Categories
উপন্যাস বিবিধ

উপন্যাস : শেষ ট্রেনের যাত্রী (তৃতীয় পর্ব: যে ট্রেন ফিরে আসে না)।

১. যাত্রার প্রথম দিন

“পরবর্তী স্টেশন—শালবন। তারিখ—১৭ নভেম্বর, ২০০৪।”

ঘোষণাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে কামরার সব আলো জ্বলে উঠল।

নিবারণ চক্রবর্তী জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখলেন, ট্রেনটি এমন একটি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে, যা তাঁর কাছে পরিচিত অথচ অচেনা। প্ল্যাটফর্মের দেওয়ালে নতুন রং, টিকিটঘরের সামনে কয়েকজন যাত্রী, চায়ের দোকানে ধোঁয়া ওঠা কেটলি। স্টেশনের বড় ঘড়িতে রাত ১১টা ৪২ মিনিট।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্যটি ছিল প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণের।

তার হাতে ক্যামেরা, কাঁধে ব্যাগ। পরনে সাধারণ শার্ট ও জিনস। সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, তারপর নিজের মোবাইল ফোনে কিছু লিখছে।

অরিত্র সেন।

যে অরিত্রকে নিবারণ এতক্ষণ ধরে চিনে এসেছেন, তারই তরুণ সংস্করণ যেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে।

মধুমিতা জানলার কাছে ছুটে গেলেন।

“ওই তো অরিত্র!”

তিতলি তাঁর হাত ধরে বলল, “কিন্তু আমাদের সঙ্গে তো অরিত্র কাকু আছেন।”

কামরার অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা অরিত্র কোনও উত্তর দিল না। সে শুধু জানলার বাইরে নিজের তরুণ সংস্করণের দিকে তাকিয়ে রইল।

অরিন্দম সেন হেসে বলল, “এবার বুঝতে পারছ? তোমরা যাকে অরিত্র বলে চিনেছ, সে আসলে সেই মানুষটির স্মৃতি, নথি আর অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি করা একটি পরিচয়। তার শরীরের বয়স আর তার পরিচয়ের বয়স এক নয়।”

নিবারণ বললেন, “সোজা করে বলুন। আপনি কী করেছেন?”

অরিন্দম একটি আসন টেনে বসল।

“২০০৪ সালে অরিত্র এই স্টেশনে এসেছিল একটি অপরাধের তদন্ত করতে। সে তখন তিরিশ বছরের সাংবাদিক। সে জানতে পেরেছিল, নীলডাঙা হল্টের বন্ধ রেলপথ ব্যবহার করে কিছু মানুষকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাদের পরিচয় মুছে ফেলা হচ্ছে, পরিবারের কাছে বলা হচ্ছে তারা মারা গেছে অথবা অন্য কোথাও চলে গেছে।”

“আপনি কি সেই দলের একজন ছিলেন?” অদিতি প্রশ্ন করল।

“আমি ছিলাম প্রকল্পের প্রশাসনিক দায়িত্বে। কিন্তু প্রকল্পের আসল উদ্দেশ্য প্রথমে আমিও জানতাম না। পরে বুঝেছিলাম, কয়েকজন বিজ্ঞানী এবং রেলকর্মী একটি অস্বাভাবিক ঘটনার সুযোগ নিয়ে গোপন পরিবহণের ব্যবস্থা তৈরি করেছে। তারা বিশ্বাস করত, নীলডাঙা হল্টের কাছাকাছি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সময়ের ব্যবধানকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে এমনভাবে সরিয়ে নেওয়া যায়, যাতে বাইরের পৃথিবীতে তাদের অনুপস্থিতির হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

অদিতি বলল, “কিন্তু আপনি বললেন, অরিত্রের পরিচয় তৈরি করা হয়েছিল। তার মানে এই মানুষটি কি আসল অরিত্র নন?”

অরিন্দম মাথা নাড়ল।

“এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে তোমাদের আগে ১৯৯১ সালের ঘটনাটি জানতে হবে।”

২. ১৯৯১ সালের রাত

অরিন্দম জানাল, ১৯৯১ সালের ১৭ নভেম্বর নীলডাঙা হল্টে একটি পরীক্ষামূলক রেল পরিষেবা চালু করা হয়েছিল। সরকারি নথিতে প্রকল্পটির নাম ছিল ‘বিশেষ সংকেত ও যোগাযোগ পরীক্ষা’। উদ্দেশ্য ছিল দুর্গম রেলপথে ট্রেনের অবস্থান নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করা।

পরীক্ষার রাতে একটি ট্রেন নীলডাঙা হল্ট থেকে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেটি পরবর্তী স্টেশনে পৌঁছয়নি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে মূল রেলপথে ট্রেনটির কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

প্রথমে সবাই ভেবেছিল, ট্রেনটি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। কিন্তু আশপাশে কোনও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেল না। ট্রেনের কয়েকজন যাত্রী পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন জায়গায় ফিরে আসেন। তাঁদের বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে মেলেনি।

কেউ বলেছিলেন, তাঁরা মাত্র কয়েক ঘণ্টা ট্রেনে ছিলেন। কেউ দাবি করেছিলেন, তাঁরা বহু মাস একটি অচেনা স্টেশনে আটকে ছিলেন। আবার কয়েকজন বলেছিলেন, ট্রেনটি কখনও স্টেশন ছেড়েই যায়নি।

“তখনই প্রকল্পের কিছু লোক বুঝতে পারে, এখানে এমন একটি ঘটনা ঘটছে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে,” অরিন্দম বলল। “তারা ঘটনাটিকে প্রকাশ্যে না এনে গবেষণার বিষয় করে তোলে। কিন্তু ধীরে ধীরে গবেষণার সঙ্গে অপরাধ জড়িয়ে যায়। কিছু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রেনে পাঠানো হতে থাকে।”

নিবারণ জিজ্ঞাসা করলেন, “আর আমার দাদা?”

“সুব্রত এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। সে রেলওয়ের একজন কর্মচারী হিসেবে ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারে। সে প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল। পরে অরিত্রের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। দু’জন মিলে প্রকল্পের নথি বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।”

“তারপর তারা নিখোঁজ হয়।”

“হ্যাঁ। কিন্তু দু’জনের পরিণতি এক ছিল না। সুব্রত ট্রেনের মধ্যে আটকে পড়ে। অরিত্র পালাতে পেরেছিল, কিন্তু তার সংগ্রহ করা প্রমাণ এবং তার পরিচয় নিয়ে এমন ঘটনা ঘটে, যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা আজও আমাদের কাছে নেই।”

অদিতি বলল, “আপনি কি বলতে চাইছেন, ট্রেনটি মানুষের পরিচয় বদলে দেয়?”

“না। ট্রেন কোনও জাদুকরী যন্ত্র নয়, যা মানুষের শরীর বা পরিচয় ইচ্ছেমতো বদলে দেয়। এখানে মূল ঘটনা হল সময়ের ব্যবধান, বিচ্ছিন্নতা, দীর্ঘদিনের গোপন আটক এবং নথি জালিয়াতি। এর সঙ্গে একটি অস্বাভাবিক রেল-ঘটনা জড়িয়ে আছে, যার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমরা এখনও জানি না। কিন্তু সেই অজানাকে ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণা করা হয়েছে।”

অরিত্র এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে বলল, “অরিন্দম সবটা বলছে না।”

সবাই তার দিকে তাকাল।

“আমাকে সে তৈরি করেনি। আমি কোনও কৃত্রিম মানুষ নই। আমার স্মৃতি আছে, আমার অনুভূতি আছে, আমার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমার জীবনের কিছু অংশ অন্যের নথি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আমাকে বলা হয়েছে, আমি অরিত্র সেন। আমি সেই নামেই বহু বছর ধরে বেঁচেছি। এখন বুঝতে পারছি, আমার অতীতের কিছু অংশ হয়তো আমার নিজের নয়।”

নিবারণ ধীরে বললেন, “তাহলে আপনি কে?”

অরিত্র দীর্ঘক্ষণ নীরব থেকে উত্তর দিল, “সেটাই আমাকে জানতে হবে।”

৩. যে সত্য কেউ বলতে চায়নি

ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল। জানলার বাইরে শালবন স্টেশনের আলো মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর চারদিকে কুয়াশা ছাড়া আর কিছু দেখা গেল না।

অরিন্দম সেন তার ব্যাগ থেকে একটি পুরোনো ফাইল বের করল। ফাইলের ওপর লেখা—‘প্রকল্প ১৭/৪৭’।

“এই ফাইলের মধ্যে ২০০৪ সালের ঘটনার নথি রয়েছে। এখানে অরিত্র, সুব্রত, মধুমিতা এবং ঋজুর নাম আছে। কিন্তু আরও একটি নাম আছে, যেটি তোমাদের জানা দরকার।”

সে ফাইল খুলে একটি কাগজ সামনে রাখল।

নাম—অরিন্দম ঘোষ।

মধুমিতা কাগজটি দেখে চমকে উঠলেন।

“এই নামটা আমার স্বামীর।”

নিবারণ তাকালেন।

“আপনার স্বামীর নাম অরিন্দম ঘোষ?”

মধুমিতা মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। ঋজুর বাবা। কিন্তু ও নিখোঁজ হওয়ার পর অরিন্দমও হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। আমাকে বলা হয়েছিল, সে কাজের সূত্রে বাইরে গেছে। পরে আর কোনও খবর পাইনি।”

অরিন্দম সেন বলল, “ঋজুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার সঙ্গে তার বাবারও সম্পর্ক ছিল। অরিন্দম ঘোষ প্রকল্পের জন্য কাজ করত না। সে ছিল একজন রেল-প্রযুক্তিবিদ। নীলডাঙা হল্টের পরীক্ষামূলক সিগন্যাল ব্যবস্থায় তার কিছু প্রযুক্তিগত অবদান ছিল। কিন্তু পরে সে বুঝতে পারে, তার তৈরি ব্যবস্থাকে অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।”

“তাহলে সে কি আমাদের সাহায্য করতে গিয়েছিল?” মধুমিতা প্রশ্ন করলেন।

“হ্যাঁ। সে ঋজুকে সরিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেই রাতে সে নিজেই নিখোঁজ হয়ে যায়।”

মধুমিতা চোখ বন্ধ করলেন।

“আমাকে কেউ কিছু জানায়নি। এত বছর ধরে আমি ভেবেছি, আমার স্বামী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।”

অরিন্দম বলল, “তার কোনও প্রমাণ নেই। নথি অনুযায়ী, সে শেষবার নীলডাঙা হল্টে দেখা গিয়েছিল। তারপর তার কোনও নির্ভরযোগ্য খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

তিতলি ধীরে ধীরে বলল, “তাহলে আমার সঙ্গে ঋজুর সম্পর্ক কী?”

অরিন্দম তার দিকে তাকাল।

“এই প্রশ্নের উত্তরও ওই ফাইলের শেষ পাতায় আছে।”

পাতাটি উল্টে দেখা গেল, সেখানে একটি শিশুর ছবি। ছবির পেছনে লেখা—‘অজ্ঞাতপরিচয় কন্যাশিশু, উদ্ধার: ১৮ নভেম্বর ২০০৪’।

মধুমিতা ছবিটি হাতে নিয়ে স্থির হয়ে গেলেন।

শিশুটির বাঁ হাতে একটি লাল সুতো বাঁধা।

তিতলির হাতেও ছোটবেলা থেকে সেই দাগ ছিল।

মধুমিতা কাঁপা গলায় বললেন, “তুমি কি আমার মেয়ে?”

তিতলি কোনও উত্তর দিতে পারল না।

অরিন্দম বলল, “নথিতে শিশুটির নাম ছিল না। পরে তাকে অনাথ আশ্রমে পাঠানো হয়। তার পরিচয় নির্ধারণের জন্য কোনও পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা করা হয়নি। কিন্তু উদ্ধারস্থল, তারিখ এবং হাতে বাঁধা সুতোর বর্ণনা মিলছে।”

তিতলি ধীরে বলল, “আমার জন্মের কথা কেউ জানে না। অনাথ আশ্রমের নথিতে শুধু লেখা আছে, আমাকে শালবন স্টেশনের কাছে পাওয়া গিয়েছিল।”

মধুমিতা তার হাত ধরলেন।

“আমি তোমাকে হারিয়েছিলাম কি না, তা এখনও নিশ্চিত নই। কিন্তু যদি তুমি আমার মেয়ে হও, তাহলে তোমাকে খুঁজে পেতে আমার এত বছর লাগল কেন?”

অরিত্র বলল, “কারণ কেউ চায়নি, তোমরা একে অপরকে খুঁজে পাও। ঋজুকে ট্রেনের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছিল। আর তিতলির পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল, যাতে পরিবারের কোনও সূত্র বাইরে না আসে।”

তিতলি চোখ মুছল।

“তাহলে আমার নাম তিতলি কে রেখেছিল?”

“সম্ভবত অনাথ আশ্রমের কর্মীরা,” অরিন্দম বলল। “তোমার জন্মের নাম কী ছিল, তা নথিতে নেই।”

মধুমিতা তিতলিকে বুকে টেনে নিলেন।

“তোমার নাম যাই হোক, তুমি আমার কাছে হারিয়ে যাওয়া সন্তান হয়ে থাকবে না।”

কিন্তু তিতলি তাঁকে আলতো করে ছেড়ে দিয়ে বলল, “আমি আপনার মেয়ে কি না, তা নিশ্চিত হতে চাই। শুধু এই গল্পের ওপর ভিত্তি করে নয়। আমি প্রমাণ চাই।”

মধুমিতা মাথা নাড়লেন।

“তুমি ঠিক বলেছ। এত বছর মিথ্যা আর অসম্পূর্ণ তথ্যের মধ্যে কাটিয়েছি। এবার সত্যিটা যাচাই করেই এগোব।”

৪. শেষ কামরার গোপন ঘর

ট্রেনের ভেতরে হঠাৎ একটি দীর্ঘ ঘণ্টা বেজে উঠল।

অরিত্র জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমরা নীলডাঙা হল্টের কাছে পৌঁছে গেছি।”

অরিন্দম উঠে দাঁড়াল।

“আমাদের হাতে খুব বেশি সময় নেই। এই ট্রেন যখন আবার শালবনের দিকে ফিরবে, তখন সিগন্যাল চালু করতে হবে। না হলে ট্রেনটি আবার সেই একই চক্রে ঢুকে পড়বে।”

নিবারণ বললেন, “তাহলে চলুন, এখনই লিভার টেনে দিই।”

“এত সহজ নয়,” অরিন্দম বলল। “সিগন্যাল কক্ষের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এই কামরার পেছনে। কিন্তু সেখানে পৌঁছতে হলে শেষ কামরার দরজা খুলতে হবে। আর সেই দরজা খোলার জন্য একটি পরিচয় যাচাই করতে হয়।”

“কীসের পরিচয়?”

“প্রথম যাত্রীর পরিচয়।”

সবাই অরিত্রের দিকে তাকাল।

অরিত্র বলল, “আমার নাম দিয়ে দরজা খুলবে না। কারণ এই ট্রেনের নথিতে প্রথম যাত্রীর পরিচয় নিয়ে অসঙ্গতি আছে।”

“তাহলে কী করতে হবে?” অদিতি প্রশ্ন করল।

অরিন্দম উত্তর দিল, “যে ব্যক্তি প্রথমবার ট্রেনে উঠেছিল, তাকে নিজের নাম বলতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল, প্রথম যাত্রী কে ছিল, তা কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না।”

নিবারণ বললেন, “আপনি তো বললেন, প্রথম যাত্রী অরিত্র।”

“আমি বলেছি, নথিতে সেই নাম রয়েছে। কিন্তু ১৯৯১ সালের রেজিস্টারে একটি শিশুর নাম লেখা ছিল না। পরে সেই শিশুটির পরিচয় অরিত্র সেন হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়। আসল পরিচয় গোপন রাখা হয়েছিল।”

অরিত্র হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।

“তুমি কি বলতে চাইছ, আমি অরিত্র নই?”

অরিন্দম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

“আমি বলতে চাইছি, তোমার জন্মপরিচয় সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত নই। তোমার স্মৃতি, তোমার নথি এবং তোমার শারীরিক বয়সের মধ্যে অসঙ্গতি রয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তোমার অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা মিথ্যা।”

অরিত্রের চোখে রাগ জমে উঠল।

“তুমি আমার জীবন নিয়ে পরীক্ষা করেছ। আমাকে এমন একটি নাম দিয়েছ, যার সঙ্গে আমার জন্মের কোনও সম্পর্ক নেই। তারপর বলছ, আমার পরিচয় নিশ্চিত নয়!”

“আমি তোমাকে এই অবস্থায় আনিনি,” অরিন্দম বলল। “আমি শুধু সেই নথিগুলির রক্ষক ছিলাম, যেগুলি অন্যেরা বদলে দিয়েছিল।”

“তাহলে আসল অপরাধী কে?”

অরিন্দম উত্তর দেওয়ার আগেই কামরার দরজা খুলে গেল।

দরজার ওপারে একটি ছোট ঘর। দেওয়ালে পুরোনো সিগন্যাল প্যানেল। তার মাঝখানে একটি লাল লিভার। পাশে একটি ধাতব বাক্স, যার ওপর লেখা—

‘প্রথম যাত্রীর নাম।’

অদিতি বাক্সটির কাছে গিয়ে বলল, “এখানে কোনও বৈদ্যুতিক সংযোগ নেই। এটা হয়তো যান্ত্রিক লক।”

নিবারণ লিভারটি পরীক্ষা করলেন।

“এটা টানলেই কি ট্রেন থেমে যাবে?”

“সম্ভবত,” অরিন্দম বলল। “কিন্তু লিভার টানার আগে বাক্সটি খুলতে হবে।”

অদিতি বাক্সের তালা পরীক্ষা করে বুঝল, তালাটি সাধারণ চাবি দিয়ে খোলা যায় না। তার পাশে একটি ছোট ধাতব প্লেট, তাতে ছয়টি খোপ। প্রতিটি খোপে একটি করে নামের প্রথম অক্ষর বসানোর জায়গা।

অরিত্র বলল, “আমাদের ছয়জনের নাম?”

“সম্ভবত,” অদিতি উত্তর দিল। “অরিত্র, সুব্রত, নিবারণ, মধুমিতা, ঋজু এবং তিতলি—এই ছয়টি নাম বসালে দেখা যাক কী হয়।”

তারা একে একে অক্ষর বসাল। কিন্তু তালা খুলল না।

তারপর অদিতি পুরোনো রেজিস্টারের পাতাটি মনে করল। সেখানে লেখা ছিল—‘যে নাম প্রথমে লেখা হয়েছিল, সেটি মুছে ফেললেও তার চিহ্ন থেকে যায়।’

সে ধাতব প্লেটের ওপর আলো ফেলল। প্রথম খোপের নীচে ক্ষীণ আঁচড়ে একটি অক্ষর দেখা গেল—‘স’।

নিবারণ বললেন, “সুব্রত?”

সুব্রত মাথা নাড়লেন।

“না। আমার নামের প্রথম অক্ষর এখানে লেখা হয়নি।”

অরিত্র প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল, “সেটা হয়তো ‘সেন’ নয়। ‘স্মৃতি’।”

অদিতি মাথা নাড়ল।

“না। এটা নামের প্রথম অক্ষর। কিন্তু আমরা যে ছয়টি নাম জানি, তাদের মধ্যে আরেকটি নাম আছে, যেটি কেউ উল্লেখ করেনি।”

মধুমিতা ধীরে বললেন, “অরিন্দম ঘোষ।”

অরিন্দম সেনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

“না,” সে বলল। “ওর নাম এখানে থাকার কথা নয়।”

“কেন?” নিবারণ প্রশ্ন করলেন।

অরিন্দম উত্তর দিল না।

ঠিক তখনই ধাতব বাক্সের ভেতর থেকে একটি শব্দ এল।

টিক।

তারপর তালাটি খুলে গেল।

বাক্সের ভেতরে একটি ছোট কাগজ।

তাতে লেখা—

প্রথম যাত্রীর নাম: অরিন্দম ঘোষ।

মধুমিতা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।

“তাহলে আমার স্বামীই প্রথম যাত্রী?”

অরিন্দম সেন ধীরে মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। ১৯৯১ সালের পরীক্ষার সময় সে নীলডাঙা হল্টে উপস্থিত ছিল। তার তৈরি সিগন্যাল ব্যবস্থার ত্রুটির কারণেই প্রথম অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। পরে সে সেই ভুল সংশোধন করতে চেয়েছিল। কিন্তু প্রকল্পের অন্যরা তাকে থামিয়ে দেয়।”

“তাহলে সে কোথায়?” মধুমিতা জিজ্ঞাসা করলেন।

অরিন্দম বলল, “এই ট্রেনের মধ্যেই।”

৫. যে মানুষটি নিজের নাম ভুলে গিয়েছিল

শেষ কামরার পেছনের দরজাটি খুলতেই একটি সরু করিডর দেখা গেল। করিডরের শেষে ছোট একটি কেবিন। সেখানে একজন মানুষ বসে আছেন। মাথা নিচু, সামনে একটি পুরোনো রেলওয়ে লগবুক।

মধুমিতা ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলেন।

“অরিন্দম?”

লোকটি মাথা তুলল।

তার মুখে বয়সের ছাপ রয়েছে। চুল পেকে গেছে, চোখের নীচে গভীর কালি। কিন্তু মধুমিতা তাকে চিনতে পারলেন।

“তুমি!”

অরিন্দম ঘোষ উঠে দাঁড়ালেন। কিছুক্ষণ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর ধীরে বললেন, “মধু?”

মধুমিতা কেঁদে ফেললেন।

“তুমি কোথায় ছিলে এত বছর? আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গেছ।”

অরিন্দম তাঁর হাত ধরলেন।

“আমি ফিরতে পারিনি। প্রথমে ভেবেছিলাম, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বেরিয়ে যাব। তারপর বুঝলাম, এই ট্রেনের সময় আর বাইরের সময় এক নয়। আমি যতবার বেরোনোর চেষ্টা করেছি, ততবার আবার এই একই জায়গায় ফিরে এসেছি।”

“ঋজু কোথায়?”

অরিন্দম মধুমিতার মুখের দিকে তাকালেন।

“ঋজু কি ফিরে এসেছে?”

“হ্যাঁ। সে ট্রেনে আছে। তার বয়স এখনও পাঁচ বছর।”

অরিন্দমের চোখে জল এসে গেল।

“আমি ওকে শেষবার দেখেছিলাম যখন ওর বয়স পাঁচ। ওকে নিরাপদে রাখার জন্য অরিত্রকে বলেছিলাম, ট্রেনের বাইরে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমরা জানতাম না, ট্রেনের সময়ের মধ্যে ও আটকে পড়বে।”

মধুমিতা বললেন, “তুমি কি জানো, তিতলি কে?”

অরিন্দম ঘোষ তিতলির দিকে তাকালেন। অনেকক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, “তিতলি?”

মেয়েটির চোখ ভিজে উঠল।

“আপনি আমাকে চেনেন?”

অরিন্দম ধীরে বললেন, “তুমি আমার মেয়ে। ঋজুর ছোট বোন।”

মধুমিতা বিস্ময়ে বললেন, “কিন্তু আমাদের তো একটাই সন্তান ছিল!”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

“না। তোমাদের দ্বিতীয় সন্তান জন্মেছিল ২০০৪ সালের নভেম্বরের শুরুতে। কিন্তু সেই সময় আমি নীলডাঙার প্রকল্পে আটকে পড়েছিলাম। তুমি অসুস্থ ছিলে। শিশুটিকে হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। পরে যখন আমি তাকে খুঁজতে যাই, তখন জানতে পারি, তাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি আর খুঁজে পাইনি।”

তিতলি কাঁপা গলায় বলল, “তাহলে আমি কি সেই শিশু?”

“সম্ভবত,” অরিন্দম বললেন। “কিন্তু আমি চাই, তোমার পরিচয় নির্ভরযোগ্যভাবে যাচাই করা হোক। এত বছর ধরে যে নথি বদলানো হয়েছে, তার মধ্যে কোনও একটি কাগজকে একমাত্র সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।”

তিতলি এগিয়ে এসে তাঁর হাত ধরল।

“আমি আপনার মেয়ে কি না, তা পরীক্ষায় জানা যাবে। কিন্তু এত বছর ধরে যে মানুষটিকে খুঁজছিলাম, তিনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন—এটাই আমার কাছে অনেক বড় কথা।”

অরিন্দম তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

“আমি তোমাদের কাছে ফিরতে চাই।”

নিবারণ বললেন, “তাহলে আমাদের এখনই ট্রেন থামাতে হবে।”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

“হ্যাঁ। কিন্তু লিভার টানলে ট্রেনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাবে। যারা এই ট্রেনে আটকে আছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের সময়ে ফিরতে পারবে। কিন্তু যারা অন্য সময়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে, তাদের কী হবে, তা আমি জানি না।”

অদিতি বলল, “তাহলে আমাদের ঝুঁকি নিতে হবে। এই ট্রেনকে আর চলতে দেওয়া যায় না।”

৬. শেষ সংকেত

সবাই আবার সিগন্যাল কক্ষে ফিরে এল।

বাইরে ট্রেনের চাকা দ্রুত ঘুরছে। জানলার বাইরে কখনও শালবন, কখনও নীলডাঙা, কখনও অচেনা স্টেশনের আলো ভেসে উঠছে। মনে হচ্ছে, ট্রেনটি একই পথ বারবার অতিক্রম করছে, কিন্তু প্রতিবার সময়ের ভিন্ন বিন্দুতে পৌঁছচ্ছে।

অরিন্দম ঘোষ লিভারের সামনে দাঁড়ালেন।

“এটা আমাকেই করতে হবে। প্রথম যাত্রার ভুল আমার প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমি সিগন্যাল ব্যবস্থায় একটি বিশেষ পুনরাবৃত্তি চক্র তৈরি করেছিলাম। পরে সেটিকে অন্যরা ব্যবহার করে ট্রেনকে একই সময়ে ফিরিয়ে আনতে থাকে।”

নিবারণ বললেন, “আপনি নিশ্চিত?”

“না। কিন্তু এই দায় থেকে আর পালাতে চাই না।”

মধুমিতা তাঁর হাত ধরে বললেন, “এত বছর তুমি একা ছিলে। এবার আর একা সিদ্ধান্ত নিও না।”

অরিন্দম তাঁর দিকে তাকালেন।

“আমি যদি ফিরতে না পারি?”

মধুমিতা চোখ মুছলেন।

“তাহলে অন্তত চেষ্টা করব, যেন আমাদের সন্তানরা সত্যিটা জানতে পারে। কিন্তু আমি চাই, তুমি ফিরে আসো।”

অরিন্দম মাথা নাড়লেন।

অদিতি বাক্সের ভেতরের নথিগুলি পরীক্ষা করে দেখল, লিভারের পাশে একটি ছোট সুইচ রয়েছে। সুইচটির নীচে লেখা—

‘শেষ সংকেতের আগে সব যাত্রীর নাম নথিভুক্ত করুন।’

তারা একে একে নাম লিখল—নিবারণ চক্রবর্তী, সুব্রত চক্রবর্তী, মধুমিতা ঘোষ, ঋজু ঘোষ, তিতলি, অদিতি সেন, অরিত্র সেন এবং অরিন্দম ঘোষ।

কিন্তু অরিত্র নিজের নাম লিখতে গিয়ে থেমে গেল।

“আমি কি সত্যিই অরিত্র সেন?”

অরিন্দম ঘোষ তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার জন্মপরিচয় সম্পর্কে সব নথি হয়তো উদ্ধার করা যাবে না। কিন্তু তুমি যে মানুষ, তোমার অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্তের দায়িত্ব তোমারই। কোনও নাম তোমার মানবিকতাকে মুছে দিতে পারে না।”

অরিত্র কলম তুলে লিখল—‘অরিত্র সেন—পরিচয় যাচাই অসম্পূর্ণ।’

নামটি লেখা শেষ হতেই বাক্সের ভিতরে একটি সবুজ আলো জ্বলে উঠল।

অরিন্দম ঘোষ লিভারটি শক্ত করে ধরলেন।

“সবাই প্রস্তুত?”

নিবারণ বললেন, “হ্যাঁ।”

“তাহলে দরজা বন্ধ করে দিন।”

অদিতি দরজাটি বন্ধ করল।

অরিন্দম লিভার টানলেন।

প্রথমে কিছুই ঘটল না।

তারপর গোটা ট্রেন কেঁপে উঠল। জানলার বাইরে আলো ছুটে যেতে লাগল। স্পিকারে ভাঙা ভাঙা ঘোষণা শোনা গেল—

“বিশেষ পরিষেবা বন্ধ করা হচ্ছে… সকল যাত্রীকে… নিজ নিজ গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হতে অনুরোধ করা হচ্ছে…”

ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল।

হঠাৎ একটি বিকট শব্দ হলো।

সিগন্যাল কক্ষের আলো নিভে গেল।

অরিন্দম লিভারের পাশে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর মুখে তীব্র যন্ত্রণা।

মধুমিতা চিৎকার করে উঠলেন, “অরিন্দম!”

তিনি মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলেন। নিবারণ তাঁকে ধরে ফেললেন।

অরিন্দম দুর্বল গলায় বললেন, “ট্রেন থামছে। কিন্তু শেষ সংকেতটা এখনও বাকি।”

“কী করতে হবে?” অদিতি জিজ্ঞাসা করল।

অরিন্দম কষ্ট করে হাত তুলে জানলার বাইরে দেখালেন।

দূরে একটি প্ল্যাটফর্ম দেখা যাচ্ছে। সেখানে একটি ছোট ঘর। ঘরের দেওয়ালে লেখা—

‘শেষ সিগন্যাল।’

“ওখানে যেতে হবে,” অরিন্দম বললেন। “ট্রেন পুরো থামার আগে সিগন্যালটি চালু করতে হবে। নইলে আবার চক্র শুরু হবে।”

নিবারণ বললেন, “আমি যাব।”

সুব্রত তাঁর হাত ধরে ফেললেন।

“না। তুই এত বছর আমাকে খুঁজেছিস। এবার আমাকে যেতে দে।”

“দাদা, আমি তোমাকে আবার হারাতে পারব না।”

সুব্রত মৃদু হাসলেন।

“তুই আমাকে হারাসনি, নিবারণ। আমি নিজেই পথ হারিয়েছিলাম। এবার বাড়ি ফিরতে চাই।”

তিনি সিগন্যাল কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।

নিবারণ তাঁর পেছনে ছুটতে চাইলেন, কিন্তু ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

কাচের ওপারে দেখা গেল সুব্রত প্ল্যাটফর্মের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে।

সে ঘরে ঢুকে একটি লাল সুইচ টিপল।

তারপর সব আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল।

ট্রেনটি প্রবল ঝাঁকুনিতে থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত সম্পূর্ণ নীরবতা।

তারপর ঘোষণা শোনা গেল—

“যাত্রা সমাপ্ত। যাত্রীরা অনুগ্রহ করে নিজ নিজ গন্তব্যে নেমে যান।”

৭. যে মানুষটি ফিরে এল

নিবারণ যখন চোখ খুললেন, তখন তিনি শালবন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে আছেন।

ভোরের আলো ফুটেছে। চায়ের দোকান খুলছে। দূরে পাখির ডাক।

মধুমিতা তাঁর পাশে বসে। তিতলি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। অদিতি মোবাইল হাতে কারও সঙ্গে কথা বলছে।

ঋজু মধুমিতার কোলে ঘুমিয়ে।

নিবারণ উঠে বসে চারদিকে তাকালেন।

“দাদা কোথায়?”

কেউ উত্তর দিল না।

তিনি উঠে দাঁড়িয়ে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে ছুটে গেলেন। সেখানে একটি পুরোনো বেঞ্চের ওপর সুব্রতর চশমা পড়ে আছে। পাশে একটি ভাঁজ করা কাগজ।

কাগজে লেখা—

‘নিবারণ,

আমি এবার নিজের সময়ে ফিরতে পেরেছি কি না, তা জানি না। কিন্তু তুই যেন আর আমাকে খুঁজতে গিয়ে নিজের জীবন আটকে রাখিস না।

বাড়ি ফিরে যা। আমাদের পুরোনো বাড়ির বারান্দায় এখনও সেই আমগাছটা আছে কি না, দেখে আসিস।

যদি কোনও দিন দেখা হয়, তখন আমাকে আর নিখোঁজ মানুষ বলে ডাকিস না।

— সুব্রত।’

নিবারণ কাগজটি বুকে চেপে ধরলেন।

তিনি জানতেন না, সুব্রত বেঁচে আছেন কি না। তিনি জানতেন না, আবার কখনও দেখা হবে কি না। কিন্তু প্রথমবার তাঁর মনে হলো, দাদার হারিয়ে যাওয়া জীবনের একটা অধ্যায় অন্তত শেষ হয়েছে।

স্টেশনের বড় ঘড়িতে তখন সকাল ৬টা ১২ মিনিট।

ঘড়িটি স্বাভাবিকভাবে চলছে।

অদিতি এসে বলল, “ট্রেনটি আর নেই।”

“মানে?”

“রেললাইনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিয়েছি। নীলডাঙা হল্টের শাখা লাইনে কোনও নতুন চিহ্ন নেই। গত রাতের কোনও ট্রেনের রেকর্ডও নেই। শুধু এই সুটকেসটা পাওয়া গেছে।”

সে একটি পুরোনো চামড়ার সুটকেস নিবারণের হাতে দিল।

সুটকেসের ট্যাগে লেখা—অরিত্র সেন।

ভেতরে একটি চিঠি।

‘যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝবে, ট্রেনটি থেমেছে। আমি জানি না, আমি কোথায় ফিরে গেছি। হয়তো নিজের সময়ে, হয়তো এমন কোনও জায়গায়, যেখানে আমার নামের আর কোনও প্রয়োজন নেই।

আমি যে মানুষ ছিলাম, তাকে খুঁজতে গিয়ে অনেক মানুষকে হারিয়েছি। কিন্তু এবার আমি চাই, যারা বেঁচে আছে, তারা নিজেদের জীবন ফিরে পাক।

আমার গল্পের সব উত্তর হয়তো পাওয়া যাবে না। তবু আমার নামে যে অন্যায় হয়েছে, তা যেন আর কারও সঙ্গে না হয়।

— অরিত্র।’

মধুমিতা চিঠিটি পড়ে চোখ বন্ধ করলেন।

“ও কি ফিরে আসবে?”

অদিতি উত্তর দিল, “আমি জানি না।”

নিবারণ বললেন, “কিন্তু এবার আমরা ওর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি নতুন করে তদন্ত করব। কোনও প্রমাণ গোপন থাকবে না।”

৮. সাত মাস পরে

পরবর্তী সাত মাসে অনেক কিছু বদলে গেল।

অদিতি এবং নিবারণ মিলে নীলডাঙা হল্টের ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন। পুরোনো রেলকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক এবং নিখোঁজ মানুষের পরিবারগুলির সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হলো। ১৯৯১ সালের বিশেষ পরিষেবার নথি, ২০০৪ সালের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ এবং কয়েকটি গোপন প্রশাসনিক আদেশের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গেল।

তদন্তে উঠে এল, দীর্ঘদিন ধরে কিছু মানুষকে গোপনে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের পরিবারকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। কয়েকটি সরকারি নথি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছিল। এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে, কয়েকজন নিখোঁজ, আর কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

তবে ট্রেনটির অস্বাভাবিক ঘটনার কোনও নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। কিছু বিশেষজ্ঞ একে বিচ্ছিন্ন রেল-দুর্ঘটনা, মানসিক আঘাত এবং ভুল স্মৃতির মিশ্রণ বলে মনে করেছেন। অন্যদিকে কয়েকটি নথিতে এমন সময়ের ব্যবধানের উল্লেখ রয়েছে, যা সাধারণ হিসাবের সঙ্গে মেলেনি।

অদিতি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে সব প্রমাণ সংরক্ষণ করার পক্ষে মত দিল।

নিবারণ আর কুসংস্কারকে সত্য বলে মানলেন না। আবার নিজের চোখে দেখা ঘটনাগুলিকেও অকারণে উড়িয়ে দিলেন না।

মধুমিতা ও তিতলির সম্পর্কের বিষয়ে চিকিৎসা ও পরিচয়সংক্রান্ত নথি যাচাই করা হলো। প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেলেও, পুরোনো রেকর্ডের ঘাটতির কারণে সব প্রশ্নের উত্তর একবারে পাওয়া সম্ভব হয়নি। তবু মধুমিতা ও তিতলি সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁরা একসঙ্গে থাকবেন এবং নিজেদের সম্পর্ককে সময় দেবেন।

ঋজুর শারীরিক বয়সের সঙ্গে তার স্মৃতির ব্যবধান ছিল অত্যন্ত অস্বাভাবিক। তাকে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হলো। সে ধীরে ধীরে নতুন পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করল। মধুমিতা তাকে কোনও পুরোনো স্মৃতি মনে করতে বাধ্য করলেন না। বরং প্রতিদিন নতুন গল্প শোনালেন, নতুন বই পড়ে শোনালেন, তাকে নিয়ে পার্কে গেলেন।

একদিন ঋজু নিজেই জিজ্ঞাসা করল, “মা, আমি কি আবার বড় হব?”

মধুমিতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “তুমি নিজের মতো করে বড় হবে। তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।”

অরিন্দম ঘোষের অবস্থার বিষয়ে কোনও নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি। শেষ সিগন্যাল কক্ষে তাঁর উপস্থিতির প্রমাণ ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি কোথায় গেলেন, তা জানা যায়নি।

আর সুব্রত চক্রবর্তী?

তাঁর কোনও সন্ধান মেলেনি। তবে নিবারণ প্রতি মাসে একবার তাঁদের পুরোনো বাড়িতে যান। বারান্দার আমগাছটি এখনও বেঁচে আছে। গাছের নীচে একটি বেঞ্চ বসানো হয়েছে। সেখানে বসে তিনি কখনও কখনও দাদার চিঠিটি পড়েন।

৯. শেষ ট্রেনের শেষ যাত্রী

এক বছর পর, ১৭ নভেম্বরের রাতে, নিবারণ শালবন স্টেশনে ডিউটি করছিলেন।

সেই রাতে কোনও বিশেষ ট্রেনের কথা ঘোষণা করা হয়নি। রেলওয়ের রেকর্ডে শেষ লোকাল ট্রেনটির সময় রাত ১১টা ৪৭ মিনিট।

নিবারণ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর পাশে অদিতি। দু’জনেই জানতেন, এই তারিখটি তাঁদের জীবনে আর পাঁচটা দিনের মতো নয়।

ঘড়িতে ১১টা ৪৬।

দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল।

১১টা ৪৭।

শেষ লোকাল ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে এসে থামল।

যাত্রীরা নামল। কেউ ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে গেল, কেউ রিকশার খোঁজ করল। ট্রেনের শেষ কামরা থেকে এক বৃদ্ধ নামলেন। তাঁর হাতে একটি কাপড়ের ব্যাগ।

বৃদ্ধ প্ল্যাটফর্মে নেমে নিবারণের দিকে তাকালেন।

“মশাই, শালবন বাজারের রাস্তা কোন দিকে?”

নিবারণ রাস্তা দেখিয়ে দিলেন।

বৃদ্ধ ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলেন।

ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করল।

নিবারণ শেষ কামরার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেখানে কোনও ধূসর কোট পরা মানুষ নেই। কোনও রহস্যময় আলো নেই। কোনও অচেনা ঘোষণা নেই।

শুধু সাধারণ যাত্রীদের একটি সাধারণ ট্রেন।

অদিতি বলল, “আপনি কি মনে করেন, সব শেষ হয়ে গেছে?”

নিবারণ কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলেন, “আমি জানি না। হয়তো ট্রেনটি সত্যিই থেমেছে। হয়তো আমরা এমন কিছু দেখেছিলাম, যার ব্যাখ্যা এখনও পাইনি। কিন্তু আমি একটা বিষয় শিখেছি—কোনও মানুষ নিখোঁজ হলে তাকে শুধু একটা পুরোনো খবরের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। তার পরিচয়, তার পরিবার, তার স্মৃতি—সবকিছুর মূল্য আছে।”

তিনি স্টেশনের বড় ঘড়ির দিকে তাকালেন।

ঘড়িতে রাত ১১টা ৪৮ মিনিট।

সময় এগিয়ে চলেছে।

সেই সময়ই তাঁর পকেটে রাখা পুরোনো ফোনটি বেজে উঠল।

অচেনা নম্বর।

নিবারণ ফোন ধরলেন।

ওপারে কয়েক সেকেন্ড কোনও শব্দ নেই।

তারপর একটি পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল।

“নিবারণ?”

নিবারণের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“দাদা?”

ওপারে মৃদু হাসি।

“হ্যাঁ, আমি। তুই কেমন আছিস?”

নিবারণের চোখে জল এসে গেল।

“তুমি কোথায়?”

সুব্রত বললেন, “এবার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটা কথা বলি। তুই যে আমগাছটার কথা মনে রেখেছিস, সেটার নীচে কাল সকালে দেখা করব।”

“তুমি ফিরেছ?”

“আমি ফিরেছি কি না, সেটা কাল দেখা হলে বুঝবি।”

ফোন কেটে গেল।

নিবারণ অনেকক্ষণ ফোনটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

অদিতি জিজ্ঞাসা করল, “কে ছিল?”

নিবারণ হাসলেন।

“একজন যাত্রী। যে অবশেষে নিজের গন্তব্য খুঁজে পেয়েছে।”

তিনি আর কোনও কথা বললেন না।

দূরে রাতের আকাশে কুয়াশা জমছে। রেললাইন ধরে পরের ট্রেনের আলো এগিয়ে আসছে। শালবন স্টেশনের ঘড়ি নির্ভুলভাবে সময় দেখাচ্ছে।

কিন্তু নিবারণ জানতেন, কিছু রহস্যের উত্তর কেবল ঘড়ির কাঁটায় মেলে না। কিছু উত্তর মেলে মানুষের ফিরে আসায়, ক্ষমা চাওয়ায়, আর হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলায়।

শেষ ট্রেনের যাত্রা শেষ হয়েছে কি না, তা হয়তো কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবে না।

কিন্তু যে মানুষগুলি এত বছর ধরে নিজেদের অতীতের কাছে বন্দি ছিল, তারা অন্তত এবার ভবিষ্যতের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে।

আর সেটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় ফিরে আসা।

— সমাপ্ত —

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *