রেললাইনের পাশ দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করত। ট্রেনের শব্দ, ধোঁয়া আর ধুলোর মধ্যে জায়গাটা ছিল রুক্ষ ও প্রাণহীন। সেখানে কেউ দাঁড়াত না, কেউ তাকিয়েও দেখত না।
শুধু এক বৃদ্ধ প্রতিদিন সকালে সেখানে আসতেন।
তাঁর নাম মুকুন্দ। হাতে থাকত একটি ছোট কোদাল আর পুরনো জলের বোতল। তিনি রেললাইনের পাশের এক টুকরো অনাবাদি জমিতে মাটি খুঁড়তেন, আগাছা পরিষ্কার করতেন, তারপর ছোট ছোট গাছের চারা লাগাতেন।
লোকজন তাঁকে দেখে হাসত।
একদিন চায়ের দোকানের মালিক বললেন,
—“মুকুন্দ কাকা, এই জায়গায় গাছ লাগিয়ে কী হবে? দুদিন পর ধুলোয় মরে যাবে।”
মুকুন্দ মৃদু হেসে বললেন,
—“মরে গেলে আবার লাগাব।”
—“আপনার কি আর কোনও কাজ নেই?”
বৃদ্ধ কোদাল চালাতে চালাতে বললেন,
—“আছে। কিন্তু এই কাজটা না করলে মনটা ভালো থাকে না।”
কেউ তাঁর কথা বুঝত না।
প্রতিদিন তিনি একটু একটু করে জমিটা পরিষ্কার করতেন। কোথাও গাঁদা, কোথাও জবা, কোথাও সূর্যমুখীর চারা লাগাতেন। জল কম থাকলে বাড়ি থেকে জল নিয়ে আসতেন।
একদিন স্কুলফেরত কয়েকটি শিশু তাঁকে ঘিরে দাঁড়াল।
একটি ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—“দাদু, আপনি ফুলগুলো কার জন্য লাগাচ্ছেন?”
মুকুন্দ বললেন,
—“যে দেখবে, তার জন্য।”
শিশুরা হেসে উঠল।
—“কিন্তু এখানে তো কেউ আসে না!”
বৃদ্ধ মাটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
—“আজ আসে না। কাল আসতে পারে।”
পরের কয়েক মাসে আশ্চর্য পরিবর্তন হল। চারাগুলো বড় হতে লাগল। গাঁদার হলুদ ফুল ফুটল, জবার লাল পাপড়ি খুলল, সূর্যমুখীগুলো মুখ তুলল আকাশের দিকে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে যাত্রীরা বাগানটি দেখতে শুরু করলেন। কেউ ছবি তুলতেন, কেউ হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতেন।
একদিন রেললাইনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক তরুণী দেখল, মুকুন্দ মাটিতে বসে আছেন। তাঁর শরীর ভালো নেই, তবু তিনি গাছের গোড়ায় জল ঢালছেন।
তরুণী এগিয়ে এসে বলল,
—“আপনি একা এত কষ্ট করেন কেন?”
মুকুন্দ বললেন,
—“গাছগুলো ছোট থাকতে একটু যত্ন চায়। বড় হয়ে গেলে নিজেরাই দাঁড়িয়ে থাকবে।”
কথাটা শুনে তরুণী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
পরদিন সে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে এল। তারা বাগানের চারপাশে বেড়া দিল, একটি জলের ড্রাম রাখল, শুকনো গাছের জায়গায় নতুন চারা লাগাল।
তারপর সপ্তাহে একদিন করে আরও মানুষ আসতে শুরু করল।
কেউ গাছ লাগাত, কেউ জল দিত, কেউ আবর্জনা পরিষ্কার করত।
এক বছর পর রেললাইনের পাশের সেই জমি ছোট্ট এক বাগানে পরিণত হল।
কিন্তু সেই বছরই মুকুন্দ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আর বাগানে আসতে পারলেন না।
শিশুরা তাঁকে দেখতে গেল। তাদের একজন বলল,
—“দাদু, আপনি চিন্তা করবেন না। আমরা বাগানটা দেখব।”
মুকুন্দের মুখে ক্লান্ত হাসি ফুটল।
—“তাহলে তো আমার কাজ শেষ।”
কয়েক সপ্তাহ পর মুকুন্দ মারা গেলেন।
তাঁর স্মৃতিতে বাগানের প্রবেশপথে একটি ছোট ফলক বসানো হল। সেখানে লেখা ছিল—
“এই বাগান একজন মানুষ শুরু করেছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন—যে জায়গায় আজ কেউ সৌন্দর্য দেখে না, সেখানেও আগামী দিনের ফুল ফুটতে পারে।”
আজও প্রতিদিন ট্রেন ছুটে যায় সেই বাগানের পাশ দিয়ে। জানালার ধারে বসা যাত্রীরা সবুজ পাতা আর রঙিন ফুল দেখতে পান।
তাঁদের অধিকাংশই মুকুন্দের নাম জানেন না।
কিন্তু তিনি যে সৌন্দর্য রেখে গেছেন, তা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের চোখে পড়ে।
শিক্ষা: ভালো কাজের জন্য সব সময় প্রশংসা বা স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না। কখনও কখনও নিঃশব্দে শুরু করা একটি ছোট উদ্যোগও বহু মানুষের জীবনে আনন্দ ছড়িয়ে দিতে পারে।