শহরের এক পুরনো আবাসনের চারতলায় থাকতেন অবসরপ্রাপ্ত ডাক বিভাগের কর্মী শশাঙ্কবাবু। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একাই থাকতেন তিনি।
প্রতিদিন সকালে দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকানো ছিল তাঁর অভ্যাস।
একদিন সকালে দরজা খুলেই তিনি দেখলেন—দরজার সামনে একজোড়া ছোট্ট জুতো।
কালো স্কুলের জুতো। ধুলোয় মাখা।
শশাঙ্কবাবু চারপাশে তাকালেন। করিডোরে কেউ নেই।
জুতো দুটো তুলে দরজার পাশে রেখে দিলেন।
পরদিন আবার একই জায়গায় জুতো।
এবার জুতোর পাশে একটা ছোট কাগজ।
তাতে লেখা—
“কাকু, একটু রেখে দেবেন?”
শশাঙ্কবাবু অবাক হলেন।
পরপর কয়েকদিন একই ঘটনা ঘটতে লাগল।
প্রতিদিন সকালে নতুন কিছু—কখনও জুতো, কখনও স্কুলব্যাগ, কখনও ছাতা।
শশাঙ্কবাবু সবকিছু দরজার পাশে যত্ন করে রেখে দিতেন।
একদিন তিনি করিডোরে অপেক্ষা করলেন।
দুপুরের দিকে দশ-এগারো বছরের একটি ছেলে ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এল।
শশাঙ্কবাবুকে দেখে থমকে গেল।
—“তুমিই রাখো এগুলো?”
ছেলেটি মাথা নিচু করল।
—“হ্যাঁ।”
—“কেন?”
ছেলেটি বলল, —“আমাদের ঘরটা ছোট। মা কাজ করতে যায়। আমি স্কুল থেকে ফিরে একটু এখানে বসি। কিন্তু কাউকে বিরক্ত করতে চাই না।”
শশাঙ্কবাবু বললেন, —“তোমার নাম কী?”
—“রাহুল।”
—“বাড়ি কোথায়?”
ছেলেটি নিচতলার একটি ঘরের দিকে দেখাল।
শশাঙ্কবাবু বুঝলেন, একই বাড়িতেই থাকে।
তিনি বললেন, —“জুতো দরজার সামনে রেখে যাওয়ার দরকার নেই। চাইলে আমার বারান্দায় বসে পড়াশোনা করতে পারো।”
রাহুল অবাক হয়ে তাকাল।
—“সত্যি?”
—“হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত।”
—“কী?”
—“আমাকে পড়া শোনাতে হবে।”
সেদিন থেকে শশাঙ্কবাবুর একাকিত্ব একটু একটু করে কমতে লাগল।
রাহুল প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে তাঁর কাছে বসত।
শশাঙ্কবাবু অঙ্ক শেখাতেন, বাংলা পড়াতেন, পুরনো দিনের গল্প বলতেন।
কয়েক মাস পর রাহুলের পরীক্ষার ফল বেরোল।
সে ক্লাসে প্রথম হয়েছে।
খবরটা দিতে সে দৌড়ে শশাঙ্কবাবুর বাড়িতে এল।
কিন্তু দরজা বন্ধ।
রাহুল অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল।
পরদিন জানতে পারল, শশাঙ্কবাবুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সে মায়ের সঙ্গে হাসপাতালে ছুটে গেল।
শশাঙ্কবাবু দুর্বল গলায় বললেন,
—“রাহুল, এবার তো আমাকে পড়া শোনাতে হবে।”
রাহুল চোখ মুছে বলল, —“আমি প্রথম হয়েছি।”
শশাঙ্কবাবুর মুখে হাসি ফুটে উঠল।
কয়েকদিন পর তিনি বাড়ি ফিরলেন।
দরজার সামনে এসে দেখলেন, সেখানে একটি জোড়া নতুন জুতো রাখা।
তার পাশে একটি কাগজ।
“এবার আপনার জন্য। আপনি অনেকদিন আমার জুতো পাহারা দিয়েছেন।”
শশাঙ্কবাবু জুতোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে বারান্দায় দুটি চেয়ার পাশাপাশি রাখলেন।
একটি নিজের জন্য।
আরেকটি রাহুলের জন্য।
সেদিন থেকে দরজার সামনে আর কোনও জুতো পড়ে থাকত না।
কারণ রাহুল বুঝে গিয়েছিল—
কিছু দরজা শুধু ঘরে ঢোকার জন্য নয়, কারও জীবনে জায়গা করে দেওয়ার জন্যও খোলা থাকে।