গ্রামের মাঝখানে একটি বিশাল আমগাছ ছিল। গাছটির বয়স প্রায় পঞ্চাশ বছর। তার ছায়ায় বসে গ্রামের বৃদ্ধরা গল্প করতেন, দুপুরে পথিকেরা বিশ্রাম নিতেন, আর স্কুলফেরত ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করত।
কিন্তু গাছটির একটি অদ্ভুত ব্যাপার ছিল—কোনও দিন তাতে আম ধরত না।
গ্রামের অনেকে বলত,
—“এত বড় গাছ, অথচ কোনও কাজে লাগে না!”
কেউ কেউ গাছটি কেটে ফেলার কথাও বলেছিল।
শুধু বৃদ্ধা সরলা দেবী গাছটিকে ভালোবাসতেন। প্রতিদিন সকালে তিনি গাছের গোড়ায় জল দিতেন, শুকনো পাতা পরিষ্কার করতেন।
একদিন গ্রামের নতুন প্রধান তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন,
—“মাসিমা, যে গাছে ফল হয় না, তার জন্য এত কষ্ট করেন কেন?”
সরলা দেবী গাছের দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আপনি কি কখনও এর ছায়ায় বসেছেন?”
প্রধান বললেন,
—“হ্যাঁ, বসেছি।”
—“তাহলে বলুন তো, আপনার বিশ্রামটা কি মিথ্যে ছিল?”
প্রধান কোনও উত্তর দিতে পারলেন না।
সময় কেটে গেল।
এক বছর গ্রীষ্মে গ্রামে ভয়াবহ দাবদাহ দেখা দিল। পুকুরের জল শুকিয়ে এল, মাঠে কাজ করা কঠিন হয়ে উঠল। দূর থেকে আসা পথিকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন।
সেই সময় গ্রামের মানুষ ওই আমগাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিতেন। সেখানে একটি মাটির কলসিতে জল রাখা শুরু হল। স্কুলের শিক্ষক গাছটির নিচে শিশুদের পড়াতে লাগলেন, কারণ টিনের ঘরে দুপুরের গরম সহ্য করা যাচ্ছিল না।
একদিন প্রচণ্ড গরমে গ্রামের এক বৃদ্ধ পথ চলতে চলতে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। কয়েকজন তাঁকে দ্রুত গাছের ছায়ায় নিয়ে এলেন। সেখানে বিশ্রাম ও জল পেয়ে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হলেন।
ঘটনাটির পর গ্রামের মানুষ গাছটিকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করলেন।
তবু একদিন এক কাঠুরে এসে বলল,
—“গাছটা কেটে দিলে অনেক কাঠ পাওয়া যাবে।”
সরলা দেবী তখন খুব অসুস্থ। তাঁকে খবর দেওয়া হলে তিনি নাতির হাত ধরে গাছটির কাছে এলেন।
তিনি বললেন,
—“গাছটা ফল দেয় না, ঠিক। কিন্তু কত মানুষকে আশ্রয় দেয়, সেটা কি কখনও গুনে দেখেছ?”
গ্রামের লোকেরা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, গাছটি কাটা হবে না। তার চারপাশে বসার জায়গা তৈরি করা হবে, পথিকদের জন্য জলের ব্যবস্থা করা হবে এবং শিশুদের জন্য ছোট্ট একটি পাঠচক্র চালু হবে।
কয়েক মাস পর সরলা দেবী মারা গেলেন।
তাঁর স্মৃতিতে গ্রামের মানুষ গাছটির পাশে একটি ফলক বসালেন। তাতে লেখা ছিল—
“যে গাছটি ফল দিত না, সে আমাদের শিখিয়েছিল—উপকারের সব রূপ চোখে দেখা যায় না।”
বছর কয়েক পর এক শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল,
—“বাবা, গাছটায় আম ধরে না কেন?”
বাবা হেসে বললেন,
—“জানি না রে। তবে এই গাছ আমাদের এমন কিছু দিয়েছে, যা অনেক ফলের থেকেও দামি।”
—“সেটা কী?”
বাবা ছায়ায় বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“অন্যের জন্য জায়গা করে দেওয়া।”
সেদিন বিকেলে গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ মাটিতে নকশা আঁকছিল। তার নিচে কেউ পড়ছিল, কেউ গল্প করছিল, কেউ বিশ্রাম নিচ্ছিল।
গাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার কোনও ফল ছিল না, অথচ তার দেওয়ার শেষও ছিল না।
শিক্ষা: মানুষের মূল্য শুধু সে কী অর্জন করেছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সে কতজনকে আশ্রয়, স্বস্তি ও সাহস দিয়েছে—সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।