Categories
গল্প

গল্প : শেষ ছবিটার মানুষটি।

শহরের এক প্রান্তে ছোট্ট একটি ফটোগ্রাফির দোকান ছিল—‘আলোকচিত্র’। দোকানটির মালিক অর্ক। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। ছোটবেলা থেকেই ছবি তুলতে ভালোবাসত সে। মানুষের মুখ, রাস্তার দৃশ্য, উৎসব, বৃষ্টি—সবকিছুর মধ্যেই সে গল্প খুঁজে পেত।

এক বর্ষার বিকেলে দোকানে বসে পুরোনো ক্যামেরার মেমোরি কার্ড গোছাচ্ছিল অর্ক। হঠাৎ একটি পুরোনো ফোল্ডার চোখে পড়ল।

ফোল্ডারের নাম—‘২০১২’।

অর্ক অবাক হল। সে তো ২০১২ সালে স্কুলে পড়ত। তখন নিজের ক্যামেরা ছিল না। ছবিগুলো এল কোথা থেকে?

ফোল্ডার খুলতেই একের পর এক ছবি সামনে আসতে লাগল।

বাজার। নদীর ঘাট। স্কুলের মাঠ। পুজোর ভিড়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।

সবশেষে একটি ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি ছোট ছেলে ফুটপাথের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে লাল রঙের খেলনা গাড়ি।

অর্ক ছবিটা বড় করে দেখল।

ছেলেটির মুখ অদ্ভুতভাবে পরিচিত।

তারপরই বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা লাগল।

ছেলেটি আসলে অর্ক নিজেই।

কিন্তু ছবির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি কে?

একজন যুবক। হাতে ক্যামেরা। মুখে হালকা হাসি।

অর্ক কাউকে চিনতে পারল না।

ছবির তারিখ—১৭ জুলাই ২০১২।

অর্কের মনে পড়ল, সেই দিনটিই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত দিনগুলোর একটি। ছোটবেলায় সে মেলার ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পর এক অচেনা মানুষ তাকে পুলিশের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।

কিন্তু সেই মানুষটির মুখ সে কোনোদিন মনে করতে পারেনি।

অর্ক ছবিটা নিয়ে বাড়ি গেল।

রাতে মাকে ছবিটি দেখাতেই মা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।

“এই ছবিটা কোথায় পেলি?”

“আমার দোকানের পুরোনো মেমোরি কার্ডে।”

মা ছবির পেছনের মানুষটির দিকে তাকিয়ে বললেন,

“লোকটাকে আমি দেখেছি।”

অর্ক চমকে উঠল।

“কোথায়?”

“সেই দিন। তোর হারিয়ে যাওয়ার পর সবাই যখন তোকে খুঁজছিল, এই লোকটাই প্রথম এসে বলেছিল—একটা ছেলে নদীর দিকের মেলার কাছে একা দাঁড়িয়ে আছে।”

অর্ক স্তব্ধ।

“তাহলে উনি কে?”

মা মাথা নাড়লেন।

“জানি না। তুই ফিরে আসার পর অনেকবার খুঁজেছি। আর পাইনি।”

পরদিন অর্ক ছবিটি নিয়ে পুরোনো মেলার মাঠে গেল। এখন সেখানে বহুতল বাড়ি তৈরি হয়েছে। তবে পাশেই একটি ছোট চায়ের দোকান এখনও আছে।

দোকানের বৃদ্ধ মালিক অর্কের হাতে ছবি দেখে বললেন,

“এই লোকটাকে আমি চিনি।”

“নাম জানেন?”

“সুব্রত। ছবি তুলত। খুব ভালো মানুষ ছিল।”

“এখন কোথায়?”

বৃদ্ধের মুখ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল।

“অনেক বছর হলো নেই।”

অর্ক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

“কী হয়েছিল?”

“একদিন পাহাড়ে ছবি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা হয়েছিল।”

অর্ক ছবির দিকে তাকাল।

সুব্রতর ক্যামেরাটি ছবিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।

“ওঁর কোনো পরিবার ছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

“একজন ছোট ভাই ছিল। নাম অনিক। শহরের বাইরে থাকে।”

অনেক খোঁজাখুঁজির পর অর্ক অনিকের সন্ধান পেল।

অনিক প্রথমে দেখা করতে চাইছিল না। কিন্তু অর্ক ছবিটি দেখানোর পর তার চোখে জল চলে এল।

“দাদা এই ছবিটা তুলেছিল?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আপনি জানেন না, দাদা কেন ছবি তুলত?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

অনিক বলল,

“দাদা বলত, মানুষের জীবনে কিছু মুহূর্ত থাকে যেগুলো মানুষ ভুলে যায়। ছবি সেই মুহূর্তগুলোকে বাঁচিয়ে রাখে।”

তারপর অনিক একটি পুরোনো ক্যামেরা অর্কের হাতে দিল।

“দাদা মারা যাওয়ার আগে এটা আমাকে দিয়েছিল। বলেছিল, একদিন এমন কাউকে খুঁজে বের করতে, যার একটা ছবি তার কাছে রয়ে গেছে।”

অর্ক অবাক হয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে রইল।

“মানে?”

“দাদা জানত না তুমি কে। কিন্তু সেই দিন তোমার ছবি তোলার পর সে বলেছিল—এই ছেলেটার পরিবার নিশ্চয়ই ওকে খুঁজছে।”

অর্কের চোখ ভিজে গেল।

একজন অচেনা মানুষ শুধু তাকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেয়নি, তার একটি ছবি তুলে সেই মুহূর্তটাকেও ধরে রেখেছিল।

অনিক আরও একটি কথা বলল।

“দাদার ক্যামেরায় একটা শেষ ছবি ছিল। আমরা কখনও খুলিনি।”

অর্ক ক্যামেরাটি নিয়ে কম্পিউটারে সংযোগ করল।

একটি মাত্র ছবি।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে—ছোট্ট অর্ক মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরছে। দূরে দাঁড়িয়ে সুব্রত ক্যামেরা হাতে তাকিয়ে আছে।

ছবির নিচে একটি ছোট লেখা ছিল—

“যাকে তার মানুষদের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি, তার মুখটাই আজ আমার সবচেয়ে সুন্দর ছবি।”

অর্ক অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না।

কয়েকদিন পর সে নিজের দোকানের দেওয়ালে ছবিটি বাঁধিয়ে রাখল।

নিচে লিখল—

“সুব্রত—একজন অচেনা মানুষ, যিনি একদিন একটি শিশুকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।”

তারপর থেকে অর্কের দোকানে একটি নিয়ম চালু হল।

কোনো দরিদ্র মানুষ ছবি তুলতে এলে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হবে না।

কারণ অর্ক বুঝেছিল—

কিছু ছবি শুধু মুখ ধরে রাখে না।

কিছু ছবি একজন মানুষের ভালোবাসা, দায়িত্ব আর অচেনা মানবিকতার ইতিহাস ধরে রাখে।

আর কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য।

তারপর তিনি চলে যান।

কিন্তু রেখে যান এমন একটি মুহূর্ত, যা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *