Categories
উপন্যাস

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব )।

তৃতীয় পর্ব — যে ফিরে এসেছিল

“তোমার নাম অর্ণব। আর আজ থেকে ঠিক পঁচিশ বছর আগে তুমি এই বাড়িতে মারা গিয়েছিলে।”

মেঘলার কথাটা যেন ঘরের চার দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে বারবার ফিরে আসছিল।

অর্ণব।

মারা গিয়েছিল।

পঁচিশ বছর আগে।

অর্ক কিছুতেই কথাগুলোর অর্থ মিলিয়ে নিতে পারছিল না।

সে মেঘলার হাতটা সরিয়ে দিল।

“এসব কী বলছ তুমি?”

মেঘলা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

“আমার নাম অর্ক। আমার জন্ম—”

“তোমার জন্মের কথা তুমি নিজে জানো?”

প্রশ্নটা শুনে অর্ক থেমে গেল।

মেঘলা ধীরে ধীরে বলল,

“তুমি তোমার জন্মের কোনো স্মৃতি মনে করতে পারো?”

অর্ক উত্তর দিতে পারল না।

“তোমার বাবা-মায়ের সঙ্গে তোমার ছোটবেলার কোনো ছবি আছে?”

অর্কের মুখ শুকিয়ে গেল।

“আছে।”

“কোথায়?”

অর্ক চোখ নামিয়ে নিল।

তার নিজের কাছেই উত্তরটা পরিষ্কার নয়।

তার কাছে শৈশবের কয়েকটা অস্পষ্ট ছবি ছাড়া তেমন কিছু নেই। সে জানে তার বাবা-মা তাকে বড় করেছেন। জানে ছোটবেলায় তারা শহরের অন্য প্রান্তে থাকতেন। কিন্তু তার জন্ম কোথায়—সে কখনও ভেবে দেখেনি।

মেঘলা বলল,

“কারণ তোমার জীবনটা যেভাবে তুমি জানো, তার অনেকটাই তোমাকে বলা হয়েছে।”

“কে বলেছে?”

“যারা চেয়েছিল তুমি সত্যিটা কখনও জানতে না পারো।”

অর্ক এবার রেগে গেল।

“তাহলে সত্যিটা বলো!”

মেঘলা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

“পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে আগুন লেগেছিল।”

“আমি জানি না।”

“তখন তোমার বয়স ছিল পাঁচ।”

“আর তুমি?”

“আমি চার।”

অর্ক স্তব্ধ।

“আমরা ভাই-বোন ছিলাম না,” মেঘলা বলল। “কিন্তু আমাদের বাবা-মায়েরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমরা একসঙ্গে বড় হচ্ছিলাম।”

অর্ক আয়নার দিকে তাকাল।

সেই ছোট ছেলেটার মুখ এখনও তার চোখে ভাসছে।

“তারপর আগুন লাগল?”

“হ্যাঁ।”

“আমি মারা গেলাম?”

মেঘলা চোখ নামিয়ে বলল,

“সবাই তাই ভেবেছিল।”

“তাহলে আমি বেঁচে গেলাম কীভাবে?”

মেঘলা এবার জানালার দিকে তাকাল।

বৃষ্টির ফোঁটা কাচ বেয়ে নেমে আসছে।

“তোমাকে কেউ বাড়ির পেছনের গোপন দরজা দিয়ে বের করে নিয়ে গিয়েছিল।”

“কে?”

মেঘলা উত্তর দিল না।

“কে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল?”

মেঘলা বলল,

“আমার বাবা।”

অর্ক চমকে উঠল।

“তোমার বাবা?”

“যাকে তুমি তিন বছর আগে আমার বাবা বলে চিনেছিলে।”

অর্কের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“কিন্তু তুমি বলেছিলে তিনি তোমার বাবা নন।”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে?”

“তিনি আমার কাকা ছিলেন।”

ঘরটা যেন আরও অন্ধকার হয়ে গেল।

মেঘলা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল—

“আমাদের বাবা-মায়েরা মারা যাওয়ার পর তিনি আমাকে নিয়ে চলে যান। তোমাকেও নিয়ে যান। কিন্তু তোমাকে নিজের ছেলে বলে পরিচয় দেননি। তোমাকে অন্য এক পরিবারের কাছে দিয়ে দেন।”

“কেন?”

“কারণ তিনি ভয় পেয়েছিলেন।”

“কিসের?”

“এই বাড়ির।”

অর্ক বিরক্ত হয়ে বলল,

“একটা বাড়িকে মানুষ ভয় পায় কেন?”

মেঘলা এবার আয়নার দিকে তাকাল।

“কারণ এই বাড়িতে একটা ঘটনা ঘটেছিল, যেটা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।”

“কী ঘটনা?”

“আগুন লাগার আগের রাতে আমাদের বাবা একটা ঘড়ি পেয়েছিলেন।”

অর্ক থমকে গেল।

“ঘড়ি?”

“পুরনো একটা পকেট ঘড়ি। তাতে কাঁটা ছিল না। কিন্তু সেটা সবসময় টিকটিক করত।”

অর্কের শরীর শিউরে উঠল।

ঘরের কোথাও আবার টিকটিক শব্দ শোনা গেল।

টিক…

টিক…

টিক…

মেঘলা বলল,

“আগুন লাগার পর থেকে ঘড়িটা আর কখনও থামেনি।”

“ঘড়িটা কোথায়?”

মেঘলা ঘরের এক কোণে ইশারা করল।

সেখানে একটা পুরনো কাঠের বাক্স।

অর্ক বাক্সটার কাছে গেল।

ঢাকনা খুলতেই তার ভেতর থেকে একটা কালো পকেট ঘড়ি বেরিয়ে এল।

ঘড়িতে কোনো কাঁটা নেই।

তবু—

টিক…

টিক…

টিক…

অর্ক ঘড়িটা হাতে নিতেই মাথার ভেতর একটা তীব্র ব্যথা শুরু হলো।

তারপর—

একটা স্মৃতি।

সে ছোট।

বয়স পাঁচ।

তার সামনে মেঘলা দাঁড়িয়ে।

মেঘলা কাঁদছে।

“অর্ণব, তাড়াতাড়ি!”

“কোথায় যাব?”

“কাকা বলেছে পেছনের দরজা দিয়ে যেতে।”

“তুমি যাবে?”

“আমি আসছি।”

“মিথ্যে বলছ!”

“না।”

তারপর আগুন।

একজন পুরুষের চিৎকার—

“মেঘলা! অর্ণবকে নিয়ে যাও!”

তারপর—

একটা বিস্ফোরণের শব্দ।

অন্ধকার।

অর্ক হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এল।

ঘড়িটা তার হাত থেকে পড়ে গেল।

সে হাঁপাতে লাগল।

মেঘলা তাকে ধরে ফেলল।

“তুমি মনে করতে পেরেছ?”

অর্ক মাথা নাড়ল।

“আমি… আমি এখানে ছিলাম।”

“হ্যাঁ।”

“তুমি ছিলে।”

“হ্যাঁ।”

“তারপর?”

মেঘলা চুপ।

“তারপর কী হয়েছিল?”

মেঘলার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

“তুমি আমাকে রেখে চলে গিয়েছিলে।”

“আমি?”

“না। তোমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।”

“কে নিয়ে গিয়েছিল?”

মেঘলা বলল,

“যে মানুষটাকে তুমি এতদিন তোমার বাবা বলে জেনেছ।”

অর্কের বুকের মধ্যে যেন কিছু ভেঙে পড়ল।

“আমার বাবা?”

“তিনি তোমার আসল বাবা ছিলেন না।”

“তাহলে আমার আসল বাবা?”

মেঘলা উত্তর দিল,

“তিনি এই বাড়ির আগুনে মারা যান।”

অর্ক চোখ বন্ধ করল।

“আর আমার মা?”

“তিনিও।”

ঘরে কিছুক্ষণ কোনো শব্দ নেই।

শুধু বাইরে বৃষ্টি।

তারপর অর্ক ধীরে ধীরে বলল,

“তাহলে এত বছর আমাকে মিথ্যে বলা হয়েছে?”

মেঘলা বলল,

“তোমাকে বাঁচানোর জন্য।”

“কিসের হাত থেকে?”

মেঘলা তার দিকে তাকাল।

“যে মানুষ আগুন লাগিয়েছিল, সে এখনও বেঁচে আছে।”

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

“কে?”

মেঘলা উত্তর দেওয়ার আগেই নিচতলা থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল।

ধাম!

দুজনেই চমকে উঠল।

মেঘলা ফিসফিস করে বলল,

“সে এসেছে।”

“কে?”

“যে আমাদের খুঁজে বের করেছে।”

পায়ের শব্দ।

ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে কেউ ওপরে উঠছে।

ঠক।

ঠক।

ঠক।

মেঘলা অর্কের হাত ধরে বলল,

“লুকোতে হবে।”

“কোথায়?”

“এই ঘরের পেছনে।”

দুজনেই একটা পুরনো কাঠের আলমারির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।

পায়ের শব্দ আরও কাছে এল।

তারপর দরজা খুলল।

একজন বৃদ্ধ ঘরে ঢুকলেন।

অর্ক তাকে দেখে জমে গেল।

সে লোকটাকে চিনতে পারছে না।

কিন্তু তার চোখে অদ্ভুত একটা পরিচিতি।

বৃদ্ধ ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।

তার হাতে একটা লণ্ঠন।

তিনি চারপাশে তাকালেন।

“মেঘলা?”

কোনো উত্তর নেই।

“আমি জানি তুমি এখানে।”

মেঘলা অর্কের হাত শক্ত করে ধরে রইল।

বৃদ্ধ এবার আয়নার সামনে গেলেন।

আয়নায় তাকিয়ে বললেন,

“অর্ণব ফিরে এসেছে।”

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে হাসলেন।

“পঁচিশ বছর পর।”

মেঘলা আর থাকতে পারল না।

সে আলমারির আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।

“আপনি এখানে কেন এসেছেন?”

বৃদ্ধ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি জানো কেন।”

“ওকে আর ছুঁবেন না।”

“আমি ওকে ছুঁতে আসিনি।”

“তাহলে?”

বৃদ্ধ অর্কের দিকে তাকালেন।

“আমি সত্যিটা শেষ করতে এসেছি।”

অর্ক সামনে এগিয়ে এল।

“আপনি কে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আমি সেই মানুষ, যে তোমাকে আগুনের রাত থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল।”

অর্ক স্তব্ধ।

“আপনি?”

“হ্যাঁ।”

“তাহলে আমার বাবা-মা…”

বৃদ্ধ চোখ নামিয়ে বললেন,

“তোমার বাবা-মা আগুনে মারা যাননি।”

অর্কের চোখ বড় হয়ে গেল।

“কী?”

মেঘলাও যেন প্রথমবার কথাটা শুনল।

“আপনি কী বলছেন?”

বৃদ্ধ বললেন,

“আগুনটা ছিল সাজানো।”

“কেন?”

“কারণ তোমার বাবা এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করেছিলেন, যেটা অনেক মানুষের জন্য বিপজ্জনক ছিল।”

অর্ক বলল,

“কী জিনিস?”

বৃদ্ধ বললেন,

“একটা পুরনো নথি।”

“কিসের নথি?”

“নির্ভয়পুরের জমি, পাহাড় আর সেই পাহাড়ের নিচে থাকা খনিজ সম্পদের নথি।”

অর্ক কিছু বুঝতে পারল না।

বৃদ্ধ বললেন,

“তোমার বাবা জানতে পেরেছিলেন, বহু বছর ধরে একটা বড় চক্র বেআইনিভাবে পাহাড়ের জমি দখল করছে। তিনি প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। সেই প্রমাণের একটা অংশ ছিল এই বাড়িতে।”

“আর আগুন?”

“প্রমাণ নষ্ট করার জন্য।”

মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,

“তাহলে অর্ণবকে কেন বাঁচানো হয়েছিল?”

বৃদ্ধ বললেন,

“কারণ তোমার বাবা জানতেন, প্রমাণের শেষ অংশটা কোথায় আছে—শুধু অর্ণব জানে।”

অর্কের মাথা ঘুরে উঠল।

“আমি?”

“তুমি ছোট ছিলে। কিন্তু তোমার বাবা শেষ মুহূর্তে তোমাকে একটা কথা বলেছিলেন।”

“কী কথা?”

বৃদ্ধ বললেন,

“তিনি বলেছিলেন—‘ঘড়ির নিচে যা আছে, অর্ণব একদিন সেটা খুঁজে পাবে।’”

অর্কের চোখ ঘরের দেয়ালে থাকা ঘড়ির দিকে গেল।

ঘড়িটা থেমে আছে ১২টা ০৫ মিনিটে।

সে ধীরে ধীরে ঘড়িটা নামাল।

পেছনে কাঠের একটা গোপন খোপ।

অর্ক হাত ঢোকাতেই একটা ধাতব বাক্স পেল।

বাক্স খুলতেই ভেতরে পুরনো কাগজপত্র।

একটা ছবি।

একটা পেনড্রাইভ।

আর একটা চিঠি।

চিঠিটা খুলতেই অর্কের হাত কেঁপে উঠল।

প্রথম লাইনে লেখা—

“আমার ছেলে অর্ণবের জন্য।”

অর্ক পড়তে শুরু করল।

“তুমি যখন এই চিঠি পড়বে, তখন হয়তো আমি আর তোমার মা তোমার কাছে থাকব না। কিন্তু মনে রেখো, সত্যিকে কখনও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা যায় না। আমি জানি যারা আমাদের বিরুদ্ধে, তারা একদিন তোমাকে খুঁজবে। তাই তোমাকে দূরে পাঠানো হবে। তুমি তোমার নাম ভুলে যাবে। কিন্তু একদিন মেঘলা তোমাকে খুঁজে নেবে।”

অর্কের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।

শেষ লাইনে লেখা—

“আর যদি কখনও ফিরে আসো, মনে রেখো—শেষ ট্রেনটাই তোমাকে বাড়ি ফিরিয়ে আনবে।”

অর্ক চিঠিটা নামিয়ে রাখল।

মেঘলা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

“তাহলে তুমি আমাকে সত্যিই খুঁজেছিলে,” অর্ক বলল।

মেঘলা মৃদু হাসল।

“আমি তিন বছর ধরে অপেক্ষা করেছি।”

“কিন্তু তুমি আমাকে এতদিন কেন কিছু বলোনি?”

“কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম না তুমি সত্যিই অর্ণব কি না।”

“তাহলে আজ?”

মেঘলা ঘড়িটার দিকে তাকাল।

“আজ রাত ১২টা ০৫ মিনিটে ঘড়িটা আবার চলেছে।”

অর্ক ঘড়ির দিকে তাকাল।

কাঁটা নড়ছে।

১২টা ০৬।

১২টা ০৭।

বৃদ্ধ হঠাৎ জানালার দিকে তাকালেন।

“আমাদের এখনই বেরোতে হবে।”

“কেন?”

“কারণ ওরা জেনে গেছে তুমি ফিরে এসেছ।”

দূরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।

একটা নয়।

দুইটা।

তারপর আরও কয়েকটা।

মেঘলা বলল,

“পুলিশ?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

“না।”

অর্ক জানালার কাছে গেল।

নিচে কয়েকজন লোক গাড়ি থেকে নামছে।

তাদের হাতে টর্চ।

একজন বাড়ির দিকে তাকিয়ে ফোনে বলল—

“ওরা ভেতরেই আছে।”

অর্ক পিছিয়ে এল।

“এখন কী করব?”

বৃদ্ধ বললেন,

“যে পথে তোমাকে পঁচিশ বছর আগে বের করে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই পথেই যেতে হবে।”

মেঘলা বলল,

“কিন্তু সেই সুড়ঙ্গ তো বন্ধ।”

বৃদ্ধ হেসে বললেন,

“বন্ধ ছিল।”

তারপর তিনি মেঝের একটা কাঠের পাটাতন সরালেন।

নিচে অন্ধকার গর্ত।

সিঁড়ি নেমে গেছে মাটির নিচে।

অর্ক নিচে তাকাল।

সেই মুহূর্তে তার মনে হলো—

এই পথটা সে আগে দেখেছে।

অনেক আগে।

খুব ছোটবেলায়।

সে মেঘলার হাত ধরল।

“চলো।”

তিনজন অন্ধকার সুড়ঙ্গে নামতে শুরু করল।

উপরে তখন দরজায় প্রচণ্ড আঘাত পড়ছে।

ধাম!

ধাম!

ধাম!

“দরজা খুলুন!”

কেউ চিৎকার করছে।

অর্ক, মেঘলা আর বৃদ্ধ অন্ধকার সুড়ঙ্গ দিয়ে এগিয়ে চলল।

প্রায় পাঁচ মিনিট পর তারা একটা ছোট্ট ভূগর্ভস্থ ঘরে পৌঁছল।

বৃদ্ধ একটা লোহার দরজা খুললেন।

তার ওপারে পাহাড়ের অন্য প্রান্ত।

বৃষ্টি এখনও পড়ছে।

অর্ক বাইরে এসে গভীর শ্বাস নিল।

কিন্তু মেঘলা কোথায়?

সে পিছনে তাকাল।

বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে।

মেঘলা নেই।

“মেঘলা?”

কোনো উত্তর নেই।

অর্ক আবার সুড়ঙ্গে ঢুকতে যাবে—

বৃদ্ধ তার হাত ধরে বললেন,

“ও আসবে।”

“কোথায় গেল?”

“ওকে যেতে হয়েছে।”

“কোথায়?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“যেখানে পঁচিশ বছর আগে ওর মা শেষবার গিয়েছিল।”

অর্কের বুক ধক করে উঠল।

“কোথায়?”

বৃদ্ধ পাহাড়ের ওপারের অন্ধকারের দিকে তাকালেন।

“পুরনো খনি।”

অর্ক বলল,

“ও একা গেছে?”

বৃদ্ধ বললেন,

“না।”

“কার সঙ্গে?”

বৃদ্ধের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“যে মানুষটা পঁচিশ বছর ধরে তোমাকে খুঁজছে।”

“কে?”

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন না।

শুধু অর্কের হাতে সেই পুরনো পকেট ঘড়িটা দিয়ে বললেন—

“এবার তোমার নিজের অতীতের শেষ দরজাটা খুলবে।”

অর্ক ঘড়িটার দিকে তাকাল।

হঠাৎ ঘড়ির ভেতর থেকে ক্ষীণ একটা শব্দ এল।

টিক…

তারপর—

মেঘলার কণ্ঠ।

“অর্ক…”

অর্ক স্তব্ধ।

ঘড়ির ঢাকনার ভেতর থেকে যেন একটা রেকর্ডিং বাজছে—

“তুমি যদি এটা শুনতে পাও, তাহলে আমি হয়তো আর তোমার কাছে নেই। কিন্তু মনে রেখো…”

কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর মেঘলার কণ্ঠ—

“আমি তোমাকে যে সত্যিটা বলেছি, সেটাও সম্পূর্ণ সত্যি নয়।”

অর্কের চোখ বড় হয়ে গেল।

রেকর্ডিং চলতে থাকল—

“কারণ তুমি অর্ণব নও।”

ঘড়িটা অর্কের হাত থেকে পড়ে গেল।

বৃদ্ধও স্থির হয়ে গেলেন।

আর পাহাড়ের ওপারে, দূরে কোথাও, একটা বন্দুকের গুলির শব্দ শোনা গেল।

ধাঁই!

অর্ক ছুটতে শুরু করল।

মেঘলার দিকে।

পুরনো খনির দিকে।

আর তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—

“আমি অর্ণব নই।”

কিন্তু যদি সে অর্ণব না হয়—

তাহলে সে কে?

আর মেঘলা এতদিন ধরে কাকে খুঁজছিল?

শেষ ট্রেন কি সত্যিই তাকে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিল?

নাকি তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল এমন এক সত্যির কাছে, যেটা জানার পর তার নিজের জীবনটাই আর আগের মতো থাকবে না?

পাহাড়ের অন্ধকারের মধ্যে অর্ক দৌড়ে চলল।

তার পিছনে বৃষ্টি।

সামনে পুরনো খনি।

আর সেই খনির গভীরে অপেক্ষা করছে—

মেঘলা।

শেষ ট্রেনের যাত্রী।

—উপন্যাস  সমাপ্ত—

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *