Categories
অনুগল্প বিবিধ

একটি বেঞ্চের বিচার।

শহরের এক সরকারি আদালতের সামনে ছিল বিশাল এক বটগাছ। তার ছায়ায় রাখা কাঠের বেঞ্চটিতে প্রতিদিন নানা মানুষ এসে বসতেন। কেউ মামলার তারিখের অপেক্ষায়, কেউ আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করতে, আবার কেউ নিছক একটু বিশ্রাম নিতে।

বেঞ্চটির পাশেই ছোট্ট একটি চায়ের দোকান ছিল। দোকান চালাতেন শম্ভুনাথ। তিনি বহু বছর ধরে আদালতের মানুষের আসা-যাওয়া দেখেছেন। কে ধনী, কে গরিব, কে অপরাধী বলে অভিযুক্ত, আর কে নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করতে মরিয়া—সবই তাঁর চোখের সামনে ঘটত।

একদিন সকালে বেঞ্চটিতে এসে বসলেন এক বৃদ্ধ। পরনে সাধারণ ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতে পুরোনো একটি কাপড়ের ব্যাগ। তাঁর মুখে গভীর উদ্বেগের ছাপ।

কিছুক্ষণ পর দামি পোশাক পরা এক ব্যক্তি এসে বেঞ্চের অন্য প্রান্তে বসলেন। তিনি ফোনে কথা বলতে বলতে বিরক্ত হয়ে বললেন, “এই বেঞ্চে এত লোক বসে থাকে কেন? আদালতের সামনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বলে কিছু নেই!”

বৃদ্ধটি একটু সরে বসলেন। কিন্তু লোকটি তাতেও সন্তুষ্ট হলেন না।

“আপনার মতো লোকেদের জন্যই সব জায়গার পরিবেশ নষ্ট হয়,” তিনি বললেন।

বৃদ্ধ কোনও উত্তর দিলেন না। মাথা নিচু করে নিজের ব্যাগটি আঁকড়ে ধরলেন।

দূর থেকে দৃশ্যটি দেখছিলেন শম্ভুনাথ। তাঁর মনে হল, লোকটির কথায় বৃদ্ধের চেয়ে তাঁর নিজের অহংকারই বেশি প্রকাশ পাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর আদালতের কর্মচারী এসে বৃদ্ধকে ডাকলেন। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাগ থেকে একটি কাগজ বের করতে গিয়ে কয়েকটি পুরোনো ছবি মাটিতে পড়ে গেল।

শম্ভুনাথ দৌড়ে গিয়ে ছবিগুলো তুলে দিলেন। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল এক তরুণী, এক যুবক এবং ছোট্ট একটি শিশু। ছবির কোণগুলো বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল।

বৃদ্ধ কৃতজ্ঞ চোখে বললেন, “এগুলো আমার পরিবারের ছবি। আজ বহু বছর পর ছেলেকে দেখতে এসেছি।”

শম্ভুনাথ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনার ছেলে এখানে?”

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন। “একটি মামলায় তার বিচার চলছে। অনেক বছর আগে সে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল। এখন সে কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি না, সে আমার সঙ্গে দেখা করবে কি না। তবু একবার দেখতে এসেছি।”

শম্ভুনাথ আর কিছু জিজ্ঞাসা করলেন না।

ঠিক তখনই সেই দামি পোশাক পরা ব্যক্তিটি আবার বেঞ্চের কাছে এলেন। তিনি বৃদ্ধের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, “আপনি কি আপনার ছেলের নাম বলবেন?”

বৃদ্ধ নামটি বলতেই লোকটির মুখ বদলে গেল।

তিনি ছিলেন অভিযুক্ত ছেলেটির আইনজীবী।

“আপনি কি তাঁর বাবা?” তিনি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন।

বৃদ্ধ মাথা নাড়লেন।

আইনজীবী কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, “আপনার ছেলে আমার সঙ্গে কথা বলার সময় কখনও পরিবারের কথা বলেনি। শুধু একবার বলেছিল, জীবনে এমন কিছু ভুল করেছে যার জন্য সে নিজের বাবার সামনে দাঁড়াতে পারে না।”

বৃদ্ধের চোখ ভিজে উঠল। “আমি ওকে শাস্তি দিতে আসিনি। শুধু বলতে চাই, ভুল করলে তার দায় নিতে হয়। কিন্তু ভুলের জন্য মানুষকে সারাজীবন একা থাকতে হবে, এমন নয়।”

আইনজীবী কোনও উত্তর দিলেন না। তিনি আদালতের ভেতরে চলে গেলেন।

দুপুরের দিকে তিনি ফিরে এসে জানালেন, ছেলেটি বাবার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হয়েছে।

বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর হাত কাঁপছিল। তিনি একবার বেঞ্চটির দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে আদালতের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।

সেদিন বিকেলে শম্ভুনাথ দেখলেন, সেই আইনজীবী আবার বেঞ্চে এসে বসেছেন। তাঁর দামি পোশাক আগের মতোই ছিল, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেছে।

তিনি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, “শম্ভুদা, আজ একটা কথা বুঝলাম। আমরা মানুষের পোশাক দেখে তার সম্মান নির্ধারণ করি, অথচ তার জীবনের গল্পটা জানার চেষ্টা করি না।”

শম্ভুনাথ হেসে বললেন, “বেঞ্চে বসলে সবাই সমান জায়গা পায় বাবু। বিচার করার আগে মানুষকে একটু সময় দেওয়া দরকার।”

এরপর থেকে আইনজীবীটি আদালতের সামনে কাউকে ছোট করে কথা বলতেন না। আর সেই বেঞ্চটি তাঁর কাছে শুধু বসার জায়গা রইল না—হয়ে উঠল নিজের ভুল চিনে নেওয়ার একটি নীরব স্মারক।

বটগাছের নিচে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ বসতেন। তাঁদের সবার বিচার আদালতে হত না। কখনও কখনও নিজের মনের আদালতে দাঁড়িয়েও মানুষকে নিজের আচরণের জবাব দিতে হয়।

শিক্ষা: মানুষের বাহ্যিক পরিচয় দেখে তাকে বিচার করা উচিত নয়। প্রত্যেকের জীবনের পেছনে এমন একটি গল্প থাকে, যা না জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া অন্যায় হতে পারে।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *