মধুবন গ্রামের বাজারের শেষ মাথায় একটা ছোট্ট দোকান ছিল।
দোকানের সামনে টিনের চাল।
ভেতরে কাঠের একটা টেবিল।
আর টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো কালো রঙের সেলাই মেশিন।
সকাল হলেই দোকান থেকে ভেসে আসত—
ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…
সেলাই মেশিনের শব্দ।
দোকানের মালিক ছিলেন কমলা দেবী।
বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।
স্বামী মারা যাওয়ার পর নিজের হাতে সেলাই শিখে তিনি এই দোকানটি দাঁড় করিয়েছিলেন।
প্রথম দিকে গ্রামের মানুষ তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করত।
কেউ বলত,
—“মহিলা হয়ে দোকান চালাবে?”
কেউ বলত,
—“এতে আবার সংসার চলে নাকি?”
কমলা কোনো উত্তর দিতেন না।
দিনের পর দিন কাপড় সেলাই করতেন।
ব্লাউজ।
পেটিকোট।
স্কুলের পোশাক।
শিশুদের জামা।
ধীরে ধীরে তাঁর দোকানের পরিচিতি বাড়তে লাগল।
তবে কমলার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল তাঁর মেয়ে রিনাকে পড়াশোনা করানো।
রিনা তখন কলেজে পড়ে।
সে মায়ের দোকানে বসতে চাইত না।
একদিন বলল,
—“মা, আমি অন্য কাজ করতে চাই।”
কমলা হেসে বললেন,
—“তুই যা করতে ভালোবাসিস, সেটাই কর।”
রিনা বলল,
—“তুমি কি আমার জন্য এত কষ্ট করছ?”
কমলা সেলাই করতে করতে বললেন,
—“মা হওয়ার কষ্টের হিসাব রাখা হয় না।”
একদিন গ্রামের স্কুল থেকে বড় অর্ডার এল।
প্রায় দুশোটি স্কুল ইউনিফর্ম।
কাজটা কমলার একার পক্ষে সম্ভব নয়।
তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন।
সেই সময় রিনা বলল,
—“আমি সাহায্য করব।”
কমলা অবাক হয়ে তাকালেন।
—“তুই তো বলেছিলি এই কাজ পছন্দ করিস না।”
রিনা বলল,
—“কাজটা পছন্দ করি না বলিনি। শুধু ভাবতাম, এটা আমার ভবিষ্যৎ নয়।”
—“এখন?”
রিনা মেশিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—“এখন বুঝছি, ভবিষ্যৎ তৈরি করতে কাজের ধরন নয়, কাজের প্রতি মনটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
সেদিন থেকে মা-মেয়ে একসঙ্গে কাজ শুরু করল।
রিনা মাপ নিত।
কমলা কাটিং করতেন।
তারপর দুজনে মিলে সেলাই।
দিনের পর দিন।
সকাল থেকে রাত।
অর্ডার সময়মতো তৈরি হল।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক এসে বললেন,
—“কমলাদেবী, আপনারা অসাধারণ কাজ করেছেন।”
কমলা বললেন,
—“আমরা শুধু আমাদের কাজ করেছি।”
কিন্তু সেই অর্ডারের পর গ্রামের আরও কয়েকজন মহিলা কমলার কাছে এলেন।
তাঁরা বললেন,
—“আমরাও সেলাই শিখতে চাই।”
কমলা বললেন,
—“শিখবে?”
—“হ্যাঁ।”
—“তাহলে কাল থেকে এসো।”
পরদিন এলেন তিনজন।
তারপর পাঁচজন।
তারপর দশজন।
কমলার দোকানের পাশে একটা ছোট ঘর ভাড়া নেওয়া হল।
সেখানে শুরু হল সেলাই শেখানোর ক্লাস।
কেউ আগে কখনও মেশিন ধরেনি।
কেউ সূচে সুতো পরাতেও পারত না।
কমলা ধৈর্য ধরে শেখাতে লাগলেন।
তিনি বলতেন,
—“সেলাই শুধু কাপড় জোড়ে না। মানুষের আত্মবিশ্বাসও জোড়ে।”
মহিলারা ধীরে ধীরে কাজ শিখতে লাগলেন।
কেউ নিজের জন্য পোশাক বানালেন।
কেউ প্রতিবেশীর অর্ডার নিলেন।
কেউ বাড়িতে বসে কাজ শুরু করলেন।
কয়েক মাসের মধ্যে মধুবন গ্রামের দশটি পরিবারে অতিরিক্ত আয় শুরু হল।
গ্রামের মানুষ এবার কমলার দোকানকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করল।
একদিন সেই লোকটিই, যে প্রথম দিকে বলেছিল “মহিলা হয়ে দোকান চালাবে?”, সে এসে বলল,
—“কমলাদেবী, আমার মেয়ের বিয়ের পোশাকটা আপনারাই বানাবেন।”
কমলা হেসে বললেন,
—“অবশ্যই।”
রিনা মায়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
কিন্তু কিছুদিন পর কমলার পুরোনো সেলাই মেশিনটি নষ্ট হয়ে গেল।
মেশিনটা ছিল তাঁর জীবনের সঙ্গী।
মেরামত করতে অনেক টাকা লাগবে।
কমলা বললেন,
—“নতুন মেশিন কিনতে পারব না।”
রিনা বলল,
—“আমি কিনব।”
কমলা অবাক।
—“তুই?”
রিনা বলল,
—“আমি একটা কাজ পেয়েছি।”
সে শহরের একটি পোশাক সংস্থায় ডিজাইনের কাজ শুরু করেছে।
প্রথম মাসের বেতন দিয়ে সে মায়ের জন্য একটি নতুন সেলাই মেশিন কিনল।
মেশিনটি দোকানে এনে রাখার পর কমলা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর বললেন,
—“তুই আমার মেশিন কিনলি?”
রিনা হেসে বলল,
—“না মা। তুমি যে স্বপ্নটা আমাকে দিয়ে বড় করেছ, তার জন্য একটা মেশিন কিনলাম।”
কমলার চোখে জল এসে গেল।
তিনি পুরোনো মেশিনটার ওপর হাত রাখলেন।
বললেন,
—“এটা ফেলে দিস না।”
—“কেন?”
—“এটার শব্দে তোর শৈশব আছে।”
রিনা পুরোনো মেশিনটি যত্ন করে দোকানের এক কোণে রেখে দিল।
নতুন মেশিনে কাজ শুরু হল।
কাজ বাড়তে লাগল।
কমলা আর রিনা মিলে গ্রামের মহিলাদের নিয়ে ছোট একটি পোশাক তৈরির দল গড়ে তুলল।
তাদের তৈরি জামাকাপড় শহরের দোকানেও যেতে শুরু করল।
একদিন রিনা মাকে বলল,
—“আমরা কি আমাদের কাজের একটা নাম দিতে পারি?”
কমলা বললেন,
—“দে।”
রিনা নাম রাখল—
“সেলাইয়ে স্বপ্ন”।
দোকানের সামনে নতুন বোর্ড লাগল।
তার নিচে ছোট করে লেখা—
“নিজের হাতে নিজের ভবিষ্যৎ।”
বছর কয়েক পর মধুবন গ্রামের চেহারা বদলে গেল।
অনেক মেয়ে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি সেলাই শিখছে।
অনেক মহিলা বাড়িতে বসেই কাজ করছেন।
কেউ সংসারের খরচে সাহায্য করছেন।
কেউ নিজের সন্তানকে পড়াচ্ছেন।
আর কমলা?
তিনি এখনও প্রতিদিন দোকানে বসেন।
তবে এখন আর একা নন।
চারপাশে দশ-পনেরোজন মহিলা কাজ করেন।
একদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে রিনা পুরোনো মেশিনটার কাছে গেল।
মেশিনটি বহুদিন ব্যবহার হয়নি।
সে হাত দিয়ে মেশিনটির ওপর জমে থাকা ধুলো মুছে দিল।
কমলা বললেন,
—“কী করছিস?”
রিনা বলল,
—“একবার চালাব।”
সে পুরোনো মেশিনে সুতো লাগাল।
পা দিয়ে প্যাডেল চাপল।
ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…
পুরোনো শব্দটা আবার দোকানের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল।
কমলা চুপ করে শুনলেন।
তার চোখে জল।
রিনা বলল,
—“মা, শব্দটা এখনও বদলায়নি।”
কমলা মৃদু হেসে বললেন,
—“শব্দ বদলায়নি। শুধু তার গল্পটা বড় হয়েছে।”
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো।
দোকানের দরজার সামনে নতুন প্রজন্মের কয়েকজন মেয়ে দাঁড়িয়ে।
তারা আগামী দিনের সেলাই শিখতে এসেছে।
কমলা তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“চলো, আজ থেকে তোমাদেরও একটা স্বপ্ন সেলাই করতে শেখাই।”
মেয়েরা হেসে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
আর দোকানের ভেতর আবার শোনা গেল—
ঘড়ঘড়… ঘড়ঘড়…
সেই শব্দ যেন বলছিল—
সুঁইয়ের ছোট্ট ফোঁড়ে যেমন কাপড় জোড়া লাগে, তেমনই ছোট ছোট চেষ্টায় একদিন মানুষের জীবনও জোড়া লাগে।