Categories
গল্প বিবিধ

জলের চাকা।।

শালবন গ্রামের শেষ প্রান্তে ছিল বিশাল এক ধানখেত। বর্ষায় সেই মাঠ সবুজ হয়ে উঠত, শীতকালে সোনালি ধানের ঢেউ খেলত। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।

কিন্তু কয়েক বছর ধরে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

বর্ষা শেষ হওয়ার পর মাঠে জল ধরে রাখা যেত না।

পুকুর শুকিয়ে যেত, ছোট খালগুলোর জল কমে যেত। চাষিরা ডিজেল পাম্প চালিয়ে জমিতে জল দিতেন। তাতে খরচ বাড়ত।

গ্রামের কৃষক মধুসূদন এসব দেখে খুব চিন্তায় ছিলেন।

বয়স পঞ্চান্ন। ছোটবেলা থেকেই চাষ করছেন।

একদিন সকালে ছেলে রাহুলকে নিয়ে মাঠে গিয়ে দেখলেন, পাশের কৃষক শিবু পাম্প চালিয়ে জল তুলছেন।

পাম্পের শব্দে চারপাশ কাঁপছে।

শিবু মাথায় হাত দিয়ে বলল,

—“আর পারছি না মধুদা। ডিজেলের দাম বাড়ছে, জল তুলতে খরচ বাড়ছে, ফসলের দাম আবার ঠিক নেই।”

মধুসূদন বললেন,

—“জল তো আছে। শুধু তুলতে হচ্ছে।”

শিবু হেসে বলল,

—“জল আছে, কিন্তু টাকার জোর নেই।”

কথাটা মধুসূদনের মনে দাগ কাটল।

সেদিন রাতে তিনি পুরোনো ঘরের বাক্স খুললেন।

সেখানে ছিল কিছু মরচে ধরা লোহার যন্ত্র, পুরোনো ছবি আর একটি অদ্ভুত নকশা।

নকশাটা করেছিলেন তাঁর বাবা।

মধুসূদনের বাবা ছিলেন গ্রামের মানুষ হলেও যন্ত্রপাতি নিয়ে নানা পরীক্ষা করতেন।

অনেক বছর আগে তিনি নদীর স্রোত ব্যবহার করে জল তোলার একটি চাকা বানিয়েছিলেন।

চাকার সঙ্গে বাঁধা থাকত ছোট ছোট পাত্র।

নদীর স্রোতে চাকা ঘুরত।

চাকা ঘুরলে পাত্রগুলো জল তুলে ওপরে নিয়ে যেত।

তারপর জল নেমে যেত খালের মধ্যে।

কোনও ডিজেল লাগত না।

কিন্তু মধুসূদনের বাবা মারা যাওয়ার পর সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়।

মধুসূদন নকশাটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলেন।

রাহুল পাশে এসে বলল,

—“বাবা, কী দেখছ?”

—“তোর ঠাকুরদার পুরোনো নকশা।”

—“এটা কী?”

—“জলের চাকা।”

রাহুল আগ্রহী হয়ে উঠল।

—“আবার বানানো যায়?”

মধুসূদন বললেন,

—“জানি না। তবে চেষ্টা করা যায়।”

পরদিন বাবা-ছেলে নদীর ধারে গেল।

পুরোনো চাকার জায়গাটা এখনও ছিল।

কাঠের কিছু অংশ পচে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

লোহার একটি মোটা দণ্ড এখনও পড়ে ছিল।

রাহুল বলল,

—“বাবা, এটা তো অসম্ভব।”

মধুসূদন হেসে বললেন,

—“অসম্ভব কথাটা খুব তাড়াতাড়ি বলিস না।”

তারা কাজ শুরু করল।

প্রথমে কাঠ জোগাড় হল।

তারপর লোহা।

গ্রামের মেকানিক বিজয়ও সাহায্য করতে এগিয়ে এল।

কয়েকজন কৃষক হাসাহাসি করল।

—“মধু পাগল হয়ে গেছে।”

কেউ বলল,

—“নদীর জল দিয়ে চাকা ঘুরিয়ে জমি সেচ করবে! সিনেমায় হয়।”

মধুসূদন কিছু বললেন না।

তিনি শুধু কাজ করে গেলেন।

প্রথম চাকা তৈরি হল।

নদীর জলে বসানো হল।

রাহুল উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে।

চাকা একটু নড়ল।

তারপর থেমে গেল।

সবাই হতাশ।

বিজয় বলল,

—“কোথাও ভারসাম্য ঠিক নেই।”

তারা আবার খুলল।

দুই দিন পর আবার চেষ্টা।

চাকা ঘুরল।

কিন্তু জল উঠল না।

তৃতীয়বারও ব্যর্থ।

চতুর্থবার চাকা ঘুরল, কিন্তু পাত্রগুলো অর্ধেক জল নিয়ে উঠে আসার আগেই খালি হয়ে গেল।

রাহুল বিরক্ত হয়ে বলল,

—“বাবা, ছেড়ে দাও।”

মধুসূদন বললেন,

—“তুই জানিস, তোর ঠাকুরদা এই চাকা বানাতে কতবার চেষ্টা করেছিলেন?”

—“কতবার?”

—“গুনে রাখেননি।”

রাহুল চুপ করে গেল।

পরের সপ্তাহে আবার কাজ শুরু হল।

এইবার গ্রামের দুই কৃষকও সাহায্য করলেন।

চাকার পাত্রের আকার বদলানো হল।

নদীর স্রোতের সঙ্গে চাকার কোণ ঠিক করা হল।

শেষ পর্যন্ত এক ভোরে চাকা ঘুরতে শুরু করল।

ধীরে।

তারপর একটু দ্রুত।

একটা পাত্র জলে ডুবল।

উঠে এল।

আর তার ভেতরের জল ছোট্ট কাঠের নালার মধ্যে পড়ল।

নালা দিয়ে জল এগিয়ে গেল।

তারপর খালে।

রাহুল চিৎকার করে উঠল,

—“জল আসছে!”

মধুসূদনের চোখে জল।

তিনি হাত দিয়ে জলটা ছুঁয়ে দেখলেন।

তারপর বললেন,

—“এটা শুধু জল নয়। এটা সময়ের ফিরে আসা।”

সেদিন গ্রামের মানুষ জড়ো হল।

যারা হাসাহাসি করেছিল, তারাও এল।

শিবু চাষি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

—“মধুদা, এটা যদি সত্যিই কাজ করে, তাহলে আমাদের অনেক টাকা বাঁচবে।”

মধুসূদন বললেন,

—“শুধু আমার জমিতে জল দিলে হবে না। সবার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে।”

কাজ আরও বড় হল।

চাকার জল একটা বড় খালে নিয়ে যাওয়া হল।

সেখান থেকে কয়েকটি ছোট নালায় জল ভাগ করা হল।

গ্রামের কৃষকরা পালা করে সেই জল ব্যবহার করতে লাগলেন।

ডিজেল পাম্পের ব্যবহার কমে গেল।

কয়েক মাস পর দেখা গেল, কৃষকদের সেচের খরচ অনেকটাই কমেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, গ্রামের তরুণরা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল।

রাহুল নিজের বন্ধুদের নিয়ে আরও কয়েকটি ছোট জলচাকা বানানোর পরিকল্পনা করল।

স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক এসে বললেন,

—“এটা তো ছাত্রদের দেখানো যায়।”

একদিন স্কুলের মাঠে বিজ্ঞান প্রদর্শনী হল।

রাহুল সেখানে ছোট একটি মডেল নিয়ে গেল।

বিচারকরা জিজ্ঞেস করলেন,

—“এই ধারণা কোথা থেকে পেয়েছ?”

রাহুল বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

—“আমার বাবার কাছ থেকে। আর তারও আগে আমার ঠাকুরদার কাছ থেকে।”

মধুসূদন দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিলেন।

তার মুখে মৃদু হাসি।

কয়েক মাস পর খবর এল, পাশের আরও তিনটি গ্রাম এই জলচাকার পদ্ধতি ব্যবহার করতে চায়।

মধুসূদন বললেন,

—“নকশা নিয়ে যাও। বানিয়ে নাও।”

লোকেরা বলল,

—“আপনি টাকা নেবেন না?”

তিনি মাথা নাড়লেন।

—“জলের জন্য টাকা নিলে জল ছোট হয়ে যায়।”

এক সন্ধ্যায় রাহুল বাবাকে জিজ্ঞেস করল,

—“বাবা, তুমি যদি ঠাকুরদার নকশাটা না পেতে?”

মধুসূদন বললেন,

—“তাহলে হয়তো আমরা নতুন একটা নকশা বানাতাম।”

—“মানে?”

—“পুরোনো জ্ঞান পথ দেখায়, কিন্তু নতুন পথ তৈরি করতে হয় নিজেদের।”

রাহুল কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।

নদীর দিকে তাকিয়ে দেখল, চাকা এখনও ঘুরছে।

ধীরে ধীরে।

নিরন্তর।

কেউ তাকে তেল দিচ্ছে না।

কেউ তাকে ডিজেল খাওয়াচ্ছে না।

নদীর স্রোতই তার শক্তি।

রাহুল বলল,

—“বাবা, চাকা তো থামছে না।”

মধুসূদন হাসলেন।

—“চাকা থামলে জল থামবে। আর জল থামলে জীবনও থেমে যাবে।”

সেদিন থেকে গ্রামের মানুষ জলকে নতুন চোখে দেখতে শিখল।

তারা বুঝল, বড় সমস্যার সমাধান সবসময় বড় যন্ত্র দিয়ে হয় না।

কখনও কখনও পুরোনো একটা নকশা, কয়েকজন মানুষের পরিশ্রম আর একটু বিশ্বাসই যথেষ্ট।

আর নদীর ধারে সেই কাঠের চাকা আজও ঘুরে চলেছে।

তার প্রতিটি ঘূর্ণনের সঙ্গে যেন একটা কথাই শোনা যায়—

“প্রকৃতির শক্তিকে বুঝতে পারলে, প্রকৃতিই তোমার সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে ওঠে।”

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *