শহরের পুরনো বইয়ের বাজারে একটি ছোট দোকান ছিল—“পাতা ও পেন্সিল”। দোকানটির মালিক ছিলেন নিরঞ্জনবাবু। বয়স সত্তরের কাছাকাছি হলেও প্রতিদিন সকালেই তিনি দোকান খুলতেন।
একদিন দুপুরে দোকানে এল বারো বছরের একটি ছেলে। নাম অর্ণ।
ছেলেটি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা সুন্দর নীল মলাটের খাতা হাতে নিল।
নিরঞ্জনবাবু বললেন, —“নেবে?”
অর্ণ মাথা নিচু করে বলল, —“খুব ভালো লেগেছে। কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই।”
নিরঞ্জনবাবু খাতাটা তার হাতেই রেখে বললেন, —“টাকা না থাকলে কী হয়েছে? খাতা তো আর পালিয়ে যাবে না।”
অর্ণ অবাক হয়ে তাকাল।
—“সত্যি দেবেন?”
—“একটা শর্তে।”
—“কী শর্ত?”
—“প্রথম পাতাটা আজই ভরবে।”
অর্ণ খাতা নিয়ে চলে গেল।
পরদিন সে আবার এল।
খাতাটা খুলে প্রথম পাতায় লেখা—
“আমি বড় হয়ে এমন একটা কাজ করতে চাই, যাতে কেউ আমাকে চিনুক না চিনুক, আমার কাজটা মানুষকে সাহায্য করে।”
নিরঞ্জনবাবু লেখাটা পড়ে মৃদু হাসলেন।
—“বাহ! তারপর?”
অর্ণ বলল, —“আরও লিখব।”
সেই থেকে অর্ণ প্রায় প্রতিদিন দোকানে আসত। কখনও বই পড়ত, কখনও খাতায় লিখত। নিরঞ্জনবাবু তাকে পুরনো বই পড়তে দিতেন।
কয়েক বছর পর অর্ণ আর আসত না।
নিরঞ্জনবাবু ভেবেছিলেন, হয়তো পড়াশোনার চাপে ছেলেটা দূরে চলে গেছে।
সময় কেটে গেল।
এক বর্ষার সন্ধ্যায় দোকানের সামনে একটি গাড়ি এসে থামল।
একজন যুবক নেমে দোকানে ঢুকল।
—“নিরঞ্জন কাকু?”
নিরঞ্জনবাবু তাকিয়ে বললেন, —“কে?”
যুবক হেসে বলল, —“প্রথম পাতাটা মনে আছে?”
নিরঞ্জনবাবু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চিনতে পারলেন।
—“অর্ণ!”
অর্ণ তাঁর সামনে একটি বড় বাক্স রাখল।
ভেতরে ছিল অনেকগুলো নতুন খাতা, পেন, বই।
—“এগুলো কী?”
—“আপনার দোকান থেকে আমি যে খাতা পেয়েছিলাম, তার ঋণ শোধ করতে এসেছি।”
নিরঞ্জনবাবু হেসে বললেন, —“একটা খাতার দাম শোধ করতে এত কিছু?”
অর্ণ মাথা নাড়ল।
—“খাতার দাম নয়, কাকু। বিশ্বাসের দাম।”
তারপর সে জানাল, এখন সে একটি স্কুলে পড়ায়। শহরের দরিদ্র শিশুদের জন্য সে একটি ছোট পাঠাগারও করেছে।
নিরঞ্জনবাবু চুপ করে শুনছিলেন।
অর্ণ বলল, —“আমার প্রথম খাতার প্রথম পাতায় একটা কথা লিখেছিলাম। সেটা ভুলিনি।”
—“কী লিখেছিলে?”
অর্ণ হেসে বলল, —“এমন কাজ করব, যাতে কাজটা মানুষকে সাহায্য করে।”
নিরঞ্জনবাবু ধীরে ধীরে তাক থেকে সেই পুরনো খাতাটা নামালেন।
শেষ পাতা পর্যন্ত লেখা হয়ে গেছে।
কিন্তু প্রথম পাতার নিচে অর্ণের বহু বছর আগের লেখার পাশে নিরঞ্জনবাবু ছোট করে একটি বাক্য লিখলেন—
“স্বপ্নের প্রথম পাতাটা কখনও ছোট হয় না।”
অর্ণ সেই বাক্যটি পড়ে খাতাটা বুকে চেপে ধরল।
দোকানের বাইরে তখন বৃষ্টি পড়ছে।
আর ভেতরে, একটি পুরনো খাতার প্রথম পাতায় লেখা স্বপ্নটি অনেক দূর এগিয়ে গেছে।