শহরের ব্যস্ত মোড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় এক অন্ধ বৃদ্ধ বসে বাঁশি বাজাতেন। তাঁর নাম কেউ জানত না। মানুষ তাঁকে চিনত শুধু ‘বাঁশিওয়ালা’ বলে।
কেউ তাঁর সামনে কয়েন রেখে যেত, কেউ আবার বিরক্ত হয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তবু প্রতিদিন একই সময়ে তিনি এসে বসতেন। চোখ বন্ধ করে বাঁশিতে এমন এক সুর তুলতেন, যেন শহরের সমস্ত কোলাহল মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।
সেই মোড় দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেত ছোট্ট মেয়ে ইরা। একদিন সে দাঁড়িয়ে বাঁশিওয়ালার সুর শুনল।
বাড়ি ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করল,
—“মা, উনি চোখে দেখতে পান না, তবু এত সুন্দর সুর বাজান কী করে?”
মা বললেন,
—“হয়তো উনি চোখ দিয়ে যা দেখতে পান না, মন দিয়ে তা অনুভব করেন।”
পরদিন ইরা নিজের টিফিনের টাকা থেকে কয়েকটি কয়েন বাঁশিওয়ালার সামনে রাখল।
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,
—“ধন্যবাদ, মা।”
ইরা জিজ্ঞেস করল,
—“আপনি প্রতিদিন একই সুর বাজান কেন?”
বৃদ্ধ একটু চুপ করে বললেন,
—“একজনের জন্য বাজাই।”
—“তিনি কোথায়?”
—“জানি না।”
ইরা অবাক হল।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন। বহু বছর আগে তাঁর একটি মেয়ে ছিল। মেয়েটি ছোটবেলায় বাবার বাঁশির সুর শুনে ঘুমোত। একদিন কাজের সন্ধানে শহরে যাওয়ার পর আর ফিরে আসেনি। বৃদ্ধ জানতেন না, মেয়েটি কোথায় আছে, কেমন আছে।
তবু তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোনও একদিন মেয়ে ফিরে এলে এই সুর শুনে বাবাকে চিনতে পারবে।
ইরা সেদিন বাড়ি ফিরে বাবাকে সব বলল। তার বাবা একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে কাজ করতেন। তিনি বৃদ্ধের খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন।
কয়েক সপ্তাহ পর জানা গেল, বৃদ্ধের নাম নিত্যানন্দ। তাঁর মেয়ে বহু বছর আগে অন্য রাজ্যে চলে গিয়েছিল। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর আর বাবার সন্ধান পায়নি।
সংগঠনের লোকেরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে মেয়েটির বর্তমান ঠিকানা খুঁজে পেলেন। তাকে খবর পাঠানো হল।
কিন্তু উত্তর এল না।
নিত্যানন্দ অবশ্য আগের মতোই প্রতিদিন বাঁশি বাজাতে লাগলেন।
একদিন শীতের সন্ধ্যায় মোড়ে এসে ইরা দেখল, বৃদ্ধের পাশে এক মহিলা বসে আছেন। তাঁর চোখ ভেজা। তিনি বৃদ্ধের হাত ধরে আছেন।
নিত্যানন্দ কাঁপা গলায় বললেন,
—“তুই এসেছিস?”
মহিলা মাথা নাড়লেন।
—“বাবা, তোমার বাঁশির সুর আমি ভুলিনি। ছোটবেলায় তুমি যে সুর বাজাতে, সেই সুর শুনেই বুঝেছিলাম, তোমাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।”
বৃদ্ধের হাত কাঁপছিল। তিনি মেয়ের মুখ ছুঁয়ে দেখলেন।
—“এত দেরি করলি কেন, মা?”
মেয়ে কেঁদে বলল,
—“পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, বাবা।”
নিত্যানন্দ আর কোনও প্রশ্ন করলেন না। শুধু মেয়ের হাতটা শক্ত করে ধরে রইলেন।
সেদিন অনেক দিন পর তিনি বাঁশি বাজালেন। কিন্তু এবার সুরটা আলাদা ছিল। তাতে অপেক্ষার কষ্ট ছিল না, ছিল ফিরে পাওয়ার আনন্দ।
ইরা দূরে দাঁড়িয়ে শুনছিল।
তার মনে হল, কিছু সুরের কোনও নাম হয় না। তবু সেই সুরই কখনও কখনও হারিয়ে যাওয়া মানুষকে বাড়ির পথ চিনিয়ে দেয়।
পরদিন থেকে মোড়ে নিত্যানন্দ আর একা বসতেন না। তাঁর মেয়ে পাশে বসে থাকত।
আর ইরা যখনই সেখানে যেত, বৃদ্ধ তাকে বলতেন,
—“শোন মা, এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় সুর।”
শিক্ষা: ভালোবাসার সম্পর্ক কখনও কখনও দূরত্বে হারিয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতি আর আন্তরিকতার টান মানুষকে আবার কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারে।