১. ডাকবাক্সের ভিতরে
ডাকপিয়নটি মারা যাওয়ার তিন দিন পর তাঁর বাড়িতে একটি চিঠি এসে পৌঁছল।
চিঠিটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। হলুদ হয়ে যাওয়া খাম, কোণায় পুরোনো ডাকটিকিট, আর নীল কালিতে লেখা একটি ঠিকানা। খামের ওপর প্রাপকের নাম—ঋতুপর্ণা দত্ত। ঠিকানাটি পশ্চিম মেদিনীপুরের ছোট্ট শহর চন্দ্রকোণার একটি পুরোনো বাড়ির।
কিন্তু চিঠিটির তারিখ দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।
বারো বছর আগের তারিখ।
আর প্রেরকের নামের জায়গায় লেখা ছিল—
অর্ক।
অর্ক সেন, যে বারো বছর আগে পাহাড়ি নদীতে ডুবে নিখোঁজ হয়েছিল।
ঋতুপর্ণার বয়স তখন উনিশ। অর্ক ছিল তার কলেজের সহপাঠী। দুজনের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল, আর সেই বন্ধুত্ব যে কখন ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল, তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।
অর্ক নিখোঁজ হওয়ার পর তার দেহ পাওয়া যায়নি। পুলিশ দীর্ঘদিন খোঁজ চালিয়েছিল। পরে সরকারি নথিতে তাকে মৃত বলে ধরে নেওয়া হয়। ঋতুপর্ণা কোনও দিন তা মেনে নিতে পারেনি।
অর্কের পরিবার শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তার বাবা অসুস্থ হয়ে মারা যান। মা এক আত্মীয়ের কাছে চলে যান। আর ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে নিজের জীবন গুছিয়ে নেয়। সে এখন একটি স্কুলে বাংলা পড়ায়। তার বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। পুরোনো বাড়িতে সে একাই থাকে।
বাইরের মানুষ তাকে শান্ত, সংযত, নিজের কাজে ডুবে থাকা একজন নারী বলেই জানে।
কেউ জানে না, প্রতি বছর বর্ষার প্রথম দিনে সে অর্কের পুরোনো ছবিটা বের করে।
কেউ জানে না, তার আলমারির একেবারে নীচের তাকে এখনও রাখা আছে অর্কের দেওয়া একটি শুকনো কৃষ্ণচূড়ার ফুল।
আর কেউ জানে না, বারো বছর আগে অর্ক নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের রাতে ঋতুপর্ণা তাকে একটি কথা বলেছিল, যার উত্তর সে কোনও দিন পায়নি।
সেদিন অর্ক বলেছিল, ‘আমি ফিরে এসে সব বলব।’
তারপর সে আর ফেরেনি।
চিঠিটা হাতে নিয়ে ঋতুপর্ণা অনেকক্ষণ বসে রইল।
খামের গায়ে অর্কের হাতের লেখা। সেই একই বাঁকানো অক্ষর, একইভাবে ‘ঋ’ লেখার অভ্যাস। এত বছর পরেও সে ভুল করতে পারে না।
কাঁপা হাতে খামটা খুলল।
ভিতরে মাত্র একটি পাতার চিঠি।
‘ঋতু,
যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছয়, তাহলে বুঝবে আমি আমার কথা রাখতে পারিনি। আমি ফিরে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কেউ আমাকে ফিরতে দেয়নি।
তুমি আমাকে বিশ্বাসঘাতক ভেবো না।
আর একটা কথা মনে রেখো—যে রাতে আমি নিখোঁজ হয়েছিলাম, সেই রাতে নদীর ধারে আমরা দুজন ছাড়া আরও একজন ছিল।
তুমি তাকে দেখেছিলে। কিন্তু তোমার মনে নেই।
তোমার ঘরের পুরোনো দেওয়ালঘড়ির পিছনে যে চাবিটা লুকিয়ে রেখেছিলাম, সেটা এখনও আছে কি না দেখে নিও।
চাবিটা পেলে রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে এসো।
কাউকে সঙ্গে এনো না।
বিশ্বাস করো, ঋতু, আমি তোমাকে কখনও মিথ্যে বলিনি।
— অর্ক।’
চিঠিটা পড়া শেষ করে ঋতুপর্ণা বুঝতে পারল, তার হাত কাঁপছে।
দেওয়ালঘড়ির পিছনে চাবি?
সে তো কোনও দিন এমন চাবির কথা শোনেনি।
অথচ ঘড়িটা এখনও তার ঘরে রয়েছে। বহু বছর আগে বাবা কিনেছিলেন। ঘড়িটা চলে না, তবু সে ফেলে দেয়নি। অর্ক একবার মজা করে বলেছিল, ‘এই ঘড়ির মধ্যে যদি কোনও গুপ্তধন লুকিয়ে রাখি, তুই খুঁজে পাবি?’
ঋতুপর্ণা হেসে বলেছিল, ‘তুই গুপ্তধন রাখার আগে নিজেই হারিয়ে যাবি।’
কথাটা মনে পড়তেই তার বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে ঘড়িটা দেওয়াল থেকে নামাল।
পিছনে ধুলো জমেছে। কাঠের খোলের নীচের দিকে একটা ছোট্ট ফাঁক। আঙুল ঢুকিয়ে টানতেই বেরিয়ে এল কালো কাপড়ে মোড়া একটি চাবি।
চাবির সঙ্গে বাঁধা ছোট্ট কাগজে লেখা—
‘বারো বছর অপেক্ষা করো।’
ঋতুপর্ণা চেয়ারে বসে পড়ল।
বারো বছর আগে অর্ক এই চাবি লুকিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু কেন?
আর চিঠিটা এত দিন পরে এল কীভাবে?
২. মৃত ডাকপিয়নের শেষ পথ
পরদিন সকালে ঋতুপর্ণা গেল স্থানীয় ডাকঘরে।
চিঠিটা যে ডাকপিয়নের হাত দিয়ে এসেছে, তাঁর নাম ছিল হরিপদ মাইতি। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে চিঠি বিলি করেছেন। তিন দিন আগে নিজের বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
ডাকঘরের বর্তমান কর্মী সুমিত প্রথমে চিঠিটা দেখে বলল, ‘এটা তো পুরোনো চিঠি। নতুন করে কীভাবে এল, বুঝতে পারছি না।’
‘খামের ওপর কোনও নতুন ডাকঘরের সিল নেই,’ বলল ঋতুপর্ণা। ‘তাহলে এটা আপনারা পেলেন কোথায়?’
সুমিত রেজিস্টার ঘাঁটতে লাগল।
‘হরিপদ কাকু মারা যাওয়ার আগের দিন কিছু পুরোনো চিঠি জমা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এগুলো ঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দিতে হবে। আমরা ভেবেছিলাম, হয়তো কোনও পুরোনো বস্তা থেকে পাওয়া।’
‘আর কোনও চিঠি ছিল?’
‘ছিল। বেশ কয়েকটা। কিন্তু সেগুলো অন্য এলাকার।’
ঋতুপর্ণা একটু ঝুঁকে বলল, ‘হরিপদবাবু কি এই চিঠির কথা কিছু বলেছিলেন?’
সুমিত মাথা নাড়ল।
‘শুধু বলেছিলেন, এই চিঠিটা যেন দেরি না করে পৌঁছে যায়। আর একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন।’
‘কী কথা?’
‘বলেছিলেন, “চিঠির মানুষটা ফিরে এসেছে।”’
ঋতুপর্ণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘হরিপদবাবুর বাড়ি কোথায়?’
সুমিত ঠিকানাটা লিখে দিল।
বিকেলে ঋতুপর্ণা গেল হরিপদ মাইতির বাড়িতে। ছোট্ট টালির ঘর, সামনে তুলসীমঞ্চ, উঠোনে শুকোতে দেওয়া কাপড়। দরজায় বসে ছিলেন তাঁর বিধবা মেয়ে মঞ্জু।
ঋতুপর্ণা নিজের পরিচয় দিয়ে চিঠির কথা বলতেই মঞ্জু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
‘বাবা শেষ কয়েক মাস খুব অদ্ভুত আচরণ করছিলেন। মাঝরাতে উঠে পুরোনো চিঠির বাক্স খুলতেন। কখনও কখনও বলতেন, “আমি আর দেরি করতে পারব না। ওদের কাছে চিঠিগুলো পৌঁছে দিতেই হবে।”’
‘ওদের মানে?’
‘জিজ্ঞাসা করলেই চুপ করে যেতেন।’
মঞ্জু ভিতরে গিয়ে একটি পুরোনো টিনের বাক্স নিয়ে এল।
‘বাবা মারা যাওয়ার আগে এটা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, কেউ যদি চিঠি নিয়ে আসে, তাকে বাক্সটা দেখাতে।’
বাক্সের ভিতরে অনেকগুলো খাম। অধিকাংশই পুরোনো, কিছু খোলা, কিছু বন্ধ। প্রত্যেকটির গায়ে আলাদা নাম লেখা।
ঋতুপর্ণা একটা খাম তুলে নিল।
তার নিজের নাম।
আরেকটি খামে লেখা—অর্ক সেন।
তৃতীয় খামটিতে লেখা—‘যে সত্য জানে’।
তার বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল।
‘এই চিঠিগুলো কত দিনের পুরোনো?’
মঞ্জু বলল, ‘বাবা বলতেন, সব চিঠি একই রাতে লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো কখনও বিলি করা যায়নি।’
‘কেন?’
মঞ্জু মাথা নাড়ল।
‘বাবা বলেননি। শুধু মৃত্যুর আগের রাতে একটা কথা বলেছিলেন—“নদী কাউকে ফেরত দেয় না, কিন্তু কখনও কখনও নদীর কাছ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে হয়।”’
ঋতুপর্ণা টিনের বাক্সের দিকে তাকিয়ে রইল।
অর্কের চিঠির পাশে আরও একটি খাম রয়েছে। তার ওপর লেখা—
‘ঋতুপর্ণার জন্য। অর্কের চিঠি পড়ার পর খুলবে।’
সে খামটা হাতে নিল।
ভিতরে একটি ছোট্ট কাগজ।
‘যদি অর্কের চিঠি পেয়ে থাকো, তাহলে রাত বারোটায় পুরোনো ডাকঘরে যেয়ো না।
ওখানে যে অপেক্ষা করছে, সে অর্ক নয়।’
ঋতুপর্ণার হাত থেকে কাগজটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
দুটি চিঠি।
একটি তাকে পুরোনো ডাকঘরে যেতে বলছে।
অন্যটি নিষেধ করছে।
দুটিতেই তার নাম।
আর দুটিই যেন অর্ককে ঘিরে।
৩. বারো বছর আগের নদী
সন্ধ্যার পর ঋতুপর্ণা পুরোনো ছবির বাক্স খুলল।
অর্কের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো এখনও আছে। কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান, পিকনিক, নদীর ধারে বসে থাকা, বইমেলায় ঘোরার ছবি। প্রতিটি ছবিতে অর্কের চোখে যেন কোনও গোপন কথা লুকিয়ে আছে।
একটি ছবির দিকে তাকিয়ে সে থেমে গেল।
ছবিটা তোলা হয়েছিল অর্ক নিখোঁজ হওয়ার আগের দিন।
নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে তারা দুজন। পিছনে কাশফুল, দূরে ছোট্ট নৌকা। ছবিতে ঋতুপর্ণা হাসছে, অর্ক তাকিয়ে আছে তার দিকে।
কিন্তু ছবির একেবারে ডানদিকে ঝাপসা একটি অবয়ব দেখা যাচ্ছে।
একজন মানুষ।
মুখ বোঝা যাচ্ছে না।
ঋতুপর্ণা ছবিটা আলোয় ধরল। বড় করে দেখার চেষ্টা করল।
লোকটির পরনে সাদা শার্ট। ডান হাতে কালো ছাতা।
তার মনে পড়ল, সেদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল। বৃষ্টি হয়নি। তবু নদীর ধারে একজন লোক ছাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে লোকটিকে দেখেছিল।
কিন্তু কে ছিল?
সেদিন অর্ক আচমকা বলেছিল, ‘ঋতু, যদি কোনও দিন আমার কথা ভুলে যাস, তাহলে নদীর কাছে যাস না।’
ঋতুপর্ণা হেসে বলেছিল, ‘নদীর সঙ্গে তোর কী শত্রুতা?’
অর্ক কোনও উত্তর দেয়নি।
বরং তার হাত ধরে বলেছিল, ‘একটা কথা বলবি?’
‘কী?’
‘যদি আমি হারিয়ে যাই, তুই কি আমাকে খুঁজবি?’
ঋতুপর্ণা বলেছিল, ‘তুই হারাবি কেন?’
অর্ক তার দিকে তাকিয়ে ছিল অনেকক্ষণ।
তারপর বলেছিল, ‘কখনও কখনও মানুষ নিজে হারায় না, তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়।’
সেদিন কথাটার মানে বুঝতে পারেনি ঋতুপর্ণা।
আজ বুঝতে পারছে, অর্ক কিছু একটা জানত।
কিছু একটা, যা তার নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে জড়িত।
রাত এগারোটার দিকে সে পুরোনো ডাকঘরের ঠিকানা খুঁজতে বেরোল। ডাকঘরটি বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। শহরের প্রান্তে, নদীর পুরোনো ঘাটের কাছে, ভাঙাচোরা একতলা বাড়ি।
বাড়িটার সামনে পৌঁছে ঋতুপর্ণা থামল।
তার ফোনে সময়—রাত ১১টা ৪৮।
চিঠিতে লেখা ছিল রাত বারোটায় আসতে।
সে ভিতরে ঢুকল না। রাস্তার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি।
ঠিক তখনই একটা মোটরবাইক এসে থামল।
বাইক থেকে নামল এক যুবক। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। মুখে হালকা দাড়ি, পরনে কালো জ্যাকেট। সে চারদিকে তাকিয়ে ডাকঘরের দিকে এগোল।
ঋতুপর্ণা ছায়ার আড়াল থেকে দেখছিল।
যুবকটি দরজায় তিনবার টোকা দিল।
ভিতর থেকে দরজা খুলে গেল।
কেউ যেন তাকে ভিতরে টেনে নিল।
ঋতুপর্ণা আর অপেক্ষা করতে পারল না। সে দৌড়ে দরজার কাছে গেল।
দরজাটা বন্ধ।
ভিতর থেকে কথা শোনা যাচ্ছে।
একটি পুরুষের গলা বলল, ‘তুমি দেরি করে ফেলেছ।’
অন্য কণ্ঠস্বরটি শুনে ঋতুপর্ণার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল।
অর্ক!
‘আমি ফিরে আসতে চাইনি,’ সেই কণ্ঠস্বর বলল। ‘কিন্তু এবার আমাকে আসতেই হল।’
ঋতুপর্ণা দরজায় ধাক্কা দিল।
‘অর্ক!’
ভিতরের কথাবার্তা থেমে গেল।
তারপর একেবারে নীরবতা।
সে আবার ডাকল, ‘অর্ক, আমি ঋতু!’
দরজার ওপাশ থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শব্দ এগিয়ে এল।
কেউ হাতল ধরল।
দরজাটা সামান্য খুলল।
ফাঁক দিয়ে একটি চোখ দেখা গেল।
ঋতুপর্ণা নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইল।
চোখটা অর্কের মতো।
কিন্তু দরজা খুলতেই সে পিছিয়ে গেল।
কারণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি অর্ক নয়।
সে সেই যুবক, যে কিছুক্ষণ আগে মোটরবাইক নিয়ে এসেছিল।
যুবকটি শান্ত গলায় বলল, ‘আপনি ঋতুপর্ণা দত্ত?’
‘হ্যাঁ। অর্ক কোথায়?’
যুবকটি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বলল, ‘অর্ক সেন বারো বছর আগে মারা গেছে।’
ঋতুপর্ণা কেঁপে উঠল।
‘তাহলে আমি ভিতরে ওর গলা শুনলাম কেন?’
যুবকটি উত্তর দিল না।
সে পকেট থেকে একটি ছবি বের করল। ছবিতে তিনজন মানুষ—অর্ক, সেই যুবক এবং সাদা শার্ট পরা একজন অচেনা লোক।
ছবির পিছনে লেখা—
‘যে রাতে একজন নিখোঁজ হয়েছিল, সেদিন আসলে দুজন মারা গিয়েছিল।’
ঋতুপর্ণা ছবিটা আঁকড়ে ধরল।
‘আপনি কে?’
যুবকটি বলল, ‘আমার নাম অয়ন। অর্ক আমার দাদা।’
‘কিন্তু অর্কের তো কোনও ভাই ছিল না!’
অয়ন মৃদু হেসে বলল, ‘সেটাই সবাইকে বিশ্বাস করানো হয়েছিল।’
তারপর সে ডাকঘরের ভিতরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনি যদি সত্য জানতে চান, তাহলে আমার সঙ্গে আসুন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন—আজ রাতের পর আপনি আর কোনও মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারবেন না।’
ঋতুপর্ণা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ভিতরে পা রাখল।
পুরোনো ডাকঘরের মেঝেতে ধুলো জমে আছে। দেয়ালে ঝুলছে ছেঁড়া ক্যালেন্ডার। কাউন্টারের পিছনে একটি কাঠের আলমারি। আলমারির দরজা খোলা, ভিতরে অসংখ্য চিঠি।
প্রতিটি চিঠির গায়ে একটি করে নাম।
ঋতুপর্ণা এগিয়ে গিয়ে দেখল, তার নামও লেখা আছে।
শুধু একটি নয়।
বারোটি খাম।
প্রতিটি খামের ওপর আলাদা তারিখ।
প্রথমটি বারো বছর আগের।
শেষটি আজকের তারিখে লেখা।
সে কাঁপা হাতে শেষ খামটা খুলল।
ভিতরে একটি ছোট্ট কাগজ।
‘ঋতু,
আমি জানি, তুমি এখন এই ঘরে দাঁড়িয়ে আছ।
আমি জানি, তুমি অয়নের সঙ্গে দেখা করেছ।
কিন্তু অয়নকে বিশ্বাস কোরো না।
সে আমার ভাই নয়।
সে-ই সেই মানুষ, যে আমাকে নদীতে ঠেলে দিয়েছিল।
তোমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আমার পরিচয় চুরি করেছে।
আর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যটা হল—
সেদিন নদীর ধারে যে দ্বিতীয় মানুষটি মারা গিয়েছিল, সে ছিল তোমার বাবা।’
ঋতুপর্ণার চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল।
তার বাবা তো মারা গিয়েছিলেন তার জন্মেরও আগে!
তাহলে অর্কের চিঠিতে এই কথা কেন লেখা?
আর চিঠির লেখক যদি সত্যিই অর্ক হয়, তবে সে বারো বছর ধরে কোথায় ছিল?
ঋতুপর্ণা ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
অয়ন তখন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে সেই একই শান্ত হাসি।
‘চিঠিটা পড়েছেন?’ সে জিজ্ঞাসা করল।
ঋতুপর্ণা কোনও উত্তর দিল না।
অয়ন বলল, ‘এবার আপনাকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে।’
‘কোথায়?’
‘নদীর ধারে।’
‘আমি সেখানে যাব না।’
অয়নের হাসি মিলিয়ে গেল।
‘আপনি না গেলেও হবে। কারণ নদী নিজেই আপনার কাছে চলে এসেছে।’
ঠিক তখনই পুরোনো ডাকঘরের সমস্ত জানালা একসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরে থেকে ভেসে এল জলের শব্দ।
প্রথমে মৃদু।
তারপর ক্রমশ প্রবল।
যেন একটা বিশাল নদী ডাকঘরের চারদিক ঘিরে ফেলছে।
ঋতুপর্ণা জানালার দিকে ছুটে গেল।
কাচের ওপারে জল উঠে আসছে।
রাস্তা, গাছ, বাড়ি—সবকিছু জলের নীচে ডুবে যাচ্ছে।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটি ছিল দূরে।
জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একজন মানুষ।
পরনে ভেজা সাদা শার্ট।
ডান হাতে কালো ছাতা।
মুখটা অন্ধকারে ঢাকা।
লোকটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
আর জানালার ওপার থেকে ঋতুপর্ণার নাম ধরে ডাকল—
‘মা!’
ঋতুপর্ণার পা থেকে যেন সমস্ত শক্তি চলে গেল।
কারণ সেই কণ্ঠস্বরটি কোনও অচেনা মানুষের নয়।
সেই কণ্ঠস্বরটি তার নিজের বাবার।
যে বাবাকে সে কোনও দিন দেখেনি।
চলবে…