Categories
গল্প বিবিধ

যে মানুষটি ভাঙা খেলনায় প্রাণ ফিরিয়ে দিত।

১. পুরোনো বাজারের ছোট্ট দোকান

পূর্ব মেদিনীপুরের একটি ছোট্ট শহরের নাম আনন্দপুর। শহরের মাঝখানে সপ্তাহে দুদিন বসত বড় বাজার। সেখানে সবজি, মাছ, কাপড়, বাসনপত্র থেকে শুরু করে নানা রকম জিনিস বিক্রি হতো। বাজারের একেবারে শেষ প্রান্তে ছিল টিনের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট্ট দোকান। দোকানটির সামনে কাঠের একটি বোর্ডে লেখা ছিল—‘খেলনা মেরামত করা হয়’।

দোকানের মালিক ছিলেন ষাট পেরোনো এক বৃদ্ধ। তাঁর নাম নিবারণ পাল। বহু বছর আগে তিনি কাঠের খেলনা তৈরি করতেন। পরে প্লাস্টিকের তৈরি সস্তা খেলনার বাজার বেড়ে যাওয়ায় তাঁর ব্যবসা কমে যায়। নতুন খেলনা তৈরির কাজ প্রায় বন্ধ করে দিতে হলেও পুরোনো খেলনা সারানোর কাজ তিনি ছাড়েননি।

প্রতিদিন সকালে তিনি দোকান খুলতেন, ছোট্ট টেবিলের ওপর সরঞ্জাম সাজিয়ে রাখতেন, তারপর অপেক্ষা করতেন কোনো শিশু কিংবা অভিভাবক ভাঙা খেলনা নিয়ে আসবেন।

কেউ নিয়ে আসত চাকা খুলে যাওয়া গাড়ি, কেউ নিয়ে আসত হাত ভেঙে যাওয়া পুতুল, আবার কেউ নিয়ে আসত এমন একটি খেলনা, যার শব্দ আর হচ্ছিল না।

নিবারণবাবু প্রতিটি খেলনাকে খুব যত্ন করে দেখতেন। তাঁর কাছে ভাঙা খেলনা মানে বাতিল জিনিস নয়। বরং এমন একটি জিনিস, যার মধ্যে কারও স্মৃতি, আনন্দ কিংবা ভালোবাসা জড়িয়ে রয়েছে।

একদিন তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দশ বছরের একটি ছেলে প্রশ্ন করল, —কাকু, ভাঙা খেলনা সারিয়ে কী হবে? নতুন একটা কিনে নিলেই তো হয়!

নিবারণবাবু মৃদু হেসে বললেন, —নতুন খেলনা কিনলে খেলতে পারবি। কিন্তু পুরোনো খেলনাটার সঙ্গে যে গল্প জড়িয়ে আছে, সেটা কোথা থেকে কিনবি?

ছেলেটি কথাটার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না। কিন্তু বৃদ্ধের মুখের হাসিটা তার মনে থেকে গেল।

২. ছোট্ট অর্কের লাল গাড়ি

সেই শহরেই থাকত অর্ক নামে একটি ছেলে। অর্কের বাবা ছিলেন দিনমজুর, মা কয়েকটি বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন। সংসারে খুব বেশি টাকা না থাকলেও তাঁরা ছেলের ছোট ছোট আনন্দের দিকে খেয়াল রাখতেন।

অর্কের সবচেয়ে প্রিয় খেলনা ছিল একটি লাল রঙের ছোট্ট গাড়ি। গাড়িটি তাকে কিনে দিয়েছিলেন তার বাবা, যখন অর্ক প্রথমবার স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিল।

সেদিন বাবা কাজ থেকে ফিরে ছেলেকে ডেকে বলেছিলেন, —তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করেছিস। আমার পক্ষে বড় কিছু কেনা সম্ভব নয়। তবে এটা তোর জন্য।

লাল গাড়িটি হাতে পেয়ে অর্কের আনন্দের সীমা ছিল না। সে গাড়িটিকে কখনও বিছানার পাশে, কখনও পড়ার টেবিলের নিচে, আবার কখনও নিজের বালিশের কাছে রাখত।

একদিন বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে গিয়ে গাড়িটির সামনের চাকা ভেঙে গেল। অর্ক অনেক চেষ্টা করেও সেটি ঠিক করতে পারল না।

সে গাড়িটিকে বুকে চেপে বাড়ি ফিরল। মা বললেন, —কী হয়েছে?

অর্ক কাঁদতে কাঁদতে বলল, —গাড়িটা ভেঙে গেছে। বাবা অনেক কষ্ট করে কিনে দিয়েছিল।

মা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, —দেখি, কোথাও সারানো যায় কি না।

পরদিন মা অর্ককে নিয়ে নিবারণবাবুর দোকানে গেলেন।

বৃদ্ধ গাড়িটি হাতে নিয়ে ভালো করে পরীক্ষা করলেন। তারপর বললেন, —চাকাটা ভেঙেছে, কিন্তু গাড়িটা একেবারে নষ্ট হয়নি। চেষ্টা করলে ঠিক করা যাবে।

অর্ক উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করল, —সত্যি পারবেন?

—চেষ্টা না করলে বুঝব কী করে?

নিবারণবাবু গাড়িটি সারাতে শুরু করলেন। প্রয়োজনীয় ছোট্ট একটি অংশ বদলে, চাকার সংযোগ ঠিক করে এবং গাড়ির নিচের অংশ পরিষ্কার করে তিনি সেটিকে আবার চলার উপযোগী করে তুললেন।

গাড়িটি টেবিলের ওপর ছেড়ে দিতেই সেটি গড়িয়ে গেল।

অর্ক আনন্দে চিৎকার করে উঠল, —গাড়িটা আবার চলছে!

নিবারণবাবু হেসে বললেন, —মনে রাখিস, ভেঙে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়।

৩. দোকানের ভেতরের রহস্য

অর্ক এরপর থেকে মাঝেমধ্যে নিবারণবাবুর দোকানে যেতে শুরু করল। কখনও সে ভাঙা খেলনা নিয়ে আসত, কখনও শুধু বসে বসে বৃদ্ধের কাজ দেখত।

দোকানের ভেতরে ছিল নানা রকম সরঞ্জাম—ছোট স্ক্রু-ড্রাইভার, প্লায়ার্স, কাঠ ঘষার কাগজ, রং করার তুলি, আঠা এবং ছোট ছোট বাক্সে সাজানো যন্ত্রাংশ।

একদিন অর্ক দেখল, নিবারণবাবু একটি পুরোনো কাঠের ঘোড়া মেরামত করছেন। ঘোড়াটির একটি পা ভেঙে গিয়েছিল, গায়ের রংও উঠে গিয়েছিল।

অর্ক বলল, —কাকু, এত পুরোনো খেলনা সারাতে এত সময় দিচ্ছেন কেন? নতুন একটা কাঠের ঘোড়া বানিয়ে দিলেই তো পারেন।

বৃদ্ধ বললেন, —এই ঘোড়াটা একসময় একজন ছেলের খুব প্রিয় ছিল। তার মা খেলনাটা নিয়ে এসেছেন। ছেলেটি এখন অনেক বড় হয়েছে, কিন্তু খেলনাটা ফেলে দিতে পারেনি। বুঝলি, কোনো জিনিসের দাম শুধু তার বাজারদর দিয়ে মাপা যায় না।

অর্ক মাথা নাড়ল।

নিবারণবাবু তাকে ছোট একটি স্ক্রু-ড্রাইভার দেখিয়ে বললেন, —যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে শিখবি?

অর্কের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। —শিখব!

—তাহলে প্রথমে একটা কথা মনে রাখবি। কিছু মেরামত করার আগে বুঝতে হবে জিনিসটা কীভাবে কাজ করে। না বুঝে জোর করলে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।

সেদিন থেকে অর্ক দোকানে বসে কাজ দেখা শুরু করল। বৃদ্ধ তাকে নিরাপদে সরঞ্জাম ধরতে শেখালেন। ধারালো যন্ত্র কিংবা বৈদ্যুতিক অংশ নিয়ে কাজ করার সময় বড়দের সাহায্য নেওয়ার নিয়মও বুঝিয়ে দিলেন।

অর্ক ধীরে ধীরে শিখল, ধৈর্য ছাড়া কোনো জিনিস ভালোভাবে মেরামত করা যায় না।

৪. যখন দোকান বন্ধ হওয়ার কথা উঠল

সময় যত এগোতে লাগল, বাজারের চেহারাও তত বদলাতে লাগল। বড় বড় দোকানে রঙিন খেলনা বিক্রি হতে শুরু করল। অনলাইনে অর্ডার করলেও খেলনা বাড়িতে পৌঁছে যেত।

অনেকেই আর পুরোনো খেলনা সারাতে চাইতেন না। সামান্য সমস্যা হলেই নতুন খেলনা কিনে নিতেন।

নিবারণবাবুর দোকানে ক্রেতা কমে গেল। একদিন বাজারের এক ব্যবসায়ী তাঁকে বললেন, —নিবারণদা, এই দোকান রেখে আর কত দিন চলবে? জায়গাটা ভাড়া দিলে ভালো টাকা পাবেন।

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, —দেখি, আর কিছুদিন চেষ্টা করি।

কিন্তু বাস্তবতা কঠিন ছিল। দোকানের ভাড়া, বিদ্যুতের খরচ আর নিজের ওষুধের খরচ জোগাড় করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল।

এক সন্ধ্যায় অর্ক দোকানে এসে দেখল, নিবারণবাবু পুরোনো সরঞ্জামগুলো বাক্সে ভরে রাখছেন।

—কাকু, আজ দোকান বন্ধ করছেন?

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, —হয়তো আর বেশিদিন চালাতে পারব না রে। কাজ কমে গেছে। শরীরও আগের মতো নেই।

অর্কের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

—তাহলে ভাঙা খেলনাগুলো সারাবে কে?

নিবারণবাবু মৃদু হাসলেন। —মানুষ নতুন জিনিস কিনতে শিখেছে। পুরোনো জিনিস আগলে রাখার অভ্যাস হয়তো একদিন আবার ফিরবে।

কিন্তু অর্কের মনে প্রশ্ন জাগল—দোকানটা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একজন বৃদ্ধের কাজই হারিয়ে যাবে, নাকি আরও কিছু হারিয়ে যাবে?

৫. অর্কের নতুন ভাবনা

সেদিন বাড়ি ফিরে অর্ক অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তার লাল গাড়িটি টেবিলের ওপর রাখা ছিল। গাড়িটিকে দেখে তার মনে পড়ল, নিবারণবাবু না থাকলে হয়তো সেটি অনেক আগেই ফেলে দিতে হতো।

পরদিন স্কুলে গিয়ে সে তার শিক্ষিকা মধুমিতা দেবীর সঙ্গে কথা বলল। সব শুনে শিক্ষিকা বললেন, —তোমার ভাবনাটা ভালো। তবে শুধু আবেগ দিয়ে দোকান বাঁচানো যাবে না। এমন কিছু করতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে খেলনা মেরামতের উপকারিতা কী।

অর্ক জিজ্ঞাসা করল, —আমি কী করতে পারি, ম্যাডাম?

শিক্ষিকা বললেন, —স্কুলে একটি ছোট প্রদর্শনীর আয়োজন করা যায়। সেখানে দেখানো হবে, কোন ধরনের খেলনা নিরাপদে মেরামত করা যায়, কোনগুলো পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব এবং অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য কমাতে মেরামত কীভাবে সাহায্য করে। নিবারণকাকুকে আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।

অর্কের মাথায় নতুন পরিকল্পনা এল।

সে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে স্কুলে একটি উদ্যোগ শুরু করল—‘আবার ব্যবহার করি’।

প্রথমে তারা বাড়িতে থাকা অচল খেলনাগুলোর তালিকা তৈরি করল। তারপর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে নিরাপদ ও মেরামতযোগ্য খেলনাগুলো স্কুলে নিয়ে এল। ভাঙা বা ক্ষতিগ্রস্ত খেলনার মধ্যে কোনগুলো সারানো সম্ভব, তা নিবারণবাবু পরীক্ষা করে দেখবেন।

শিশুরা নিজেরা ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবে না। মেরামতের কাজ করবেন নিবারণবাবু কিংবা উপযুক্ত অভিজ্ঞ ব্যক্তি।

অর্ক ও তার বন্ধুরা পোস্টার তৈরি করল। তাতে লেখা হলো—

‘ফেলে দেওয়ার আগে ভাবুন—মেরামত করা যায় কি না।’

৬. স্কুলের প্রদর্শনী

শনিবার স্কুলের হলঘরে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো। টেবিলের ওপর রাখা হলো কিছু ভাঙা খেলনা, কিছু মেরামত করা খেলনা এবং কয়েকটি কাঠের খেলনা তৈরির নমুনা।

নিবারণবাবু প্রথমে আসতে চাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, কয়েকজন শিশুর উদ্যোগে আর কী-ই বা হবে!

কিন্তু অর্ক নিজে তাঁর দোকানে গিয়ে বলল, —কাকু, আপনি না এলে প্রদর্শনীটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আপনি আমাদের শেখাবেন কীভাবে একটা খেলনা পরীক্ষা করতে হয়।

অবশেষে বৃদ্ধ রাজি হলেন।

প্রদর্শনীতে তিনি একটি খেলনা গাড়ি খুলে দেখালেন, কীভাবে চাকা ও অক্ষের সংযোগ কাজ করে। তারপর একটি কাঠের পুতুলের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করার পদ্ধতি বোঝালেন।

তিনি আরও বললেন, সব খেলনা মেরামত করা নিরাপদ নয়। ভাঙা ব্যাটারি, ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক তার, ধারালো অংশ বা ছোট হয়ে যাওয়া বিপজ্জনক যন্ত্রাংশ থাকলে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। কিছু খেলনা ফেলে দেওয়াই নিরাপদ হতে পারে।

শিশুরা মন দিয়ে শুনল।

একজন অভিভাবক প্রশ্ন করলেন, —নতুন খেলনা কেনার চেয়ে পুরোনো খেলনা সারালে কি সত্যিই লাভ হয়?

নিবারণবাবু উত্তর দিলেন, —যদি খেলনাটি নিরাপদে মেরামত করা যায়, তাহলে অল্প খরচে আবার ব্যবহার করা সম্ভব। এতে টাকা বাঁচে, অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যও কমে। তবে প্রতিটি খেলনা সারানো সম্ভব নয়—সেটা আগে বুঝতে হবে।

প্রদর্শনী শেষে কয়েকজন অভিভাবক তাঁদের পুরোনো খেলনা মেরামতের জন্য দিতে চাইলেন। স্কুলের শিক্ষকরা নিবারণবাবুর সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিলেন।

বৃদ্ধের মুখে অনেকদিন পর স্বস্তির হাসি দেখা গেল।

৭. শুধু দোকান নয়, একটি কর্মশালা

প্রদর্শনী সফল হওয়ার পর অর্ক ও তার বন্ধুরা নতুন প্রস্তাব দিল। প্রতি মাসে একদিন স্কুলে ‘মেরামত শেখার কর্মশালা’ হবে। সেখানে নিবারণবাবু শিশুদের দেখাবেন কীভাবে সাধারণ খেলনার সমস্যা চেনা যায়, কাঠের খেলনা যত্নে রাখা যায় এবং জিনিসপত্র অকারণে নষ্ট না করে ব্যবহার করা যায়।

স্কুল কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিল। তবে নিরাপত্তার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার সিদ্ধান্ত হলো।

কর্মশালার প্রথম দিনে অর্ক একটি ছোট কাঠের ট্রেন নিয়ে এল। ট্রেনটির একটি চাকা ঢিলে হয়ে গিয়েছিল।

নিবারণবাবু তাকে বললেন, —আগে ভালো করে দেখ। কোথায় সমস্যা হয়েছে, সেটা বোঝার চেষ্টা কর।

অর্ক ট্রেনটি ঘুরিয়ে দেখল। তারপর বলল, —চাকাটার সংযোগটা ঢিলে হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।

—ঠিক বলেছিস। এবার আমি দেখাচ্ছি কীভাবে নিরাপদে সেটা ঠিক করা যায়।

নিবারণবাবুর সাহায্যে ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

অর্কের মনে হলো, সে যেন শুধু একটি খেলনা সারায়নি; একটি নতুন দক্ষতা শিখেছে।

কর্মশালায় গ্রামের কয়েকজন তরুণও যোগ দিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কাঠের কাজ জানতেন, কেউ ছোটখাটো যন্ত্র মেরামত করতে পারতেন। তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে লাগলেন।

ধীরে ধীরে নিবারণবাবুর দোকানে কাজের পরিমাণও বাড়তে শুরু করল। তিনি আবার নতুন করে কাঠের কয়েকটি খেলনা তৈরি করার সাহস পেলেন।

৮. যে উপহারটি নতুন ছিল না

কয়েক মাস পরে অর্কের জন্মদিন এল। বাবা-মা তাকে নতুন খেলনা কিনে দিতে চাইলেন। কিন্তু অর্ক বলল, —এবার আমি একটা নতুন খেলনা চাই না। আমার পুরোনো লাল গাড়িটাকে একটু সাজিয়ে দিতে চাই।

বাবা অবাক হয়ে বললেন, —সেটা তো আগেই সারানো হয়েছে!

অর্ক বলল, —হ্যাঁ, কিন্তু এখন গাড়িটার গায়ের রং উঠে গেছে। নিবারণকাকুর সাহায্যে নতুন করে রং করব। আর নিচে একটা ছোট্ট লেখা লাগাব।

—কী লেখা?

অর্ক হাসল। —‘বাবার প্রথম উপহার’।

জন্মদিনের দিন নিবারণবাবু গাড়িটির গায়ে নতুন রং করলেন। চাকার সংযোগ পরীক্ষা করলেন এবং নিরাপদভাবে ছোট্ট একটি ফলক লাগিয়ে দিলেন।

অর্ক গাড়িটি বাবার হাতে দিয়ে বলল, —এটা তুমি আমাকে দিয়েছিলে। আমি চাই, এটা আরও অনেক দিন আমার কাছে থাকুক।

বাবার চোখ ভিজে উঠল। তিনি ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

নিবারণবাবু একটু দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন। তাঁর মনে হলো, এতদিন ধরে তিনি যে কাজ করে এসেছেন, তার প্রকৃত মূল্য হয়তো এই মুহূর্তেই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল।

তিনি শুধু খেলনা মেরামত করেননি; মানুষের স্মৃতিকে যত্ন করে রাখার সুযোগ তৈরি করেছেন।

৯. নতুন প্রজন্মের হাতে পুরোনো দক্ষতা

এক বছর পরে আনন্দপুরের বাজারে নিবারণবাবুর দোকানটি আর আগের মতো নির্জন থাকত না। দোকানের বাইরে একটি নতুন বোর্ড লাগানো হয়েছিল—

‘নিবারণ পালের খেলনা মেরামত ও কাঠের কাজের কর্মশালা’

দোকানটি আগের মতো বিশাল ব্যবসা হয়ে ওঠেনি। তবু নিয়মিত কিছু কাজ আসত। স্কুলের কর্মশালার সুবাদে কয়েকজন তরুণ তাঁর কাছ থেকে কাজ শিখছিলেন।

অর্কও পড়াশোনার পাশাপাশি মাঝে মাঝে সেখানে যেত। সে জানত, সবকিছু নিজে মেরামত করতে শেখা সম্ভব নয়, কিন্তু জিনিসের যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনে দক্ষ মানুষের সাহায্য চাওয়া শেখা যায়।

একদিন এক ছোট্ট মেয়ে একটি ভাঙা পুতুল নিয়ে দোকানে এল। পুতুলটির চুল এলোমেলো, একটি হাত ঢিলে হয়ে গিয়েছিল।

মেয়েটি বলল, —কাকু, আমার দিদি আমাকে পুতুলটা দিয়েছে। এটা কি ঠিক করা যাবে?

নিবারণবাবু পুতুলটি পরীক্ষা করে বললেন, —দেখি, চেষ্টা করি।

অর্ক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে মেয়েটিকে বলল, —পুতুলটা ঠিক হয়ে গেলে যত্ন করে রাখিস। খেলতে গিয়ে আবার নষ্ট হলে দুঃখ পাবি না। তখন দেখা যাবে, কী করা যায়।

মেয়েটি মাথা নাড়ল।

সেদিন সন্ধ্যায় দোকান বন্ধ করার আগে নিবারণবাবু অর্ককে বললেন, —জানিস, তুই আমাকে শুধু দোকানটা চালিয়ে যেতে সাহায্য করিসনি। তুই আমাকে বুঝিয়েছিস, আমার শেখা কাজের এখনও মূল্য আছে।

অর্ক বলল, —আমি তো শুধু চেয়েছিলাম, আপনার কাজটা হারিয়ে না যাক।

বৃদ্ধ উত্তর দিলেন, —সেই চাওয়াটাই অনেক বড় কথা। পৃথিবীতে নতুন জিনিস তৈরি হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুনের জন্য পুরোনো সবকিছুকে মূল্যহীন ভাবলে আমরা অনেক কিছু হারিয়ে ফেলব।

অর্ক বাড়ি ফেরার পথে ভাবল, একটি খেলনা ভাঙলে সেটি আবার জোড়া লাগানো যায় কি না, তা দেখা দরকার। আর কোনো মানুষের অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা হারিয়ে যাওয়ার আগে তাকে কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়াও জরুরি।

তার মনে হলো, পৃথিবীকে সুন্দর করার জন্য সব সময় বড় কোনো আবিষ্কার করতে হয় না। কখনও কখনও একটি ভাঙা খেলনাকে আবার চলতে শেখানোই যথেষ্ট।

কারণ, যত্ন করে রক্ষা করা প্রতিটি জিনিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যা পুরোনো হয়েছে, তা সব সময় মূল্যহীন নয়; আর যা ভেঙে গেছে, তার সবকিছুরই শেষ হয়ে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

সমাপ্ত।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *