Categories
নারী কথা প্রবন্ধ

মহীয়সী নারী: দিপা কর্মকার—ভারতীয় জিমন্যাস্টিকসে অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অনন্য কাহিনি।।

কোনও কোনও মানুষের জীবন আমাদের শেখায়, সাফল্যের জন্য সব সময় বড় শহর, উন্নত পরিকাঠামো কিংবা সীমাহীন সুযোগের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন স্বপ্ন দেখার সাহস, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলার মানসিকতা। ভারতের ক্রীড়াজগতে এমনই এক অনুপ্রেরণার নাম দিপা কর্মকার। তিনি ভারতের অন্যতম পরিচিত জিমন্যাস্ট এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতীয় মহিলাদের জিমন্যাস্টিকসকে নতুন পরিচিতি দিয়েছেন।

ত্রিপুরার আগরতলা থেকে উঠে এসে বিশ্বজুড়ে নিজের প্রতিভার পরিচয় দিয়েছিলেন দিপা। যে খেলায় সামান্য ভুলও গুরুতর চোটের কারণ হতে পারে, সেই জিমন্যাস্টিকসে তিনি কঠোর অনুশীলন, আত্মবিশ্বাস এবং অসাধারণ শারীরিক দক্ষতার মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করেন।

২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে তাঁর পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। তিনি পদক জিততে না পারলেও ভল্ট ইভেন্টের ফাইনালে চতুর্থ স্থান অর্জন করে দেশবাসীর মন জয় করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সাফল্য এবং দীর্ঘ বিরতির পর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি আবারও প্রমাণ করেন যে, একজন ক্রীড়াবিদের পরিচয় শুধু পদক দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

দিপা কর্মকারের জীবন তাই শুধু খেলাধুলার গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় এবং সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করার এক অনন্য কাহিনি।

শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ

দিপা কর্মকারের জন্ম ১৯৯৩ সালের ৯ আগস্ট, ত্রিপুরার আগরতলায়। তাঁর বাবা দুলাল কর্মকার ভারোত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ত্রিপুরার ক্রীড়াজগতের পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। বাবার ক্রীড়া-অভিজ্ঞতা দিপার জীবনে প্রভাব ফেলেছিল।

ছোটবেলা থেকেই দিপার শরীরচর্চা ও খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু জিমন্যাস্টিকস এমন একটি খেলা, যেখানে শৈশব থেকেই নিয়মিত প্রশিক্ষণ, শারীরিক নমনীয়তা, ভারসাম্য এবং নিখুঁত কৌশল আয়ত্ত করা প্রয়োজন।

দিপার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। ভারতের বড় ক্রীড়াকেন্দ্রগুলির তুলনায় ত্রিপুরায় জিমন্যাস্টিকসের সুযোগ সীমিত ছিল। তবু তিনি অনুশীলন চালিয়ে যান।

তাঁর পরিবার তাঁকে উৎসাহ জুগিয়েছিল। এই সমর্থন এবং নিজের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি তাঁকে কঠিন প্রশিক্ষণের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।

জিমন্যাস্টিকসের জগতে প্রবেশ

জিমন্যাস্টিকস এমন একটি ক্রীড়া, যেখানে শক্তি, নমনীয়তা, ভারসাম্য, ক্ষিপ্রতা এবং শরীরের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়। একজন জিমন্যাস্টকে প্রতিটি কৌশল বহুবার অনুশীলন করতে হয়, যাতে প্রতিযোগিতার সময় তা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা যায়।

দিপা ছোটবেলা থেকেই এই কঠিন প্রশিক্ষণের মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে ওঠেন। তাঁর কোচ বিশ্বেশ্বর নন্দী তাঁর প্রতিভা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্রশিক্ষণের সময় তাঁকে শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন জটিল কৌশল আয়ত্ত করতে হয়েছিল।

জিমন্যাস্টিকসে সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু সাহস থাকলেই চলে না। শরীরের প্রতিটি নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করা, গতির সঠিক ব্যবহার এবং অবতরণের সময় ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দিপা ধীরে ধীরে নিজের দক্ষতা বাড়াতে থাকেন। বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং ভারতের অন্যতম সম্ভাবনাময় জিমন্যাস্ট হিসেবে পরিচিতি পেতে শুরু করেন।

সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এগিয়ে চলা

দিপা কর্মকারের ক্রীড়াজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সীমিত সুযোগের মধ্যেও নিজেকে তৈরি করে নেওয়া। আন্তর্জাতিক মানের জিমন্যাস্টিকসের জন্য বিশেষ যন্ত্রপাতি, নিরাপদ প্রশিক্ষণব্যবস্থা এবং দক্ষ কোচের প্রয়োজন হয়।

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে জিমন্যাস্টিকস ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়নি। ফলে এই খেলায় প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার সুযোগও তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।

দিপাকে এই বাস্তবতার মধ্যেই নিজের দক্ষতা বাড়াতে হয়েছে। তিনি নিয়মিত অনুশীলন, শারীরিক প্রস্তুতি এবং কৌশলগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করার উপযোগী হয়ে ওঠেন।

তাঁর যাত্রা দেখিয়েছে, কোনও খেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য শুধু একজন প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ যথেষ্ট নন; প্রয়োজন প্রশিক্ষক, পরিবার, ক্রীড়া সংস্থা এবং সমাজের সম্মিলিত সমর্থন।

২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমসে সাফল্য

দিপা কর্মকারের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়তে শুরু করে ২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমসে। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতায় তিনি মহিলাদের ভল্ট ইভেন্টে ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন।

এই সাফল্য ছিল ঐতিহাসিক। কমনওয়েলথ গেমসে জিমন্যাস্টিকসে পদক জয় করে দিপা দেখিয়ে দেন যে, ভারতীয় জিমন্যাস্টরাও আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য অর্জন করতে পারেন।

ভল্ট ইভেন্টে প্রতিযোগীকে দৌড়ে এসে একটি নির্দিষ্ট যন্ত্রের সাহায্যে লাফ দিতে হয় এবং বাতাসে জটিল কৌশল সম্পন্ন করে নিরাপদে অবতরণ করতে হয়। এই ইভেন্টে শক্তি ও গতির পাশাপাশি শরীরের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দিপার ব্রোঞ্জ পদক তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে ভারতীয় ক্রীড়া মহলেও তাঁর প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।

২০১৫ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ

২০১৫ সালে দিপা কর্মকার বিশ্ব জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন। এই প্রতিযোগিতায় তিনি ভল্ট ইভেন্টে অষ্টম স্থান অর্জন করেন।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো পারফরম্যান্স তাঁকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও প্রতিষ্ঠিত করে। এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের সেরা জিমন্যাস্টরা অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজের অবস্থান তৈরি করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই সময়ে দিপা এমন একটি কঠিন ভল্ট কৌশল অনুশীলন করছিলেন, যা আন্তর্জাতিক জিমন্যাস্টিকসে বিশেষভাবে পরিচিত। কৌশলটি ছিল ‘প্রোদুনোভা ভল্ট’। রাশিয়ার প্রাক্তন জিমন্যাস্ট ইয়েলেনা প্রোদুনোভার নাম অনুসারে এই ভল্টের নামকরণ করা হয়েছে।

এই কৌশলে সামনের দিকে দৌড়ে এসে হাতের সাহায্যে ভল্ট টেবিল থেকে ধাক্কা নিয়ে বাতাসে সামনের দিকে দুবার গড়িয়ে অবতরণ করতে হয়। এটি অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভল্ট হিসেবে পরিচিত।

দিপার এই কৌশল আয়ত্ত করার প্রচেষ্টা তাঁর সাহস ও প্রশিক্ষণের গভীরতা তুলে ধরে। তবে এই ধরনের কঠিন কৌশল সম্পন্ন করার জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা অপরিহার্য।

রিও অলিম্পিক ২০১৬: ইতিহাসের দরজায় ভারত

দিপা কর্মকারের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় হলো ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিক। তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা জিমন্যাস্ট হিসেবে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেন।

এই যোগ্যতা অর্জন করাই ছিল বিরাট সাফল্য। কারণ জিমন্যাস্টিকসের মতো প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অলিম্পিকে পৌঁছতে হলে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, আন্তর্জাতিক মানের পারফরম্যান্স এবং কঠোর বাছাইপর্ব অতিক্রম করতে হয়।

রিও অলিম্পিকে দিপা মহিলাদের ভল্ট ইভেন্টে ফাইনালে পৌঁছান। ফাইনালে তিনি চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। পদক থেকে অল্পের জন্য দূরে থাকলেও তাঁর পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে ওঠে।

ভারতের বহু মানুষ প্রথমবারের মতো জিমন্যাস্টিকসের একটি ইভেন্ট নিয়ে গভীর আগ্রহ দেখান। দিপার নাম সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয় এবং বহু তরুণ-তরুণী এই খেলার প্রতি আকৃষ্ট হন।

তাঁর সাফল্যের বিশেষত্ব হলো, তিনি এমন একটি খেলায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, যেখানে দেশের আন্তর্জাতিক সাফল্য তখনও সীমিত ছিল।

পদক না পেলেও কেন তিনি বিজয়ী

ক্রীড়াজগতে পদক গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু প্রতিটি সাফল্যের মূল্য শুধু পদকের রং দিয়ে বিচার করা যায় না। দিপা কর্মকার রিও অলিম্পিকে পদক জিততে পারেননি, কিন্তু তাঁর চতুর্থ স্থান অর্জন ছিল অসাধারণ কৃতিত্ব।

অলিম্পিকের মতো মঞ্চে বিশ্বের সেরা প্রতিযোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ফাইনালে পৌঁছানোই কঠিন। সেখানে চতুর্থ স্থান অর্জন করা তাঁর দক্ষতা, প্রস্তুতি এবং মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।

তাঁর পারফরম্যান্স ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসন ও সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরে—যে খেলাগুলি জনপ্রিয় নয়, সেগুলির উন্নয়নে কি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হচ্ছে?

দিপার সাফল্যের পর জিমন্যাস্টিকস নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। তাঁর কৃতিত্ব দেখিয়ে দেয়, সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে ভারতীয় ক্রীড়াবিদরাও বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় সাফল্যের কাছাকাছি পৌঁছতে পারেন।

চোট ও দীর্ঘ প্রত্যাবর্তন

একজন পেশাদার জিমন্যাস্টের জীবন শুধু সাফল্য ও পদকের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম, চোটের ঝুঁকি এবং দীর্ঘ পুনর্বাসনের অভিজ্ঞতা।

দিপা কর্মকারও চোটের সমস্যার মুখোমুখি হন। ২০১৬ সালের অলিম্পিকের পর তাঁর হাঁটুর অস্ত্রোপচার হয়। অস্ত্রোপচারের পর আগের ফিটনেস ও দক্ষতা ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁকে দীর্ঘ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

চোটের পর কোনও ক্রীড়াবিদের পক্ষে আগের পর্যায়ে ফিরে আসা সহজ নয়। শারীরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করার পাশাপাশি মানসিকভাবেও প্রস্তুত হতে হয়। আবার চোট পাওয়ার ভয় কাটিয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।

দিপা ধীরে ধীরে অনুশীলনে ফিরে আসেন এবং নিজের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। তাঁর প্রত্যাবর্তন প্রমাণ করে, দীর্ঘ বিরতি মানেই ক্রীড়াজীবনের সমাপ্তি নয়।

এশিয়ান জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা

২০১৮ সালে দিপা কর্মকার এশিয়ান জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে ভল্ট ইভেন্টে সোনা জয় করেন। এই সাফল্য তাঁর ক্রীড়াজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন।

চোটের পর ফিরে এসে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করা তাঁর জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই জয় দেখিয়ে দেয়, কঠিন সময়ের মধ্যেও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব।

এশিয়ান পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সোনা জয় ভারতীয় জিমন্যাস্টিকসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের ক্রীড়াবিদদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আরও আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে।

২০২৪ সালের প্রত্যাবর্তন ও নতুন অধ্যায়

দীর্ঘ বিরতি ও চোটের সমস্যার পর দিপা কর্মকার আবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্য অর্জন করেন। ২০২৪ সালে তাশখন্দে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সিনিয়র জিমন্যাস্টিকস চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি মহিলাদের ভল্ট ইভেন্টে সোনা জয় করেন।

এই জয় তাঁর ক্রীড়াজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিযোগিতার বাইরে থাকার পর আবারও এশিয়ার সেরা পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করা তাঁর দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় বহন করে।

তবে ২০২৪ সালের অক্টোবরে দিপা কর্মকার প্রতিযোগিতামূলক জিমন্যাস্টিকস থেকে অবসর ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনের পর এই সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

তাঁর অবসর ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে আবেগের মুহূর্ত হলেও, তাঁর অর্জন ভারতীয় জিমন্যাস্টিকসের ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকবে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

দিপা কর্মকারের সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সম্মান লাভ করেছেন। ২০১৫ সালে তাঁকে অর্জুন পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০১৬ সালে তিনি রাজীব গান্ধী খেলরত্ন পুরস্কার লাভ করেন, যা বর্তমানে মেজর ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন নামে পরিচিত।

এই সম্মানগুলি তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের স্বীকৃতি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান হলো, তিনি ভারতীয় জিমন্যাস্টিকসকে সাধারণ মানুষের আলোচনায় নিয়ে এসেছেন।

একটি খেলাকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য কখনো কখনো একজন ক্রীড়াবিদের অসাধারণ পারফরম্যান্সই যথেষ্ট হয়ে ওঠে। দিপা কর্মকারের ক্ষেত্রে তার একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়।

নারীর ক্ষমতায়ন ও ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা

দিপা কর্মকারের জীবন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি এমন একটি খেলায় নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখানে শারীরিক সক্ষমতা ও সাহসের পাশাপাশি মানসিক স্থিরতা অত্যন্ত জরুরি।

ভারতের বহু মেয়ের সামনে এখনও খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধা রয়েছে। পারিবারিক উদ্বেগ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণের অভাব এবং সামাজিক ধারণা অনেক সময় তাঁদের স্বপ্নকে সীমিত করে দেয়।

দিপার সাফল্য দেখিয়েছে, মেয়েরা কঠিনতম ক্রীড়াক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারেন। তবে শুধু অনুপ্রেরণা যথেষ্ট নয়; মেয়েদের জন্য নিরাপদ প্রশিক্ষণকেন্দ্র, দক্ষ কোচ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুবিধা এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভা বিকাশের জন্য ব্যক্তিগত পরিশ্রমের পাশাপাশি উপযুক্ত পরিকাঠামো ও সামাজিক সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে।

নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

দিপা কর্মকারের জীবন থেকে কয়েকটি মূল্যবান শিক্ষা পাওয়া যায়।

প্রথমত, সীমাবদ্ধতাকে চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নেওয়া উচিত নয়। ছোট শহর বা সীমিত সুযোগের মধ্য থেকেও বড় স্বপ্ন দেখা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, সাফল্যের জন্য ধারাবাহিক অনুশীলন অপরিহার্য। প্রতিভা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সঙ্গে শৃঙ্খলা ও কঠোর পরিশ্রম যুক্ত হয়।

তৃতীয়ত, চোট বা ব্যর্থতার পরেও নতুন করে শুরু করা যায়। জীবনের কোনও একটি কঠিন সময় ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনাকে শেষ করে দেয় না।

চতুর্থত, সাফল্য মানে শুধু পদক জয় নয়। নতুন পথ তৈরি করা, অন্যদের অনুপ্রাণিত করা এবং কোনও খেলাকে মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলাও বড় অবদান।

উপসংহার

দিপা কর্মকারের জীবন ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। ত্রিপুরার আগরতলা থেকে উঠে এসে তিনি বিশ্ব জিমন্যাস্টিকসের মঞ্চে ভারতের পরিচিতি বাড়িয়েছেন। ২০১৪ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ, ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে চতুর্থ স্থান, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা—তাঁর ক্রীড়াজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলির মধ্যে রয়েছে।

চোট, দীর্ঘ বিরতি এবং কঠিন প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, বড় সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং নিজের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস।

দিপা কর্মকার শুধু একজন সফল জিমন্যাস্ট নন; তিনি সেই সাহসী নারীর প্রতীক, যিনি সীমিত সুযোগকে অতিক্রম করে ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে নিজের জন্য এক অনন্য স্থান তৈরি করেছেন।

Share This

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *