শহরের পুরনো বাজারের ভেতরে একটা সরু গলি ছিল। সেই গলির একেবারে শেষ মাথায় ছোট্ট একটি দোকান—“সময় মেরামত ঘর”।
দোকানের মালিক ছিলেন নব্বই ছুঁইছুঁই নিবারণবাবু। সারাজীবন ঘড়ি মেরামত করেছেন। তাঁর দোকানে দেয়ালজুড়ে ঝুলত নানা রকমের ঘড়ি—কেউ টিকটিক করত, কেউ ধীরে চলত, আবার কোনওটা বহু বছর ধরে বন্ধ।
নিবারণবাবু বলতেন,
—“ঘড়ি নষ্ট হয়, সময় নয়। মানুষ শুধু সময়টাকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারে না।”
একদিন দুপুরে দোকানে এল এক যুবক। নাম সৌরভ।
তার হাতে একটি পুরনো হাতঘড়ি।
—“কাকু, এটা কি ঠিক করা যাবে?”
নিবারণবাবু ঘড়িটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন।
—“পুরনো মডেল। যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন।”
সৌরভ বলল,
—“যত টাকা লাগে দেব। এটা আমার বাবার।”
নিবারণবাবু ঘড়ির পিছনের ঢাকনাটা খুললেন।
ভেতরে ছোট করে খোদাই করা—
“সৌরভের জন্য—যেদিন সে বুঝবে, সময়ের দাম।”
নিবারণবাবু থেমে গেলেন।
—“তোমার বাবা কী করতেন?”
—“রেলওয়েতে কাজ করতেন। আমি ছোট থাকতেই মারা যান।”
—“তোমাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?”
সৌরভ একটু হেসে বলল,
—“খুব একটা ভালো ছিল না। উনি সবসময় বলতেন পড়াশোনা কর, সময় নষ্ট করিস না। আমি ভাবতাম, উনি শুধু বকেন।”
নিবারণবাবু আর কিছু বললেন না।
তিনদিন ধরে তিনি ঘড়িটা মেরামত করতে লাগলেন।
চতুর্থ দিন ঘড়িটা চলতে শুরু করল।
সৌরভ খুশি হয়ে টাকা দিতে চাইলে নিবারণবাবু বললেন,
—“টাকা পরে দিও। আগে একটা কাজ করো।”
—“কী?”
—“বাবার সঙ্গে তোমার যে কথাগুলো বলা হয়নি, সেগুলো মনে মনে একবার বলে নিও।”
সৌরভ অবাক হলেও মাথা নাড়ল।
ঘড়িটা হাতে নিয়ে সে চলে গেল।
কয়েক সপ্তাহ পর সৌরভ আবার দোকানে এল।
তার হাতে একটি পুরনো কাঠের বাক্স।
—“কাকু, এটা আপনাকে দিতে এসেছি।”
নিবারণবাবু বাক্স খুলে দেখলেন—ভেতরে বেশ কয়েকটি পুরনো ঘড়ি।
—“এগুলো?”
—“বাবার জিনিস। উনি ঘড়ি খুব ভালোবাসতেন। আমি কখনও বুঝিনি।”
সৌরভ একটু থেমে বলল,
—“বাবার মৃত্যুর পর তাঁর আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে একটা চিঠি পেয়েছিলাম। সেখানে লেখা ছিল, ‘সৌরভ বড় হয়ে যদি কোনওদিন এই ঘড়িটা পরে, তাহলে বুঝব আমি অপেক্ষা করতে জানতাম।’”
নিবারণবাবুর চোখ নরম হয়ে এল।
সৌরভ বলল,
—“আমি এত বছর ভেবেছি বাবা আমাকে বোঝেননি। আসলে আমিই তাঁকে বুঝিনি।”
নিবারণবাবু ধীরে বললেন,
—“সময় কখনও কখনও আমাদের ভুল বুঝতে শেখায়। কিন্তু তার জন্য সময় থাকতে হয়।”
সৌরভ চলে যাওয়ার পর নিবারণবাবু দোকানের সামনে একটা কাগজ ঝুলিয়ে দিলেন—
“পুরনো ঘড়ি মেরামত হয়। পুরনো সম্পর্কও—যদি সময় থাকতে হাত বাড়ানো যায়।”
বহু বছর পর নিবারণবাবুর দোকান বন্ধ হয়ে গেল।
কিন্তু দোকানের সেই সাইনবোর্ডটি রয়ে গেল।
আর তার নিচে ছোট্ট অক্ষরে কেউ লিখে দিয়েছিল—
“সময়কে ঠিক করার আগে, সময় থাকতে মানুষটাকে ঠিক করে নিন।”