখা—

“প্রথম বেতনের টাকা দিয়ে কেনা।”

অনির্বাণ অবাক হল।

বাবার প্রথম বেতন দিয়ে কেনা জুতো!

কাগজের নিচে আরেকটি লাইন—

“এই জুতো পরে প্রথমবার স্কুলে গিয়েছিলাম।”

অনির্বাণ জুতোর দিকে তাকিয়ে রইল।

পরদিন সে বাবার পুরোনো স্কুলে গেল।

প্রধান শিক্ষককে জুতোর কথা বলতেই তিনি হেসে ফেললেন।

“ওই জুতো?”

“আপনি জানেন?”

“তোর বাবা যখন চাকরিতে যোগ দিয়েছিল, তখন তার কাছে ভালো জুতো কেনার টাকাও ছিল না।”

“তাহলে?”

“স্কুলের এক ছাত্রের বাবা তাকে জুতো কিনে দিয়েছিল।”

অনির্বাণ অবাক।

“কেন?”

প্রধান শিক্ষক বললেন,

“তোর বাবা গ্রামের দরিদ্র ছাত্রদের নিজের পকেট থেকে খাতা-কলম কিনে দিত। একদিন এক ছাত্রের বাবা সেটা দেখে বলেছিল, ‘স্যার, আপনি আমাদের ছেলেকে মানুষ করছেন। আপনাকে একটা জুতো না দিলে আমার লজ্জা হবে।’”

অনির্বাণ চুপ করে গেল।

প্রধান শিক্ষক আরও বললেন,

“তোর বাবা সেই জুতো প্রায় বিশ বছর পরেও ফেলে দেয়নি।”

বাড়ি ফিরে অনির্বাণ মাকে সব বলল।

মা মৃদু হেসে বললেন,

“তুই কি জানিস, তোর বাবার একটা অভ্যাস ছিল?”

“কী?”

“প্রতি বছর দুর্গাপুজোর আগে একটা নির্দিষ্ট টাকা আলাদা করে রাখত।”

“কেন?”

“কিছু ছাত্রের বই, জামাকাপড় আর জুতোর জন্য।”

অনির্বাণের বুক ভারী হয়ে এল।

সে বাবাকে মনে মনে নতুন করে চিনতে শুরু করল।

কয়েকদিন পর বাড়ির পুরোনো আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি খাতা পাওয়া গেল।

পাতায় পাতায় নাম।

রাহুল—জুতো।

সেলিম—স্কুলব্যাগ।

মৌসুমি—বই।

বিপ্লব—পরীক্ষার ফি।

প্রতিটি নামের পাশে তারিখ এবং টাকার হিসাব।

শেষ পাতায় লেখা—

“আমার পরে যদি কেউ এই খাতা পায়, তাহলে যেন এই কাজটা বন্ধ না হয়।”

অনির্বাণ অনেকক্ষণ খাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে বুঝতে পারল, বাবার আসল সম্পত্তি ব্যাংকে নেই।

কোনো জমির দলিলেও নেই।

তার আসল সম্পদ ছিল মানুষের বিশ্বাস।

কয়েক মাস পর অনির্বাণ নিজের বেতনের একটি অংশ আলাদা করে রাখতে শুরু করল।

প্রথমে তিনজন ছাত্র।

তারপর পাঁচজন।

তারপর দশজন।

একদিন গ্রামের এক স্কুলে সে এক কিশোরকে নতুন জুতো দিল।

ছেলেটি জুতো হাতে নিয়ে বলল,

“কাকু, আমি কি আপনার টাকা পরে ফিরিয়ে দেব?”

অনির্বাণ হেসে বলল,

“না। তুমি বড় হয়ে অন্য কাউকে দেবে।”

ছেলেটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

“কাকে?”

“যার প্রয়োজন হবে।”

সেদিন রাতে অনির্বাণ বাবার পুরোনো জুতোর জোড়াটি পরিষ্কার করে কাঠের আলমারির ওপর রাখল।

মা পাশে এসে দাঁড়ালেন।

“ফেলে দিলি না?”

অনির্বাণ মাথা নাড়ল।

“না। এগুলো আর জুতো নয় মা।”

“তাহলে?”

অনির্বাণ মৃদু হেসে বলল,

“এগুলো আমাদের পরিবারের পথ দেখাবে।”

জানালার বাইরে তখন হালকা বৃষ্টি।

অনির্বাণ বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,

“তুমি যে পথটা শুরু করে গিয়েছিলে, বাবা, আমি চেষ্টা করব সেটা থামতে না দিতে।”

পুরোনো জুতোর জোড়া নীরবে পড়ে রইল।

কিন্তু সেই জোড়া জুতোর পথ ধরে একের পর এক শিশুর জীবনে নতুন রাস্তা তৈরি হতে লাগল।

কারণ কিছু মানুষের রেখে যাওয়া জিনিস শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে না—

সেগুলো অন্য মানুষের ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *