শহরের এক ব্যস্ত হাসপাতালের শিশু বিভাগে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসত। কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউ প্রিয়জনের পাশে দাঁড়াতে, আবার কেউ জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়ের সঙ্গে লড়াই করতে। সেই হাসপাতালেরই একটি ছোট ঘরে কাজ করতেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মালতী।
মালতীর কাজ ছিল মেঝে পরিষ্কার রাখা, বিছানার চারপাশ গোছানো এবং হাসপাতালের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা। কাজের চাপ ছিল প্রচুর, তবু তিনি কখনও কাউকে বিরক্ত মুখে উত্তর দিতেন না। বিশেষ করে শিশুদের দেখলে তাঁর মুখে অদ্ভুত এক মায়া ফুটে উঠত।
একদিন শিশু বিভাগে ভর্তি হল আট বছরের ছেলে অর্ক। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তাকে অনেকটা সময় হাসপাতালেই থাকতে হচ্ছিল। অন্য বাচ্চাদের মতো বাইরে দৌড়ে খেলা, স্কুলে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তার ছিল না।
অর্কের বাবা প্রতিদিন অফিস থেকে এসে ছেলের পাশে বসতেন। মা হাসপাতালেই থাকতেন। তাঁরা যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন ছেলেকে আনন্দে রাখতে, কিন্তু অর্কের মন ক্রমশ বিষণ্ণ হয়ে উঠছিল।
এক সকালে মালতী ঘর পরিষ্কার করতে এসে দেখলেন, অর্ক জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “কী দেখছিস বাবা?”
অর্ক বলল, “আকাশটা।”
মালতী জানালার বাইরে তাকালেন। হাসপাতালের পাশের উঁচু বাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে সামান্য আকাশ দেখা যাচ্ছিল।
অর্ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে অনেক বড় আকাশ দেখা যায়। এখানে আকাশটাও যেন ছোট হয়ে গেছে।”
মালতী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর কাজ শেষ করে চলে গেলেন।
পরদিন সকালে তিনি ফিরে এলেন একটি ছোট বাক্স নিয়ে। বাক্সের মধ্যে ছিল রঙিন কাগজ, পেনসিল, কয়েকটি পুরোনো পত্রিকা আর আঠা।
অর্ক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “এগুলো কী?”
মালতী বললেন, “আজ আমরা নিজেরাই একটা আকাশ বানাব।”
তিনি অর্ককে সঙ্গে নিয়ে কাগজ কেটে নীল মেঘ, সাদা তুলোর মতো মেঘ আর নানা রঙের পাখি তৈরি করতে শুরু করলেন। অর্ক প্রথমে অনিচ্ছা নিয়ে বসেছিল, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখে আনন্দ ফিরে এল।
দুজন মিলে একটি বড় কাগজে নীল রং লাগাল। তার ওপর আঁকল সূর্য, মেঘ, পাখি আর দূরে উড়ে যাওয়া একটি ঘুড়ি।
কাজ শেষ হলে মালতী ছবিটি অর্কের বিছানার সামনে দেয়ালে লাগিয়ে দিলেন।
অর্ক ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এটা তো আমার নিজের আকাশ!”
সেদিন থেকে প্রতিদিন নতুন কিছু তৈরি করা তাদের অভ্যাস হয়ে গেল। কখনও কাগজের নৌকা, কখনও রঙিন মাছ, কখনও আবার কল্পনার বাগান। মালতী কাজের ফাঁকে সময় পেলেই অর্কের ঘরে এসে বসতেন।
ধীরে ধীরে পাশের বিছানার শিশুরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। কেউ ছবি আঁকল, কেউ কাগজ ভাঁজ করে পাখি বানাল। শিশু বিভাগের একটি কোণ যেন ছোট্ট সৃজনশীল জগতে পরিণত হল।
একদিন হাসপাতালের এক চিকিৎসক সেই ঘরে এসে দৃশ্যটি দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি দেখলেন, যে শিশুরা কয়েক দিন আগেও চুপচাপ শুয়ে থাকত, তারা আজ নিজেদের তৈরি জিনিস নিয়ে গল্প করছে।
চিকিৎসক মালতীকে বললেন, “আপনি তো ওদের জন্য অনেক বড় কাজ করছেন।”
মালতী লজ্জা পেয়ে বললেন, “আমি তো শুধু ওদের মন ভালো রাখার চেষ্টা করি।”
চিকিৎসক জানালেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুদের জন্য একটি ছোট সৃজনশীল কার্যক্রম শুরু করতে চায়। মালতীর অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের কথা শুনে তাঁকে সেই কাজে সাহায্য করার অনুরোধ করা হল।
মালতী প্রথমে ভয় পেয়েছিলেন। তিনি তো কোনও শিল্পী নন, কোনও প্রশিক্ষণও নেই। কিন্তু অর্কের মা তাঁকে সাহস দিয়ে বললেন, “শিশুরা আপনার সঙ্গে আনন্দ পায়। সেটাই তো সবচেয়ে বড় যোগ্যতা।”
কিছুদিন পর হাসপাতালের শিশু বিভাগে নিয়মিত ছবি আঁকা, কাগজের কাজ এবং গল্প বলার সময় নির্ধারিত হল। স্বেচ্ছাসেবীরাও এগিয়ে এলেন।
অর্ক সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার দিন মালতীর হাতে একটি ছবি তুলে দিল। ছবিতে ছিল একটি বড় নীল আকাশ। আকাশের মাঝখানে লেখা—‘মালতী মাসি, তুমি আমাকে আকাশ দেখিয়েছ।’
মালতী ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখে জল এসে গেল।
তিনি জানতেন, অর্ক আবার নিজের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে বিশাল আকাশ দেখতে পাবে। কিন্তু হাসপাতালের সেই ছোট ঘরে তৈরি হওয়া আকাশটি হয়তো তার মনে অনেক দিন থেকে যাবে।
আর মালতীর কাছে সেই দিন থেকে পরিষ্কার হয়ে গেল—মানুষের কাজের মূল্য শুধু তার পদবি কিংবা বেতনে মাপা যায় না। কখনও কখনও একটি ছোট উদ্যোগ, সামান্য সময় আর একটু ভালোবাসা কারও কঠিন দিনকে সহনীয় করে তুলতে পারে।
শিক্ষা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সব সমস্যা দূর করা সম্ভব না হলেও, ভালোবাসা ও সৃজনশীলতার সাহায্যে মানুষের মনে আনন্দ ও আশার জায়গা তৈরি করা যায়।